English Version

হে বিবেক তুমি জেগে ওঠ…

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

মীর আব্দুল আলীম: একজন নারী যখন ধর্ষিত হয় কিংবা খুন হয় তখন তার সুরতহাল রিপোর্ট সম্পন্ন করেন একজন পুরুষ ডাক্তার। কখনো সঙ্গে থাকেন পুরুষ পুলিশ অফিসারও। এটা কতটা লজ্জার? খুবই লজ্জাজনক একটা ব্যাপার। এই লজ্জা শুধুমাত্র আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয় নয়; পুরো ১৬ কোটি মানুষের লজ্জা।

নারীর সবচেয়ে বড় যে জায়গায় তা হলো তাঁর সম্মানবোধ। সেই জায়গাটাতে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি। নারীর ক্ষমায়ন বেড়েছে বটে, নারীকে এখনও আমরা সম্মান দিতে ব্যর্থ। তাই যে কাজটি নিন্দনীয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা পরিপন্থী তাই করা হচ্ছে দেশে। উচ্চ আদালত রায় দিলেও এখনও কেন ধর্ষিতা, কিংবা মৃত নারীর দেহের সুরতহাল রিপোর্ট এবং ময়নাতদন্ত করছে একজন পুরুষ ডাক্তার? নির্যাতনে শিকার একজন নারীর জন্য এটি দ্বিতীয়বার নির্যাতনের শামিল। এর ফলে নির্যাতনে শিকার নারী মানুষিক ভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এধরণের পরীক্ষা আবশ্যিকভাবে নারী ডাক্তার ও নার্স দিয়ে করা উচিত।

ইউটিউব এ সাবস্ক্রাইব করুন

উচিত হলেও তাঁরা কে মানছে আদালতের নির্দেশ? বাংলাদেশে যে কয়েকটি সমস্যা নারী অধিকারের পরিপন্থী এর মধ্যে অন্যতম হল ধর্ষণ মামলায় আইনি প্রতিকারের জন্য পুরুষ ডাক্তার কর্তৃক ধর্ষিতার শরীর পরীক্ষা। মূলত আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষ ডাক্তাররাই এ জাতীয় পরীক্ষা করে থাকেন। এটা সত্যিই বিবেক বর্জিত এবং গর্হিত কাজ। মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় পরিপন্থীতো বটেই! এ জন্য দায়ী কে? আমি মনে করি এজন্য দায়ী আমাদের বিবেক। আমাদের বিবেকে বলবো, রাষ্ট্রিয় বিবেককে বলবো-“বিবেক তুমি জাগ্রত হও” “বিবেক তুমি জাগ্রত হও”।

বাহ! ভালইতো? একজন কিংবা একাধিক পুরুষ একজন অবলা নারীকে ধর্ষণ করলো আর একদল পুরুষ ডাক্তারের কাছে অপরাধ প্রমাণের সনদের জন্য সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় তাঁর পুরো শরীর পরীক্ষা করতে হলো। ছি: ছি: এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে। ধর্ষণইতো ভালো ছিলো! ধর্ষকরা ধর্ষণ করেছে জোরজুলুম করে। আর সেচ্ছায় কাপড়খুলে কয়েকজন পুরুষের কাছে ফের গণধর্ষিত হলো সেই নারী। এ সমাজ, এ রাষ্ট্রিয় ব্যবস্থাকে ধিক্কার জানাই। বলা হয় আমাদেও নাকি পর্যাপ্ত নারী ডাক্তার নাই। যদি বিচার বিভাগ স্বাধীন করে দিয়ে একসাথে ৪ শত বিচারক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব সেখানে কেন ধর্ষণের পরীক্ষার জন্য নারী ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়? তা হলে কি ভাববো আমরা? সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং কমিটমেন্টের অভাব?

আমাদের বিবেক, ধর্মীয়বোধের অভাব? আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এ জাতীয় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তা নাহলে আমাদেও নারীরা আমাদেও মায়েরা, আমাদেও বোনেরা ধর্ষিত হতেই থাকবে। এটা অসম্ভব। এটা অসভ্যতা। এ অসভ্যতা থেকে আমরা কবে মুক্ত হবো তা আল্লাহই জানেন। ধর্ষণ মামলায় মেয়ে ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবেই। নতুবা রাষ্ট্র বলে দিকে ধর্ষিত নারীর বিচার দারকার নেই। তাহলে নারী লজ্জাবোধ থেকে বেঁচে যায়। এটা খুব জরুরী। আমি ধর্ষিতার শরীর পরীক্ষার বিপক্ষে মত দিচ্ছি, তা কিন্তু নয়। বিচার পেতে হলে ধর্ষিতার মরীর পরীক্ষা করতেই হবে। তবে তা পুরুষ দিয়ে নয়। নারী ধর্ষিতার শরির পরীক্ষা করুক। আমরা চাই ধর্ষণকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। ধর্ষিতা নারী তাঁর বিচার পাক। কেবল আপত্তি ধর্ষিতাকে পরীক্ষা করাতে হবে মেয়ে ডাক্তার দিয়ে।

