English Version

‘একটি ঘরও নেই যেখানে ধর্ষণ-নির্যাতন হয়নি’


মিয়ানমারের সেনারা যখন পুইন্ত ফিউ চাউং গ্রামে এসে পৌঁছায়, তখন সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় পায় সবাই। ২৫ বছরের নূর আনকিস বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। নূর জানায়, সেখানে তাকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে পেটানো হয়। পরে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে তাকে ও অন্য নারীদের ধর্ষণ করে সেনারা। রাশিদা বেগম (২২) নিজেদের তিন সন্তানকে নিয়ে স্রোতস্বী নদীতে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। ভাগ্যের পরিহাস। তার ছোট্ট মেয়েটি ছিটকে যায় হাত থেকে। সুফায়াত উল্লাহ’ও (২০) নদীতে নেমে যায়। দু’দিন পানিতে থাকার ওপর ডাঙায় ফিরে এসে দেখতে পান সেনারা তাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তার মা, বাবা আর দুই ভাই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে।

এই বর্ণনাগুলো মিয়ানমার থেকে গত কয়েকদিনে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের। ওরা এখন বাংলাদেশে। তাদের বর্ণনায় উঠে এলো সাম্প্রতিক মাসে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংস বিদ্রোহী-বিরোধী অভিযানে কি ধরনের সহিংসতার অবতারণা ঘটেছে।

তাদের গল্প স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা অসম্ভব হলেও, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্টগুলোর সঙ্গে এগুলো সঙ্গতিপূর্ণ। এসব রিপোর্টে বলা হয়েছে, সেনারা উত্তর রাখাইন রাজ্যের গ্রামগুলোতে প্রবেশ করেছে। বাছবিচারহীনভাবে গুলি করেছে। রকেট লাঞ্চার দিয়ে বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। নারী ও মেয়েদের ঢালাওভাবে ধর্ষণ করেছে। আগুনে পুড়ে খাক হয়েছে কমপক্ষে ১৫০০ ঘরবাড়ি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণে এমনটাই দেখা গেছে।

এই আগ্রাসী অভিযান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দক্ষিণের দিকে ধাবিত হয়েছে। মিয়ানমার সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মধ্যে জেগে ওঠা মিলিট্যান্সি সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে বলে সন্তুষ্ট বোধ করছে ততক্ষণ এই অভিযান চলবে বলেই মনে হচ্ছে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে মুসলিম জাতিগত রোহিঙ্গা গোষ্ঠীটি দশকের পর দশক ধরে নিপীড়নের শিকার।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফর্টিফাই রাইটসের ম্যাথিউ স্মিথ বলেন, ‘সব চেয়ে নিকৃষ্টতম পরিস্থিতি এখনও দেখার বাকি- এমন ঝুঁকি রয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীগুলো এরপর কি করবে তা আমরা নিশ্চিত নই। তবে আমরা জানি যে, বেসামরিক ব্যক্তিদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে।’

মিয়ানমার সরকারের নিয়োগ পাওয়া একটি কমিশন গত সপ্তাহে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অথচ, ওই গ্রামগুলোতে পশ্চিমা সাংবাদিক ও মানবাধিকার তদন্তকারীদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষের দাবি, রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের বাড়িতে আগুন দিচ্ছে। আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বেশির ভাগ অভিযোগই তারা অস্বীকার করেছে। শুধু ব্যতিক্রম একটি ঘটনা- যেখানে এক রোহিঙ্গাকে প্রহার করার দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে ভিডিওতে। শান্তিতে নোবেল জয়ী মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি এই সহিংসতার প্রেক্ষিতে আরো কর্তৃত্ব নিয়ে জবাব দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সমালোচিত হয়েছেন।

অক্টোবর মাসে রাখাইন রাজ্যের তিনটি সীমান্ত চৌকিতে হামলার ঘটনার পর শুরু হয় এই অভিযান। ওই হামলায় ৯ পুলিশ নিহত হয়। সশস্ত্র একটি রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গ্রুপ ওই হামলা চালিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ওই ঘটনার আগ পর্যন্ত এই গ্রুপ ছিল অপরিচিত।

সামরিক বাহিনীর এই অভিযানকে সরকার ‘নির্মূল’ (ক্লিয়ারিং) অভিযান বলে বর্ণনা করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে এই অভিযানে বহুলাংশে টার্গেট করা হয়েছে বেসামরিক ব্যক্তিদের। এর ফলে আনুমানিক ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন এ তথ্য দিয়েছে।

মিয়ানমার সীমান্তের নিকটে লেডা শরণার্থী ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ও একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী দুদু মিয়া সম্প্রতি পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বলেন, “স্রোতের মতো আসতে শুরু করে তারা। সবাই পাগলের মতো আচরণ করছিল। ওরা সবাই ছিল হতবিহ্বল। তারা বলছিল যে, ‘আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে, আমার মাকে মেরে ফেলেছে, আমাকে মারধর করেছে।’ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ছিল তারা।”

