একসময় ঢাকার প্রাণ ছিল বুড়িগঙ্গা। স্বচ্ছ পানিতে ভেসে চলত নৌকা, ঘাটে ঘাটে মানুষ নামত গোসল করতে, শিশুরা খেলত নদীর পানিতে। সেই নদীই আজ কালচে, দুর্গন্ধযুক্ত, নিস্তব্ধ। বুড়িগঙ্গার পানি আর জীবন বহন করে না, বহন করে বিষ। ঢাকার শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি নিকাশি ও প্লাস্টিকের বর্জ্যে নদীর পানি হয়ে উঠেছে বিষাক্ত মিশ্রণ। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়; মেঘনা, যমুনা, পদ্মা, কর্ণফুলী দেশের প্রধান নদীগুলোর পানিও আজ মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য।
২০১০ সালের তুলনায় এখন দূষণের মাত্রা তিনগুণ বেড়েছে। বুড়িগঙ্গায় দূষণ ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ শতাংশে, পদ্মায় ১৮ থেকে ৬৫, যমুনায় ১০ থেকে ৫৫ এবং মেঘনায় ১৫ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ঢাকার নদীগুলোয় প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ কোটি লিটার বর্জ্য মিশছে, যার অন্তত ৬০ শতাংশই অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য। অক্সিজেনের মাত্রা নেমে এসেছে ১.৫ মিলিগ্রাম/লিটারে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মৃত্যুঘণ্টা।
দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নিষ্কাশনব্যবস্থার ঘাটতি একত্রে বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। রাজধানী ঢাকার চারপাশে গড়ে ওঠা হাজারো কারখানা, ডাইং ইউনিট ও চামড়া শিল্প নদীতে প্রতিদিন বিষ ঢালছে। নদীশূন্য এই বাস্তবতা শুধু পরিবেশ নয়, কৃষি, মাছ চাষ, এমনকি জনস্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের বড় নদীগুলোর ৮০ শতাংশ পানিই জীববৈচিত্র্যহীন ও পানযোগ্যতার সীমার বাইরে চলে যাবে।
২০১৯ সালের পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকার নদীগুলোর দূষণের মাত্রা ২০০০ সালের পর থেকে ২০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বড়ে গেছে। নদীতে ফেলে দেওয়া অপরিশোধিত বর্জ্য মাছ, শামুক এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) ২০২১ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার নদীতে অক্সিজেনের ঘনত্ব মাত্র ১.৫ মিলিগ্রাম/লিটারে (সম/খ) নেমে এসেছে, যা স্বাভাবিক ৪ মিলিগ্রামের অনেক নিচে। ফলে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের পথে।
বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী বাংলাদেশের মূল জলসম্পদ হলেও অত্যধিক দূষণের কারণে এ নদীগুলো আজ বিপর্যয়ের মুখে। বিভিন্ন গবেষণা অনুসারে, বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের প্রধান কারণ শিল্পকারখানার বর্জ্য ও আবাসিক এলাকা থেকে নিষ্কাশিত পানির অপ্রতুল ব্যবস্থাপনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিষয়ক
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় প্রায় ৩৫০ কোটি লিটার বর্জ্য পানি প্রবাহিত হচ্ছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য। রঞ্জন, বস্ত্র, চামড়া ও কাগজ শিল্পগুলো নদীতে বিষাক্ত ধাতু যেমন পারদ, সীসা, ক্রোম ও কপার নিঃসরণ করে।
তুরাগ নদীর দূষণ মূলত শিল্পায়নের কারণে। বগুড়া, গাজীপুর ও ধামরাইয়ের হালকা ও ভারী শিল্পের বর্জ্য নদীতে প্রবাহিত হয়ে নদীর পানি ও মাটি দূষিত করছে। তুরাগের পানি পরীক্ষায় দেখা গেছে উচ্চ মাত্রার বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) ও কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (সিওডি), যা পানির জীববৈচিত্র্য হ্রাসে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া তুরাগ ও বুড়িগঙ্গার তীরে অনিয়ন্ত্রিত আবাসিক বর্জ্য, প্লাস্টিক ও কাঠের অপচয়ও দূষণ বাড়াচ্ছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নদীগুলোর দূষণ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্ষাকালে নদীর পানির ভলিউম বাড়লেও বর্জ্য পানি নির্গমন কমেনি, ফলে দূষণের ঘনত্ব কমছে না। সাম্প্রতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নদীর তলদেশে মাটির ক্ষয় ও দূষিত কাদার জমাট বাঁধার ফলে নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য বিপন্ন। এই দূষণ নদীর পানি ব্যবহার ও মাছ চাষের জন্য ক্ষতিকর, যার ফলে স্থানীয় জনসংখ্যা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ শহর ও এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল