ঢাকা, বাংলাদেশ, ২৬°সে | আজ |
English Version

খালেক-মজিদ-মজিবর কি শুধুই ছবি?

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন


জুয়েল হিমু, টাঙ্গাইল: “বল বীর, চির উন্নত মম শির”। ওরা মহান মুক্তিযোদ্ধা। ওরা বীর ছিল, আছে। জন্ম-জন্মান্তর ওরা জাতির কাছে চির বীর হয়ে বেঁচে থাকবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের আলোচিত ছবিগুলোর মধ্যে খালেক, মজিদ ও মজিবর এই তিনজনের ছবিটি অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অধিকাংশ প্লে-কার্ড, ফেসটুন ব্যানারসহ পাঠ্য বইয়ের গল্পের প্রচ্ছদেও ছবিটি ব্যবহার হয়ে আসছে। “যে ছবি আজ বাংলার ঘরে ঘরে। তাঁদের খোঁজ আজ কে রাখে? এরা কি শুধুই ছবি? নাকি ৭১’র মুক্তিযুদ্ধে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের বীরত্বের প্রতিচ্ছবি। সুপরিচিত এই ছবিটি এখনও বাংলার ঘরে ঘরে থাকলেও এই তিন বীরের পরিচয় ও দু:সাহসিকতা অনেকেরই অজানা। নেই তাদের কোন ব্যতিক্রমী স্বীকৃতি।

এদের একজনকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জীবন যুদ্ধে রিকশা চালাতে হয়েছে। আরেকজন কখনও কারখানার শ্রমিক কখনও বা নৌকার মাঝি হয়ে উপার্জন করতে হয়েছে। স্বাধীনতায় অগ্রণী ভূমিকা রাখার জন্য এদের জন্য নেই বাড়তি কোন সম্মাননা। তিন জনের মধ্যে দুজনেই দীর্ঘ সময়ে পায়নি সম্মানজনক কোন উপার্জনের উৎস। অনুসন্ধানে মিলেছে দুর্লভ এই ছবির দুরন্ত তিন যোদ্ধার পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধে অবদান আর তাদের সামাজিক অবস্থান।

ছবিতে থাকা তিনজনই টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন ইউনিয়নের মুশুরিয়া গ্রামের। ওপরে গ্রেনেড ছুঁড়ছেন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক। মাঝে রাইফেল হাতে আব্দুল মজিদ। বামে রয়েছেন মজিবর রহমান। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানকে স্মরণীয় রাখতে আলোচিত ফ্রেমে আটকে পড়েন এই তিন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর গোধূলি লগ্নে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে পাকসেনাদের একটি শক্ত ঘাটির বাংকার ধ্বংস করার সময়ের ছবি এটি। মুক্তিযুদ্ধে এই তিন বীরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি একটি দৈনিকে ছবিটি প্রকাশের পর স্বজনরা জানতে পারে ওরা তখনও বেঁচে আছেন।

চা খেতে খেতে কথা হয় আব্দুল খালেকের সাথে। কথায়-কথায় বেড়িয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের অবদান ও সাহসিকতার পরিচয়। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক। মুশুরিয়া গ্রামের মরহুম হযরত আলী ও রুপজানের ছেলে আব্দুল খালেক। মজিবর রহমান ওই গ্রামের মৃত মনসের আলী ও মৃত সখিনা বেগমের সন্তান। আব্দুল মজিদও একই গ্রামের মৃত সলিম উদ্দিন ও সোনাবানুর সন্তান। এদের মধ্যে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক ছিল সবচেয়ে আলোচিত। আব্দুল খালেক জানালেন তাঁদের দুঃসাহসিকতার কথা, জানালেন মনের কষ্টের কথা।