এর আগে উচ্চ আদালত নারী পুলিশ এবং নারী ডাক্তার দিয়ে সুরতহাল রিপোর্ট করতে রায় দিয়েছেন। সে রায় কতটা কার্যকর হয়েছে? এখনো হরহামেশাই নারীর মৃতদেহ কিংবা ধর্ষিতার দেহ পরীক্ষা করছে পুরুষ। এটা একজন নারীর জন্য কতটা অপমানের? রাষ্ট্রের কি অধিকার আছে একজন নারীর শ্লীলতাহানি করার? এটা তো অবশ্যই শ্লীলতাহানি। আমরা জানি একজন ধর্ষিতাকে কী পন্থায় ডাক্তারি পরীক্ষা (সুরতহাল) করা হয়। নির্যাতনের শিকার একজন নারীর জন্য এটি দ্বিতীয়বার যৌন নির্যাতনের শামিল। নির্যাতনের শিকার নারী এর ফলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এ ধরনের পরীক্ষা নারী ডাক্তার ও নার্স দিয়ে করা উচিত। এ রাষ্ট্র কি সে ব্যবস্থা রেখেছে?

মূলত বাধ্য হয়েই একজন ধর্ষিত নারী পুরুষ ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করাচ্ছে। একজন ধর্ষিতাকে বাধ্য হয়ে একজন পুরুষ পুলিশ অফিসারের কাছে তার লজ্জার কথা অকপটে বলতে হচ্ছে। বিপদে না পড়লে বোধ করি কখনোই একজন নারী পুরুষ ডাক্তারের সামনে পোশাক খুলে বিবস্ত্র হতেন না। ধর্ষণের সেই নির্মম কাহিনীর ধারা বর্ণনা দিতেন না। যখন চিকিৎসক একজন নারীকে শরীরের সব পোশাক খুলে ফেলতে বলেন তখন জীবনটা তার কাছে যন্ত্রণাদায়ক মনে হয় বৈকি। এটা তার জীবনে দ্বিতীয় ধর্ষণও। পরিতাপের বিষয় এই যে শুধু ধর্ষকের শাস্তির জন্য এত কিছু করার পরও সেই মামলায় ধর্ষক বেঁচে যাচ্ছে প্রায় ক্ষেত্রেই। সত্যি বিচিত্র এ দেশ। এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা। স্মরণ রাখতে হবে, আমরা সবাই কোনো না কোনো পরিবারের সদস্য এবং পরিবারে আমাদের সবারই মা, বোন ও মেয়ে রয়েছে। তারা যে কেউ এ পরিস্থিতির মুখোমুখি যদি হয় তখন আমাদের একই কষ্ট লাগবে।

কথা হলো কোনো মহিলা পুলিশ অফিসার অভিযোগ নিলে ধর্ষিতারা অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারবেন। তার ডাক্তারি পরীক্ষা যদি কোনো মহিলা ডাক্তার করেন তবে তার সহমর্মিতা পেতে পারেন অত্যাচারিতা। এতে তদন্তের কাজও দ্রুত শেষ হতে পারে। পারিবারিক নির্যাতন, সহিংসতা, ধর্ষণ, ইভ টিজিং, যৌন হয়রানিসহ নারী ভিকটিমদের সাপোর্ট দিতে নারী পুলিশ কর্মকর্তা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে নারী ভিকটিমরা সব বিষয় শেয়ার করতে পারে না। এ ছাড়া কোনো নারী খুন হলে তার সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করতে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাকে সমস্যায় পড়তে হয়। ধর্ষণ, হত্যা, দুর্ঘটনার মামলা অথবা ছেলে বা মেয়ের বয়স নির্ধারণে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে সনদ নিতে হয়। আইনের চোখে এ সনদ গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

