English Version

আজকের চাকরির খবর লাইভ খেলা দেখুন

প্রধানমন্ত্রী সাগরে কি দেখছিলেন?


কক্সবাজার-টেকনাফ ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করলেন মাননীয়  প্রধানমন্ত্রীশেখ হাসিনা । ৬ মে,  দুপুর সাড়ে ১২টায় অনুষ্ঠান শেষ  হলে সাধারন মানুষের মতো তিনি সাজা সৈকতে নেমে যান। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র তটিনী কক্সবাজার সৈকতে  কিছুক্ষণ খালি পায়ে হাঁটেন তিনি, নামেন পানিতেও। সেসময় প্রধানমন্ত্রীকে বেশ উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছিল। অপলক চেয়ে ছিলেন সাগর পানে। দৃষ্টিতে ভাবনা ছিলো। কি সেই ভাবনা? এ ভাবনাটা হয়তো পর্যটন শিল্পের বিকাশে ভাবনা। সাগরে যখন তার পা ভেজানা দৃশ্য দেখলাম, তখনই ভাবছিলাম এবার দেশের পর্যটন শিল্পের হয়তো  কিছু একটা হবে। সেদিন মানণীয় প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত দিলেন। বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন শহর কক্সবাজারকে আরও আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি। এত সুন্দর সমুদ্র সৈকত, কিন’ কক্সবাজার সবসময় অবহেলিত ছিল। এটাকে আরও আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তোলা  কর্তব্য বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশকে সারাবিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল ১০টি পর্যটন মার্কেটের একটি হিসেবে ভাবা হলেও পর্যটন শিল্পে আমাদের অবস্থান কোথায়? নিরাশা এই যে, দেশীয় পর্যটন বিকাশে তেমন কিছুই করছে না আমাদের পর্যটন কর্পোরেশন। আমাদের দেশে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটলেও পর্যটন শিল্পে এখনো অনেক পিছিয়ে। আমাদের পাশের অনেক দেশ যখন পর্যটনকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধন করছে, তখন বাংলাদেশের অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক নয়। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমাদের নয়নাভিরাম পর্যটন স্পট থাকা সত্ত্বেও অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা পর্যটক ধরতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রীর সমুদ্রদর্শন এবং পর্যটন নিয়ে তার পজেটভি বক্তব্য এ শিল্পের বিকাশে আশাজাগায় বৈকি! আমাদেও সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। আমাদের রয়েছে সুবিশাল সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, অরণ্যঘেরা জলপ্রপাত, প্রত্নতত্ত্বের প্রাচুর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত স্নান, যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। কিন’ সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে আমাদের এ শিল্প অনেকটা আড়ালে পড়ে রয়েছে। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে আকর্ষণীয় করার অন্যতম উপায় হতে পারে পর্যটন শিল্প।