দেশের অন্যতম দূষিত পানির এলাকা। স্থানীয় পরিবেশ গবেষণা এবং বিডব্লিউডিবির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জে নদী ও খালগুলোতে শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালির পানি ও রাসায়নিকের মাত্রা অত্যধিক। বিশেষত কেমিক্যাল, চামড়া ও রঞ্জন শিল্প থেকে মিথানল, ক্রোম ও অন্যান্য ভারী ধাতু নদীতে নিঃসৃত হচ্ছে। ঢাকার নিকটবর্তী এই শিল্পাঞ্চলের নদী ও খালগুলোয় বিওডি এবং সিওডির মান নিরাপদ সীমার অনেক ওপরে, যা পানি ব্যবহার ও মাছ চাষকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের নদীর পানি ভয়াবহ রকমের দূষিত। নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করলেও শহরের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ জনগণ দূষিত পানির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন। রোগতত্ত্ব ও পরিবেশ গবেষণা অনুযায়ী, নদী ও খাল থেকে মাছ ও অন্যান্য জলজ খাদ্যশ্রেণিতে দূষক উপাদান উপস্থিত হওয়ার কারণে স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিষক্রিয়াজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) সদস্য সচিব শরীফ জামিল এ বিষয়ে বলেন, ইন্ডাস্ট্রি হওয়ার পর বেশিরভাগ কারখানা পরিদর্শন করা হয়। কাজেই ইন্ডাস্ট্রিকে তো কমপ্লায়েন্সের আওতায় আসতে হবে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে। আগের সরকার তো মানেনি, বর্তমান সরকারও মানছে না। এখন প্রশ্ন সরকারগুলো পানিদূষণ রোধে আন্তরিক কিনা। হাইকোর্ট তো নিদের্শনা দিয়েছেন। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব কারখানা পরিদর্শন করে তাদের কমপ্লায়েন্স না হয়ে লোন রিনিউ না করলে পারে। একসঙ্গে অনেক কারখানা রয়েছে, সেখানে প্ল্যান্ট সেট করা যেতে পারে। এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনালে ছাত্রছাত্রীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। আসলে উৎসে দূষণ বন্ধ করতে না পারলে দূষণ রোধ করা সম্ভব না। কোনো সরকারই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
কৃষিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে রাসায়নিক দ্রবণ নদীতে প্রবেশ করছে। নদীর পানিতে নাইট্রেট ও ফসফেটের মাত্রা নিরাপদসীমার তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে মানুষের কিডনি, লিভার ও হৃৎপিণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। ২০১৫ সালে ঢাকার পানির লবণাক্ততার মাত্রা ৫০০ সম/খ ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে লবণাক্ততা বেড়ে ১ হাজার ২০০ সম/খ এ পৌঁছেছে।
ঢাকার মতো শহরগুলোয় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিডব্লিউডিবির ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানি প্রতি বছর গড়ে ১.২ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে পানির স্বচ্ছতা কমছে, লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে এবং খাল ও পুকুরের পানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণাক্ত পানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার কৃষিজমি ও মানুষের স্বাস্থ্য উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নগরীর ড্রেনেজ ও জলাধারের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা দূষণের মাত্রা আরও বাড়াচ্ছে। বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি ও নদীর পানির মিশ্রণ শহরের অনেক এলাকা জলমগ্ন করছে, যার সঙ্গে দূষিত পানি সরাসরি মানুষের সংস্পর্শে আসে। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী ও মাদারীপুরেও নদীর দূষণ ভয়াবহ। পদ্মা নদীর পানি কৃষি ও গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। যমুনা ও মেঘনা নদীর পানিতেও কেমিক্যাল, কৃষি সার এবং শিল্প বর্জ্যরে মাত্রা অনুমোদিত সীমার দ্বিগুণ।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব এরই মধ্যে স্পষ্ট। মাছের প্রজাতি কমছে, নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পথে। দীর্ঘমেয়াদি দূষিত পানি ব্যবহার কিডনি, লিভার ও পেটের সংক্রমণ বাড়াচ্ছে। আইএইচইইর ২০২০ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ধানমন্ডি, মিরপুর ও গুলশান এলাকার পানিতে ঊ.পড়-এর এবং অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা অনুমোদিত সীমার দ্বিগুণ। কিডনি রোগে বৃদ্ধি ৮ শতাংশ, লিভার রোগে বৃদ্ধি ৫ শতাংশ এবং ১২৫ কোটি টাকার বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ঘটছে মাছ চাষ ও চাষাবাদে।
