English Version

দরকার একজন সুখময়ের

নূর মোহাম্মদ হৃদয় : পৃথিবীতে সব মানুষের মন রকম নয়। সবার ইচ্ছা এক নয়। কেউ পড়াশুনা করতে, কেউবা ছবি আকঁতে, কেউবা ক্রিকেট খেলতে ভালোবাসে। এরকমই একটি ছেলে গৌরব। যার দিন শুরু হয় ক্রিকেট বল বা ব্যাট হাতে আর দিন শেষ হয় তা দিয়ে মাঠে ময়দানে ক্রিকেট ম্যাচের সমাপ্তি দিয়ে। যার মন পড়াশুনায় একদম নেই বললেই চলে। তার মাথায় সারাক্ষণ ঘুড়তে থাকে কিভাবে কোন শট খেললে ভাল রান করা যায়। কিভাবে একজন ভালো ক্রিকেটার হওয়া যায়। তার স্বপ্ন একটাই। জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে দেশের জন্য খেলতে পারা। মা হারা গৌরবের এই স্বপ্ন পছন্দ করে না কেউই। সবাই চায় সে শুধু সারাক্ষণ বই হাতে বসে থাকবে। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করবে। যা সৌরভের ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিপরীত। সে পড়াশুনা বাদ দিয়ে সারাক্ষণ ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকায় পরীক্ষায় ফেল করে। তাই সিটি করপোরেশনের কেরানীর কাজ করা তার বাবা সুখময়কে শুনতে হয় গৌরবের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের তিরস্কার। সেই রাগের প্রতিফলন সে ঘটায় তার ছেলের উপর বকাবকি ও মারধরের মাধ্যমে। শুরু হয় বাবা ছেলের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। একসময় বাবার করা আঘাতে কোমায় চলে যেতে হয় গৌরবকে।

গরীব হওয়ায় তার ছেলের চিকিৎসায় এগিয়ে আসে তার প্রতিবেশিরা। একদিকে ছেলেকে সাড়িয়ে তোলার লড়াই অন্যদিকে যার জন্য তার ছেলের এই অবস্থা সেই শিক্ষাপদ্ধতিকে পরিবর্তনের আন্দলনে নামে সুখময়। তার কথা, যেখানে শিক্ষক ই জানে ১৭ এর সাথে ৭ গুণ করলে কত হয়, ইলতুৎমিশ এর বাবার নাম কী সেখানে ছোট ছোট বাচ্চাদের এগুলো পড়তে হবে কেন ? যে শিক্ষক একটি বিষয়ের উপর উচ্চ পর্যায়ে পরাশুনা করেও ঐ একটা বিষয়কে আয়ত্বে রাখতে হিমশিম খায় সেখানে শিক্ষার্থীরা কিভাবে ১৩ থেকে ১৪ টি বিষয় একসাথে আয়ত্বে রাখতে পারে ?

প্রতিবছর বইয়ের অধ্যায় পাল্টে তার জন্য নতুন নতুন সহায়িকা ছাপিয়ে শিক্ষাকে ব্যবসা করে তুলেছে কেন ? এরই উত্তর জানতে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে দেখা করার আবেদন জানায় সে। কিন্তু তার মত এত তুচ্ছ লোকের সাথে শিক্ষামন্ত্রী দেখা করবে না বলে ফিরতি চিঠি পাঠালে বাধ্য হয়ে তাকে বেছে নিতে হয় অন্য রাস্তা। শরীরে নকল বোমাবেধে মুখ্যমন্ত্রীর বাঙলোতে ঢুকে পড়ে সে, আর ভয় দেখায় কেউ এগোনোর চেষ্টা করলে বোমা বিস্ফরণ করবে তিনি। তাই বাধ্য হয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে তার সম্মুখীন হতে হয়। সে তাকে প্রশ্ন করে, যে ব্যক্তি যে বিষয়ে পারদর্শী তাকে সে বিষয়ে আরো এগোতে না দিয়ে অন্য বিষয়ের খারাপ করার জন্য তার ভবিষ্যতের পথ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে কেন ? তার কথাগুলোর যৌক্তিকতা বুঝতে পেরে শিক্ষাপদ্ধতি পাল্টানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন মুখ্যমন্ত্রী।

অন্যদিকে গৌরবও ভালো হয়ে উঠতে থাকে। আবারও ব্যাট হাতে মাঠে নামে গৌরব। আবারও শুরু হয় তার সেঞ্চুরির বন্যা।

এটি কোন বাস্তব ঘটনা হয়। এটি হরনাথ চক্রবর্তীর পরিচালনায়, মহেন্দ্র সোনি ও শ্রীকান্ত মোহতার প্রযোজনায় ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র “চলো পাল্টাই” ছবির কাহিনী। যেখানে বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যয় আর ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছে আরিয়ান ভৌমিক।

এতক্ষণ ধরে এই ছবির কাহিনী বলার একটা কারণতো নিশ্চয়ই আছে। আর সেটি হল ছবিটির কাহিনীর সাথে আমাদের সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা সবই মিলে যায়। যেখানে মানুষকে তার প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নতি সাধনের সুযোগ না দিয়ে অন্যান্য বিষয়ে পারদর্শীতা না থাকার জন্য তার প্রতিভাকে একেবারে নিভিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর এই সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনে চাই সুখময় এর মতো কোন ব্যক্তি যে সমাজের এসব চিত্র তুলে ধরতে পারবে সকলের সামনে । যে একজন মন্ত্রীর সামনে দাড়িয়েও প্রশ্ন করার সাহস রাখবে। যে মন্ত্রীর সামনে যুক্তি তর্কে সফলতা আনতে পারবে। হয়তো এরকম লোকের দেখা মেলা খুবই কষ্টের। তাই আমার মতে শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত সকলের এই ছবিটি দেখা উচিৎ যাতে সেও বুঝতে পারে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অবস্থা। যাতে একটু হলেও চাপ কমে এদেশের শিক্ষার্থীদের উপর। কারণ এখনও পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর টিভি পর্দা খুললে বা পত্রিকা পাতা ওল্টালেই চোখে পড়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর। তাই সকলের উচিৎ একবার হলেও ছবিটি দেখা আর তা উপলব্ধি করা। হয়তো এরফলেই এই মৃত্যুর সংখ্যা কমে যাবে। হাসি ফুটবে শিক্ষার্থীদের মুখে। যে যে বিষয়ে পারদর্শী তাকে সে বিষয়েই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর তাদের সাফল্যে দেশের সুনামও বৃদ্ধি পাবে।

শুধু নতুন নতুন নিয়ম চাপিয়ে দিয়েই কাজ শেষ করে হাত ধুয়ে ফেললে হবে না। বুঝতে হবে মানুষের সে ভার ওঠানোর ক্ষমতা আছে কিনা। নাহলে সেই ভারের নিচে পড়েই হারিয়ে যাবে মানুষ। নষ্ট হবে তাদের জীবন। দেশও হারাবে তার সম্ভাবনাময় এক একটি প্রতিভাকে।

 

২৪/১২/২০১৬-ZR

Shares