English Version

পাঠকের পাতায় কিংবা ভেতরের পাতায় স্যার বাবার আর্দশে আওয়ামীলীগ হয়েই জন্ম নেবো!!

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম: যখন বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই বাবার উপরে বিরক্ত ছিলাম। বাবা সব সময় বাহিরে থাকতো। বাবার রুমের চারপাশে ছড়িয়ে ছিড়িয়ে থাকতো, বই আর পেপার। গ্রামে বড় হওয়া আমার। খুব অঁজোপাড়া গাঁ একটা। বিদ্যুৎ ছিলো না তখন। ছিলো না একটা মাধ্যমিক স্কুলও। প্রায় ৩ মাইল দুরে হেঁটে স্কুলে যেতাম। সকাল ৮টায় রওনা দিতাম স্কুলে। কিন্তু সেই গ্রামেও আমরা প্রতিদিন পত্রিকা পেতাম। পুরো গ্রামে শুধু আমাদের বাসায় পেপার- পত্রিকা, বই এসব দিয়ে যেতো হকার ও হালকা গাড়ির ড্রাইভারেরা। বাবা সেই ছোট বেলা থেকেই আমাদের বইয়ের প্রতি একটা আসক্তি তৈরি করেছিলো। নানা ধরনের বইয়ের মধ্যে দিয়ে আমাদের বড় হওয়া। ভাই বোনের মধ্যে বই পড়ার একটা প্রতিযোগিতা হতো। কে কার আগে কয়টা বই শেষ করছে, এটা নিয়ে।

একটা সময় আমি বিরক্ত হতাম বাবার উপর। এতো রাজনীতিক বই কেন আনে? কি আছে এই সাপ্তাহিক আজকের সুর্যোদয়, আর গেদু চাচার কলমে? দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকা, যায় যায় দিন ম্যাগাজিন ও কাগজে। পোস্টারে পোস্টারে ছেঁয়ে যেতো পুরো ঘর। মা, প্রায় বিরক্ত হতো। সারা বাড়িতে আওয়ামী লীগের পোস্টার। এসব পোস্টার দেখে নাকি হাদিস মতে ফেরেশতা প্রবেশ করবে না, এটা সেটা বলে মা রোজ রাগারাগি করতো। কিন্তু বাবা তো বাবাই! কে শুনে কার কথা। দিনের পর দিন, বাবা বাহিরে থাকতো। মিটিং, মিছিল, ঢাকা টু কক্সবাজার, কক্সবাজার টু মহেশখালী। এভাবেই চলেছিলো আমাদের ছেলেবেলা। বাবার অনুপস্থিতি আমাদের খুব কষ্ট দিতো। মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। মাকেই পুরো সংসারটা দেখতে হতো। ৫ভাই বোন সহ আমাদের যৌথ পরিবার। সংসারের সব দায়িত্বটা ছিলো মায়ের উপর। মায়ের চোখে প্রায় জল দেখতাম, জল মুছে স্বাভাবিক হবার চেষ্টাটুকু তখন আমি বুঝতাম তবে কিছুই বলতাম না। শুধু মনে মনে বাবার উপর অভিমান জমতো।

তখন মোবাইল ছিলো না। পাশের বাড়ির নুরুল ইসলাম চাচা ও হাসান আলী চাচার কাছে যেতাম। বাবার খবর নিতে। গেলে তারা কতগুলো পোস্টার ধরিয়ে দিতো। বলতো, তোমার বাবা এসব পাঠালো এবং বলেছে, এসব পোস্টার দোকানে দোকানে সহ সবাইকে দিতে। আমি নতুন পোস্টার গুলো খুলে দেখতাম। দেখা যেতো তাতে স্বাধীনতা দিবসের পোস্টার, কখনো জেল হত্যা দিবস, কিংবা জাতির পিতার শোক দিবস, বিজয় দিবস, নেত্রীর স্বদেশপ্রত্যাবর্তন দিবস, কখনো নেত্রীর আগমণ, কখনো নেতার আগমণ, প্রচন্ড রাগ নিয়ে দর্শন করতাম। পরে দেখতাম পোস্টারের নিচে লেখা, “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ” এই লাইনটার প্রতি তাকাতাম। এই একটা লাইনের উপরে আমার সব কষ্ট গিয়ে পড়তো। এই দলটার জন্যই বাবা বাসায় আসে না। ছেলে মেয়েদের খোঁজ খবর নেয়না।

