শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা বাজেট

৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা বাজেট

করোনা মহামারি না পেরোতেই অর্থনীতিকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বৈশ্বিক সংকট। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অর্থনীতি টালমাটাল। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশেও পড়েছে সেই প্রভাব। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আগামীকাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।

এবারের বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরে যা ছিল ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে নতুন বাজেটের আকার বাড়ছে ৭৪ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয়ের বিপরীতে অর্থের সংস্থান কম।

সরকার আয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। চলতি অর্থবছরের বাজেটের ৫৫ শতাংশ অর্থ জোগান দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে এনবিআরকে; সব মিলিয়ে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুন-মার্চ) মাত্র দুই লাখ চার হাজার কোটি টাকার শুল্ক-কর আদায় হয়েছে। অর্থাৎ ঘাটতি লাখো কোটি টাকার বেশি। এই ঘাটতি পূরণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল নিজেও বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তিনি চাপবোধ করছেন। তবে সবশ্রেণির মানুষ যাতে উপকৃত হন, সেভাবেই তিনি বাজেট প্রণয়ন করেছেন। ছোট-মাঝারি ও বড় শিল্প উদ্যোক্তা সবাই উপকৃত হবেন। নতুন বাজেটে মোট কর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরে যা ছিল তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। আর এনবিআরকে তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। চলতি বাজেট থেকে এটি ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি।

এনবিআরবহির্ভূত কর থেকে আদায় করা হবে ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং কর ছাড়া প্রাপ্তি খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তিন হাজার ২৭১ কোটি টাকা বিদেশি অনুদান পাওয়া যাবে বলে বাজেটে উল্লেখ থাকবে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রতি অর্থবছরেই বিশাল বাজেট দেওয়া হয়। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকে অযৌক্তিক। এগুলো বাস্তবতাবিবর্জিত টার্গেট। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ অসম্ভব হবে।

নতুন বাজেট ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, বাজেটে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মানুষের সুরক্ষা। এজন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতের কর্মসূচিগুলোর বরাদ্দ ও আওতা দুটোই বাড়াতে হবে।

আসন্ন বাজেটে ব্যাপক কর্মসৃজনের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্য ধরা হয়েছে বিনিয়োগের বড় লক্ষ্যমাত্রা। নতুন জিডিপির ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

এদিকে জিডিপি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে এই বাজেটে ঘাটতি (অনুদানসহ) হবে ২ লাখ ৪১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীর কাছে বড় অঙ্কের ঘাটতি পূরণ করাই চ্যালেঞ্জ হবে। ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণ করা হবে ৯৫ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। অন্যান্য খাত থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৫ হাজার ১ কোটি টাকা।

বাড়বে ব্যয় ও ঋণ : আয়ের অবস্থা যেমনই থাক, খরচ তো করতেই হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদব্যয় করতেই হবে। আগামী অর্থবছরে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদই দিতে হবে ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়নব্যয় তো আছেই। আয় তেমন নেই। তাহলে উপায়? ধার করে ঘাটতি পূরণ হবে। আগামী বাজেটে ঘাটতিই থাকবে দুই লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা, জিডিপির অংশ হিসেবে যা সাড়ে ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ছিল দুই লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারকে বেশি নির্ভর করতে হবে ব্যাংক খাতের ওপর। এই খাত থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ৬৮ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়া হবে ৩৮ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্য আছে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের ব্যাংকবহির্ভূত ঋণের মধ্যে শুধু সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরে যা রয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা।

কোথায় অর্থ ব্যয় করা হবে : আগামী অর্থবছরের বাজেটে পরিচালনব্যয় ধরা হয়েছে চার লাখ ১১ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সুদ দিতেই ব্যয় করতে হবে তিন লাখ ৭৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। এই সুদের মধ্যে আবার দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদব্যয় ৭৩ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। বিদেশি ঋণের সুদ গুনতে হবে সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদব্যয়ের জন্য ধরা রয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) : আগামী অর্থবছরের জন্য এডিপির আকার ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরে যা ছিল দুই লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে দুই লাখ ৯ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি : মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ। একদিকে যেমন বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের বেশি। মানুষকে চাল, ডাল, তেলসহ সব নিত্যপণ্যই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬.২৯ শতাংশ। মার্চ মাসে ছিল ৬.২৪ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ৬.১৭ শতাংশ। গত দুই বছরে এমন মূল্যস্ফীতি আর ওঠেনি। গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির বিপরীতে মজুরি বেড়েছে ৬.১৫ শতাংশ হারে। ফেব্রুয়ারি মাসেও মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬.০৩ শতাংশ। এর অর্থ, দৈনিক আয়ের মানুষ বাড়তি আয় দিয়ে বাজার থেকে আগের মতো পণ্য ও সেবা কিনতে পারছে না। কারণ মজুরি বা বেতন বাড়লেও মূল্যস্ফীতি তা খেয়ে ফেলছে। নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৫.৬ শতাংশ।

খুঁজুন