English Version

আজকের চাকরির খবর লাইভ খেলা দেখুন

বাংলাদেশ বদলায়


এক.

শ্রাবণ মাস। বাইরে ঝুমঝুম বৃষ্টি—যাকে বলে রেইনিং কেটস অ্যান্ড ডগস। ‘এমন দিনে তারে বলা যায় এমন ঘনঘোর বরিষায়। ’ বিরামহীন বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খেতে যেমন ইচ্ছা জাগে, তেমনি জাগে লিখতে। বিশেষত কবিতা, গান ও গল্প। অর্থনীতির ছাত্র হলেও কবি কবি মন আর প্রেম প্রেম ভাব যে একেবারেই নেই তা নয়, কারণ অর্থনীতিবিদও তো মানুষ। মানুষের মন থাকে, ভালোবাসা থাকে। যাই হোক, কবিতা, গল্প কিংবা প্রেমপত্র লেখায় আপেক্ষিক সুবিধা নেই বলে ওই প্রচেষ্টা আপাতত স্থগিত। কিন্তু কালের কণ্ঠ পত্রিকা থেকে আসা অনুরোধের কী হবে?

দুই.

যা-ই করি না কেন গান হচ্ছে আমার প্রাণ। গুনগুন করে গান গাই—তো দোষ না, গুণ একমাত্র আল্লাহ মালুম। কেন জানি এই বর্ষণমুখর দিনে কয়টা গান ঘুরেফিরে মনে আসছে—যেমন ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’, ‘তুমি কি সেই আগের মতো আছ নাকি অনেকখানি বদলে গেছ’, ‘তুমি আর সেই তুমি নেই’ এবং ‘পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে।

’ লক্ষ করি যে সব কটি গানই দিল ও দিনবদলের কথা বলে, বলে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার কথা। মানুষের মন যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় পরিবেশ ও পরিপ্রেক্ষিত; বদলায় দেশ, সমাজ এমনকি বিশ্ব। মানুষের আশা ও অভাবের শেষ নেই; একটা মিটে তো অন্যটা মাথা চাড়া দেয়, চাহিদার ক্ষেত্রে বৃদ্ধি ও বদল ঘটে।

তিন.

এসব দিনবদলের কথা নিয়েই আজকের এই নিবন্ধ। সেদিন কোনো এক সভায় এমনতর পরিবর্তনীয় পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে কথা বললেন বিশ্বনন্দিত ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মুহাম্মাদ মুসা। পেশায় চিকিৎসক কিন্তু একজন অনলবর্ষী বক্তা। তাঁর বক্তব্য যতটুকু বুঝেছি তা-ই তুলে ধরছি, কারণ অন্তত আমার কাছে মনে হয়েছে, সভায় উপস্থাপিত পর্যবেক্ষণগুলো শুধু নিজের প্রতিষ্ঠান বা ব্র্যাকের জন্য নয় বরং তা বৃহত্তর সমাজ ও দেশের দিক থেকে খুবই প্রাসঙ্গিক ও প্রণিধানযোগ্য।

তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সুনির্মল শব্দগুচ্ছে সাজানো ভাষণের শিরোনাম হতে পারত ‘রূপান্তরের কথা তোমায় শোনাই শোনো’ অথবা ‘দিনবদলের গান’। যাই হোক, তাঁর পেশকৃত বক্তব্য বর্তমান দেশ, সমাজ ও যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য বলে ব্যত্যয়ের দায়ভার কাঁধে নিয়ে যতটুকু বুঝেছি ঠিক তা-ই পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি।

চার.

