English Version

আজকের চাকরির খবর লাইভ খেলা দেখুন

জেনে নিন কা’বা শরীফের কালো গিলাফের কথা


প্রতিদিন টেলি ভিশনের পর্দায় হজ্ব অনুষ্ঠানমালার দৃশ্য হাজী সাহেবরা দেখছে। যারা পূর্বে হজ্ব করেছেন এ দৃশ্য দেখে তারা উন্মাতাল হয়ে উঠে হজ্বের মনোমুগ্ধকর স্মৃতির কথা মনে করে। আর যারা এখনো হজ্বে যাননি তারা সেদেশে গিয়ে লাখো মানুষের ঘূর্ণয়নের কালো ঘরের তাওয়াফের স্বপ্ন দেখেন। সবকিছু যেন একটি কালো ঘর একটি কালো গিলাফকে ঘিরে। যাকে বলা হয় কাবা শরীফ। আমরা যারা এখন বাংলাদেশ থেকে সাড়ে তিন হাজার মাইল দূরে হজ্বের ময়দানে অবস্থান করছি তাদের জন্য আল্লাহর এ ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকার নেশা ও মজা আলাদা। হাজী সাহেবদের তাওয়াফের এ বিশাল এ স্থানকে বলা হয় মাতাফ। এ মাঝখানে কালো গিলাফ বেষ্টিত আল্লাহর ঘর।

আজ গিলাফ সম্পর্কে দু একটি কথা। গিলাফে কা’বা আলাহর ঘরের প্রতি উত্তম সম্মান প্রদর্শনের উজ্জ্বল নিদর্শন। আলাহর ঘরকে সাজানোর ব্যাপারে এটি হচ্ছে বান্দাহর আপ্রাণ প্রচেষ্টার বা¯তব নজীর। কা’বা শরীফের গিলাফের ইতিহাস খোদ কা’বা শরীফের ইতিহাস থেকেই শুরু হয়েছে। কিছু সংখ্যক ওলামার মতে, স্বয়ং হযরত ইসমাঈল (আ:) নিজেই কা’বা শরীফের গিলাফ পরিয়েছিলেন। অবশ্য অন্য এক ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয় যে, ইয়েমেনের শাসক ৩য় তুব্বা’ কা’বা শরীফে প্রথম গিলাফ পরান। মক্কায় খোযাআ’ গোত্রের শাসনামলে, ইয়েমেনের শাসক ১ম তুব্বা’ সৈন্য সামšত নিয়ে কা’বা শরীফ ধ্বংস করতে এসে নিজেই ধ্বংস হয়। এর পর দ্বিতীয় তুব্বা’ কা’বা শরীফ ধ্বংস করতে এসে কোরাইশদের হাতে পরাজিত হয়। তারপর ৩য় তুব্বা’ যাকে ‘তুববা আল হোমায়রী’ও বলা হয়, সে কা’বা শরীফ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এবং এর ধনভান্ডার আত্মসাতের জন্য অগ্রসর হয়। কিন্তু সে এবং তার সৈন্যরা হঠাৎ করে প্রচ- তুফানের সম্মুখীন হয় এবং অগ্রাভিযানে বাধাপ্রাপ্ত হয়। তারপর তারা কঠিন রোগ-শোকে আক্রান্ত হয়। এটি ছিল আল্লাহর গযব।

তার সাথে যে ধর্মযাজক ছিল সে বাদশাকে ঐ অভিযান বন্ধের পরামর্শ দেয় এবং কা’বা শরীফকে সম্মান প্রদর্শন করা, এর তাওয়াফ করা ও নিজ মাথা মুড়ানোর উপদেশ দেয়। অতএব বাদশাহ ঐ পরামর্শ মেনে নেয় এবং মক্কায় ৬ দিন পর্যন্ত অবস্থান করে। সে ঐ সময় খুবই সুন্দর এবং সর্বোচ্চ মানের কাপড় সংগ্রহ করে গিলাফ তৈরী করে কা’বা শরীফের গায়ে পরিয়ে দেয়। এ জন্যই তুববা’ আল-হোমায়রীকে কা’বা শরীফে প্রথম গিলাফ পরানোকারী বলা হয়। – (মক্কা শরীফের ইতিকথা, এ. এন. এম. সিরাজুল ইসলাম)।