মায়ের চোখে জল। আর আমাদের দিন কাটে কষ্টে। দলের প্রতি বাবার নেশাটা, আমাদের বাবাকে আমাদের কাছ থেকে দুরে নিয়ে গেছে, সেটা ভেবেই খুব কষ্ট পেতাম। বাবা ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগ করে। পরে ১৭বছর যাবৎ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। জেলার সব নেতা বাবাকে এক নামে চিনতো। কেনোনা জগত বিখ্যাত প্রিয়নেতার বিভিন্ন উৎসব ও দলীয় কর্মকান্ডে বাবা ছিলেন তাদের ডোনার। কিন্তু বাবার সারা জীবনের রাজনৈতিক অর্জন বলতে কিছু নাই। যা আছে শুধুই কষ্ট আর অভিমান। রোজ বাসায় মিটিং হতো। এলাকার মানুষজন এসে ভিড় জমাতো বাড়িতে। ঘুম থেকে উঠে বাড়িতে লোকজন দেখলেই বুঝতে পারতাম, বাবার উপস্থিতি। খুশিতে বিছানা থেকে লাঁফ দিয়ে উঠতাম। মায়ের মুখের দিকে তাকাতেই হাসি দেখতাম। কিন্তু সেখানেও বাবার পাশে যাবার সুযোগ ছিলো না। তিনি ব্যস্ত থাকতেন, তার দলের মানুষ গুলোকে নিয়ে। ছোট হৃদয়ের রাগগুলো তখন, গ্রামের মানুষ গুলোর প্রতি হতো। বাবা বাড়িতে আসলেই কেন তারা আসে?

খুব বিরক্ত হতাম। খুব গালি দিতাম মনে মনে। আদর করে কেউ ডাকলেও যেতাম না। রাগ হতো খুব। এভাবেই বেড়ে উঠা আমাদের। জানতো এসব কেহ। সকলে বাহিরের কর্ম দেখতো ভেতরের না। এই দলটা কিসের, কি আছে এতে, সেটা জানার জন্য বই পড়া শুরু করলাম। শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর ইতিহাস, বেবি মওদুদ, পলাশী থেকে ধানমন্ডি, খোন্দকার মোজাম্মেল হকের আরেক একাত্তর, শেখ হাসিনা একটি রাজনৈতিক আলোখ্য কত কী? নেতাকে নিয়ে লেখা বউগুলো পড়তাম। বাবা প্রতি বছরই ঢাকা বইমেলা থেকে বস্তা ভরে বই নিয়ে আসতো। বাবার এসব দেখে, মা বাবাকে বলতেন, “সন্তানের জন্য কি এই আওয়ামী লীগের বইগুলোই রেখে যাবেন? এসব বাদ দিয়ে আমার সন্তানদের নিয়ে কিছু ভাবুন আর চিন্তা করুন। আর কত? ‘বাবা শুনেও কোন উত্তর দিতো না। বলতো সব হবে।

