শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল: স্বাস্থ্য খাতে নীরব সংকট

বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল: স্বাস্থ্য খাতে নীরব সংকট

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত গত দুই দশকে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে।গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত হয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা পৌঁছেছে। মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, টেলিমেডিসিন ও ই-হেলথ চালুর ফলে সেবা গ্রহণ সহজ হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবার পরিধি বেড়েছে। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সচেতনতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে।কিন্তু এই উন্নয়নের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত নীরবে অবহেলিত থেকে গেছে—তা হলো পুনর্বাসন (Rehabilitation) খাত। দৃষ্টিহীনতা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, স্নায়বিক সমস্যা, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা কিংবা দুর্ঘটনাজনিত অক্ষমতা, এসব সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পুনর্বাসন ছাড়া সম্ভব নয়। অথচ এই খাতের জন্য যে রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল থাকা জরুরি, তা এখনো কার্যকরভাবে চালু হয়নি।

প্রতিদিনেরবাস্তবতা: হাসপাতালথেকেগ্রামবাংলা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (নিটোর), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কিংবা বিভাগীয় মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রতিদিন হাজারো রোগী পুনর্বাসনসেবার প্রয়োজন নিয়ে আসেন। স্ট্রোকের পর হাঁটতে না পারা রোগী, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত যুবক, জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভোগা শিশু কিংবা ডায়াবেটিসজনিত দৃষ্টিহীনতায় আক্রান্ত বৃদ্ধ—সবার ক্ষেত্রেই পুনর্বাসন অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই রোগীদের সেবা দেওয়া পেশাজীবীদের একটি বড় অংশ কোনো জাতীয় নিবন্ধন বা নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বাইরে কাজ করছেন। কোথাও মানসম্মত সেবা মিলছে, কোথাও মিলছে না। রোগী বুঝতেই পারছেন না—কে যোগ্য, কে অযোগ্য।

অপ্টোমেট্রিওদৃষ্টিহীনতারবাংলাদেশিচিত্র

বাংলাদেশে দৃষ্টিজনিত সমস্যার পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। গ্রামাঞ্চলে এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক অচিকিৎসিত রিফ্র্যাকটিভ এরর নিয়ে পড়াশোনা ও কাজ করছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, স্কুলগামী শিশুদের একটি বড় অংশ শুধুমাত্র চশমার অভাবে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে। অপ্টোমেট্রিস্টরা এই সমস্যার প্রথম সারির সমাধানকারী। তারা চোখের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা, শিশুদের দৃষ্টি মূল্যায়ন, লো ভিশন রিহ্যাবিলিটেশন, কনট্যাক্ট লেন্স ও ভিশন থেরাপির মাধ্যমে লক্ষ মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারেন।কিন্তু বাংলাদেশে অপ্টোমেট্রির বাস্তবতা হলো— একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে প্রতিবছর গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, অন্যদিকে কোনো কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্সিং বা স্কোপ অব প্র্যাকটিস নির্ধারিত নেই।ফলে অনেক ক্ষেত্রে অপেশাদার ব্যক্তি চোখের চিকিৎসা বা পাওয়ার পরীক্ষা করে রোগীর ক্ষতি করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে অন্ধত্বের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

কাউন্সিলনাথাকায়শিক্ষাওমানেরসংকট

বাংলাদেশে বর্তমানে পুনর্বাসন-সংক্রান্ত একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল না থাকায়,পাঠ্যক্রমে ব্যাপক ভিন্নতা, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সময় ও মানে অসামঞ্জস্য, শিক্ষক যোগ্যতার মান নির্ধারণের অভাব, এই সমস্যাগুলো শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিকভাবে অনেক বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট বিদেশে কাজ বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে স্বীকৃতি সংকটে পড়ছেন, কারণ দেশের কোনো শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই।

রিহ্যাবিলিটেশনকাউন্সিলকেনএখনজরুরি

রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল চালু হলে বাংলাদেশ সরাসরি কয়েকটি বড় সুবিধা পাবে, প্রথমত, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। লাইসেন্স ও নিবন্ধনের মাধ্যমে অযোগ্য চর্চা বন্ধ করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় মানদণ্ড তৈরি হবে, যা শিক্ষা ও সেবার গুণগত মান বাড়াবে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য জনবল পরিকল্পনা সহজ হবে, কতজন ফিজিওথেরাপিস্ট, অপ্টোমেট্রিস্ট বা স্পিচ থেরাপিস্ট কোথায় দরকার, তা নির্ধারণ করা যাবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পুনর্বাসন পেশাজীবীদের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা বাড়বে।

জাতীয়উন্নয়নওসামাজিকন্যায়বিচার

পুনর্বাসন শুধু চিকিৎসা নয়, এটি মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, কর্মক্ষম মানুষের কর্মজীবনে ফেরা, বয়স্কদের স্বনির্ভরতা—সবকিছুই পুনর্বাসনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভিশন রিহ্যাবিলিটেশন সময়মতো না হলে একটি শিশু আজীবন শিক্ষাবঞ্চিত হতে পারে। একটি কর্মক্ষম মানুষ অন্ধত্বের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়তে পারে। এসব ক্ষতি শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো রাষ্ট্রের।

আর দেরি নয়, বাংলাদেশে রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল গঠনের আইনি ভিত্তি ইতোমধ্যে বিদ্যমান। এখন দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা। অপ্টোমেট্রিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচ ও অকুপেশনাল থেরাপিস্টরা কেবল নিজেদের স্বার্থে নয়—রোগী, সমাজ ও জাতির স্বার্থেই এই কাউন্সিল চান। বাংলাদেশ আর পুনর্বাসন খাতকে উপেক্ষা করতে পারে না। রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল এখন সময়ের দাবি, এটি বিলম্বিত হলে ক্ষতি শুধু বাড়তেই থাকবে।

ড. মোহাম্মদমিজানুররহমান :
অ্যাডজান্ট সহযোগী  অধ্যাপক ,ইত্তেহাত কলেজ অফ হেল্‌থ সাইন্স , দিনাজপুর। 
সহকারী অধ্যাপক, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এম,এস ইউ), মালয়েশিয়া

খুঁজুন