শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সিলেট নগরী

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সিলেট নগরী

থেমে থেমে পানি বেড়ে সিলেটের বেশির ভাগ এলাকাই এখন ভাসছে বন্যার পানিতে। উজানে বৃষ্টি না থামলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে এমনটা আশঙ্কা করা হচ্ছে খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে। জেলা প্রশাসনের হিসেবে সিলেটের ছয়টি উপজেলা বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি উঠে গেছে নগরের বেশির ভাগ এলাকায়। পানির তোরে ভেঙে যাচ্ছে নদীরক্ষা বাঁধ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, সিলেটের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে গত পাঁচ দিনে ১২৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে সিলেটেও। ফলে দ্রুত বাড়ছে নদনদীর পানি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়া সংস্থাগুলোর গাণিতিক মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের আসাম, মেঘালয়, হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মিজোরাম প্রদেশের কয়েকটি স্থানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে সুরমা, কুশিয়ারা, ভোগাই কংস, ধনু-বাউলাই, খোয়াই, মুহুরী নদীর পানি কয়েকটি পয়েন্টে সময় বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
কুশিয়ারা নদীর অমলশীদ পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ১১০ থেকে বেড়ে এখন ১৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। একই নদীর শেওলা পয়েন্টের পানি ১৯ থেকে বেড়ে ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এ দিকে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টের পানি ১২৮ থেকে বেড়ে ১৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এ ছাড়া এই নদীর আরো দু’টি পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ওপরে উঠেছে। এই নদীর সিলেট পয়েন্টের পানি ২৯ এবং সুনামগঞ্জ পয়েন্টের পানি ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে পানি।

বৃষ্টিপাতের বিষয়ে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সুনামগঞ্জের ছাতকে ১৮৭ মিলিমিটার। যা গত সোমবার ছিল সিলেটের জাফলংয়ে ২২৬ মিলিমিটার। এ ছাড়া সিলেটে ৭২, সিলেটের লালাখালে ১৭৫, কানাইঘাটে ৭০, শেওলা ১২৭, জকিগঞ্জে ১১৯, জাফলং ১৬৭ এবং লাটুতে ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অন্য দিকে সুনামগঞ্জে ১০২, সুনামগঞ্জে লরেরগড়ে ১০০, মহেশখোলাতে ৬১, কুড়িগ্রামে ৫৯ এবং নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে ৯৫ এবং নেত্রকোনার জারিয়াজঞ্জালে ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

এ দিকে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে গতকাল ৩৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা গত সোমবার ছিল ৪২৪ মিলিমিটার। এ ছাড়া আসামের গোয়ালপাড়ায় ৫৮, তেজপুরে ৪৮, দিব্রগড়ে ৫১, শিলচরে ১১০, ধুব্রি ৬১, অরুণাচলের পাসিঘাটে ৭০, মেঘালয়ের শিলংয়ে ৬১ এবং সিকিমের গ্যাংটকে ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি পানির সঙ্কুুলান হচ্ছে না সুরমার বুকে। বিপদসীমা অতিক্রম করে সুরমার পানিতে নগরের ছড়াখাল ভরে গিয়ে রাস্তাঘাট ডুবছে। সময় যত যাচ্ছে, ততই জোয়ারের মতো বৃদ্ধি পাচ্ছে পানি। বাসাবাড়ি, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ছে। অনেকের বাসায় হাঁটুসমান পানি। মঙ্গলবার নগরের এমন অবস্থা অধিকাংশ এলাকার দেখা যায়। আর যদি কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হয় তলিয়ে যাবে পুরো সিলেট নগর।

মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি সিলেট ও কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার প্রায় দেড় সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা আগের দিনের চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া বেড়েছে কুশিয়ারা নদীর পানিও। এমন পরিস্থিতিতে বন্যাকবলিতদের জন্য নগরের কিশোরী মোহন ও মাছিমপুর বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুর আজিজুর রহমান।

সরেজমিন দেখা যায়, জলাবদ্ধতা সৃষ্ট এলাকাগুলো নগরের উপশহর, মাছিমপুর, ছড়ারপার, যতরপুর, সোবহানিঘাট, কালীঘাট, শেখঘাট, তালতলা, পাঠানটুলা, লন্ডনী রোড, সাগরদিঘির পার, সুবিদবাজার, শিবগঞ্জ, মেজরটিলা, মদিনা মার্কেট, দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর রোড, ভার্তখলা, মোমিনখলা, পিরোজপুর, আলমপুর ও ঝালোপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকছে। অব্যাহত পানিবৃদ্ধির কারণে সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মানুষের রাত কেটেছে নির্ঘুুম। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় মানুষের ভোগান্তির যেন কোনো শেষ নেই।

গতকাল দুপুরে নগরের উপশহর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অভিজাত এই আবাসিক এলাকার প্রধান সড়কে হাঁটুর উপরে পানি। পানি ঢুকে পড়েছে আশপাশের দোকানপাট ও এলাকার বাসাবাড়িতেও। গলির সড়কে কোমরপানি। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ওই এলাকার বাসিন্দা রোম্মান আহমদ বলেন, প্রতি মিনিটে পানি বাড়ছে। এত দ্রুত পানি বাড়তে আগে দেখিনি। আমাদের ঘরের নিচতলা তলিয়ে গেছে। আমরা দোতলায় আশ্রয় নিয়েছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উপসহকারী প্রকৌশলী নিলয় পাশা বলেন, উজানে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এই বিষয়টা আতঙ্কের। এই সময়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো: মজিবর রহমান বলেন, বন্যার্তদের মধ্যে খাদ্যসহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রথয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকবেলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি।



খুঁজুন