ঢাকা, বাংলাদেশ, ০°সে | আজ |
ইংরেজী ভার্সন English Version

ইট তৈরির কারিগরদের জীবন কাহিনী

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

আব্দুল্লাহ আল মামুন,ঝিনাইদহ: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠছে নতুন নতুন দালানকোঠা। ইটের পর ইট সাজিয়ে গড়ে তোলা হয় এসব ভবন। কিন্তু রোদে পুড়ে এই ইট যারা তৈরি করেন, তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন নেই। স্বল্প মজুরির পাশাপাশি বছরের ছয় মাস ইটভাটা বন্ধ থাকায় খুঁজতে হয় অন্য পেশা। তারপরও জীবিকার তাগিদে তারা এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন।
ইটের কারিগর মোঃ কিয়ামত হোসেন ২৪ বছর ধরে কাজ করছেন ঝিনাইদহের আবীর ব্রিকস নামক ভাটায়। সুনিপুণ হাতে ইট বানিয়েছেন অনেক, কিন্তু সেই ইট নিজের কাজে লাগেনি কখনও। ইট শ্রমিকদের জীবনযাত্রা নিয়ে তিনি জানান, দু’হাত দিয়ে লাখ লাখ ইট বানিয়ে যাচ্ছেন। যে মজুরি পান, সেই টাকা দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনো রকম ডালভাত খেয়ে জীবন চলে। অর্থের অভাবে তিন ছেলেমেয়েকেও লেখাপড়া করাতে পারেননি। নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই ইটভাটায় কাজ করেন। আর বাকি সময় অন্যের ভ্যান চালিয়ে কিংবা মাঠে কাজ করে সংসার চালাতে হয়।

আরো পড়ুন:- একটি শিক্ষনীয় গল্প- মেয়েদের জন্য

মোঃ শিমুল নামে অপর এক শ্রমিক জানান, বাবার হাত ধরে ১০ বছর আগে নাম লিখিয়েছেন এই পেশায়। এত বছরে জীবনযাত্রার খরচ দ্বিগুণ হলেও তাদের মজুরি বেড়েছে খুব সামান্য।
কিয়ামত হোসেন ও শিমুলের মতো অনেক ইটশ্রমিক জানান, বছরের ছয় মাস ব্যস্থ সময় পার করতে হয় তাদের। আর বাকি ছয় মাস কেউ ক্ষেতে কাজ করেন, আবার কেউ রিকশা কিংবা ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
শ্রমিকরা জানান, নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইট বানানোর কাজ করতে হয় তাদের। আর এই কাজটি চুক্তিতে হয়ে থাকে। ভাটায় কাজ করতে আসতে হয় সর্দারের মাধ্যমে। পুরো ছয় মাসের জন্য সর্দারই শ্রমিকের সঙ্গে চুক্তি করেন। ইট বানানোর কারিগরদের দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি টাকা। ছয় মাসের জন্য কারিগর এক লাখ, জোগালি ৪৫ হাজার, আগারটক ৮০-৯০ হাজার, গোড়ারটক ৭০-৮০ হাজার ও মাটি বহনকারী ৫০-৬০ হাজার টাকা পান। আবার প্রতিদিন কাজ শেষে দেওয়া হয় খোরাকি। সাত দিনে এই খোরাকি জনপ্রতি পান ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। মালিক পক্ষ সর্দারের কাছে ১ হাজার ইট তৈরী করতে ১ হাজার টাকা দেন কিন্তু ইট তৈরী শ্রমিককে দওয়া হয় ৬০০/৭০০ টাকা। বাকি টাকা খরচ বাবদ সর্দার কেটে রাখে। তবে একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৪হাজার থেকে ৫ হাজার পর্যন্ত ইট তৈরী করতে পারে। শ্রমিক সবাই সম্মেলীত ভাবে এই ইট তৈরী করে।

শ্রমিকরা জানান, দুই শিফটে কাজ করতে হয় তাদের। ফজরের আজানের পরপরই কাজ শুরুহয়ে চলে রাত ৮টা পর্যন্ত। এছাড়া অন্য শিফটে কাজ চলে সারা রাত। ভাটার পাশেই টিনের ঘর তুলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেন ভাটা মালিক। সেখানে নিজেরা তিনবেলা রান্না করে খাবারের ব্যবস্থা করেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুদেরও কাজ করতে দেখা যায় এসব ইটভাটায়। শেফালী বেগম নামে এক ইট শ্রমিক জানান, স্বামী আর সন্তানদের সঙ্গে কাজ করেন ভাটায়।
ইটভাটাগুলোতে গিয়ে দেখা যায় কেউবা মাটি কাটছেন, কেউবা সেই মাটি এনে অন্য জায়গায় জড়ো করছেন। আবার কেউ সেই মাটি ইটের আকার দিচ্ছেন। রোদে পুড়ে সেই ইট শক্ত হলে কেউ তা ভ্যানে করে একস্থানে জড়ো করছেন। তারপর সেখান থেকে ভাটায় পোড়ানোর পর ইট পাঠানো হয় বিক্রির জন্য।
ভাটা মালিকরা জানান, তাদের লাভের পরিমাণ খুবই সামান্য। তাই শ্রমিকদের মজুরিও বাড়াতে পারেন না তারা।
আবীর ব্রিকর্সের ম্যানেজার মোঃ মিনহাজ উদ্দিন জানান, ১৪-১৫ ঘণ্টা করে কাজ করেও ইট শ্রমিকরা যে মজুরি পেয়ে থাকেন, প্রকৃতপক্ষে জীবন চলার জন্য তা খুব সামান্যই। এ মজুরিতে চলা খুবই কষ্টকর। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও মালিক পক্ষের মজুরি বাড়ানোর কোন সুযোগ থাকে না। ভাটা মালিকদেও সব খরচ বাদ দিয়ে তাদের লাভের অঙ্কটা খুব বেশি হয় না। বিডিটুডেস/আরএ/১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