অনেকে মনে করেন, এ দলিল পেতে দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শিকার হন নারী। অবাক করার বিষয় যে দেশের কোনো হাসপাতালেই নারীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য পৃথক কক্ষ নেই। চিকিৎসকদের বসার কক্ষের পুরুষ চিকিৎসক পুরুষ ওয়ার্ডবয়ের সহযোগিতায় সেই টেবিলের ওপর ধর্ষণের শিকার নারীকে রেখে তার পরিধেয় কাপড় খুলে শারীরিক পরীক্ষা করেন। আর এভাবে পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে আঁতকে ওঠেন সবাই। পরীক্ষার আতঙ্কে অনেকে অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া থেকে বিরত থাকেন। অতি সম্প্রতি সবুজবাগ থানার সহকারী পুলিশ পরিদর্শক বিকাশ কুমার ঘোষ আদালতের নির্দেশে বয়স নির্ধারণের জন্য একটি মেয়েকে ফরেনসিক বিভাগে আনেন। খোলা বারান্দার টেবিলের ওপর পুরুষ ওয়ার্ডবয় কাপড় খুলতে শুরু করলেই চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মেয়েটি। জ্ঞান ফেরার পর বয়স নির্ধারণে আর রাজি হননি তিনি। পত্রিকার খবরে দেখেছি টাকা দিতে রাজি হলে হাসপাতালের অন্য বিভাগ থেকে নারী চিকিৎসক এনে পরীক্ষা করানো হয়। টাকা বেশি দিলে ওই দিনই পরীক্ষা সনদও পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় অভিভাবকদের কাছ থেকে। টাকা খরচ না করলে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় ধর্ষণ কিংবা বয়স নির্ধারণের প্রতিবেদনের জন্য। এটা দুঃখজনক।

আরও পড়ুন: দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার কুফল ও প্রতিকার

প্রশ্ন হলো কেন এই পদক্ষেপ? কোনো কোনো পুলিশ কর্তাকে বলতে শুনি, এসব মামলা তদন্ত সম্পন্ন করতে গিয়ে তারাও বিব্রত হচ্ছেন। এটা পুরোপুরি অমানবিক। বহু ক্ষেত্রে ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে থানার তদন্তকারী কর্মকর্তার অশ্লীল প্রশ্নবাণে কার্যত দ্বিতীয়বার ‘ধর্ষিত’ হন ধর্ষিতা। সেই পীড়নকে আমরা কেন যৌন নিপীড়ন বলব না? এ থেকে নির্যাতিতাদের বাঁচাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ লজ্জাটা শুধু ধর্ষিতা অসহায় অবলা নারীর লজ্জা তা বলব না। এটা আমাদের লজ্জা; এটা রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের লজ্জা। বিষয়টি গোটা দেশবাসীর জন্যই লজ্জার। নারীর প্রতি সমঅধিকার, নারী বৈষম্য, নারী নির্যাতন, সব কর্মে নারীর সমান সুযোগ, নারী শিক্ষার উন্নতি জাতীয় ব্যাপক নীতিকথার বুলি কচলান আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা। তাদের সেই নীতি যে কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে তার প্রমাণ তো এই লেখাতেই মিলছে। আমাদের দেশের নারী অধিকারের পরিপন্থী যেসব রীতিনীতি রয়েছে তার অন্যতম হলো- ধর্ষণ মামলায় আইনি প্রতিকারের জন্য পুরুষ ডাক্তার কর্তৃক ধর্ষিতার শরীর পরীক্ষা। বারবার এ সমস্যা সমাধানের তাগিদ আসে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু প্রতিকার হচ্ছে না।

এ দেশের ধর্ষিতারা বছরের পর বছর ধরে বিচার চাইতে গিয়ে ফের শ্লীলতাহানির শিকার হলেও দেশের বিবেকবান মানুষ কেন প্রতিবাদী হচ্ছে না? মানুষের অন্তর চক্ষুতে কেন উপরোক্ত ঘটনা ধরা পড়ে না? তাদের বিবেক কেন জাগ্রত হয় না? নাকি ভেবে নেওয়া যায় কোনো বিবেকবান মানুষ এ পর্যন্ত এ দেশে জন্মই হয়নি? হলে তারা; আমরা কেন আজ চুপটি মেরে; ঘাপটি মেরে আছি। এ জন্য দায়ী কে? মনে করা স্বাভাবিক এ দায় আমাদের বিবেকের দায়। প্রশ্ন হলো, আমাদের বিবেক কেন জাগ্রত নয়?
লেখক: মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিষ্ট।

বিডিটুডেস এএনবি/ ০১.১১.১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

15 − 4 =