এক যুগ পেরিয়ে গেছে নিমতলী ট্র্যাজেডির। তবু ঢাকার মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে ওঠা কেমিক্যাল গোডাউন সরেনি। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলীতে কেমিক্যাল গোডাউনে সংঘটিত দুর্ঘটনায় বহু হতাহতসহ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধসহ আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যাল কারখানা-গোডাউন সরাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ‘বিসিক কেমিক্যালপল্লী’ গড়ার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরে বৃহৎ পরিসরে ও অধিক উপযোগী স্থান হিসেবে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলা নির্ধারণ করে ১ম সংশোধন আনা হয়।
জুলাই ২০১৮ থেকে শুরু হয়ে জুন ২০২২ পর্যন্ত ৫ বছরে প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ৪৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। এখন আবার ভূমি অধিগ্রহণে ১১০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে জমির কাজ সম্পন্ন করতে প্রকল্প মেয়াদ এক বছর অর্থাৎ জুন ২০২৩ পর্যন্ত বৃদ্ধি বাস্তবসম্মত কি না—এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, অনুমোদিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) অনুসারে ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রম প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বন্যার সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত মাটি ভরাট করে সব পূর্ত কাজ সম্পন্ন করতে আরো দেড় বছর লাগবে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ জুন ২০২৪ পর্যন্ত হলে ভালো হয়।
প্রকল্প এলাকায় বন্যার পানির সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত মাটি ভরাট, লেক খনন ইত্যাদি কাজের জন্য প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে। জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত সময়ে ব্যয় ৬৫৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং এর বাস্তব অগ্রগতি ৪৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। তবে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেছেন, মুন্সীগঞ্জ জেলায় বিসিক কেমিক্যাল শিল্পপার্ক, বিসিক মুদ্রণ শিল্পপার্ক, বিসিক হালকা প্রকৌকল ও বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন শিল্পপার্ক, বিসিক প্লাস্টিক শিল্পপার্ক বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিসিক এপিআই শিল্পপার্ক বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে মুন্সীগঞ্জ জেলা মাল্টিসেক্টরাল শিল্প হাব হিসেবে গড়ে উঠবে।
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ১ম সংশোধিত প্রকল্পটি জুন ২০২২ সালে শেষ হওয়া জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পর প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে এসেছে। প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াকরণ-সংক্রান্ত পরিপত্র অনুসারে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে তিন মাস আগে সংশোধন প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা প্রতিপালন করা হয়নি।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ভূমি উন্নয়নব্যয় ১৩০ কোটি ১৭ লাখ টাকা টাকা থেকে ১১০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে ২৪০ কোটি ৩০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অত্যাধুনিক বলে মনে হয়েছে।
সময়-ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রকল্পের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ছে। সময় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন। ঢাকা বিভাগের কেরানীগঞ্জের পরিবর্তে এখন মুন্সীগঞ্জে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
ভূমি উন্নয়ন খাতে বিপুল পরিমাণ ব্যয়বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক জানান, মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে ১০ ফুট পর্যন্ত মাটি ভরাটের সংস্থান ছিল। কিন্তু পরে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে যে ভূমি বরাদ্দ পাওয়া গেছে তা নিচু জমি। ভূমি উন্নয়নের জন্য বন্যার পানির সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত গড়ে ১৭ ফুট পর্যন্ত মাটি ভরাটের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যে কারণে জমি অধিগ্রহণ ব্যয় বাড়ছে। ফ্ল্যাড লেভেল হাই করা হচ্ছে। যাতে প্রকল্প এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ না করে।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্প এলাকাটি দুটি নদী ধলেশ্বরী ও ইছামতীর মিলনস্থলে অবস্থিত। এমন একটি স্থানে কেমিক্যালপল্লী স্থাপনে অবশ্যই পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হবে। এ ছাড়া নদীতীর থেকে অন্তত ১০০ ফুট জায়গা ছেড়ে দিয়ে কেমিক্যালপল্লীর বাউন্ডারি নির্মাণ এবং সে আলোকে লে-আউটপ্ল্যান সংশোধন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রকল্প এলাকায় কেমিক্যাল শিল্প ও গোডাউন উভয় ধরনের স্থাপনাই থাকবে।
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্প এলাকায় যে সাততলা অফিস ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানেই মেডিকেল সেন্টার ও নামাজ পড়ার স্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে আলাদা করে মেডিকেল সেন্টার ও মসজিদ নির্মাণ প্রয়োজন হবে না এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয় হবে।