মূল কথা বাংলাদেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সত্তরের দশকের দুঃখজনক তকমা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে দেশটি আজ উন্নয়নের উজ্জীবক রোল মডেল হিসেবে পরিচিত, কেউ বলে উন্নয়ন ধাঁধা। ইউস্ট ফাল্যান্ড ও জে পারকিনসন ১৯৭৫ সালে বলেছিলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ঘটলে পৃথিবীর খুব কম দেশই থাকবে যাদের উন্নয়ন হবে না। বিদ্রূপাত্মক ব্যঞ্জন! তাঁরাই আবার ২০০৭ সালে ঢাকায় এসে বলে গেলেন, উন্নয়ন বাংলাদেশের হাতের নাগালে, যদিও নিশ্চিত নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ বদলে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে খাদ্য উৎপাদন তিন গুণ বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তির ঈর্ষণীয় কৃতিত্ব (বিশেষত মেয়েদের বেলায়), প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পথ ধরে প্রায় প্রতি খানায় মোবাইল ফোন (এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র খানায়); গ্রামীণ খানার মোট আয়ের এক-তৃতীয়াংশ উৎসারিত রেমিট্যান্স থেকে, মহিলাদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি ইত্যাদি চিত্তাকর্ষক কৃতিত্ব আজ লোকমুখে। সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হচ্ছে মাথাপিছু আয় এক হাজার ৩০০ ডলারের সুবাদে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের পাদানিতে পা রেখেছে। সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে দারিদ্র্যের প্রকোপ নব্বইয়ের দশকের ৬০ শতাংশ থেকে এখন ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমানে দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে বাস করছে, যাদের চিন্তাচেতনা ও চাহিদার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসন্ন।

পাঁচ.

উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলোয় পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের চিন্তাচেতনা ও চাহিদায় ব্যাপক পরিবর্তন ধরা পড়তে শুরু করেছে। দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। গেল দশকগুলোয় ন্যূনতম চাহিদার (মোটা কাপড়, মোটা ভাত) পেছনে ছোটা মানুষগুলো এখন ‘ন্যূনতম প্লাস’ পরিমণ্ডল পরিভ্রমণে পরিবৃত বলে মনে হয়। একসময়ের মোটা চাল ভোগকারী দরিদ্র শ্রেণির চাহিদার তালিকায় আজকাল ব্রি ধান ২৮ বা ২৯ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। নিজের টিভি নেই তাতে কী, সিগারেট বা বিড়িতে ‘সুখটান’ দিয়ে এক কাপ চায়ের সামনে বাজারের দোকানে বসে টিভি দেখার সুযোগ সৃষ্টি এবং ৬০-৭০ শতাংশ খানায় বিদ্যুত্প্রাপ্তি ভোক্তার চাহিদার চেহারাটাই বদলে দিয়েছে। এখন কম পয়সায় কবিরাজ, বৈদ্য বা হাতুড়ে ডাক্তারের ফাঁদে পড়তে কেউ যায় না, চাহিদা বেড়েছে আধুনিক চিকিৎসাসেবার—যথা প্রাইভেট ক্লিনিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ডাক্তারের। বাংলাদেশের গ্রামের গরিব মানুষও এখন ছেলে-মেয়ের জন্য সুস্বাস্থ্য ও সুশিক্ষা চায়, যার মানে তারা গুণগত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য অতিরিক্ত খরচ করতেও আগ্রহী। চাহিদা এখন শৈশবকালীন উন্নয়ন, গুণগত প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার তথা জীবনবিস্তৃত শিক্ষার, তা না হলে গ্রামাঞ্চলে কিন্ডারগার্টেন স্কুল কিংবা পার্লার গড়ে ওঠে কিভাবে? কে বা কারা কেনে গ্রামের ছোট্ট দোকানের চিপস, আইসক্রিম বা সফট ড্রিংকস? গ্রাম-শহর সর্বত্র ভাত খাওয়া কমছে কিন্তু এসব খাবার ও পানীয়, ফলমূল, ডিম, দুধ, মাংসজাতীয় দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সে কথা যাক। মানুষের চাহিদার যখন ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে তখন পণ্য বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান চুপ করে বসে থাকতে পারে না, হোক সে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, শিল্প-কারখানা, এমনকি মিডিয়া বা চলচ্চিত্র। পরিবর্তনের লু হাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে উটের মতো বালুতে মুখ গুঁজে থেকে সমস্যা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কিংবা পুরনো কাঠামো বা ভিতের ওপর ভর করে উদীয়মান চাহিদার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা অনেকটা আত্মহননের শামিল।

ছয়.

