শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় বাজার ব্যবস্থাপনায় সংকটে সরকার

বাজার ব্যবস্থাপনায় সংকটে সরকার

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল আমদানিতে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নিয়মিত আমদানি সিডিউল বিপর্যয় এবং বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়ার ঝামেলার মধ্যে সরকারকে বাজারে তেলের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিতেও নানা পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। যদিও দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, তবুও পাম্পে অনিয়মিত সরবরাহ, মানুষের আতঙ্কিত কেনাকাটা ও অবৈধ মজুদপ্রবণতা বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে।

সরকার ইতোমধ্যে তেল বিপণন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তেলের লাইভ মনিটরিং, অবৈধ মজুদ রোধ ও কৃষকদের ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। এ সময়ে তিন লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার তেল মজুদদারদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ জানাচ্ছে, বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহে কোনো প্রকৃত সংকট নেই, তবে মানুষের সাশ্রয়ী ব্যবহার ও তেলের মজুদ কমানো এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের জ¦ালানি তেলের বিপণন ব্যবস্থা নিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি জানতে গতকাল বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা তিনটি তেল বিপণন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলামসহ  জ্বালানি বিভাগের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিতি এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদদারদের পাওয়া যাচ্ছে। তেলও উদ্ধার করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে জেল, জরিমানা, অর্থদণ্ড। মন্ত্রী তেল বিপণন কোম্পানি এমডিদের নির্দেশ দিয়েছেন আরও কঠোর হতে। সারাদেশের জ্বালানি তেলের হিসাব, ডিপোতে তেলের মজুদ, ডিলারদের কাছে বিক্রি, দিনশেষে মজুদ সব কিছুর লাইভ মনিটর করা হচ্ছে। এ ছাড়া যেসব পেট্রোলপাম্প, ডিলার, পিক পয়েন্ট ডিলার তেলের অবৈধ কারবারের সঙ্গে যুক্ত তাদের লাইসেন্স স্থগিত করা, ক্ষেত্রবিশেষে লাইসেন্স বাতিল করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া এমডিদের বলা হয়েছে, কৃষকদের ডিজেল সরবরাহে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নিতে।

জ্বালানি বিভাগের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তেলবাহী জাহাজগুলো আসছে। তাই জ্বালানি তেল নিয়ে এপ্রিল মাস পুরোপুরি নিরাপদে আছে সরকার। সচিবালয়ে সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী এ তথ্য জানান। জ্বালানি তেলের চাহিদা ও আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, ডিজেলের চাহিদা গড়ে বছরে প্রায় ৪৪ লাখ মেট্রিক টন। আর অকটেন ও পেট্রল এ দুটি আমাদের মাসে দরকার হয় প্রায় ৭০ হাজার টন। দৈনিক হিসাবে পেট্রল-অকটেন প্রায় এক হাজার ২০০ টন এবং ডিজেল এক হাজার ৪০০ টন লাগে।

যুগ্ম সচিব বলেন, ?আমরা হিসাব করে দেখেছি আমাদের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। কোনো সংকট নেই। ডিজেলের ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যা নেই। মাসভিত্তিক পরিকল্পনা অনুযায়ী আমদানি করছি। এপ্রিল মাস পুরোপুরি নিরাপদ। তিনি বলেন, ‘আজ সকালেও মিটিং করেছি। বর্তমান মজুদ এবং ইনকামিং শিপ সব অনটাইম আছে। ফলে কোনো অসুবিধা হবে না।

সংকট না থাকলেও পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না কেন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন একই উত্তর দিচ্ছি গত বছর যা সরবরাহ করেছি, এ বছরও তাই করছি। পাম্প মাঝে মাঝে বন্ধ থাকছে এটাও দেখছি। কিন্তু মানুষের মধ্যে এখনও প্যানিক বায়িং (আতঙ্কিত হয়ে কেনা) বন্ধ হয়নি। এর ফলে সরবরাহ চেইনে মাঝে মাঝে বিঘ্ন ঘটছে। মজুদ প্রবণতাও রয়েছে। তবে স্বাভাবিক সরবরাহে কোনো সংকট নেই।

মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, পাম্পে তেল না পাওয়ার বিষয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে। আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে।

রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির চিঠির অগ্রগতির বিষয় জানতে চাইলে মনির হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা জবাব পাইনি। অবৈধ মজুদ ও শাস্তির বিষয়ে কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রী ইতোমধ্যে কঠোরবার্তা দিয়েছেন। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। কোম্পানির কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এত অবৈধ মজুদ তেল উদ্ধার করা হলেও কোনো ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়নিÑ এ বিষয়ে তিনি বলেন, চার ধরনের ডিলারশিপ আছে। কোথা থেকে মজুদ হচ্ছে, সেটা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন।

সারাদেশে বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা ডিজেল পাচ্ছেন না এ অভিযোগের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব বলেন,  তিন তেল বিপণন কোম্পানির এমডিকে নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন এবং আমি সকালবেলা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সভা করেছি। আমাদের ক্লিয়ার ইন্সট্রাকশন হচ্ছে কৃষকদের সার ও ডিজেলপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমি জেলা প্রশাসকদের একজন একজন করে জিজ্ঞেস করেছি। নির্দেশনাটা এ রকম যে কোনো ব্লক সুপারভাইজার যেটাকে এখন ইউনিয়ন কৃষি সহকারী কর্মকর্তা বলে। তাদের কাছে কৃষকের তালিকা থাকে। বলা হয়েছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কোনো প্রত্যয়ন নিয়ে যে কৃষক ডিজেল চাইবে, তাকে যেন এটা দেওয়া হয়।

ভিআইপিদের পেট্রলপাম্পগুলোয় সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র বলেন, বিষয়টা আমার জানা নেই। তবে এ রকম কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।

জ্বালানি সংকট না থাকলেও এই মুহূর্তে সবার জায়গা থেকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন মনির হোসেন চৌধুরী।

এদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে সরকার বেশ আর্থিক চাপে রয়েছে। কয়লা, এলএনজি, এলপিজি, পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত জ¦ালানি তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি আমদানিনির্ভর। আমদানিনির্ভর দেশ আর্থিক এবং আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এক হিসাবে বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর ১০ মাসে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয় দামের মধ্যে যে পার্থক্য সে কারণে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির মধ্যে পড়বে। সেই হিসাবও স্থির থাকবে না যদি ডলারের দাম বাড়ে বা জ্বালানি পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধের কারণে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিক হিসাবের চেয়ে আগামী তিন মাসে এলএনজি আমদানি করতে অতিরিক্ত খরচ বাড়বে ২০ হাজার কোটি টাকা। যদি এলএনজির দাম আরও বাড়ে সেই খরচ বা ভর্তুকির হিসাব আরও বাড়বে। অর্থাৎ এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানি করতে এক গভীর সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশ।

যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়তির দিকে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম ১১২ ডলারের বেশি। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দামও অনেক বেড়ে গেছে স্পট মার্কেটে। গত এক মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩১ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশে।

সরকারের এক মাসের অভিযান এদিকে সারাদেশে গত এক মাসে চার হাজার ৮২৪টি অভিযান চালিয়ে অবৈধ মজুদ করা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। তিনি বলেন, সরকারের কাছে বর্তমানে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন সরবরাহযোগ্য ডিজেল মজুদ আছে। সারাদেশে কৃষকদের মাঝে ডিজেল প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মজুদের প্রবণতা পরিহার করলে জ্বালানির কোনো সংকট থাকবে না বলেও জানান মনির হোসেন চৌধুরী। সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আনতে ও অবৈধ মজুদরোধে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং ড্যাশ বোর্ড চালুকরাসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

খুঁজুন