দেশের খাল ও হ্রদও প্রভাবিত হয়েছে। চট্টগ্রাম ও খুলনার হ্রদগুলোয় শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য মেশানো হচ্ছে। এতে হ্রদগুলোর পানিতে জৈব অক্সিজেনের মাত্রা কমছে এবং পানি জীবাণুমুক্ত নয়।
কক্সবাজারের বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় জলাভাগও দূষণ সমস্যার শিকার। সমুদ্র গবেষণা ও স্থানীয় পরিবেশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পর্যটন ও শিল্পকারখানার বর্জ্য সমুদ্রপথে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রজীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে। সমুদ্রের পানির মধ্যে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অ্যালগ ব্লুুম ঘটাচ্ছে এবং সমুদ্রজীবনের জন্য প্রাণঘাতী। এ ছাড়া, পর্যটন কেন্দ্র ও আবাসিক এলাকা থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিন সরাসরি সমুদ্রে ফেলা হচ্ছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়ানহ হুমকি।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশের পানির সংরক্ষণ ও দূষণ কমাতে বছরে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। ২০১৮-২০২২ সালের মধ্যে শহরাঞ্চলে পানি পরিশোধনের জন্য সরকার ও সহায়তা সংস্থা মোট ২০টি প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। তবে বাস্তবায়নেও অনিয়ম ও দুর্নীতি দেখা দিয়েছে। অনেক প্ল্যান্টের যন্ত্রপাতি পুরনো, কার্যক্ষম নয় বা সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে কার্যকারিতার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন শুধু পানি পরিশোধন নয়, নদী ও খাল পুনর্নিমাণ, শিল্প ও কৃষি বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, আবর্জনা ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। পানি সংকট দীর্ঘমেয়াদে সমাধান করতে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন একসঙ্গে চালাতে হবে।
দেশব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, পদ্মা নদীতে দূষণ ১৮ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশ, যমুনা ১০ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশ, মেঘনা ১৫ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ, কর্ণফুলী ১২ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ২০১৫ সালে লবণাক্ততার মাত্রা ৫০০ সম/খ থেকে ২০২৩ সালে ১ হাজার ২০০ সম/খ এ উন্নীত হয়েছে। ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমছে এবং স্থানীয় কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নদী পুনর্জীবন প্রকল্পের জন্য ২০১৫-২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের কার্যকারিতা কমে গেছে। কিছু এলাকায় আবর্জনা অপসারণ হয়নি, পানির গুণগত মান উন্নয়ন হয়নি।
নদীর তীরে অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা নির্মাণ, মাটি কাটাকাটি, অবৈধ বালু উত্তোলন ও অব্যবস্থাপিত নিষ্কাষণ ব্যবস্থা দূষণকে আরও বাড়িয়েছে। এই কারণে নদীর পানির প্রবাহ কমছে, পানি জমে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও লবণাক্ততার কারণে পানি পানের মান কমছে এবং কৃষি ফসল ও মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, দেশের পানির সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন । প্রতিটি শিল্পকলা থেকে বর্জ্য পানি পরিশোধন বাধ্যতামূলক করা। নগরাঞ্চলের আবর্জনা পুনর্ব্যবহার ও সঠিক নিষ্কাশন নিশ্চিত করা। ভূগর্ভস্থ পানির নিয়ন্ত্রিত উত্তোলন এবং লবণাক্ততা কমাতে প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণ। নদীর তীর সংরক্ষণ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষামূলক প্রচারণা।
এই পদক্ষেপগুলো দ্রুত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে আগামী দশকে দেশের পানির সংকট মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছাবে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং জনগণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এক সময়ের বিশুদ্ধ নদীগুলো পুনরায় সুস্থ ও স্বচ্ছ হতে পারবে না।
১৫ বছরে নদীদূষণ বেড়েছে তিনগুণ
১৫ বছরে নদীদূষণ বেড়েছে তিনগুণ