নাফ নদীর ওপারের গ্রামগুলোতে হামলা চালায় সেনারা। বাংলাদেশ আর মিয়ানামারকে আলাদা করে এই নাফ নদী। দূরত্ব এতোই কম যে, বাংলাদেশিরা এপার থেকে ওপারের অগ্নিসংযোগ হওয়া গ্রামগুলো থেকে ধোঁয়ার উদগীরণ দেখতে পায়। রোহিঙ্গাদের খাবার সরবরাহ করা একটি মসজিদের ইমাম নাজির আহমেদ এ কথা বলছিলেন।

তিনি আরো বলেন, এটা সত্যি যে, মিয়ানমারের বাহিনীদের হাতে বছরের পর বছর অসদাচরণে বিক্ষুব্ধ হয়ে কিছু রোহিঙ্গা নিজেদের একপ্রকার ছোটখাট বিদ্রোহী শক্তিতে সংগঠিত করেছে। কিন্তু মিয়ানমার তাদের পরিধি ও আন্তরিকতা অতিরঞ্জিত করেছে নাটকীয়ভাবে। রোহিঙ্গারা ‘হতাশ আর তারা লাঠি হাতে নিয়ে নিজেদের রক্ষার আহ্বান জানাচ্ছে। এখন তারা (মিয়ানমারে বাহিনী) যদি এক কৃষকের বাড়িতে চাপাতি পায় তাহলে তারা বলে- তুমি সন্ত্রাসবাদে জড়িত।’

গতমাসে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের একটি বিশ্লেষণে নতুন এই মিলিট্যান্ট গ্রুপ নিয়ে গুরুতর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, গ্রুপটির অর্থায়ন আর সংগঠিত করার কাজ করছে সৌদি আরবে পাড়ি দেয়া রোহিঙ্গারা। বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়, সহিংসতা অব্যাহত থাকলে তা রোহিঙ্গাদের মধ্যে জঙ্গিবাদ উস্কে দিতে পারে যারা আন্তঃদেশীয় জিহাদী গ্রুপগুলোর হাতিয়ার হতে রাজি হতে পারে।

বাংলাদেশে কুতুপালং ও লেডা শরণার্থী ক্যাম্পের ভেতরে ও আশে পাশে থেকে নেয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, সেনারা প্রথমে তাদের বাড়িতে ঢুকে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের সন্ধান করেছে। এরপর নারীদের ধর্ষণ করেছে এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। নতুন আসা অনেকেই কিয়েত ইয়োপিন গ্রামের বাসিন্দা ছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে ওই গ্রামে অক্টোবরের মাঝামাঝি দুই দিনের অভিযানে ২৪৫ টি বাড়ি ধ্বংস করা হয়।

২০ এর কোঠায় বয়স মুহাম্মদ শফিক বললো, যখন সে বন্দুকের শব্দ শুনতে পায় তখন নিজ পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে ছিল। সেনারা প্রথমে বাড়ির দরজায় বাড়ি দিতে থাকে। পরে দরজায় গুলি করে। সে যখন সেনাদের ভেতরে ঢুকতে দেয় তখন তারা বাড়ির নারীদের সরিয়ে নিয়ে যায় আর পুরুষদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখে।

শফিক বলেন, এক সেনা তার বোনের হাত ধরলে সে ওই সেনার দিকে এগিয়ে যায়। শফিকের মনে শঙ্কা দানা বাঁধে যে ওই সেনা তার বোনকে ধর্ষণ করতে চায়। পরে শফিককে সেনারা মারাত্মক মারধর করে ফেলে রেখে যায়। পরে শফিক তার এক সন্তানকে নিয়ে দ্রুত দৌড় দিয়ে পালিয়ে যায়। পালানোর সময় এক সেনার গুলি লাগে তার কনুইতে। ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে ঘণ্টাঘানেক সময় ধরে হামাগুড়ি দিয়ে, টেনে-হিঁচড়ে এগুতে থাকে সে। পরে নিরাপদ দূরত্ব থেকে সে দেখতে পায় সেনাদের আগুনে জ্বলতে থাকা কিয়েত ইয়োপেন গ্রাম। শফিক বলেন, ‘কোনো বাড়িঘর অবশিষ্ট নেই, সবকিছু পুড়ে গেছে।’

২৫ বছরের জান্নাতুল মাওয়া ওই একই গ্রাম থেকে এসেছেন। তিনি জানালেন, রাতের অন্ধকারে প্রতিবেশীদের মরদেহের মাঝখান দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পাশের গ্রামে পালিয়ে যান তিনি। জান্নাতুল বলেন, ‘কয়েকজনকে গুলি করা হয়েছে। কাউকে হত্যা করা হয়েছে ব্লেড দিয়ে। যেখানেই তারা মানুষ দেখেছে সেখানেই তাদের হত্যা করেছে।’