পর্যটন শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে বাস-বায়ন করা হলে এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ আয় সম্ভব বলে মত দিয়েছেন কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। এইতো সেদিন ক্সসবাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকর আবুল কাশেম সিকদারের অতিথি হয়ে স্বপরিবারে গিয়েছিলাম কক্সসবাজারে। পর্যটন শিল্প নিয়ে টানা কথা হয়েছে তার সঙ্গে। এ শিল্প বিকাশে সরকারের যে আগ্রহের কমতি আছে কাশেম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে তাই বুঝলাম। তিনি
জানালেন তারা ফি বছর ধরেই বহু বার সরকারের সঙ্গে সভা সেমিনার করেছেন। মুখে মুখে হয় সবই কিন’ কাজের কাজ কিছুই হয় না। সব সরকারই আমাদের পর্যটন শিল্প বিকাশে উদাসীন। বর্তমান সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইনস, হংকং, সুইজারল্যান্ড, নেপাল,
থাইল্যান্ড, তিউনিসিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, গ্রীস, ফ্রান্স, ইটালি, স্পেন, হাওয়াই, কানাডা, সাইপ্রাস, মিশর, শ্রীলংকা, কেনিয়া, মরোক্কো, ভারত, পাকিস্তান, মেক্সিকা, নিউজিল্যান্ড, ফিজি, অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়াসহ বিশ্বের বহু পর্যটন থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রচুর অর্থ উপার্জন করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করছে। বাংলাদেশেও তা সম্ভব। এদেশে বহু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যা অতি সহজে; স্বল্প ব্যয়ে বিনোদন স্পটে পরিণত করা সম্ভব।
আমাদের নদী-নালা, হাওড় বাঁওড়ের লেকের সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করবেই। বিদেশি পর্যটকদেরও ভিমড়ি খেতেই হবে প্রকৃতির সৌন্দর্যে। আমরা জানি বাংলাদেশ সরকার পর্যটন উন্নয়নের অবশ্য এক মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করেছে। বহু দিন ধরেই পর্যটন শিল্প বিকাশে নানা ফুলঝুড়ি আউড়াচ্ছে সরকার। কিন’ কাজের কাজ হচ্ছে কৈ? আমাদের বাংলাদেশের সরকারের পর্যটন বলতে দেশ জুড়ে হাতেগোনা কয়েকটি পর্যটন হোটেল মোটেল গড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাও আবার এসব হোটেল মোটেলগুলো পর্যটকদের থাকবার ভালো পরিবেশ নেই। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মতো জায়গায় স্থাপিত পর্যটনের মোটেলটি রাজধানীর গুলিস্তানের হোটেলের চেয়েও নিম্নমানের বলা যায়। নোংরা বিছানা; স্যাঁতস্যাতে গন্ধে বমি আসার উদ্রেক হবে যে কারোরই। সিলেটের পর্যটনের মোটেলের
জেনারেটর নেই। রাঙ্গামাটিতেও একই অবস‌থা। এই হচ্ছে আমাদের দেশের পর্যটন শিল্প। আমাদের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কি কাজ তাইতো বুঝিনা? অপর সম্ভাবনার এই শিল্পকে মন্ত্রণালয়ের এগিয়ে নিতে খুব বেশি কাঠখড় যে পোড়াতে হবে তা কিন’ নয়? যদি বলি এ পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের একাগ্রতা নেই; স্বদিচ্ছা নেই, তা মোটেও ভুল হবে না। তবুও হাল সময়ে সরকার পর্যটন শিল্প বিকাশে যে উদ্যোগ নিয়েছে তার সাধুবাদ জানাই।
প্রাকৃতিকভাবে অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ কক্সবাজারে পর্যটনশিল্প বিকাশের বিশাল সুযোগ রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও তা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। এক কথায় বলি, পর্যটনশিল্প বিকাশের সম্ভাবনার মধ্যে আমরা হিমালয় সমান সমস্যা নিয়ে বসে আছি। এর প্রধান কারণ, জাতীয় পর্যায়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভালো কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকা। ফলে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত ও এই অঞ্চলের পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনার কথা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে পারিনি। রাজনৈতিক নেতারা যদি তাঁদের স্ব স্ব অবস্থান থেকে নিজেদের দলীয় ফোরামে পর্যটনের বিষয়টি তুলে ধরতে পারতেন এবং এর গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হতেন, তাহলে পর্যটনের এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেত। এ ছাড়া এ পর্যন্ত সরকারগুলোও এদিকে তেমন নজর দেয়নি। কক্সবাজারে পর্যটনশিল্প বিকাশের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সর্বপ্রথম একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

 

রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যটনকে বিকশিত করতে হবে। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথা আমলাদের মধ্যে পর্যটনশিল্প নিয়ে দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে বলে মনে করি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও একটি ফ্যাক্টর। আমাদের সবার বোঝার অদূরদর্শিতা আছে। পর্যটন নিয়ে আমাদের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। পর্যটন বলতে আমরা সাধারণ মানুষ বুঝি, পাঁচতারকা হোটেল, রেস্তোরাঁ, বার-ড্যান্স ক্লাব ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পর্যটন একটি বিশাল বিষয়। পর্যটকদের কাছে ওই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।  কক্সবাজারের বিশাল অঞ্চল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। এই অঞ্চলের পর্যটন বিকাশে ও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে এর বিকল্প নেই। না হলে পর্যটকেরা এখানে আসবেন না।

‘পর্যটন নিশ্চিত করার জন্য অন্তত তিনটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে- অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং জিনিসপত্রের মান ও দামের সামঞ্জস্য।’ কিন্তু’ কে গুরুত্ব দেবে? এদেশে যার যা করবার সে তা করে না; যে যা বোঝেনা, সে সেটা করবার জন্য সবার আগে এগিয়ে যায় । আর এতে করে লেজে-গোবোরে হয়ে ওঠে সব কিছু । এক্ষেত্রে এগুলোর বিষয়ে সরকারকেই গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার সরাসরি ব্যবসা করবে না; কিন্তু  মনিটরিংয়ের দায়িত্বটা সবসময় সরকারের ঘাড়েই চাপে।

 

