English Version

আজকের চাকরির খবর লাইভ খেলা দেখুন

‘বর-বউ মিলেই জমজমাট বউ বাজার’


এম আরমান খান জয়,গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: বউ বাজারে চা বিক্রি করছেন একজন নারী। শান্তনু বৈরাগি। শান্তুনু বৈরাগির মতো এ বাজারের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের অধিকাংশই নারী। তাই বাজারের নামও বউ বাজার। তাঁরা বাড়ির কাজ করছেন আবার দোকান চালিয়ে সংসারে রাখছেন অবদান। এলাকার বউরা এই বাজার চালান বিধায় এ বাজারের নাম হয়েছে বউবাজার।

বউবাজারটি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলায় বানিয়ারচরে অবস্থান। বউবাজারের যাত্রা কিন্তু আজকালকের নয়। প্রায় ৩০ বছর আগে এই বউ বাজারের যাত্রা শুরু হয়। একটু চিন্তা করলে বোঝা যায় ৩০ বছর আগে আয় করার সংগ্রামে এক পা এগিয়ে গেছে এই এলাকার নারীরা। পারিবারিক আয়ে পুরুষের পাশাপাশি রাখছেন অবদানও।

কথা হচ্ছিল একজন দোকানি শান্তুনু বৈরাগি সাথে। পান খান তিনি কিন্তু মিষ্টি করে হাঁসেন। হাঁসতে হাঁসতে বললেন, সে ১৯৮৮’র কথা এদিককার লোকজন বানিয়ারচর থেকে প্রায় দেড়-দুই মাইল দূরে জলিলপাড় বাজারে কেনাকাটা জন্য যেত। একদিন জলিলপাড়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে বানিয়ারচরের লোকজনের ঝগড়া বিবাদ বাধে।

এরই জের ধরে জলিলপাড়ের লোকজন হুমকি ও ঘোষনা দেয় যে বানিয়ারচরের কেউ জলিলপাড় বাজারে ব্যবসা বা কেনাকাটা করতে এলে তাঁকে বেঁধে রাখা হবে। এরপর বানিয়ারচরের বাসিন্দারা জলিলপাড় বাজারে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এর কিছুদিন পর থেকেই বানিয়ারচরে বসে এই বউবাজার।

কিন্তু এই দোকানের নাম কেন বউ বাজার হলো সে প্রশ্নোর উত্তর দিলেন এই বাজারের পানের দোকানি দয়মন্তী বৈরাগী। তিনি বলেন, ঘরের পুরুষেরা সকালে কাজে চলে যান। কেউ যান ক্ষেত খামারে আবার কেউ বা অফিসে। সকালের রান্নাবান্নার পর গৃহিণীদের হাতে তেমন কাজ থাকে না তাই কেউ যেমন এখানে শাক-সবজিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করতে আসেন তেমন কিনতেও আসেন অন্যান্য গৃহিনীরা। আমাদের এখানে নারীরাই ক্রেতা আবার নারীরাই বিক্রেতা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এখানে স্থায়ী দোকান রয়েছে অন্তত ১৫০টি। বেশির ভাগ দোকানের বিক্রেতাই নারী। তবে নিজেদের কাজ শেষ করে তাঁদের স্বামীরাও সহযোগিতার হাত বাড়ায়। দুধ, মাছ, শাক-সবজি নিয়ে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে তিন শতাধিক বিক্রেতা এই বাজারে আসেন। তবে এখানে মাছ বা মাংস বিক্রির কাজ নারীরা করেন না।

বউ বাজারের আরেকজন বউ শিলা মন্ডল। তিনি চা বিক্রী করেন। শিলা মন্ডল জানালেন তিনি ১৫ বছর ধরে বাজারে চা বিক্রি করছেন। কোন অসুবিধার মুখোমুখি হন কিনা জিঞ্জাসা করলে একটু অবাক হলেন, পরক্ষণেই বললেন, বাজারের প্রায় সবাই নারী, সবই তো চেনা মুখ, এ কারণে আমাদের কখনো কোনো সমস্যা হয় না। আমরা ভালোই আছি।

বাজারের আরেক বিক্রেতা ডলি রায় প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে এখানে রুটি বিক্রি করেন। তিনি বলেন, রুটির সঙ্গে ডিম ভেজে দিই। অনেকেই তৃপ্তি সহকারে খায়। দেখেও ভালো লাগে। এই বাজারে ব্যবসায়ীদের একটি সমিতিও রয়েছে। নাম ‘বউবাজার বণিক সমিতি’। তবে এইখানে একটু খটকা আছে কারণ সমিতির হর্তাকর্তাদের বেশির ভাগই পুরুষ।

তবে বণিক সমিতির সভাপতি দীপংকর মহন্ত জানান অধিকাংশ বিক্রেতা নারী হলেও সমিতিরি সাথে তাদের কোন ফারাক নেই। তিনি বলে চলেন, আমরা সবাই সবাইকে চিনি ও জানি। তাই বেচা-কেনায় কোনো সমস্যা হয় না। পুরুষেরা সকালে মাঠের কাজে চলে যান। এক বেলা মজুর খেটে একজন পুরুষ আয় করেন ২০০ টাকা। তাঁর বাড়ির উৎপাদিত সবজি ও গরুর দুধ নিয়ে তাঁর স্ত্রী এই বাজারে আসেন। এতে প্রতিটি পরিবারই আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল ও লাভবান হচ্ছে। তিনি জানান যে বাজারটি ক্রমেই জমজমাট হয়ে উঠছে।

জলিলপাড় ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান অখিল বৈরাগী সাথে বাজারের কিছু সুযোগ সুবিধা বিষয়ে কথা বললে তিনি বলেন, বাজারে টিউবওয়েল, শৌচাগারসহ যে সব সমস্যা রয়েছে সে গুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর প্রত্যাশা এই এলাকায় নারীদের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। সব কটি পরিবার আরও স্বচ্ছল হবে। সুখে-শান্তিতে তাঁদের দিন কাটবে। বাজারের নাম বউবাজার। তবে বউদের পাশাপাশি বরদেরও অংশ গ্রহণ আছে। বর-বউ মিলেই জমজমাট বউ বাজার।

বিডিটুডেস /এম, এইচ/ ২৭ অক্টোবর, ২০১৭