একসময় ঢাকার প্রাণ ছিল বুড়িগঙ্গা। স্বচ্ছ পানিতে ভেসে চলত নৌকা, ঘাটে ঘাটে মানুষ নামত গোসল করতে, শিশুরা খেলত নদীর পানিতে। সেই নদীই আজ কালচে, দুর্গন্ধযুক্ত, নিস্তব্ধ। বুড়িগঙ্গার পানি আর জীবন বহন করে না, বহন করে বিষ। ঢাকার শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি নিকাশি ও প্লাস্টিকের বর্জ্যে নদীর পানি হয়ে উঠেছে বিষাক্ত মিশ্রণ। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়; মেঘনা, যমুনা, পদ্মা, কর্ণফুলী দেশের প্রধান নদীগুলোর পানিও আজ মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য।২০১০ সালের তুলনায় এখন দূষণের মাত্রা তিনগুণ বেড়েছে। বুড়িগঙ্গায় দূষণ ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ শতাংশে, পদ্মায় ১৮ থেকে ৬৫, যমুনায় ১০ থেকে ৫৫ এবং মেঘনায় ১৫ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ঢাকার নদীগুলোয় প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ কোটি লিটার বর্জ্য মিশছে, যার অন্তত ৬০ শতাংশই অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য। অক্সিজেনের মাত্রা নেমে এসেছে ১.৫ মিলিগ্রাম/লিটারে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মৃত্যুঘণ্টা।দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নিষ্কাশনব্যবস্থার ঘাটতি একত্রে বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। রাজধানী ঢাকার চারপাশে গড়ে ওঠা হাজারো কারখানা, ডাইং ইউনিট ও চামড়া শিল্প নদীতে প্রতিদিন বিষ ঢালছে। নদীশূন্য এই বাস্তবতা শুধু পরিবেশ নয়, কৃষি, মাছ চাষ, এমনকি জনস্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের বড় নদীগুলোর ৮০ শতাংশ পানিই জীববৈচিত্র্যহীন ও পানযোগ্যতার সীমার বাইরে চলে যাবে।২০১৯ সালের পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকার নদীগুলোর দূষণের মাত্রা ২০০০ সালের পর থেকে ২০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বড়ে গেছে। নদীতে ফেলে দেওয়া অপরিশোধিত বর্জ্য মাছ, শামুক এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) ২০২১ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার নদীতে অক্সিজেনের ঘনত্ব মাত্র ১.৫ মিলিগ্রাম/লিটারে (সম/খ) নেমে এসেছে, যা স্বাভাবিক ৪ মিলিগ্রামের অনেক নিচে। ফলে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের পথে।বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী বাংলাদেশের মূল জলসম্পদ হলেও অত্যধিক দূষণের কারণে এ নদীগুলো আজ বিপর্যয়ের মুখে। বিভিন্ন গবেষণা অনুসারে, বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের প্রধান কারণ শিল্পকারখানার বর্জ্য ও আবাসিক এলাকা থেকে নিষ্কাশিত পানির অপ্রতুল ব্যবস্থাপনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিষয়কগবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় প্রায় ৩৫০ কোটি লিটার বর্জ্য পানি প্রবাহিত হচ্ছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য। রঞ্জন, বস্ত্র, চামড়া ও কাগজ শিল্পগুলো নদীতে বিষাক্ত ধাতু যেমন পারদ, সীসা, ক্রোম ও কপার নিঃসরণ করে।তুরাগ নদীর দূষণ মূলত শিল্পায়নের কারণে। বগুড়া, গাজীপুর ও ধামরাইয়ের হালকা ও ভারী শিল্পের বর্জ্য নদীতে প্রবাহিত হয়ে নদীর পানি ও মাটি দূষিত করছে। তুরাগের পানি পরীক্ষায় দেখা গেছে উচ্চ মাত্রার বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) ও কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (সিওডি), যা পানির জীববৈচিত্র্য হ্রাসে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া তুরাগ ও বুড়িগঙ্গার তীরে অনিয়ন্ত্রিত আবাসিক বর্জ্য, প্লাস্টিক ও কাঠের অপচয়ও দূষণ বাড়াচ্ছে।গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নদীগুলোর দূষণ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্ষাকালে নদীর পানির ভলিউম বাড়লেও বর্জ্য পানি নির্গমন কমেনি, ফলে দূষণের ঘনত্ব কমছে না। সাম্প্রতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নদীর তলদেশে মাটির ক্ষয় ও দূষিত কাদার জমাট বাঁধার ফলে নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য বিপন্ন। এই দূষণ নদীর পানি ব্যবহার ও মাছ চাষের জন্য ক্ষতিকর,