রাঙ্গামাটি সিলেট কুয়াকাটা সুন্দরবনে থাকার জায়গার সংকট। পর্যটন কর্পোরেশন নামক প্রতিষ্ঠানকে আমি পর্যটনে উপযোগী কোন কাজ করতে দেখিনি। আজকাল কক্সবাজারে বহু ভালোভালো হোটেল হচ্ছে। আগামী দশ বছর পর কয়েকশো ফাইভস্টার হোটেল দাড়িয়ে যাবে। কে থাকবে ওখানে? দেশী না বিদেশী? বিদেশীদের জন্য কোন পরিবেশ আছে? আগে যাও যেত এখন তো বিদেশী পর্যটক কক্সবাজারে জেনে শুনে পা বাড়ায় না। পর্যটন কর্পোরেশান বলে একটা প্রতিষ্ঠান আছে গলাকাটা বাদে আর কোন কাজ তো দেখি না তাদের। এভাবে চলে না। দেশীয় পর্যটন বিকাশে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

 

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে অপার সম্ভাবনা দেখছে বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি)। গত ২৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে ডব্লিউটিটিসি বাংলাদেশে ভ্রমণ এবং পর্যটন ও অর্থনৈতিক প্রভাব-২০১৬ শীর্ষক  প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে ১৮৪টি দেশ এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের অপার সম্ভাবনাময় ২৪টি আঞ্চলিক পর্যটন অর্থনীতির নানা বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পর্যটন খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হলে এই খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ রফতানি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এক চমত্‌কার নজির স্থাপন হতে পারে। কেন না উন্নত পর্যটন শিল্প বিকাশের সকল উপাদানই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সহজলভ্যতায় বিরাজমান। গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় বাংলাদেশে সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক দৃঢ়তার পেছনে পর্যটন খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ২০১৫ সালে জিডিপিতে এই খাতের প্রত্যক্ষ অবদান ২ দশমিক ৪ শতাংশ বা ৪০৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন টাকা এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মোট অবদান ৮০৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন টাকা বা মোট জিডিপির ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। যা ২০১৪ সালে ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৬ সালের পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল জিডিপিতে এই খাতের অবদান বেড়ে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বা স্বদেশী মুদ্রায় ১ হাজার ৫৯৬ বিলিয়নে দাঁড়াবে আর মোট জিডিপিতে অবদান রাখবে ৫শতাংশ।  ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে বাংলাদেশে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে কর্মসংস্থান রয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০জন নারী-পুরুষের।
যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ২ শতাংশ। আশা করা হচ্ছে- ২০১৬ সালে আরো দেড় শতাংশ বাড়বে এবং ২০২৬ সাল নাগাদ মোট কর্মসংস্থানের ৪ শতাংশের বেশি প্রায় ৩ মিলিয়ন অর্থাৎ ২৮ লক্ষ ৯৪ হাজার নারী-পুরুষের এই খাতে কর্মসংস্থান হবে। এর
উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হচ্ছে তরুণ-তরুণী।

 

আরো বলা হয়েছে বাংলাদেশের তরুণরা ক্রমেই পর্যটন শিল্পের দিকে আগ্রহী হচ্ছে। বলা হয়, ভিজিটর রফতানি করে বাংলাদেশ ২০১৬ সালে আয় করেছে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা যা মোট রপ্তানি আয়ের শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। এই আয় ২০২৬ সাল নাগাদ বেড়ে হবে ২ হাজার ২৪০ কোটি। এ জন্য সরকারে পৃষ্ঠপোশকতা চাই।
আমাদেশ দেশে যেসব পর্যটন কেন্দ্র আছে সেসব জায়গায় গিয়ে পর্যটকেরা কি সন্তষ্ট? উত্তরটা নাই বলতে হবে। অবকাঠামোগত অসুবিধা তো রয়েছেই, নিরাপত্তা নিয়েও পর্যটকরা উদ্বিগ্ন থাকেন। কক্সবাজারের মতো এলাকায় পর্যটকরা ছিনতাইসহ নানা
রকমের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। সমুদ্রতীরে চাঁদের আলোয় হেঁটে বেড়াতে কার না ভালো লাগবে! কিন্তু ছিনতাইকারী বা বখাটেদের উৎপাতে সেটি হবার জো নেই। বিশেষত নারী ও বিদেশি পর্যটকরা যে রাতে একটু নিরুদ্বিগ্নভাবে ঘুরে বেড়াবে, সেটি সব সময় সম্ভব হয় না। দিনের বেলায় ফেরিওয়ালাদের উৎপাত তো আছেই! তাছাড়া পর্যটন স্পটে জিনিসপত্রের যে অগ্নিমূল্য দেখা যায়, তাতেও পর্যটকেরা অনুৎসাহিত হন। একটি আধা-লিটার পানির সর্বোচ্চ খুচরা দাম যেখানে ১২ টাকা, পর্যটন স্পটে সেটি কেন ২৫ টাকা হবে? কেন পর্যটকদের কাছ থেকে কোরাল মাছের দাম নিয়ে অন্য সামুদ্রিক মাছ খেতে দেয়া হবে?

