ঢাকা, বাংলাদেশ, ৩৪°সে | আজ |
English Version

বিয়ের ৪ মাস পর… ছোট গল্প

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

বিডিটুডেস ডেস্ক: বিয়ের ৪ মাস পর…
এক রাতে হঠাৎ খুব পেটে ব্যথা ..
আমি আমার মায়ের বাড়িই থাকি। শ্বশুড়বাড়ির চাহিদা অনুযায়ী বনিবনা হয় নাই তাই আমাকেও আর তাদের বাসায় তুলে নেয় নাই। । ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মায়ের সাথে হাসপাতালে গেলাম । বাবা বাইরে ছিলেন, খোঁজ পেয়ে সে ও জয়েন করল হাসপাতালে ..
ডাক্তার আপা টেস্ট দিল । এর মধ্যে আমার হাসব্যান্ড কে আমার বাসা থেকে জানানো হল আমার অসুস্থতার কথা । ভদ্র লোক চলে আসলেন । আমার ব্যথা অবস্থায় আমার মাথায় হাত রাখলেন। পানি খাওয়ালেন ।
আল্ট্রসোনোগ্রাম এর রুমে যেয়ে জানা গেল আমার ভিতর আরও একটা জান আছে । ২মাস হয়ে গিয়েছিল টের পাই নাই। খুব মূর্খতার পরিচয় দিলাম । এই যুগে আবার কেউ টের না পায় বলেন?

আরো পড়ুন: বল্টু দুধ চা খাবে… অতঃপর- হাসির জোকস

ডাক্তার বললেন ” বাবু কন্সিভ করেছে। স্ক্রিনে দেখো এইযে একটা কালো কিছু ধরফর করছে এইটাই তোমার বাবু । বেশি দৌড় ঝাপ করেছো তাই বাবু ব্যথা পাইছে এজন্য তোমার পেটে ব্যথা হইছে “
বুঝলাম তো না কিছুই তাও কেন যেন চোখে পানি চলে আসল ..বের হয়ে সবাইকে জানালাম । আব্বু আম্মু ঢের খুশি । শুধু খুশি না আমার বাবুর বাবা। ঔষধ পাতি দিয়ে বিদায় করে দিল ।
আমি তখনো সিউর না যে আমি খুশি নাকি আতঙ্কিত । কারণ বিয়ে হলেও আমার হাসবেন্ড এর ফ্যমিলি আমাকে তুলে নেয় নাই । নিবে কিনা সেটাও অনিশ্চিত । কারণ আমার শ্বাশুড়ির অমতে বিয়ে হয়েছিলো। তিনি তখনো আমাকে মানতে পারেন নাই এমনকি তার ছেলেকেও আমার বাসায় আসা সে পছন্দ করতো না। কিন্তু সত্যি বলতে কি কেমন যেন একটা ভাল লাগা কাজ করছিল । আমিও কারো মা হব । “মা”

ইউটিউব এ সাবস্ক্রাইব করুন

বাসায় চলে আসলাম । ও ওর মত চলে গেল বাসায় । ও আমাকে বুঝালো বাচ্চা নেওয়ার এটা সঠিক সময় না । আমিও ওকে অনেক বুঝাইলাম –একটা বাচ্চা তার ভাগ্য নিয়েই দুনিয়ায় আসবে যা হবে দেখা যাবে ..আমাদের জায়েজ বাচ্চা ।
তখন বাবুর বাবার বাবু না রাখার কারনগুলা ছিল —
১.তার বাচ্চা নেওয়ার বয়স হয় নাই
২.ঘরে বৌ উঠানোর আগে বৌ প্রেগনেন্ট এইটা সমাজে কতটা লজ্জাজনক
৩.সংসার ই শুরু করলাম না বাচ্চা কিসের
৪.তার আম্মু বলছে বাচ্চা হইলে আমাকে ঘরে তুলতে বাধ্য তাই আম্মু মানা করছে এখন বাচ্চা নিতে ।
অদ্ভুত কারন গুলোর চাপায় আমার বাচ্চা আমার পেটে থেকে শ্বাস নিতে পারছিল না । খুব কাদলাম খুব । সকাল থেকে সন্ধ্যা তার পা দুইটা জড়িয়ে ধরে রইলাম । কেঁদে ও লাভ হল না , রেগেও লাভ হল না । উল্টা আমার বাসার মানুষকে হুমকি দেওয়া হল বাচ্চা রাখলে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে । এই ভয়ে বাসার মানুষ আমাকে বলল “থাক মা সংসার টিকলে আবার বাচ্চা নিতে পারবি ” আমিও তাতেও রাজি হলাম না । আমার শাশুড়ি কে ফোন করলাম । তার উত্তর শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল ..অবশেষে দীর্ঘদিনের এই আর্গুমেনট এর পর হাসপাতালে যেতে রাজি হলাম,কতযে কষ্ট হইছে আমার বাসার আশে পাশের মানুষ গুলা জানে । সকালে দুপুরে সমানে বুক ফাটায়া কাঁদতাম । আশে পাশের মানুষ কান্না শুনে দৌড়ায়া আসত..
প্রথমদিন হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার আমার কান্না দেখে তাকে অনেক বুঝাইলো । লাভ হইল না । ডাক্তার শরিয়ত এর দোহাই দিয়েও বুঝানোর ট্রাই করল । সে বলল– “তার মা বলছে ৫ মাস পর্যন্ত বাচ্চার মধ্যে জান আসে না তো এর আগে এবরশন করলে গুনাহ হবে না”

হায়রে তাদের হাদিস ..
ঐদিনও একপ্রকার পাগলামি স্টার্ট করলাম হাসপাতালে । এবরশন করবো না এই বলে । আমার বাবুর বাবা অই অবস্থায় গায়ে হাত তুললেন । হাসপাতালে সবার সামনে পেট টায় লাত্থি মারলো। আমি বাসায় চলে গেলাম । এবরশন সেদিন হল না । রাতে বাবুর বাবা ফোনে বললেন “” আগামিকাল যদি এবরশন না করাই তাহলে সে এই বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত আমাকে ডিভোর্স দিবে না । বাচ্চা হলে বাচ্চা সেদিন ই নিয়ে যাবে আর আমাকে সেদিন ডিভোর্সি দিবে .””

