English Version

সম্ভাবনার বছর হোক ২০১৭


মীর আব্দুল আলীম : কালের বিশাল বৃক্ষ থেকে ঝরে গেলো ২০১৬। সময়ের এক একটি পাতা এভাবেই ঝরে যায়। গত বছরের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাব খুঁজতে খুঁজতে নতুন বছরকে সামনে রেখে আবর্তিত হবে নতুন নতুন স্বপ্নের। দিন যায়, দিন আসে। মানুষ
বয়েসী হয়। বয়স বাড়ে আমাদের পৃথিবীরও।

প্রাচীন হয়, হতে থাকে এভাবে আমাদের জগত-সংসার। অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞতায় মানুষও সমৃদ্ধ হয় ক্রমশ। সাধারণ মানুষেরা
তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার চড়াই-উৎরাই পার হতে হতে ভাবে যেসব দিন পেছনে পড়ে রইলো তা থেকে গেলো জীবনের সঞ্চয় রূপে স্মৃতি হিসেবে। কেউ কেউ আবার কালবৃক্ষের ঝরাপাতাদের নিয়ে আবেগে তাড়িত হয়। ফেলে আসা দিনগুলোর পাওয়া-নf পাওয়ার হিসাব মিলাতে গিয়ে হিমসিম খায়। সংসারী মানুষদের অবশ্য এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা থাকে না। তাদের কোনো হা-হুতাশ করার অবসরই থাকে না। তাদের থাকে দিন গুজরানের সংগ্রাম।

থাকে একটি দিনের সকল সাংসারিক প্রয়োজন মিটিয়ে পরবর্তী দিনের ভাবনা, ভালো কাটানোর আর সঙ্কটবিহীন জীবনের স্বপ্ন। এই
স্বপ্নই আসলে মানুষকে সংগ্রামের প্রেরণার যোগান দেয়, সুখ-দুঃখের জীবনকে সহনীয় করে চলে। আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে,/ তবুও শানি-, তবু আনন্দ, তবু অনন- জাগে।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এ কথার মতই দুঃখ, কষ্ট সবকিছু কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে যাত্রার কোলের বিশাল বৃক্ষ থেকে ঝরে গেলো ২০১৬।

নতুন বছরটি যেন সমাজ জীবন থেকে, প্রতিটি মানুষের মন থেকে সকল গ্লানি, অনিশ্চয়তা, হিংসা, লোভ ও পাপ দূর করে। রাজনৈতিক হানাহানি থেমে গিয়ে আমাদের প্রিয় স্বদেশ যেন সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে পারে এ প্রত্যাশা আমাদের।
২০১৭ কে ঘিরে অনেক প্রত্যাশা, অনেক স্বপ্ন, অনেক কল্পনা। হবে মেট্রেরেল, হবে পদ্ম সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে। বিশাল স্বপ্ন আমাদেও সামনে।  যদিও সময়ের বিচারে খুব দীর্ঘ নয় একটি বছর, মাত্র তিনশো পঁয়ষট্টিটি দিন। তবু মানুষকে প্রতিটি দিনই ইঙ্গিতে-ইশারায় ডাকে। অজানা আগামীকালের পথে ডেকে নিয়ে যায়। দিন থেমে থাকে না, রাতও নয়।

আলো ও আঁধারের অবিচ্ছিন্ন আবর্তনের ভেতর দিয়ে এবার এগিয়ে যাবে নতুন বছর। পুরনো বছরের ধূসর দিনগুলোর কথাও পাশাপাশি আমাদের মনে পড়বে কী পেয়েছি, কী হারিয়েছি। নতুনের প্রতি সবসময়ই মানুষের থাকে বিশেষ আগ্রহ ও উদ্দীপনা। নতুনের মধ্যে নিহিত থাকে অমিত সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে বাস-বে রূপায়ণ করার সুযোগ করে দিতে এলো নতুন বছর। অতীতের
ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে নতুনকে নিয়ে এগিয়ে চলাই জীবন। দেখা যাক নতুন বছর আমাদেও জন্য কি সুবাতাস নিয়ে আসে।
আসলে সৃষ্টির আদিকাল থেকেই মানুষের চলছে সুদিনের সন্ধান। আমার ২০১৭ সালকে সুদিন হিসাবে দেখতে চাই। আসছে দিন হোক ভালো দিন, এমন একটি ভাবনার বীজ মানুষের ভেতরে অঙ্কুরিত হয়েছে নিয়ত প্রতিকূল অবস্থার মোকাবেলা করতে করতে।
এই ভাবনার করে তুলেছে মানুষকে যুগে যুগে সৃষ্টিশীল। মানুষের মসি-ষ্কে খেলা করেছে অবিরত চারপাশের বিরুদ্ধ পরিবেশ প্রভাব। তার থেকে বিদ্যুৎ চমকের মতো হঠাৎ হঠাৎ বিচ্ছুরিত হয়েছে উদ্ভাবনের আলো। সেই আলোর ঝলকের সাহায্যে মানুষ খুঁজে পেয়েছে জীবনযাত্রাকে সহনীয় করে তোলার নানা প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিই বদলে দিয়েছে মানুষের পৃথিবীকে। প্রযুক্তির হাত ধরে মানবের যে পথচলা, সেখানে অনিবার্যভাবেই যুক্ত হয়েছে প্রগতির চাকা। বদলে গেছে জীবনধারা থেকে শুরু করে চিন্তা -চেতনার জগৎ।