ওরা চিরবীর খালেক, মজিদ ও মজিবর ওরা প্রায় সমবয়সী। তখন প্রায় ১৩/১৪ বছরের কিশোর ওরা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ওরা প্রেরণা পায়। ওরা ভাবেন যুদ্ধ সুনিশ্চিত। ২৫ মার্চের কালো রাত ওরা বুঝতে পারে যুদ্ধ সন্নিকটে। ২৬ মার্চ থেকে সংকল্প নেন দেশকে বাঁচাতে সংঘবদ্ধ হতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে। প্রথমে মনে করেন সেনাবাহিনীই পারবে দেশকে মুক্ত করতে। অনিশ্চয়তা দেখে সমবয়সীদের সংঘবদ্ধ করতে থাকে ওরা। মে’র শেষের দিকে ওরা ২১ জন বন্ধু মিলে নৌকা যোগে ইন্ডিয়ার মাইনকার চরে চলে যান। তিনদিন পর তাদের মেডিকেল হয়। তুরা ক্যাম্পে শুরু হয় প্রশিক্ষণ। তবে তাদের বন্ধু তোফায়েল (তুলা মিয়া) মেডিকেল আনফিট হয়ে দেশে ফিরে পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ নেন। আজও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নেই তোফায়েল। সেখানে আলফা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ২১ দিন ফ্রন্টফাইটার, অতপর ৭ দিন গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৭শ’ প্রশিক্ষিত যোদ্ধার সাথে তাঁরাও দেশে ফেরে। ওদের কৌশল ছিল, সুযোগ বুঝে শত্র“ সেনাদের ওপর আকস্মিক হামলা, পরক্ষণেই ইন্ডিয়াতে আত্মগোপন করা। কিছুদিন পর সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ। ৭১’র ৪ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী (ইন্ডিয়ান আর্মি ৬ বিহার) রেজিমেন্টের সাথে সরাসরি যুদ্ধে নামেন। শুধু পাক সেনাদের ওপর গুলি বর্ষণ করেননি ওরা, সাহসিকতার সাথে ধ্বংস করেন শত্র“ সেনাদের বেশ কয়েকটি ঘাটি। তারই একটির প্রতিচ্ছবি আলোচিত এই ছবিটি। ছবিটি ফ্রেম বন্দি করেছিলেন মানিকগঞ্জের নাইব উদ্দিন নামের এক ফটোগ্রাফার।

ওদের মনের কষ্ট সাদা মনের মানুষ আব্দুল খালেক। দেশপ্রেম হৃদয় জুড়ে, সেটা তার কথার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। অস্বচ্ছলতার পরিচয় ভাঙা বাড়িটিই সাক্ষী দিল। মুক্তিযোদ্ধাদের ভিড়ে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিতে তাঁর আত্মসম্মানে বাঁধলো। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের এত লম্বা তালিকা দেখে কেঁদে বললেন, তখন যদি সত্যি এতো মুক্তিযোদ্ধা থাকতো, তাহলে ইন্ডিয়া-রাশিয়ার সাহায্য ছাড়াই দেশ শত্র“ মুক্ত হতো।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে দেশ যেমন স্বাধীন হতো না তেমনি টাঙ্গাইল না থাকলে এতো মুক্তিযোদ্ধা পাওয়া যেত না। অথচ দুর্লভ ছবির সেই তিন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে এখনও কোন উপাধিতে ভূষিত করা হয়নি। রাস্তায় টাঙানো তাঁর নিজের ছবি দেখতে গিয়ে অনেক সময় গলা ধাক্কা খেতে হয়। সাদাসিধে পোশাকে তিনিই যে ছবির মানুষটি তা অন্যকে বোঝাতে বেগ পেতে হয়। সম্প্রতি ঢাকার খিলক্ষেত ক্যান্টনমেন্টের সামনে এই ছবির ব্যয়বহুল ভাস্কর্য তৈরি হচ্ছে। অথচ নিজের উপজেলার মানুষকে ছবি দেখিয়ে নিজের পরিচয় দিতে হয়। নেই কোন প্রতীকী ভাস্কর্য। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রায় আড়াইশ’ কবিতা লিখেছেন আব্দুল খালেক। অর্থের অভাবে প্রকাশ করা হয়ে উঠেনি। তার বাড়িতে রয়েছে ছোট্ট একটি ভাঙা ঘর। যেখানে সযত্নে রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় নিদর্শন। সরকার ঘরটিকে একদিন আঞ্চলিক জাদুঘরে রূপান্তর করবে এই প্রত্যাশা তাঁর। তিনি গোগ্রীন অটবি লি: এর গুলশান শাখার অ্যাম্বাসেডর পদে চাকুরি করতেন। অটবির ব্যবসায়িক অবস্থা মন্দা থাকায় বেতন বকেয়া পড়ে। ফলে চাকুরি ছেড়ে অবসর কাটাচ্ছেন চট্টগ্রামের ফয়েজ লেকে। খালেকের ঘরে রয়েছে চার ছেলে মেয়ে। ছেলেরা পৃথক হওয়াতে সরকারি ভাতাটাই এখন তাঁর একমাত্র উপার্জন। মুক্তিযুদ্ধে অবদান ও কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে ভিন্ন ভিন্ন সম্মাননা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

