English Version

ষড়যন্ত্র করে ছেলের মৃত্যুদণ্ড দিল, আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

বিডিটুডেস ডেস্ক: আমার ছেলের মৃত্যুদণ্ড দিল- ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মামলার রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে রয়েছেন ঝিনাইদহের তিনজন।

তারা হলেন- শৈলকুপা উপজেলার গাড়াগঞ্জ বাজারের আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, কালীগঞ্জ উপজেলার সুগার মিল পাড়ার হোসাইন আহমেদ তামিম এবং ঝিনাইদহ পৌরসভাধীন পবহাটি গ্রামের উজ্জ্বল ওরফে রতন। তারা তিনজনই কারাগারে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান বলেন, গ্রেনেড হামলার মামলার রায়ে যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে তাদের মধ্যে ঝিনাইদহের তিনজন রয়েছে। রায় ঘোষণার পরপরই জেলার গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

ইউটিউব এ সাবস্ক্রাইব করুন

এদিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত উজ্জ্বল ওরফে রতনের বাবা বেলায়েত হোসেন বলেন, ষড়যন্ত্র করে আমার ছেলেকে এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আমার ছেলে নিরপরাধ। যারা আমার ছেলেকে এ মামলায় ফাঁসিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।

অপরদিকে এ মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু বলেন, গ্রেনেড হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তারেক রহমান। রায়ে তার ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আদালত যে রায় দিয়েছেন তার প্রতি আমাদের সম্মান রয়েছে। তাই আমরা চাই এ রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।

রায় ঘোষণার পর দুপুরে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় থেকে একটি আনন্দ মিছিল বের করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে পায়রা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় সংক্ষিপ্ত সমাবেশে আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়ে অবিলম্বে রায় কার্যকর ও তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়।

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় করা হত্যা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত।

‘স্বীকারোক্তি না দিলে ওরা ক্রসফায়ারে দিত’

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি, দুই দফা তদন্ত হলেও আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে তৃতীয় দফার তদন্তে। ওই তদন্তের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল জজ মিয়া নাটক ফাঁস।

দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় সৃষ্টিকারী এই নাটক সৃষ্টিতে সিআইডির তিন কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত ছিলেন। গ্রামের সহজ-সরল এক যুবককে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করে জজ মিয়া নাটকের জন্ম দিলেও পরবর্তী সময়ে মামলাটি অধিক তদন্তের পর এর রহস্য উন্মোচিত হয়।

হামলার দিন নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার বীরকোর্টে নিজ গ্রামের বাজারে বাবুল মিয়ার চায়ের দোকানে বসে জজ মিয়া টেলিভিশনের খবরে জানতে পারেন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার খবর।

প্রথমে প্রলোভন, পরে নির্যাতন নিপীড়ন- এমনকি ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে তাকে রাজি করানো হয় একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করতে। আসল ঘটনা আড়াল করতেই এমন নাটক সাজানো হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বহুল আলোচিত সাক্ষী জজ মিয়া আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

গতকাল মঙ্গলবার বিকালে দেড় ঘণ্টার সাক্ষাত্কারে জজ মিয়া বলেন, তারা আমাকে সিআইডি অফিসে নিয়ে গিয়েছিল। গ্রেনেড হামলার ফুটেজ দেখিয়েছে। দেখায়ে বলে তোর এই ভাবে স্বীকারোক্তি দিতে হবে।

স্বীকারোক্তি না দিলে সন্ত্রাসী হিসেবে মামলা দিয়ে ক্রসফায়ারে ফেলে দেব। রাজি না হলে দফায় দফায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। এমনকি বলে তোর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে এরপর আমি স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হই। পরে আমাকে কয়েকটি নাম মুখস্থ করায় এবং ছবি দেখায়।

ওই সময় দেশ-বিদেশে আলোচিত ঘটনা ছিল জজ মিয়া নাটক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে এ হামলা হয়। এত বড় হত্যাকাণ্ড কীভাবে এই জজ মিয়া করতে পারে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ৩৭ বছর বয়সী জজ মিয়ার বাবার নাম মৃত আব্দুর রশীদ। তারা চার ভাই ও এক বোন।

তিন ভাই ঢাকায় টুকটাক ব্যবসা করে। সেদিনের সেই অমানুষিক নির্যাতনের কথা তুলে ধরতে গিয়ে এক পর্যায়ে কেঁদেই ফেলেন জজ মিয়া। বলেন, আমার জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। আমি বাঁচতে চাই। সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

