English Version

গল্প: আকাশের পরী


ভাইয়া, ভাইয়া, উঠো, আর কত ঘুমাবে । আম্মু দেখো, তোমার ছেলে এখনো ঘুমুচ্ছে । কথা গুলো বলে আকাশের রুম থেকে বেড় হয়ে গেল তার বোন রিয়া ।

সাজ সকালে রিয়ার চেচামেচিতে একরাশ বিরক্ত ঘুম থেকে উঠে আকাশ। আকাশ ভার্সিটিতে পড়ে । এবার থার্ড ইয়ারে উঠেছে । রিয়া তার একমাত্র বোন। এরই মাঝে আকাশ ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে আসে । নাস্তার পড় ভার্সিটির উদ্দেশ্যে চলে যায়।

আকাশ ক্লাসে ভাল ছাত্র হিসেবেই পরিচিত। অন্য কোন দিকে তার মন নেই। অনেক মেয়েই তাকে ভালবাসতে চেয়েছিল কিন্তু আকাশ কাউকেই নিজের মত করে মনের মধ্যে বসাতে পারেনি । ক্লাসের বিরতিতে বন্ধুদের সাথে ক্যান্টিনে যাওয়ার সময় হঠাৎ কিছু একটা ওর চোখে লাগে । দ্রুতই তাকিয়ে দেখে একটা মেয়ে হেটে যাচ্ছে । তার ওড়নাটা বাতাসে ওড়ছে । সেটাই এসে ওর চোখে লাগে । .আকাশ ভাবে মেয়েটিকে কিছু বলা দরকার।। ভেবেই ডাক দেয়:

মেয়ে— জি ভাইয়া, আমাকে বলছেন ?

মেয়েটাকে দেখে আকাশের ঘৃনাটা মুহুর্তেই উধাও হয়ে গেল। ঠিক যেন ডানা কাটা পরী । বিধাতা নিজের হাতে যেন সমস্ত সৌন্দর্য্য দিয়ে তাকে বানিয়েছে । আকাশ মনে মনে বলছে – এই মেয়ে, তুমি এত সুন্দর কেন ?

মেয়ে— ভাইয়া কিছু বলবেন ?

মেয়ের ডাকে নিজেকে ফিরে পায় আকাশ। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে –

আকাশ- আপনি কি এই ভার্সিটিতে নতুন, আগে কখনো দেখিনি তো তাই জিঞ্জাস করলাম।

মেয়ে— জি ভাইয়া, আমি এবারই ভর্তি হলাম।।

আকাশ -ও তাই। কোন সাবজেক্টে?
মেয়ে- ইংলিশ
আকাশ– আমিও তো ইংলিশে অনার্স করছি । এবার থার্ড ইয়ার। আচ্ছা আপনার নামটা জানতে পারি ?
মেয়ে- আমার নাম পরী । বলে একটু মুচকি হেসে মেয়েটা তার ক্লাসে চলে গেল।

পরী,, ঠিক যেন পরীর মতই।। ওর বাবা মা ওর জন্য একেবারে পারফেক্ট একটা নাম রেখছে । মানুষ এত সুন্দর হয় ?  ক্লাস শেষে বাসায় চলে এল আকাশ। না পরী নামের মেয়েটিকে এক মুহুর্তের জন্যও ভূলতে পারছেনা । বাতাসের উড়ন্ত ওড়না, আর যাওয়ার সময় সেই হাসিটা তার চোখে এখনো ভেসে আছে । রাতে খাবার খেয়ে শুতে গেল সে । না ঘুম কিছুতেই আসছেনা । শুধু পরীর মুখটা ভেসে উঠছে চোখে । এর আগেতো কোন মেয়েকে নিয়ে এরকম চিন্তা হয়নি, তাহলে কি মেয়েটিকে ভালবেসে ফেলেছে সে ?
পরদিন সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে ভার্সিটিতে চল গেল আকাশ। এবার তার চোখ খুজছে একটি মেয়েকে । ভার্সিটির ক্যান্টিনে মেয়েটিকে পেয়ে গেল সে ।
আকাশ- হ্যালো, কেমন আছেন ?
পরী- ও ভাইয়া , ভালো আছি, আপনি ভাল আছেন ?
আকাশ– হুম। কি করছেন এখানে বসে বসে?
পরী– না ভাইয়া, এমনি বসে আছি ।
আকাশ– যদি কিছু মনে না করো তাহলে চলো ঐ দিকের গাছের নিচটায় বসি ।
পরী- ঠিক আছে, চলুন ।
আকাশ আর পরী কি অদ্ভুত মিল তাই না । আকাশের বিশালতার মাঝে একটা ডানাকাটা পরী উড়ে বেড়াবে সারা আকাশজুড়ে । কি অপরুপ লাগবে তখন দেখতে । সবাই দেখবে একটা সাদা পরী আকাশে উড়ছে ।

………………৬ মাস পর………….