 

কিছুদিন আগে ভারতের দীঘা বিচে গিয়ে কি দেখলাম? এত সুন্দর বিচ না সেটা। কিন্তু পরিপাটি করে সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে সেখানে। ব্যবস্থাপনাও অনেক ভালো। রিক্সায় চড়বেন নির্দিষ্ট দরে, ছবি তুলবেন দামদর করতে
হবেনা। খাবারদাবারও খুব সস্থা। আর আমাদের সৈকতে তার উল্টেটা দেখি। হয়রানি আর হয়রানি। এসব বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প বিকাশের দারুণ সুযোগ রয়েছে। বিদেশিরা আসুক বা না আসুক, অভ্যন্তরীণ পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলেই এ শিল্পটি নিজ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যাবে। ১৫ কোটির বেশি মানুষের অন্তত ১০ ভাগও যদি প্রতিবছর দেশের কোথাও
না কোথাও বেড়াতে যায়, তাহলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব কতোটা বিশাল হবে সেই হিসেব অর্থনীতিবিদরা সহজেই বের করতে পারবেন। দেশের রাজস্ব খাতেও কম টাকা আয় হবে না। কিন্তু এই পর্যটন নিশ্চিত করার জন্য অন্তত তিনটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে- অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং জিনিসপত্রের মান ও দামের সামঞ্জস্য।

 

প্রথমটি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের চেয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তারাই এগিয়ে আসতে পারে কিন্তু বাকিগুলোর ক্ষেত্রে মনিটরিঙের কাজটি সরকারকেই করতে হবে। পর্যটন স্পট তৈরির ক্ষেত্রেও আমাদের প্রচলিত ভাবনার বাইরে আসা দরকার। বর্তমানে আমরা পর্যটন স্পট বলতে  সাধারনত কক্সবাজার, জাফলং, সুন্দরবন, পতেঙ্গা, সিলেটরে চা অঞ্চল, কুয়াকাটাকেই   বুঝি। এ ছাড়া কি পর্যটন স্পট নেই? বরগুনার মতো এলাকায় ছোট ছোট কিছু চমৎকার সমুদ্রসৈকত রয়েছে এখবর আমাদের কাছে কি আদ্যৗ আছে? ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রের তীরের সৌন্দযের্র খবর আমরা কয়জনে রাখি? সেখানে রিসোর্ট গড়ে উঠবে না? হাওরের
সৌন্দর্য হাওরবাসির মাঝেই বিলায়। কেন মানুষ চাইলেই দু-তিন রাতের জন্য হাওর ভ্রমণ করে সুখ সৌন্দর্যভোগ করবে না?  কেন কুমিল্লা বা ফেনীর সীমান্ত এলাকাসংলগ্ন বনাঞ্চলে বেশ কিছু পর্যটন স্পট গড়ে উঠবে না? আমাদের গোটা দেশটা পর্যটন শিল্পে ভরে দেয়া যায়। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি, দৃষ্টিনন্দন জীবনাচার বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণসমৃদ্ধ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে। এদেশের সৌন্দর্যে যুগে
যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হয়েছেন।

 

তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের হলেও বিদ্যমান পর্যটন আকর্ষণে যে বৈচিত্রতা সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে।  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পর্যটনশিল্প বিকাশের বিশাল সুযোগ রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরও তা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি।  বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। এদেশে
রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব বজায় থাকলেও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর বেড়াজালে বন্দি আমাদের অর্থনীতি। এক্ষেত্রে পর্যটন শিল্প আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখতে পারে। বিভিন্ন উৎপাদনমূলক ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, এতে অনেক সময় আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। যা পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ করে সম্ভব। প্রকৃতির অপরূপ দান আমাদের এই বাংলাদেশ। দিগন- বিস্তৃত সবুজের গালিচা পাতা রয়েছে এ দেশের পথে প্রান্তরে। অবারিত এসব সবুজকে যদি সুনিপুণ পরিচর্যার মাধ্যমে একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা যায়, তাহলে তা যে একটি স্বপ্নময় ভূবনে পরিণত
হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের কাছাকাছি দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোটদেশ সিঙ্গাপুর। অথচ এর জাতীয় আয়ের ৭০ ভাগ আসে পর্যটন শিল্প থেকে। একইভাবে নেপাল অর্জন করে ৪০ ভাগ। তাহলে আমরা কেন পারবনা? আমরাও পারবো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যটন শিল্পে চোখ তুলে তাকিয়েছেন। তাঁর স্বদিচ্ছায় পর্যটন শিল্প এগিয়ে যাবে এটাই আমরা বিশ্বাস করি।

 

 

লেখক- মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট