English Version

নামে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি হলেও কাজে কি তাই ?

নূর মোহাম্মদ, হৃদয় (১৫), পিরোজপুর: বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে চলা একটি স্বাধীন দেশের নাম বাংলাদেশ। আর এখানেই বহুকাল ধরে বসবাস করছে বাঙালি জাতির মানুষ। যদিও একসময় অন্যের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে এ দেশ। নির্যাতিতও হয়েছে বহুবার। আবার এদেশের মানুষ এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে এদেশকে মুক্ত করেছে ইংরেজদের হাত থেকে। এরপর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানসহ নানা ইতিহাস জড়িয়ে আছে বাঙালি জাতিসত্বায়। সর্বশেষ ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্তি ও বাংলাদেশ নামক এক স্বাধীন দেশ উপহার পেয়েছে বাঙালি জাতি। এখন লক্ষ্য ডিজিটাল বাংলাদেশ। আর তার জন্য যা সবচেয়ে আগে প্রয়োজন তা হলো একটি শিক্ষিত জাতি। কথিত আছে, যে দেশের মানুষ যত বেশি শিক্ষিত, সেই দেশ তত বেশি উন্নত।

বাঙালি জাতিকে উন্নত করতে যাদের শিক্ষিত হওয়া সবার আগে প্রয়োজন তা হল শিশুদের। কারণ তারাই এদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। তাদের নেতৃত্বেই একসময় চলবে এদেশ। আর এই তরুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করতে বাংলাদেশ সরকার নিয়েছে নতুন পদক্ষেপ। শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরী করেছে নতুন পন্থা। তৈরী করেছে সৃজনশীল পদ্ধতির। যেখানে শিক্ষার্থীদের লিখতে হয় সম্পূর্ণ নিজ ভাষায়। সৃজনশীলতার মাধ্যমে তৈরী করতে হয় এ প্রশ্নের উত্তর। উদ্দীপকের আলোকে তার সাথে সাদৃশ্যতা, বৈসাদ্যৃতা, যৌক্তিকতা উপস্থাপন করতে হয় তাদের।

কিন্তু সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিয়েও কি সৃজনশীলতার স্বাদ পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা ?

এই সৃজনশীল পদ্ধতির আগের পদ্ধতিতে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক মুদ্রিত পাঠ্যবইগুলোর মধ্যকার প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণের বিধান ছিল। তখন পাঠ্যবইয়ের প্রশ্ন ও প্রতিটি অধ্যায় মুখস্থ করাই ছিল ভাল নম্বর পাওয়ার একমাত্র উপায়। পরে ২০১০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ইংরেজী ও বাংলা এ দুটি বিষয় সৃজনশীল পদ্ধতির রীতি চালু হলে পাল্টে যায় পরীক্ষা পদ্ধতি। ধীরে ধীরে এ পদ্ধতির বিস্তার ঘটতে থাকে। শুধু এস.এস.সি নয় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শ্রেণিতে শুরু হয় এর প্রচলন। শুধু শ্রেণিই নয় বিষয়ের দিক থেকেও বিস্তার ঘটে এর। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের লিখতে হয় ৬ টি সৃজনশীল ও ৪০ টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর। ধারণা করা হয় এর ফলে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যার অবসান ও সৃজনশীলে পারদর্শীতার উত্থান হবে।

প্রথমে এ পদ্ধতি বন্ধে অভিভাবকরা আন্দোলনে নামলেও পড়ে মেনে নেয় তারা। শুরু হয় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পদ্ধতিতে বেশি নম্বর অর্জনের জন্য দৌড়। প্রথম দিকে নানা ধরনের সমস্যা হলেও শিক্ষা বছরের শুরুতে এ নিয়ম প্রণোয়নের ফলে পরীক্ষা দেয়ার আগে তা সামলে নিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

কিন্তু সত্যিই কি সৃজনশীলভাবে প্রশ্নের উত্তর লিখছে শিক্ষার্থীরা ?

এখনও প্রশ্নের উত্তর লিখবার জন্য শিক্ষার্থীরা নির্ভর করে মুখস্থ বিদ্যার উপর। যেখানে আগে শুধু পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো মুখস্থ’র মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করত সেখানে এখন তারা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নেমেছে গাইড বই, টেস্ট পেপারস ইত্যাদি মুখস্থের প্রতিযোগীতায়। এতে করে মুখস্থ বিদ্যারই তীক্ষèতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ পূর্বে যেখানে অল্প সংখ্যক কিছু প্রশ্ন মুখস্ত করলে হত সেখানে তাদের এখন এক একটি অধ্যায়ের প্রশ্ন-উত্তরের জন্য বিভিন্ন প্রকাশনীর সহায়িকা, গাইডবইতে মুদ্রিত শত শত প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের মতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলোতে করা প্রশ্নপত্রে হুবহু গাইড, টেস্ট পেপারস, সহায়িকা থেকে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন। তাই তারা সৃজনশীলভাবে লেখার বিপরীতে এসব গাইড মুখস্থ করতে উদ্যত হচ্ছে। গাইড বই পড়লেই যখন প্রশ্ন কমন পাচ্ছে তারা তখন তা মুখস্থ করে লিখলেই বেশি নম্বর উঠবে বলে ধারণা শিক্ষার্থীদের। তারা আরও বলে শিক্ষকরাও প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষণের ক্ষেত্রে সেই গাইডে দেয়া উত্তরের দিকেই বেশি লক্ষ্য দেন। তার সাথে যতটা মিল খুজে পান সেই অনুযায়ী প্রশ্নের মান নির্ধারণ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে নিজ উদ্যোগে লেখাপড়ার বিপরীতে ছুটছে বিভিন্ন কোচিং ক্লাসে, প্রাইভেট টিউশন ইত্যাদি যায়গায়। রাস্তায় বেড়োলো প্রায় সবসময়ই দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা দৌড়াচ্ছে ব্যাগ কাধে কোন না কোন যায়গায় টিউশন নিতে। এমনকি মানব শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য যে খেলাধুলা প্রয়োজন তারও সময় নেই তাদের হাতে। সাধারণত বিকেল বেলাকে খেলাধুলার সময় হিসেবে গণ্য করা হলেও এ সময়টাতেও তাদের দেখা যায় কোন না কোন শিক্ষকের কাছ থেকে পাঠদান নিতে। কারণ তাদের মতে সেখানে দেয়া বিভিন্ন বিষয়ের “নোটস” গুলো তাদের সাহায্য করছে পরীক্ষায় প্রশ্ন কমন পরার ক্ষেত্রে।