পরী- আকাশ তোমাকে একটা কথা বলব ?
আকাশ- কি বলবে, বলো  ।
পরী-  তুমি আমাকে কতটুকু ভালবাসো ?
আকাশ- অনে……..ক ভালবাসি তোমায় ।
পরী- যদি কখনো হারিয়ে যাই তখন কি করবে ?
আকাশ- আমি তোমাকে কখনো হারাতে দিব না। আমার জীবন দিয়ে হলেও তোমাকে ধরে রাখবো
পরী- সত্যি ধরে রাখবে তো ?
আকাশ- পরীকে জরিয়ে ধরে, এইযে তোমাকে ধরলাম আর ছারবোই না । সারাজীবন এভাবেধরে রাখবো ।

আজ কয়েকদিন ধরে আকাশের মনটা ভালনা । কারন এই কয়েকদিন ধরে তার সাথে পরীর কোন যোগাযোগ নেই। মোবাইলও বন্ধ। পরীর কোন খবর না পেয়ে পাগলের মত হয়ে গেছে আকাশ। ভার্সিটি থেকে পরীর বাসার ঠিকানা নিয়ে পরদিন চলে গেল পরীদের বাসায়। কলিংবেল চাপতেই একটা অল্পবয়স্ক মেয়ে এসে দড়জা খোলে দেয়।
আকাশ- এটা কি পরীদের বাসা ?
মেয়ে- জি, আপনি কি আকাশ ভাইয়া ?
আকাশ- হ্যা, তুমি আমার নাম জানলে কি করে ?
মেয়ে- আমি পরী আপুর ছোট বোন, আপু আপনার জন্য একটা চিঠি দিয়েছিল আমার কাছে ।

প্রিয় আকাশ, আমাকে ক্ষমা করে দিও । তোমার মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমার ছিল না । আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি । কিন্তু শেষ মুহুর্তে যখন জানলাম আমার কিডনিতে সমস্যা, আমি আর বাচব মাত্র কয়েকটা দিন তখন আর তোমার মুখোমখি হওয়া আমার সম্ভব ছিল না । খুব ভালবাসি তোমায়। খুব ভালবাসি । অনে……ক ভালবাসি তোমায়।

চিঠিটা পড়ে আকাশ কাদতে লাগলো । তার ভালবাসার মানুষটি এভাবে চোখের সামনে মরে যাবে এটা মানতেই পারছেনা সে ।
ঠিকানা নিয়ে চলে গেল হাসপাতালে । হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে পরী । না এখন আর তাকে পরীর মত লাগছে না । অনেক শুকিয়ে গেছে সে । নিজের কাপা কাপা হাতে পরীর হাতটা ধরল ।
পরী- কাদতে কাদতে, আকাশ আমি জানতাম তুমি আসবে । জানো এই বেডে শুয়ে শুয়ে শুধু একটা জিনিসই আল্লাহর কাছে চেয়েছি । যেন আমার আকাশের বুকে এই পরীর মৃত্যু হয়। আল্লাহ আমার সেই দোয়া কবুল করেছে ।এখন আমি করেও শান্তি পাব।
আকাশ- আকাশের বুক থেকে পরীরা কখনো হারিয়ে যায় না । হারাতে পারেনা । এত বিশাল আকাশের মধ্যে যদি একটা পরী স্বাধীন ভাবে বিচরন করতে না পারে তাহলে কি লাভ এই বিশালতা দিয়ে । আকাশের বিশলতায় আমার পরী আবার উড়বে ।  চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল আকাশ।

আজ পরীর অপারেশন। তার দুইটা কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে । ডাক্তার বলেছে বাচা মরা ৫০% । কিন্তু এই দিনে আকাশকে হাসপাতালের কোথাও দেখা গেল না ।

১ মাস পড় ———–

পরী এখন অনেকটাই সুস্থ। কিন্তু মনের গহীনে একটা প্রশ্ন লুকানো তার, অপারেশনের এত দিন হয়ে গেল কিন্তু আকাশকে তো দেখছিনা । সে কি এই কয়েকদিনে ভূলে গেছে আমায় ? না, এটা কি করে সম্ভব ? তাহলে আকাশ আসেনা কেন ?  পরদিন  হাসপাতালের বেডে পরী শুয়ে আছে । আকাশের এক বন্ধু এসে পরীকে একটা চিঠি দিয়ে যায় ।
চিঠি খুলে পড়তে শুরু করে পরী –

কি ভাবছো ? আমি কেন তোমার সামনে আসছি না ? ওগো তুমি কি আমায় দেখোনা ? আমি তো সবসময় তোমার পাশে আছি । তোমাকে দেখছি । পরীরা আকাশে উড়ে জানো । এত বিশাল আকাশের বুকে কি কখনো পরীরা হারাতে পারে ? জানো, তোমাকে যেদিন দেখেছিলাম সেদিন আমি আর কিছুই ভাবতে পারিনি তোমাকে ছাড়া । যখন তোমার সাথে কথা বলতাম, ভাবতাম সত্যিই কি তোমার সাথে কথা বলছি । যেদিন তোমাকে ভালবাসি বলেছিলাম সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলাম যদি তুমি ভূল বুঝে হারিয়ে যাও। কিন্তু তুমি যখন বললে ভালোবাসি তখন আমিই ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। যেদিন শুনলাম তুমি অসুস্থ, হাসপাতালে আছো, সেদিন খুব কেদেছিলাম জানো । তোমাকে ছাড়া পৃথীবিতে বাচবো এটা অসম্ভব ছিল আমার জন্য। পরীর স্থান আকাশের বুকে । সে কেনন মাটিতে নামবে । তাই আমার দুটো কিডনি আমার পরীকে দিয়ে দিলাম। আমার পরী আবার উড়বে আর আকাশের বুকে ডানা মেলে । আমি হাসবো তোমার উচ্ছলতা দেখে । আর বলব, একটু কম করে উড়ো । তোমাকে তো চোখে চোখে রাখতে হবে নাকি ।

 

লিখা: এস এম জুয়েল