যার ফলে স্থানীয় জনসংখ্যা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে।নারায়ণগঞ্জ শহর ও এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল দেশের অন্যতম দূষিত পানির এলাকা। স্থানীয় পরিবেশ গবেষণা এবং বিডব্লিউডিবির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জে নদী ও খালগুলোতে শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালির পানি ও রাসায়নিকের মাত্রা অত্যধিক। বিশেষত কেমিক্যাল, চামড়া ও রঞ্জন শিল্প থেকে মিথানল, ক্রোম ও অন্যান্য ভারী ধাতু নদীতে নিঃসৃত হচ্ছে। ঢাকার নিকটবর্তী এই শিল্পাঞ্চলের নদী ও খালগুলোয় বিওডি এবং সিওডির মান নিরাপদ সীমার অনেক ওপরে, যা পানি ব্যবহার ও মাছ চাষকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের নদীর পানি ভয়াবহ রকমের দূষিত। নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করলেও শহরের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ জনগণ দূষিত পানির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন। রোগতত্ত্ব ও পরিবেশ গবেষণা অনুযায়ী, নদী ও খাল থেকে মাছ ও অন্যান্য জলজ খাদ্যশ্রেণিতে দূষক উপাদান উপস্থিত হওয়ার কারণে স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিষক্রিয়াজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে।বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) সদস্য সচিব শরীফ জামিল এ বিষয়ে বলেন, ইন্ডাস্ট্রি হওয়ার পর বেশিরভাগ কারখানা পরিদর্শন করা হয়। কাজেই ইন্ডাস্ট্রিকে তো কমপ্লায়েন্সের আওতায় আসতে হবে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে। আগের সরকার তো মানেনি, বর্তমান সরকারও মানছে না। এখন প্রশ্ন সরকারগুলো পানিদূষণ রোধে আন্তরিক কিনা। হাইকোর্ট তো নিদের্শনা দিয়েছেন। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব কারখানা পরিদর্শন করে তাদের কমপ্লায়েন্স না হয়ে লোন রিনিউ না করলে পারে। একসঙ্গে অনেক কারখানা রয়েছে, সেখানে প্ল্যান্ট সেট করা যেতে পারে। এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনালে ছাত্রছাত্রীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। আসলে উৎসে দূষণ বন্ধ করতে না পারলে দূষণ রোধ করা সম্ভব না। কোনো সরকারই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।কৃষিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে রাসায়নিক দ্রবণ নদীতে প্রবেশ করছে। নদীর পানিতে নাইট্রেট ও ফসফেটের মাত্রা নিরাপদসীমার তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে মানুষের কিডনি, লিভার ও হৃৎপিণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। ২০১৫ সালে ঢাকার পানির লবণাক্ততার মাত্রা ৫০০ সম/খ ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে লবণাক্ততা বেড়ে ১ হাজার ২০০ সম/খ এ পৌঁছেছে।ঢাকার মতো শহরগুলোয় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিডব্লিউডিবির ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানি প্রতি বছর গড়ে ১.২ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে পানির স্বচ্ছতা কমছে, লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে এবং খাল ও পুকুরের পানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণাক্ত পানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার কৃষিজমি ও মানুষের স্বাস্থ্য উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।নগরীর ড্রেনেজ ও জলাধারের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা দূষণের মাত্রা আরও বাড়াচ্ছে। বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি ও নদীর পানির মিশ্রণ শহরের অনেক এলাকা জলমগ্ন করছে, যার সঙ্গে দূষিত পানি সরাসরি মানুষের সংস্পর্শে আসে। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী ও মাদারীপুরেও নদীর দূষণ ভয়াবহ। পদ্মা নদীর পানি কৃষি ও গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। যমুনা ও মেঘনা নদীর পানিতেও কেমিক্যাল, কৃষি সার এবং শিল্প বর্জ্যরে মাত্রা অনুমোদিত সীমার দ্বিগুণ।স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব এরই মধ্যে স্পষ্ট। মাছের প্রজাতি কমছে, নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পথে। দীর্ঘমেয়াদি দূষিত পানি ব্যবহার কিডনি, লিভার ও পেটের সংক্রমণ বাড়াচ্ছে। আইএইচইইর ২০২০ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ধানমন্ডি, মিরপুর ও গুলশান এলাকার পানিতে ঊ.পড়-এর এবং অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা অনুমোদিত সীমার দ্বিগুণ। কিডনি রোগে বৃদ্ধি