বাবাকে দেখতাম, গভীর রাতে, কি যেন লিখতে, বাবা চলে গেলেই আমি পড়তাম, তাতে লিখা থাকতো আজকের প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমীপে বাবার নানা জনহিতৈষী আবেদন। সংঘটন নিয়ে তার চিন্তা ও স্বপ্নগুলো, সব গুছিয়ে গুছিয়ে লিখতেন তিনি। যে মানুষটা নিজের দলটার সবকিছু বুঝতো, কোথায় কি করতে হবে, কখন কিভাবে কর্মী সৃষ্টি করতে হবে। সে মানুষটা কেন আমাদের সংসারের কথাগুলো বুঝে না? আমাদের কষ্টগুলো বুঝে না। অভাবটা বুঝে না। দাদার সব জমিজামা,ব্যবসা ও সম্পত্তি বাবা শেষ করলো দলের পিছনে। আজকে যারা জেলার শীর্ষ নেতার আসনে, তাদের সংসার চলতো একদিন বাবার টাকায়। সব সময় বাবার সাথে শ খানেক মানুষ থাকতো। বাবার খবর আমরা সরাসরি বাবার কাছ থেকে পেতাম না। পেতাম গ্রামের চাচাদের কাছ থেকে। মহেশখালী কুতুবদিয়ার একমাত্র জনভোটে নির্বাচিত তৎকালিন নৌকা প্রতীকের প্রয়াত এমপি ইসহাক মিয়া (বিএ) প্রায় সময় বাবাকে বলতেন, ‘ আমি বঙ্গবন্ধুর সঠিক আদর্শ তোমার মাঝে দেখেছি, জীবনে তুমি দল থেকে কিছু চাওনি শুধুই দিয়েই গেলে”। সেই প্রয়াত এমপি ইসহাক মিয়া দাদা ১৯৯২ সালের দিকে বাবাকে লুঙ্গি পড়া অবস্থায় সচিবালয় প্রবেশ করিয়ে ছিলেন।

অথচ দলের জন্য জীবনের প্রায় সব সময়টুকু ব্যয় করলেন। আমরাও সময়ের উপরে ভর করে, মায়ের ভালোবাসাটা সঙ্গী করে বড় হলাম। আজকে দিন শেষে বাবার অর্জন বলতে দেখি, তার সেই প্রিয় দলের অবহেলা। যে মানুষগুলো বাবার একটু কথা শুনার জন্য বসে থাকতো সকাল বেলায়, তারাই আজকে এলাকার নেতা হয়ে, উগ্রতা প্রকাশ করে। যারা দিনের পর দিন বাবার দিকে হাত খরচের জন্য চেয়ে থাকতো, তারাই আজকে এলাকায় দলের সব। এলাকার প্রতিনিধিরা। বাবা সারাজীবনে যা করতে পারে নাই। তারা সেটা বছর শেষ না হতেই করে দেখালো। খুব কষ্ট হয়, যখন দেখি বাবার প্রাণপ্রিয় সেই সংঘটনে বিএনপি জামাতের মানুষ পদে পদে। যখন দেখি তারা নেতা হয়ে চেয়ারে বসা। আরো দেখি যারা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে পারতোনা এলাকায় এমন হাইব্রিডও আজ নব্য আওয়ামী লীগ। এ যেন ছেলেবেলার কষ্টের চেয়ে ব্যাপক কষ্টে ভারাক্রান্ত রাজনীতির চিত্র। যা বড়ই বেদনার। বাবাকে তখন ঘৃনা করতাম শুধুমাত্র দুরে থাকতো বলে, এখন ঘৃনা করি কেন অযোগ্য, অভদ্র কিছু ছেলেদের তিনি রাজনৈতিকভাবে পালন করেছিলেন, সেটা ভেবে। যারা প্রবীনদের নুন্যতম শ্রদ্ধাবোধ দেখাতে পারে না। আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান হয়ে শুধু এটুকুই বলবো, যদি জীবনটা আবার শুরু করতে পারি তবে, চাকরী নয়, সাংবাদিকতা নয়, বাবার আর্দশে আওয়ামী লীগ হয়েই জন্ম নেবো, মাঠে থেকে রাজনীতি করবো। সারা বাংলাদেশ ও মধ্যপ্রোচ্যের সবকটি বাঙ্গালীরা জানে, গেদু চাচার খোলাচিঠি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো পড়েন কিন্তু জানিনা আমার এই ক্ষুদ্র মানুষের চিঠিখানা কি তিনি কখনো পড়বেন? প্রশ্ন জাগে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও ত্যাগী নেতাদের কি তিনি সত্যিই মূল্যায়ন করেন!! লেখক: জে.ই সজীব (বাবার আদর্শে বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধুর এক কর্মী কুতুবজোম,মহেশখালী,কক্সবাজার।)।। বিডিটুডেস/আরএ/০৬ নভেম্বর ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

13 + thirteen =