পুইন্ত ফিউ চাউং গ্রাম থেকে এসে কয়েক ডজন পরিবার। ১২ই নভেম্বর বিদ্রোহী আর সেনাদের মধ্যকার সংঘর্ষের স্থান থেকে এই গ্রামটি নিকটে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, প্রতিবেশি গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে মিলিট্যান্টরা। সেনারা তাদের অনুসরণ করলে, পুইন্ত ফিউ চাউং গ্রামের কয়েক শ’ পুরুষ বাধা দেয়। চাষাবাদে সরঞ্জাম আর ছুরির মতো হালকা অস্ত্র দিয়ে তারা রুখে দাঁড়ায়। অ্যামনেস্টির রিপোর্ট মোতাবেক মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গুলিতে নিহত হয় আর সেনারা আকাশপথে অতিরিক্ত সহায়তা ডেকে পাঠায়।

মমতাজ বেগম (৪০) বলেন, তাদের গ্রামের দু’দিক থেকে নিরাপত্তা বাহিনী প্রবেশ করার সময় ভোরে তার ঘুম ভেঙে যায়। তারা প্রতিটি বাড়ি গিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের খুঁজতে থাকে।

মমতাজ জানান, তিনি ও তার মেয়েকে বলা হয় তাদের বাড়ির বাইরে হাঁটু গেড়ে বসতে। মাথার পেছনে হাত দিতে। তাদেরকে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পেটানো হয়। তার ১০ বছরের ছেলের পায়ে গুলি করা হয়। তার স্বামী, তার মেয়ের স্বামী ও গ্রামের কয়েক ডজন পুরুষ ও বালককে আটক করে হত্য করে সেনারা। মমতাজ আরো বলেন, ‘মসজিদে মরদেহগুলো লাইন ধরে ফেলে গণনা করে তারা।’

মমতাজের মেয়ে নূর আনকিস জানান, পরের দিন সকালে সেনারা প্রতিটি বাড়ি গিয়ে তরুণী-যুবতীদের খোঁজ করে। নূর বলেন, ‘তারা নারীদের একসঙ্গে করে একটি স্থানে নিয়ে আসে। যাদেরকে পছন্দ হয় তাদের তারা ধর্ষণ করে। মেয়েরা আর সেনারা ছাড়া সেখানে কেউ ছিল না।’

পালানোর চিন্তা মাথায় এসেছিল নূরের কিন্তু নিয়তির ওপর বিশ্বাসে আচ্ছন্ন হয়ে যান তিনি। নূর বলেন, ‘বেঁচে থাকার কোনো অর্থ আছে বলে মনে হচ্ছিল না।’

কথা বলতে বলতে মাথার ওড়না নিচে নামিয়ে চোখের পানি মুছে নিলেন নূর। বললেন, স্বামীর কথা খুব মনে পড়ছে তার। ‘বিয়ের পর কিভাবে আমার খেয়াল রাখতো সে কথা মনে হয় কেবল। তাকে আবার কিভাবে দেখতে পাবো?’ নূর আনকিসের হৃদয়ছেঁড়া প্রশ্ন।

মাদ্‌রাসার ছাত্র সুফায়াত উল্লাহ জানায়, সে হামলার দিন সকালে পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে ছিল। প্রথমে গুলির আওয়াজ শুনতে পায় সুফায়াত। দ্রুতই মাথায় আসে বাঁচার একমাত্র উপায় পালিয়ে যাওয়া। সুফায়াত বললো, ‘যেসব মানুষ তারা কাছে পেয়েছে তাদের চাপাতি দিয়ে মেরেছে। দূরের লোকদের গুলি করেছে।’

বাড়ি থেকে দৌড় দিয়ে সুফায়াত শহরের কোনায় নদীর দিকে ছুটে যায়। পানিতে ঝাঁপ দিয়ে যতক্ষণ পেরেছে সাঁতরাতে থাকে। পরের দু’দিনের বেশির ভাগ সময় পানিতেই কেটেছে তার। অবশেষে একপর্যায়ে প্রতিবেশী একটি গ্রামের তীরে গিয়ে ওঠে। এরপর সে জানতে পারে তার মা, বাবা, দুই ভাই- সবাইকে তাদের বাড়ির মধ্যে পুড়িয়ে মারা হয়েছে।

হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে সুফায়াত বললো, ‘কোন রকম শান্তি লাগে না আমার। ওরা আমার বাবা-মাকে মেরে ফেলেছে। এই জগতে আমার আর কি অবশিষ্ট আছে?’