৮ মাস আগে মা মারা গেছেন। একমাত্র বোনকে বিয়ে দিতে পারছি না। আমার কারণে তিন দফা বিবাহ ভেঙে গেছে। আমি নিজের পরিচয় দিতে পারি না। পরিচয় গোপন করে আমাকে চলতে হয়। বর্তমানে জজ মিয়া ঢাকায় ভাড়ায় টেম্পু চালান।

জজ মিয়া জানান, তখন গুলিস্তান মোড়ে ফুটপাতে পোস্টার বিক্রি করতেন। অসুস্থ থাকায় ঘটনার দিন তিনি গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। সন্ধ্যায় কানকিরহাট বাজার এলাকায় হামলার প্রতিবাদে মিছিলেও তিনি অংশ নেন।

অথচ ঘটনার ৮ মাস পর সেনবাগ থানার এসআই কবির দুপুরে বাসায় গিয়ে জজ মিয়াকে গ্রেফতার করেন। ওই সময় গ্রামের মানুষ হতবাক হয়ে যায়। একজন নিরীহ মানুষকে কেন গ্রেফতার করা হলো।

গ্রেফতারের একদিন পর গ্রামবাসী জানতে পারে গ্রেনেড হামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রামের মানুষ কেউই এটা মেনে নিতে পারছিল না। জজ মিয়ার পক্ষে এ ধরনের হামলা চালানো কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে গ্রামবাসী মন্তব্য করেন।

জজ মিয়া বলেন, আমাকে গ্রেফতারের পর মুখ বেঁধে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকায় আনার আগে সিআইডির এএসপি রশীদসহ একটি দল থানার গেট বন্ধ করে আমার ওপর চালায় নিষ্ঠুর নির্যাতন। বলে, ঢাকায় গিয়ে সব বলবি। ঢাকায় আনতে পথিমধ্যে গাড়ি থামিয়ে যা শিখানো হবে তাই স্বীকার করতে বলা হয়।

তালিকা যা দেওয়া হবে তাই বলতে বলা হয়। নইলে ক্রসফায়ার। জজ মিয়া বলেন, তখন আমি বলি, আমি তো কিছুই জানি না। কী বলবো। সাদা প্যান্ট ও টি-শার্ট পরিহিত জজ মিয়া আরো বলেন, ঢাকায় এনে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ, মুকুল, রশীদ, হাসেম, সফিক এবং রমনা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোখলেসুর রহমানকে নাম মুখস্থ করতে বলে।

সিআইডির অফিসের উক্ত তিন কর্মকর্তা আমাকে শিখিয়ে দেন যে মগবাজারে মোখলেসুর রহমানের বাসায় গোপন বৈঠকের পর এই হামলা করা হয়।

আমাকে বলে, তুই শেখানো কথা বললে রাজসাক্ষী হিসেবে খালাস দেওয়া হবে। বিদেশে পাঠিয়ে দেবো। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিক, সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুর রশীদ -এই তিন জন স্বীকারোক্তি আদায় করতে আমার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালান।

তারা বলেন, বড় অফিসাররা আসলে আমাদের শিখানো কথা বলবি। নইলে তুই রক্ষা পাবি না। পরে রাজি হই এবং ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দেই। যখন এই জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছিল, তখন সিআইডির ওই তিন কর্মকর্তা পাশে ছিলেন। পরে জজ মিয়াকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

আরও পড়ুন: দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার কুফল ও প্রতিকার

সেখান থেকে কাশিমপুর কারাগারে রাখা হয় জজ মিয়াকে। এমন পরিস্থিতিতে এলাকায় যেটুকু চাষের জমি ছিল তা বিক্রি করে দিয়ে আমার মা জোবেদা বেগম টাকা নিয়ে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। অনেককে ঘুষও দেন, কিন্তু কিছুই হয়নি।

জজ মিয়া আরো বলেন, এক সময় বিএনপি জোট সরকারের পরিবর্তন হয়ে আসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় কাশিমপুর কারাগারে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক গুলজার উদ্দিন আহমেদ ও সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলুল করিম আমার সঙ্গে দেখা করেন এবং সত্য ঘটনা জানতে চান। পরে আমি পুরো ঘটনা তুলে ধরি। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে মুক্তি পাই।

প্রসঙ্গত, বিনা অপরাধে চার বছর জেল খেটে ওলট-পালট হয়ে যায় জজ মিয়ার জীবন। নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার বীরকোর্ট গ্রাম থেকে ছয় বছর আগে পৈতৃক ভিটার ৭ শতাংশ জমি বিক্রি করে গ্রাম ছাড়েন তিনি। আর গ্রামে ফিরে যাননি।

বিডিটুডেস এএনবি/ ১১/১০/১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

twenty − 9 =