জাহেলিয়াতের যুগে বহু লোক কা’বা শরীফে গিলাফ পরিয়েছেন। তারা এটাকে দীনি ওয়াজিব মনে করত। যে কোন লোক যে কোন সময় ইচ্ছা করলেই গিলাফ লাগাতে পারত। গিলাফের কাপড়গুলো ছিল প্রখ্যাত ইয়েমেনী কাপড়, ইরাকী সিল্ক, প্রখ্যাত মিসরীয় কাবাতী কাপড় ইত্যাদি। তখন একটার উপর আর একটা গিলাফ একের পর এক পরানো হতো। যখন গিলাফগুলো ভারী কিংবা পুরাতন হয়ে যেত তখন সেগুলো সরিয়ে ফেলা হত এবং দাফন করে দেয়া হত।

মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুলাহ (স.) কা’বা শরীফে গেলাফ পরানোর কাজকে বহাল রাখলেন। একজন মহিলা কা’বা শরীফে সুঘ্রাণযুক্ত ধুঁয়া দেয়ার সময় গিলাফে আগুন ধরে গেলাফটি পুড়ে যায়। তখন নবী করীম (স.) ইয়েমেনী কাপড় দ্বারা কা’বা শরীফের গিলাফ লাগান।সৌদী সরকারের শাসন শুরুর পর বাদশাহ আবদুল আযীয আল-সঊদ ১৩৪৬ হিজরীর মুহররম মাসে মক্কায় একটি বিশেষ গিলাফ নির্মাণ কারখানা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। ঐ বছরের মাঝামাঝি গিলাফ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। মক্কায় এটাই ছিল প্রথম কা’বার গিলাফ তৈরীর প্রচেষ্টা।

বর্তমানে খাঁটি প্রাকৃতিক সিল্ক দিয়ে কা’বার গিলাফ তৈরি করা হয়। সিল্ককে কাল রং দিয়ে রঙ্গীন করা হয়। পরে এতে জাকা পদ্ধতিতে, লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসূূলুল্লাহ, আল্লাহু জালা-জালালুহু, সুবহানালাহ ওয়া বিহামদিহী, সুবহানালাহিল আজীম-এরূপ বাণীসমূহের নকশা আঁকা হয়। গিলাফের উচ্চতা ১৪ মিটার। এর উপরের তৃতীয়াংশে, ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া নির্মিত বেল্টে, (বন্ধনীতে) সংযুক্ত ত্রৈ-আক্ষরিকভাবে কুরআনের আয়াত লেখা হয়। বন্ধনীতে ইসলামী কারুকার্য খচিত একটি ফ্রেম থাকে। বন্ধনীটি সোনার প্রলেপ দেয়া রূপালী তারের মাধ্যমে এমব্রয়ডারী করা হয়। এই বন্ধনীটি কা’বা শরীফের চতুর্দিকেই পরিবেষ্টিত থাকে। বন্ধনীর দৈর্ঘ হচ্ছে ৪৭ মিটার এবং তা ১৬ টি টুকরায় বিভক্ত। বন্ধনীটির নীচে প্রতি কোনায় সূরা ইখলাসকে গোলাকার চতুর্ভূজ বৃত্তের মধ্যে ইসলামী ডিজাইনের প্রতিফলন ঘটিয়ে লেখা হয়।