৮ শতাংশ, লিভার রোগে বৃদ্ধি ৫ শতাংশ এবং ১২৫ কোটি টাকার বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ঘটছে মাছ চাষ ও চাষাবাদে।দেশের খাল ও হ্রদও প্রভাবিত হয়েছে। চট্টগ্রাম ও খুলনার হ্রদগুলোয় শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য মেশানো হচ্ছে। এতে হ্রদগুলোর পানিতে জৈব অক্সিজেনের মাত্রা কমছে এবং পানি জীবাণুমুক্ত নয়।কক্সবাজারের বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় জলাভাগও দূষণ সমস্যার শিকার। সমুদ্র গবেষণা ও স্থানীয় পরিবেশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পর্যটন ও শিল্পকারখানার বর্জ্য সমুদ্রপথে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রজীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে। সমুদ্রের পানির মধ্যে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অ্যালগ ব্লুুম ঘটাচ্ছে এবং সমুদ্রজীবনের জন্য প্রাণঘাতী। এ ছাড়া, পর্যটন কেন্দ্র ও আবাসিক এলাকা থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিন সরাসরি সমুদ্রে ফেলা হচ্ছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়ানহ হুমকি।বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশের পানির সংরক্ষণ ও দূষণ কমাতে বছরে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। ২০১৮-২০২২ সালের মধ্যে শহরাঞ্চলে পানি পরিশোধনের জন্য সরকার ও সহায়তা সংস্থা মোট ২০টি প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। তবে বাস্তবায়নেও অনিয়ম ও দুর্নীতি দেখা দিয়েছে। অনেক প্ল্যান্টের যন্ত্রপাতি পুরনো, কার্যক্ষম নয় বা সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে কার্যকারিতার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন শুধু পানি পরিশোধন নয়, নদী ও খাল পুনর্নিমাণ, শিল্প ও কৃষি বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, আবর্জনা ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। পানি সংকট দীর্ঘমেয়াদে সমাধান করতে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন একসঙ্গে চালাতে হবে।দেশব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, পদ্মা নদীতে দূষণ ১৮ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশ, যমুনা ১০ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশ, মেঘনা ১৫ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ, কর্ণফুলী ১২ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ২০১৫ সালে লবণাক্ততার মাত্রা ৫০০ সম/খ থেকে ২০২৩ সালে ১ হাজার ২০০ সম/খ এ উন্নীত হয়েছে। ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমছে এবং স্থানীয় কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।নদী পুনর্জীবন প্রকল্পের জন্য ২০১৫-২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের কার্যকারিতা কমে গেছে। কিছু এলাকায় আবর্জনা অপসারণ হয়নি, পানির গুণগত মান উন্নয়ন হয়নি।নদীর তীরে অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা নির্মাণ, মাটি কাটাকাটি, অবৈধ বালু উত্তোলন ও অব্যবস্থাপিত নিষ্কাষণ ব্যবস্থা দূষণকে আরও বাড়িয়েছে। এই কারণে নদীর পানির প্রবাহ কমছে, পানি জমে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও লবণাক্ততার কারণে পানি পানের মান কমছে এবং কৃষি ফসল ও মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, দেশের পানির সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন । প্রতিটি শিল্পকলা থেকে বর্জ্য পানি পরিশোধন বাধ্যতামূলক করা। নগরাঞ্চলের আবর্জনা পুনর্ব্যবহার ও সঠিক নিষ্কাশন নিশ্চিত করা। ভূগর্ভস্থ পানির নিয়ন্ত্রিত উত্তোলন এবং লবণাক্ততা কমাতে প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণ। নদীর তীর সংরক্ষণ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষামূলক প্রচারণা।এই পদক্ষেপগুলো দ্রুত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে আগামী দশকে দেশের পানির সংকট মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছাবে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং জনগণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এক সময়ের বিশুদ্ধ নদীগুলো পুনরায় সুস্থ ও স্বচ্ছ হতে পারবে না।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত