English Version

আজকের চাকরির খবর লাইভ খেলা দেখুন

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘মনগড়া’ প্রতিবেদন প্রকাশ


শরিফুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি ‘মনগড়া’ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। আলোচিত সেই তদন্ত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো সেনাবাহিনীর বর্বর গণহত্যা, ধর্ষণ, শিশুহত্যা ও অগ্নিসংযোগ করে বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়াসহ চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সুকৌশলে অস্বীকার করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাখাইনে কোনো রোহিঙ্গাকে হত্যা, বাড়িঘর পুড়ানো, নারীদের ধর্ষণ বা লুটপাটের কোন ঘটনা ঘটায়নি। অথচো মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিরা সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতনের সচিত্র প্রমাণ পেয়েছেন।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সেনাবাহিনীর এই প্রতিবেদনকে বাহিনীটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দূর করার চেষ্টা বলে মনে করছে।

এদিকে জাতিসংঘ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর চালানো নির্যাতনকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বিবিসির প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্যাতনের কিছু চিত্র পেয়েছেন। এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রতিবেদনের কোনো মিল নেই বলেও জানানো হয়েছে।

এর আগেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনকে মিয়ানমারে প্রবেশ করে সঠিক তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গণমাধ্যমের প্রবেশে কড়াকড়ি আছে। সেই সাথে মানবাধিকার সংগঠনগুলো গুগল ম্যাপের সাহায্যে যেসব ছবি সংগ্রহ করেছে সেখানে স্পষ্ট অগ্নিসংযোগ এবং নির্যাতনের চিত্র পেয়েছে।

সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি সফরে রাখাইনে গিয়েছিলেন বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি জোনাথন হেড। সেখানে তিনি রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে পুলিশের সঙ্গে বৌদ্ধ পুরুষদেরও অবস্থান করতে দেখতে পান।

চলতি বছরের আগস্ট থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাড়ে ছয় লাখের উপরে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু। এখন পর্যন্ত সেই ধারা অব্যাহত আছে। আর টেকনাফ নদী পাড়ি দিয়ে আসতে গিয়ে নৌকাডুবিতে নিহত হয়েছেন আরো অন্তত কয়েক’শ রোহিঙ্গারা। এতে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। আবার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শিবিরে এতিম শিশুদের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

উল্লেখ্য, রাখাইনের একটি পুলিশ ফাঁড়িতে চালানো অতর্কিত হামলার জের ধরে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তাদের অত্যাচারে আহত বা বুলেটবিদ্ধ হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানান, স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের সহায়তায় মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ করে এবং নির্বিচারে হত্যা করতে শুরু করে।

তবে ফেসবুকে প্রকাশিত এক পোস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনী জানায়, তারা নিরীহ কোনো গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালায়নি, নারীদের প্রতি কোনো সহিংস আচরণ করেনি। এমনকি তারা সাধারণ গ্রামবাসীকে গ্রেপ্তার, মারধর বা হত্যা করেনি।

এ ছাড়া সাধারণ মানুষের বাড়ি থেকে মূল্যবান সামগ্রী বা গবাদিপশু লুটের বিষয়টিও অস্বীকার করেছে সেনাবাহিনী। মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেওয়া বা সাধারণ মানুষের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধও করেনি বলে ওই পোস্টে দাবি করা হয়েছে।

ফেসবুক পোস্টে আরো বলা হয়, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা এসব ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী। এসব সন্ত্রাসীর ভয়েই লাখো মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে।

এ বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে বোঝাই যায় যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো ইচ্ছা নেই। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব সম্মিলিতভাবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া।

এদিকে, রাখাইন রাজ্যের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর এক জেনারেলকে বদলি করা হয়েছে। তবে তাঁর বদলির কারণ হিসেবে কিছু জানানো হয়নি সরকার।

বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের কড়াকড়ি চার শর্তারোপ এবং আন্তর্জাতিক চাপ এড়ানোর জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মনগড়া এই তদন্ত প্রতিবেদন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এমন অবস্থায় বিশ্ব নেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান মানবাধিকার সংগঠনগুলোর।

বিডিটুডেস/ এস আই/ ১৪ নভেম্বর, ২০১৭