এই অধিক মুখস্থের চাপে অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জনেও বাধা পড়ছে তাদের। কারণ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের পরে অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান আহোরণের সময় পাচ্ছে না তারা। আর সময় পেলেও বিশ্রামের মাধ্যমেই তার ব্যয় করতে হচ্ছে তাদের। কারণ মানব শরীরকে চালনার জন্য বিশ্রাম অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়।

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি সিদ্ধান্ত প্রণীত হয়। যাতে উল্লেখ করা হয় এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি পরীক্ষায় ৬টি সৃজনশীল এর পরিবর্তে ৭টি সৃজনশীল প্রশ্নের ও ৪০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নের পরিবর্তে ৩০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মনে ভ্রান্তি’র সৃষ্টি হয় সময় নির্ধারণ নিয়ে। তাদের মতে আগে তারা ৬টি সৃজনশীল ও ৪০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য সময় পেত ২ ঘন্টা ৫০ মিনিট। এখন মাত্র ১০ মিনিটের অতিরিক্ত সময়ে নতুন একটি সৃজনশীল লেখা তাদের পক্ষে অসম্ভব। এমনকি এই অতিরিক্ত সৃজনশীল প্রত্যাহারের দাবীতে আন্দোলনেও নামে তারা। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় সময় নির্ধারণ সঠিক হয়েছে বলে তা প্রত্যাহারে দাবী প্রত্যাখ্যান করে। তারা সময় নির্ধারণের যৌক্তিকতাও তুলে ধরেন শিক্ষার্থীদের সামনে। এতে করে মেনে নিতে হয় শিক্ষার্থীদের।

সঠিকভাবে সময় নির্ধারণ হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে ৭টি সৃজনশীলের উত্তর কি দিতে পারবে শিক্ষার্থীরা ?

এই একই প্রশ্নে ভীতির সঞ্চার হয়েছে শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ শিক্ষকদের মনেও। কারণ কথিত আছে মানুষ অভ্যাসের দাস। কয়েক বছর ধরে ৬টি সৃজনশীল ও ৪০ টি বহুনির্বাচনী’র উত্তর দিতে দিতে এই ধারায় অভ্যস্থ হয়ে গেছে শিক্ষার্থীরা। এতদিন একভাবে প্রশ্ন-উত্তর দিতে দিতে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ৬টি প্রশ্নের উত্তর করতে শিখে গেছে তারা। হটাৎ করে অভ্যাস বদল করা মানুষের পক্ষে অতি কষ্টসাধ্য। তাই সঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে হটাৎ করে অতিরিক্ত ১টি সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারা নিয়ে। শিক্ষার্থীরা বলছে যদি শিক্ষাবছরের শুরু থেকে আমরা এই ধারার চর্চার মাধ্যমে আমাদের লেখাপড়া চালিত করতাম তবে এতদিনে ৭টি সৃজনশীল লেখা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হত। যার ফলে পরীক্ষা অংশগ্রহণ ও ভাল ফলাফল করাও আমাদের পক্ষে বেশি কঠিন বিষয় ছিল না। কিন্তু এভাবে হটাৎ করে শিক্ষাবছরের শেষে নতুন নিয়মের ফলে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে আমাদের। এই নতুন নিয়মের ফলে লেখাপড়ায় অনেকটা বেগও পেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
সৃজনশীল পদ্ধতি বলতে বোঝায় প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর লিখতে হবে নিজের মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়ে নিজ মেধার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ৭টি সৃজনশীল লিখতে সময় দেয়া হয়েছে ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট। যার মাঝে নেই কোন বিরতির সময়। বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, একটি মস্তিষ্ক একই কাজে সর্বোচ্চ ৪৫ মিনিট লক্ষ্য রাখতে পারে। এরপর প্রয়োজন হয় ১০ থেকে ১৫ মিনিট বিরতির। না হলে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের একটানা ২ ঘন্টা ৩০ মিনিটই একই কাজের জন্য মস্তিষ্কে চাপ দিতে হচ্ছে। যা তাদের শারিরীক সমস্যারও ঝুঁকি বাড়ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেয়া হটাৎ সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে। ভাল ফলাফলের ক্ষেত্রেও তা প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা শিক্ষকদের।

Shares