ডা. মুসা মনে করেন যে উদীয়মান চাহিদা-চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে পণ্য বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনয়ন করতে না পারলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। প্রথমত, ভোগ চাহিদার পরিবর্তন সাপেক্ষে সরবরাহকৃত প্যাকেজে পরিবর্তন সাধন অর্থাৎ পুরনো পণ্যের বদলে নতুন পণ্য সংযোজন। মনে রাখা দরকার, মানুষ আজকাল এতই সচেতন যে পুরনো বোতলে নতুন মদ ঢেলে বোকা বানানোর দিন গতপ্রায়। যাই হোক, গ্রামবাংলায় একসময় ওরাল স্যালাইনের চাহিদা ছিল সম্ভবত সর্বশীর্ষে, কারণ পানিবাহিত রোগে শিশুমৃত্যু তথা কলেরা ও ডায়রিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল অনেক বেশি। এখন কিন্তু মূল রোগের মধ্যে আছে ‘অসংক্রামক রোগ যথা বহুমূত্র ও হৃদরোগ। অন্যদিকে ষাট, সত্তর, এমনকি আশির দশকের খাদ্যাভাব ও দারিদ্র্য নিয়ে কিংবা নায়ক-নায়িকার প্রেমপত্র নিয়ে গল্পের প্লট আজকালের দর্শক গ্রহণ করবে কি না সন্দেহ আছে। দ্বিতীয়ত, পরিবর্তন ঘটাতে হবে পণ্য বা সেবা প্রদান পদ্ধতিতে। এ ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে রূপান্তর অত্যন্ত জরুরি। রোগীকে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে চিকিৎসককে বরং রোগীর কাছে কিভাবে নিয়ে আসা যায় সে চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। অর্থাৎ ডিজিটাল সেবা বিস্তৃত করতে হবে। সব শেষে পরিবর্তন আনতে হবে পণ্যসেবা সৃষ্টির নিমিত্ত অর্থায়নে। বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক নিশ্চিত জানেন যে সরকারি-বেসরকারি খাত কিংবা এনজিওর জন্য বৈদেশিক সাহায্য ও অনুদান ব্যাপক হ্রাস পেতে চলেছে। এর কারণ সুবিদিত একটা মধ্যম আয়ের দেশকে সাহায্য ও অনুদান দেওয়া হবে কোন যুক্তিতে? নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ যেমন অহংকারের বিষয়, তেমনি গর্ব নিহিত রয়েছে পণ্য ও সেবা সৃষ্টি ও সরবরাহে নিজস্ব উৎস থেকে অর্থায়নে। নিজস্ব উৎস থেকে অর্থায়ন করতে হলে প্রয়োজন নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাংগঠনিক পরিবর্তন সাপেক্ষে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিসমেত নবধারামূলক চিন্তাভাবনার ক্ষেত্র প্রসারিত করা এবং খদ্দেরের চাহিদা মাথায় রেখে সাপ্লাই চেইনে পরিবর্তন আনয়ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, উদীয়মান চাহিদামাফিক গুণগত পণ্য ও সেবা প্রদান করা যে পণ্যসেবার জন্য গ্রাহক অতিরিক্ত মূল্য দিতে প্রস্তুত। বোধ করি বলা অত্যুক্তি হবে না যে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ এখন ন্যূনতম চাহিদা নিয়ে ন্যূনতম মাথা ঘামায়, তারা চায় ‘ন্যূনতম প্লাস’ অর্থাৎ ভালো শিক্ষাব্যবস্থা, ভালো স্বাস্থ্যসেবা ও গুণগত পণ্য। যে প্রতিষ্ঠান এই ‘প্লাস’কে মাইনাস করবে সেই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকার সম্ভাবনা কম আর যে প্রতিষ্ঠান এই প্লাসকে স্বীকৃতি দেবে, তার টেকসই অস্তিত্ব অনেকটা নিশ্চিত।

সাত.

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাতে না পারার খেসারত কম নয়। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদের কাছ থেকে শোনা একটু প্রণিধানযোগ্য পর্যবেক্ষণ এই যে গেল ১০০ বছরে পৃথিবীতে যত প্রতিষ্ঠান জন্ম নিয়েছে তার মধ্যে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি এখনো তালগাছের মতো মাথা উঁচু করে টিকে আছে। এর প্রধান কারণ তারা পরিবর্তনশীল পৃথিবী তথা জনগণের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। তাই পৃথিবীর যেকোনো প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার ক্ষেত্রে রূপান্তর ঘটানোর কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ বদলায়—এটাই চরম বাস্তবতা। বিলিভ ইট অর নট। আর তাই আটঘাট বেঁধে পরিবর্তনীয় পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক সংস্কার সাধন এবং দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন দরকার। যত তাড়াতাড়ি এ সত্য উপলব্ধি করা যাবে, ততই মঙ্গল দেশের ও প্রতিষ্ঠানের জন্য।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আবদুল বায়েস