English Version

মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক

picture2মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক

সিরাজী এম আর মোস্তা

————————————————————

কে মুক্তিযোদ্ধা, কে অমুক্তিযোদ্ধা চলছে মহাবিতর্ক
কেহবা পাচ্ছে মহামূল্য স্বার্থ।
যুদ্ধকালে দেশে ছিল সাড়ে সাত কোটি নাগরিক
শুধু দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা, অন্যরা বিপরীত।
ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ নারী পায়নি মুক্তিযোদ্ধা কোটা
তালিকায় নেই বঙ্গবন্ধু, ওসমানী ও চার নেতা।
মুুক্তিযোদ্ধা তালিকাটি ত্রিশ লাখ এক থেকে সূচণা
দুই লাখ মা-বোন পেয়েছে বঞ্চণা।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোটা, বৈষম্য আর বিভাজন
সকল বিতর্কের কারণ।
পাকিস্তানী সেনারা খুনি যুদ্ধাপরাধী নয়, বাংলাদেশীরাই তা
আন্তর্জাতিক আদালতে পেয়েছে সাজা।
যুদ্ধাপরাধী প্রজন্ম এখন বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিক
হয়তো যুদ্ধাপরাধী ছিল ত্রিশ লাখ শহীদ।

বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক চরমে উঠেছে। তার প্রভাব পড়েছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় এবং দেশের সকল চাকুরি ক্ষেত্রে। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনি এবং অমুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততির মাঝে চলছে লড়াই। অমুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা যথেষ্ট মেধা ও যোগ্যতা সত্ত্বেও কোটাভোগী মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কাছে হার মানছে। অমুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম পরীক্ষায় শতকরা পচাত্তুর বা আশি পেয়েও বঞ্চিত হচ্ছে আর কোটাধারীরা মাত্র চল্লিশ পেয়েই মহামুল্য স্বার্থ হাসিল করছে। বাংলাদেশে মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার শতকরা ত্রিশ ভাগ কোটাসুবিধা পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, আজ পর্যন্ত ত্রিশভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পালনে যত বাদ পড়েছে, তাও পুরণ করা হচ্ছে। যেমন ধরুন, একটি প্রতিষ্ঠানে এযাবৎ একশত লোক নিয়োগ হয়েছে। তাতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কমপক্ষে ত্রিশজন নিয়োগের কথা ছিল। হয়তো কারণবশত: দশজন নিয়োগ পেয়েছে। অর্থাৎ বিশজন বাদ পড়েছে। উক্ত প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পচিশটি পদ খালি হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথমে বিগত ঘাটতি পুরণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটাতেই নিয়োগ হচ্ছে। একইভাবে চলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি এবং সকল চাকুরির নিয়োগ প্রক্রিয়া। ফলে কোটি কোটি অমুক্তিযোদ্ধা সন্তান এখন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা টের পাচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক কাকে বলে!
এবছর (২০১৬) মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা প্রকাশ হয়েছে। বলা হয়েছে, ১৯৭১ এর ২৬ মার্চে যাদের বয়স ন্যুনতম তের বছর ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা। তবে সবাই নয়। যারা বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, দেশ ছেড়েছিল এবং ভারতের লাল বইতে নাম তুলেছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে গিয়েছিল প্রায় এক কোটি শরণার্থী, তবে তারা মুক্তিযোদ্ধা নয়। যুদ্ধকালে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির যারা দেশে ছিল, তারাও মুক্তিযোদ্ধা নয়। তারা ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারী, অমুক্তিযোদ্ধা. রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ইত্যাদি। তেমনি দেশে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, আদরের কন্যা দেশনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার স্বামী প্রয়াত ড. ওয়াজেদ মিয়াও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নন। তারা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারভুক্তও নন। কারণ স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর নামও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, তবে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা নন। বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয় চার নেতা ও সেনাপ্রধান এম.এ.জি ওসমানীও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নন। তাদের পরিবারও মুক্তিযোদ্ধা কোটাভুক্ত নয়। এভাবে অসংখ্য লড়াকু মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-সন্ততি স্বীকৃতি বঞ্চিত। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেককে স্বীকৃতি বা তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছিল। তারা বলেছিল, জীবনপণ লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছি; এখন মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির জন্য আবেদন করবো কেন? আমরা কি অমুক্তিযোদ্ধা? আজও তার সদুত্তর মেলেনি।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এদেশের সকল নাগরিককে স্পষ্টভাবে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেন। (১০ জানুয়ারী, ১৯৭২ তারিখে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য দ্রষ্টব্য)। যুদ্ধরীতি অনুসারে মাত্র ৬৭৬ জন যোদ্ধাকে তিনি বিশেষ খেতাব দেন ও বীর ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও বন্দী হিসেবে একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেন। এভাবে জাতীয় চার নেতা, এম.এ.জি ওসমানী এবং অগণিত লড়াকু যোদ্ধাগণ খেতাবের তোয়াক্কা না করে তারাও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেন। ফলে বঙ্গবন্ধুর সময়ে দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন ছিলনা। ছিলনা কোটাসুবিধাও। বঙ্গবন্ধু সবাইকে সমান বিবেচনা করে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছেন।