বন্ধনীর নীচে পৃথক পৃথক ফ্রেমে ৬টি কুরআনের আয়াত লেখা হয়। ঐগুলির মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টির জন্য মাঝখানে মোমবাতির আকারে ‘ইয়া হাইউ-ইয়া-কাইউমু’ অথবা ‘ইয়া রাহমানু-ইয়া রাহীমু’ কিংবা ‘আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আ’লামীন’ কথাগুলো লেখা থাকে। বন্ধনীর নীচে সবগুলো লেখা সংযুক্ত ত্রি-আক্ষরিকভাবে অংকিত। এতে উপযুক্ত এমব্রয়ডারী করা হয় এবং এর উপর সোনা ও রূপার চিকন তার লাগানো হয়। সৌদী শাসনামল থেকেই এ গিলাফের কারুকার্যে স্বর্ণের ব্যবহার শুরু হয়। এ ছাড়াও এতে ১১টি নকশা করা মোমবাতির প্রতিকৃতি আছে। এগুলো কা’বার ৪ কোনে লাগানো আছে।

খানায়ে কা’বার দরজার পর্দাটিকে বোরকা বলা হয়। তাও কালো রং-এর সিল্ক দিয়ে তৈরী। এর উচ্চতা সাড়ে ৭ মিটার এবং প্রস্থ ৪ মিটার। এতেও ইসলামী কারুকার্যের প্রতিফলন ঘটিয়ে কুরআনের আয়াত লেখা হয়। এই লেখাগুলোও সোনা ও রূপার চিকন তার দিয়ে এমব্রয়ডারী করা হয়।

কা’বা শরীফের দরজা ও বাইরের গিলাফ দুটোই মজবুত সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরী। গিলাফের মোট ৫টি টুকরা বানানো হয়। ৪ টুকরা ৪ দিকে এবং পঞ্চম টুকরাটি দরজায় লাগানো হয়। টুকরাগুলো পরস্পর সেলাইযুক্ত। প্রতিবছরই নতুন গিলাফ পরানোর সময় পুরাতন গিলাফটি সরিয়ে ফেলা হয়। বর্তমান গিলাফ তৈরীতে, ৬৭০ কেজি সিল্ক ও ১৫০ কেজি সোনা ও রূপার চিকন তার ব্যবহার হয়ে থাকে।

প্রত্যেক বছর জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে কা’বা শরীফের গায়ে নতুন গিলাফ পরানো হয়। সেদিন হজ্জের দিন। হাজীরা সব আরাফাতের ময়দানে থাকে এবং মসজিদে হারামে মুসলীর সংখ্যা থাকে খুবই কম। বর্তমানকালে হজ্জ উপলক্ষে এবং স্বয়ং হজ্জের দিনই ঐ গিলাফ লাগানো হয়। হাজীরা আরাফাত থেকে ফিরে এসে কা’বা শরীফের গায়ে নতুন গেলাফ দেখতে পান।

গিলাফ নির্মাণ কারখানায় গিলাফ তৈরীর পর কা’বা শরীফের গায়ে পরানোর আগে কারখানার পক্ষ থেকে তা কা’বা শরীফের চাবি রক্ষক তথা বনি শায়বা গোত্রের মনোনীত কা’বা শরীফের সেবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তার অনুমোদনক্রমে সংশিষ্ট সকলের সহযোগিতায় গিলাফ লাগানো হয়।
হজ্জের কয়েকদিন আগ থেকেই কা’বার গিলাফের নীচু অংশ উপরের দিকে তুলে দেয়া হয় এবং এতে কা’বা শরীফের দেয়ালের বাইরের অংশ দেখা ও ধরা যায় আর ভক্তদের হাত থেকে গিলাফকে হিফাজত করা সম্ভব হয়। আল্লাহপাক আমাদেরকে সে হৃদয়কাড়া কালো গিলাফ স্পর্শ করে চোখ জুড়ানোর তাওফিক দিন।

 

আর এস – বিডিটুডেজ – ০৫/০৮/২০১৭ইং