অবশ্যই পদার্থের প্রতিটি ক্রিয়ার বিপরীতে যে আরেকটি প্রতিক্রিয়া রয়েছে, তা থেকে কিন’ এই মানবজীবন মুক্ত নয়। আবিষ্কার প্রযুক্তির ব্যবহার ও পরিবর্তনের নানা ধারার ভালো দিকটার পাশাপাশি মন্দটাও হুমকি হয়ে উঠেছে। এই হুমিকটাও মোকাবেলা করে
মানুষ এগোয়। অগ্রযাত্রা বয়ে যায় নদীর স্রোতের মতো। আসলে মানবজীবনের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে বহু সঙ্কট। ধর্ম-দর্শনের চর্চার মাঝে মানুষ চেয়েছে,শানি-, স্বসি-, নিরাপত্তা ও আনন্দ-ভালোবাসায় মানবতাকে চিরজাগ্রত রাখতে। চেয়েছে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে বহুমত ও বহুপথের সমন্বয়ে নিজেদের পারস্পরিক মিলনের নিরাপদ আবাসভূমি। মানুষের এই স্বপ্ন যে পূরণ হয়েছে এই আকাঙ্খা যে বাস-বায়িত হয়েছে বিশ্বময় তা কিন’ নয়। কল্যাণ-চেতনার পাশেই অকল্যাণের অপশক্তি তাদের মতান্ধতা চাপিয়ে দিয়ে যুগে যুগে মানবতাকে বিপণ্ন করে তুলেছে, মানুষের চিন্তাকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে মুক্তির প্রশান- আকাশের ডানা ছেঁটে দিতে প্রয়াসী হয়েছে।

মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা-বিরোধী এই দানবতার প্রকাশ আজও বিশ্বের দেশে দেশে চলছে। তবে, মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক
মানুষেরাও থেমে নেই। শুভ-অশুভের এই সংগ্রামে দেশে দেশে মানুষের জীবনহানি ঘটছে। মানুষ তার চিরকালের বসবাসের আনন্দভূমি হারিয়ে নিদারুণ গ্লানিময় শরণার্থীর জীবন বহন করে ঘুরে মরছে আশ্রয়ের সন্ধানে দেশ থেকে দেশান্তরে। এই
অমানবিকতা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে হলে আজ শুভবুদ্ধি সব মানুষকে একতাবদ্ধভাবে অশুভ দানবদের আঘাত হানতে হবে।
সেই সুদূর অতীতে মানবজীবন বিকশিত হবার পর্যায়ে কোথাও কোথাও সম্পদ জমতে থাকলে অর্থনীতি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় তা বিশেষ ক্ষমতা অর্জন করে পুঁজিবাদের পথে ধাবিত হয়। বর্তমানকালে এসে এই পুঁজিবাদ তাদের পুষ্টি-প্রভাব বিস্তৃত করার জন্যে নীতি-নৈতিকতাকে পাশ কাটিয়ে ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দেয়, পৃষ্ঠপোষণা করে।

আবার সেই অপশক্তি যখন পুঁজির শোষণের প্রতিদ্বন্‌দ্বী রূপে নিজেরাই আবির্ভূত হতে থাকে তখন ধ্বংস করার পদক্ষেপ নিয়ে যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যায় তাতেও তার ফায়দা সেলুটে নেয় অস্ত্র ব্যবসার মাধ্যমে। সাম্যবাদী চিন্তার অগ্রযাত্রাকেও ব্যাহত করেছে এই পুঁজিবাদই, ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে বিশ্বের নানা অঞ্চলে মদত দিয়ে, প্রত্যক্ষ সহায়তা করে।

আজকের মানুষকে তাই এই প্রবল দুই প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করে এগিয়ে যাবার কথা ভাবতে হবে। দেশে দেশে শুভচিন্তার মানবতাবাদী মানুষকে সংঘবদ্ধ হয়ে জেগে উঠতে হবে। আজকের ২০১৬ সনের এই বিদায়ের দিনে সবার মাঝে জাগরণের এই ভাবনা ব্যাপ্তি লাভ করুক। নতুন বছরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সকল বাঙ্গালির সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রত্যাশা। আরও প্রত্যাশা হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও হানাহানি পরিহার করে বাংলাদেশটা পরিণত হবে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুখী ও সুন্দর মানুষের দেশে। নতুন বছরের কাছে প্রত্যাশা ভালো থাকার, সুন্দর থাকার। দেশ হোক অসি’তিশীলতা-সহিংসতা-নৃশংসতামুক্ত। চাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন। নতুন বছরের
কাছে চাওয়া একটি সুন্দর জীবন। সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ, শিক্ষাঙ্গণে সুস্থ্য পরিবেশ। মানুষে মানুষে শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা। সব মিলে হবে একটি শান্তিময় দেশ। ২০১৭কে ঘিরে এমন স্বপ্নই দেখছি আমরা।

লেখক- মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিষ্ট