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সে আদর্শ আর নেই। মুক্তিযোদ্ধা-শহীদ পার্থক্য শুধু নয়; মুক্তিযোদ্ধা, অমুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ জনতা, রাজাকার, আলবদর, আল-শামস্, যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতা বিরোধীশক্তি প্রভূতি বহু বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতে পাকিস্তানি খুনী ও ঘাতকদের পরিবর্তে শুধু বাংলাদেশীরা যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছে। ফাঁসি এবং যাবজ্জীবন সাজাও হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানবাহিনী হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাট করেনি, বাংলাদেশীরাই তা করেছে। আর শুধু দুই লাখ তালিকাভুক্ত বা কোটাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাগণই দেশ স্বাধীন করেছেন। ত্রিশ লাখ শহীদেরও কোনো ভূমিকা নেই। শহীদের সংখ্যাটি প্রচারের জন্য মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ত্রিশ লাখ এক থেকে শুরু হয়েছে। শহীদদের পরিচয়, তালিকা, পরিবার-পরিজন এবং মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি কিছুই নেই। মুক্তিযোদ্ধা তালিকা দু’লাখই চুড়ান্ত। যদিও তাতে বঙ্গবন্ধু, চার নেতা, এম.এ.জি ওসমানী এবং অগণিত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম নেই। তবে কি তারা অমুক্তিযোদ্ধা?
বলা হয়, শুধুমাত্র নি¤œ শ্রেণীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা বা কোটা-সুবিধা দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু, চার নেতা, এম.এ.জি ওসমানী, লাখো শহীদ, সম্ভ্রমহারা নারী এবং স্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বা কোটার প্রয়োজন নেই। তারা উচু স্তরের মুক্তিযোদ্ধা। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের উচু স্তর ও নি¤œ স্তরে ভাগ করা হয়েছে। উচু স্তরের মুক্তিযোদ্ধাগণ শুধু মুখে মুখেই। তাদের সন্তান-সন্ততিও জানে না, তারা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারভুক্ত কিনা। শুধুমাত্র নি¤œস্তরের মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তান-সন্ততি এককভাবে ভোগ করছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা। পাচ্ছে চাকুরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও সকল সুযোগ-সুবিধা। আর উচুস্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততি বিবেচিত হয়েছে অমুক্তিযোদ্ধা। এতে বিঘিœত হয়েছে স্বাধীনতা চেতনা। তাই কোনো পরাশক্তির বিরূদ্ধে আবার যুদ্ধ বাধলে হয়তো দেশের কেউ প্রাণ দিতে এগিয়ে যাবেনা। তারা শিক্ষা নেবে ৭১-এর লাখো শহীদ, আত্মত্যাগী নারী ও অগণিত মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চণা থেকে। যে দেশে সর্বাত্মক যুদ্ধের পরও মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন হয়, সে দেশে ঐক্যবদ্ধ জাতি সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক একটি জাতীয় বিষয়। এ বিতর্ক দূর করতে প্রয়োজন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও ত্যাগ। গ্রহন করতে হবে একটি সমন্বিত ভিত্তি। তা হতে পারে এমন ঃ
১. বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙ্গালি জাতির জনক এবং স্বাধীনতার স্থপতি মনে করে। অর্থাৎ দেশের সবাই তার সন্তান-সন্ততি বা তার আদর্শের ধারক-বাহক। বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা কে আছে? তবুও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় বঙ্গবন্ধুর নাম নেই। সুতরাং তার সন্তানদের মাঝেও মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন কাম্য নয়। অর্থাৎ দেশের সবাই মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম, কেউ অমুক্তিযোদ্ধা নয়।
২. একথা সুবিদিত যে, ১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ প্রাণ হারিয়েছে। তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা ধরে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা তালিকাটি ত্রিশ লাখ এক থেকে শুরু হয়েছে। এরপরও মাত্র দুই লাখ পরিবার মুক্তিযোদ্ধা কোটা পাচ্ছে। অর্থাৎ শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা নয়। তারা মুক্তিযোদ্ধা হলে, ষোল কোটি নাগরিকের কে শহীদ পরিবারের সদস্য নয়; তা নির্ণয় করা কঠিন। তাই শহীদদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক বন্ধ করা উচিত।
৩. আমরা জানি, ১৯৭১ সালে দুই লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে। তাদের আত্মত্যাগ অপরিসীম। অথচ তারা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ কোনো তালিকাতেই নেই। তবে কি স্বাধীনতাযুদ্ধে তাদের অবদান নেই? বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে সম্ভ্রমহারা নারীর সংখ্যা দুই লাখ সুনির্দিষ্ট করেছেন এবং তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়েছেন। ৭১-এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির মধ্যে দুই লাখ সংখ্যাটি কম নয়। সে হিসেবে বর্তমান ষোল কোটি নাগরিকের কেউ তাদের পরিবারের বাইরে নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক ও বিভাজন সমীচীন নয়।

Shares