শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বাংলাদেশের অপ্টোমেট্রিস্টদের ভূমিকা ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাত

বাংলাদেশের অপ্টোমেট্রিস্টদের ভূমিকা ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাত

বিশ্ব দৃষ্টি দিবস (World Sight Day) প্রতিবছর অক্টোবর মাসে পালিত হয়। এ দিনটিকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে চোখের যত্ন, দৃষ্টিশক্তি রক্ষা এবং অন্ধত্ব প্রতিরোধের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। ২০২৫ সালের বিশ্ব দৃষ্টি দিবসের প্রতিপাদ্য আমাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখনো পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ প্রতিরোধযোগ্য বা চিকিৎসাযোগ্য দৃষ্টি সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। অথচ সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত ও আইনগতভাবে স্বীকৃত অপ্টোমেট্রিস্টরা এই সমস্যার বড় অংশ সমাধান করতে পারেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে এখনো অপ্টোমেট্রিস্টদের পূর্ণাঙ্গ আইনি স্বীকৃতি নেই। তাই আজকের এই দিনে আমাদের ভাবতে হবে—কীভাবে অপ্টোমেট্রিস্টদের সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো দৃষ্টি সমস্যায় আক্রান্ত। এর মধ্যে অন্তত ১০০ কোটির বেশি মানুষের সমস্যা প্রতিরোধযোগ্য বা চিকিৎসাযোগ্য ছিল। সবচেয়ে বড় কারণ হলো অসংশোধিত রিফ্র্যাকটিভ এরর, অর্থাৎ কাছের বা দূরের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া। এর বাইরে ছানি, গ্লুকোমা, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, বয়সজনিত চোখের রোগও ব্যাপক হারে দেখা যায়। বাস্তবে দেখা গেছে, দৃষ্টিশক্তি হারানোর এই অধিকাংশ কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে সহজেই চিকিৎসা সম্ভব। আর এই কাজের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন অপ্টোমেট্রিস্টরা। তারা প্রাথমিক চক্ষু সেবার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য—চোখ পরীক্ষা করা, রিফ্র্যাকশন বা চশমার পাওয়ার নির্ধারণ, কন্টাক্ট লেন্স প্রদান, শিশুদের দৃষ্টি সমস্যা শনাক্তকরণ, স্ক্রিনিং করা, রোগীকে বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করা—সবই তাদের দক্ষতার মধ্যে পড়ে। তাই অনেক দেশেই অপ্টোমেট্রিস্টরা চোখের যত্নের প্রথম ধাপের প্রধান কর্মী হিসেবে কাজ করেন।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, যেসব দেশ অপ্টোমেট্রিস্টদের আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করেছে, তারা দৃষ্টি সমস্যার বোঝা অনেকটা কমিয়ে আনতে পেরেছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতে অপ্টোমেট্রিস্টরা প্রাথমিক চক্ষু সেবার মূল ভরসা। রোগীরা প্রথমে অপ্টোমেট্রিস্টের কাছে যান, প্রয়োজন হলে তিনি বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করেন। ফলে অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে না বিশেষজ্ঞদের ওপর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও অপ্টোমেট্রি একটি স্বীকৃত পেশা। সেখানে সরকারিভাবে লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, প্রশিক্ষণ ও কার্যপরিধি নির্ধারিত। এর সুফল জনগণ পাচ্ছে নিরাপদ ও মানসম্মত চক্ষু সেবার মাধ্যমে। ভারতে ও নেপালে গঠন করা হয়েছে  National Health Professional Council (NHPC) যাতে শিক্ষা, লাইসেন্স ও কার্যপরিধি একক কাঠামোর মধ্যে আনা যায়। এসব দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সঠিক কাঠামো থাকলে অপ্টোমেট্রিস্টরা জাতীয় পর্যায়ে দৃষ্টি সমস্যার বড় অংশ সমাধান করতে পারেন।

বাংলাদেশে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটির বেশি হলেও প্রশিক্ষিত অপ্টোমেট্রিস্টের সংখ্যা মাত্র ৭০০ জনের মতো। এই সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় অতি নগণ্য। এর মধ্যে অনেকেই আবার বেসরকারি খাত বা এনজিও-ভিত্তিক প্রোগ্রামে কাজ করছেন। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তাদের তেমন সুযোগ নেই। কারণ এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে অপ্টোমেট্রিস্টদের সরকারিভাবে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। নেই লাইসেন্সিং বা নিবন্ধন প্রক্রিয়া। ফলে একজন ব্যক্তি কোথায় কাজ করতে পারবেন, কতদূর পর্যন্ত রোগীর সেবা দিতে পারবেন, তা স্পষ্ট নয়। শিক্ষা ব্যবস্থাও একরকম অগোছালো। চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের  অনুমোদনপ্রাপ্ত কমিউনিটি অপথ্যালমোলজি ইনস্টিটিউট, সুরু করেছে ২০১০ সাল থেকে এবং রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত কিছু প্রাইভেট মেডিকেল ইনস্টিটিউট সম্প্রতি চালু করেছে বি.অপ্টম (Bachelor of Optometry) প্রফেসনাল প্রগ্রামটি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়নি, শিক্ষক সংকট রয়েছে, অবকাঠামো দুর্বল, নতুন ইনস্টিটিউট গুলো নেই ক্লিনিক্যাল ট্রেনিং ফেসেলেটি।