আমি খুব ভয় পায়া গেলাম । মনে কয়েক মণ পাথর রেখে রাজি হইলাম..
পরেরদিন আমাকে কিছু প্রি টেস্ট দিল ডাক্তার । নার্স আমার লাস্ট টাইম বাবুকে পেটে রেখে আল্ট্রসোনোগ্রাম করছে ।বলল “তোমার বাচ্চার হার্টবিট দেখো ” তার হাত জড়ায়া ধরলাম আর বললাম “আপা বাচ্চাটা তো আর রাখতে পারব না .মেয়ে নাকি ছেলে বাচ্চা ছিল পেটে এটা কি একটু বলবেন প্লিজ আপা “
নার্স বলল ” নিয়ম নাই । তাছাড়া ৩ মাসে সস্পষ্ট বুঝা যায় না “

আমি তখন ও কাঁদতেছি । উনি আমাকে বললেন ” একটা উপায় আছে । তুমি কাঁইদো না । আমি দেখে দিচ্ছি “
ইউরিন আর সোডা মিক্সড করে উনি কি যেন একটা করলেন আর বললেন “মা গো ছেলে বাচ্চা “
আমি যেন সব অন্ধকার দেখতেছিলাম । তখনো মনে হচ্ছিল কোথাও পালায়া যাই । বাচ্চাটাকে বাঁচাই । এমন খুনির সংসার না করলে কি হয়? কিন্তু ঐযে ভয়, সমাজের ভয় । আমাকে আটকায়া দিল , একটু পরেই আমাকে অপারেশন থিয়েটার এ নেওয়া হল ..বাইরে আমার বাবুর বাবা সরি আমার বাবুর খুনি বসে আছে । অপেক্ষায় আছে খুন নিশ্চিত হওয়ার ..
ওটি তে ডাক্তার একটা অজ্ঞান করার ইঞ্জেকশন দিল আর জিজ্ঞেস করল আমার নাম কি ? আমি নাম বলার আগেই অজ্ঞান_______অনেক্ষন পর জ্ঞান ফিরল । আমার পেট খালি । আমার বাবু নাই । আমি পারলাম না যুদ্ধে তারে নিয়ে বাঁচতে আমি শুধু একটা মরা লাশ হিসেবে বেচে রইলাম ..

জানিনা আর কখনো বাচ্চার মুখ দেখতে পারব কিনা কিন্তু আজও নিজেকে সমান অপরাধী ভাবি আমার বাচ্চার খুনের .. সেই সংসার টা ভেঙ্গেই গেল কিন্তু আমার বাবুর খুন টা হইল । এখনো খুব কষ্টে নিজেকে সামলাই এই কথা গুলা মনে করার পর ..সংসার ভাঙ্গার দুঃখ লাগে না দুঃখ লাগে বাচ্চাটার জন্য ,, ” মা ” ডাকটা শুনতে না পারার যন্ত্রনা আমাকে অনেক জ্বালায় । খুন করতে ইচ্ছা করে ঐ খুনী গুলাকে …. কিন্তু এতে তো আর আমার বাবু ফিরে আসবে না । মাফ চাই আমার সেই সন্তানের কাছে যাকে আমি আমার দায়িত্বে বাচাতে পারি নাই ..
লিখাগুলা লিখার সময় আমার হাত নয় আমার বুক কাঁপছিলো .. মা ডাকটা না শুনতে পারার যন্ত্রনা শুধু আমার মত মেয়েগুলো বুঝবে ……..।।

আমি প্রতিবছর এই লেখাটা শেয়ার করব । আমি জানিনা আমি কবে “মা” ডাক শুনতে পারবো। বিয়ের পর অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছি কিন্তু সবকিছুর জন্য তাকে মাফ করলেও এই একটা ঘটনার জন্য তাদেরকে আমি কখনোই মাফ করতে পারবো না।
এই একতা ঘটনার জন্য আমি আজো আমাকে মাফ করতে পারি না। কেন যেনো আমার ডিভোর্সেরও এত শোক ছিলো না কখনো কষ্টও লাগে না আমার। কিন্তু এই এক জায়গা থেকে আমি কেন যেনো আজও বের হতে পারি না। হেরে যাই। প্রতিবার। যখন দেখি পাশের বান্ধবীটা বাচ্চা নিয়ে খেলে আর আমি তাকিয়ে দেখি।

অনেকে তো এটাও ভাবে আমার নাকি নজর লাগবে বাচ্চাদের উপর। যেদিন এটা জানতে পেরেছি সেদিন থেকে কারো নতুন বাবু হলে আমি দেখতে যাই না। নানান তালবাহানা দেখিয়ে যাওয়া হয় না।
কারণ আমার কষ্ট উপলব্ধি করার ক্ষমতা তাদের নাই। তবুও আমি দোয়া করি সব গুলো বাবু ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক।
প্রত্যেকটা মায়ের বুকে সুস্থ থাকুক তার সোনামনিটা … বিডিটুডেস/আরএ/২০ আগস্ট, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

fourteen + 13 =