এদিকে, মজিবর রহমান ২০১৪ সালে মারা যান। মজিবর রহমানের স্ত্রী সাহাতন বেগম জানান, ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মজিবর রহমান রেখে গেছেন চার ছেলে। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেও আমৃত্যু জীবিকার খোঁজে রিকশা চালাতে হয়েছে মজিবর রহমানকে। তার ছোট ছেলে রনি উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করছে। সাহাতন বেগমের আশা, তাঁর অন্য সন্তানরা কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেলেও সরকার রনির কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখবেন।

অপরজন আব্দুল মজিদ। তিনি ব্যাটেলিয়ান আনসার-এ প্লার্টুন কমান্ডার পদে কাপ্তাইয়ে কর্মরত আছেন। মুঠোফোনে কথা হয় মজিদের সাথে। খালেকের মতো একই ধরনের কথা বললেন তিনিও। তার তিন মেয়ে। ওই সময়ে অর্থের অভাবে কাউকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেননি তিনি।

এটা কি শুধুই ছবি? প্রশ্ন এলাকাবাসীসহ সুশীল সমাজের। ছবির মধ্য দিয়ে যদি মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ বীরত্ব প্রকাশ পেয়ে থাকে, তাহলে তাদের বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করার দাবি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই বিশেষ ছবির একটি ভাস্কর্য এলাকায় নির্মাণ করা হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিশেষ জায়গায় নাম লেখাতে পারবে দেলদুয়ার উপজেলা। এই তিন বীর, তাদের স্বজনসহ স্থানীয় সুশীল সমাজ সরকারের কাছে জোর দাবি জানান, আলোচিত ছবির এই তিন যোদ্ধাকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকারিভাবে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করে তাঁদের যথাযথ সম্মান দেবে।

আলোচিত এই ছবির একজন আব্দুল খালেককে চেনেন দেলদুয়ার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবু তাহের বাবলু। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে আব্দুল খালেককে চিনি। তবে ছবির অপর দুজনের কথাও শুনেছেন তিনি। তিনিও ভাস্কর্যটি নির্মাণের জন্য সরকারে কাছে দাবি জানান।

দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহাদত হোসেন কবির জানান, দুর্লভ ছবির তিন জন বীরকে পরিচিত করতে ইতোমধ্যে এবারের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পত্রের প্রচ্ছদে তাদের ওই ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে তাদের পরিচিতি। ভাস্কর্যের বিষয়ে তিনি বলেন, জেলা পরিষদের সহযোগিতা পেলে একটি ভাস্কর্য তৈরি করা সম্ভব।

বিডিটুডেস/ নাভূ/ ১৩.০৩.১৮