তবুও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ অপ্টোমেট্রিক সোসাইটি (BOS) ২০০৯ সাল থেকে পেশার উন্নয়ন ও স্বীকৃতির জন্য কাজ করছে। তারা সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে বিভিন্ন সময়ে দাবি তুলেছে। এনজিও খাতে কিছু ভালো উদাহরণও তৈরি হয়েছে। যেমন, পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মাঝে রিডিং গ্লাসেস বা চশমা সরবরাহ করার উদ্যোগ। এতে দেখা গেছে, শ্রমিকদের কাজের মান ও উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ যে, দৃষ্টি সমস্যার সমাধান সরাসরি অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে জড়িত।

এখন প্রশ্ন হলো, কেন বাংলাদেশে অপ্টোমেট্রিস্টদের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি? প্রথমত, দেশে দৃষ্টি সমস্যার চাহিদা বিপুল। WHO এর মতে, বিশ্বব্যাপী যেসব দৃষ্টি সমস্যা আছে, তার অন্তত অর্ধেক প্রতিরোধযোগ্য। বাংলাদেশে এত কম সংখ্যক প্রশিক্ষিত কর্মী থাকায় বিশাল জনগোষ্ঠী অচিকিৎসিত থেকে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, খরচের দিক থেকে অপ্টোমেট্রিস্টরা অত্যন্ত কার্যকর। তারা স্বল্প ব্যয়ে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় চোখ পরীক্ষা ও চশমা প্রেসক্রিপশন দিতে পারেন। তৃতীয়ত, এতে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের ওপর চাপ কমবে। বর্তমানে অনেক রোগী সরাসরি চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যান, অথচ তাদের সমস্যা সহজেই অপ্টোমেট্রিস্টরা সমাধান করতে পারতেন। ফলে বিশেষজ্ঞরা জটিল সার্জারি ও উন্নত চিকিৎসায় বেশি সময় দিতে পারবেন। চতুর্থত, আইনি স্বীকৃতি মানে মান নিয়ন্ত্রণ। এখন অনেকে প্রশিক্ষণ ছাড়াই চোখের চিকিৎসার নামে ব্যবসা করছেন। এতে রোগীর ক্ষতি হচ্ছে। যদি আইন করা হয়, তবে সবার জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক হবে, কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ মানসম্মত হবে, এবং নিয়মিত তদারকি চালু হবে। পঞ্চমত, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। WHO-এর World Report on Vision (2020)-এ বলা হয়েছে, প্রতিটি দেশকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে চোখের যত্নকে যুক্ত করতে হবে। অপ্টোমেট্রিস্টদের স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশ এই লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাবে। আর ষষ্ঠত, এর সামাজিক-অর্থনৈতিক সুফল অপরিসীম। শিশুরা ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারবে, শ্রমিকরা উৎপাদনশীল হবে, প্রবীণরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে। যেমন, ভারতে অপ্টোমেট্রি কাউন্সিল গঠন করে শিক্ষা ও লাইসেন্স কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে অপ্টোমেট্রিস্টদের সরকারি নিবন্ধন ও নির্দিষ্ট কার্যপরিধি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে তারা প্রাথমিক চক্ষু সেবার চালিকাশক্তি। এসব দেশেই দেখা গেছে, অপ্টোমেট্রিস্টদের কার্যকর ভূমিকা থাকলে দৃষ্টি সমস্যার বোঝা অনেকটা কমে যায়।

বাংলাদেশে এখন সময় এসেছে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার। প্রথমত, আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে। এজন্য একটি আইন বা বিধিমালা প্রণয়ন করে অপ্টোমেট্রিস্টদের নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং বোর্ড গঠন করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা মান উন্নয়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বি.অপ্টম কোর্স চালু রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক, অবকাঠামো, ল্যাবরেটরি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, স্নাতক শেষে লাইসেন্স পরীক্ষা চালু করতে হবে এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ (Continuing Professional Education) বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অপ্টোমেট্রিস্ট নিয়োগ দিতে হবে, হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রসবখানেই। পঞ্চমত, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে জনগণ বুঝতে পারে অপ্টোমেট্রিস্ট কী ধরনের সেবা দেন।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের জন্য এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষা, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, সব ক্ষেত্রেই এর সুফল আসবে। বিশ্বের অনেক দেশ যেখানে অপ্টোমেট্রিস্টদের ওপর ভরসা করে দৃষ্টি সমস্যার সমাধান করছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন?

সর্বশেষে বলা যায়, বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ২০২৫ আমাদের জন্য এক বড় সুযোগ। এ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দৃষ্টি কোনো বিলাসিতা নয়—এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশ যদি এখনই অপ্টোমেট্রিস্টদের স্বীকৃতি দেয় এবং জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একীভূত করে, তবে কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। শিশুরা পরিষ্কার চোখে পড়াশোনা করতে পারবে, শ্রমিকরা আরও দক্ষভাবে কাজ করতে পারবে, প্রবীণরা সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবে। দৃষ্টি হারানো মানুষ কমবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তাই আমাদের সবার অঙ্গীকার হোক—“দৃষ্টি সবার অধিকার, কারো জন্য বিলাসিতা নয়।”

ডা. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক এবং রিসার্চ ফেলো
ম্যানেজমেন্ট এন্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া

খুঁজুন