প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয় শিল্প মন্ত্রাণলয়ের
অধীন একটি কারিগরি দফতর। এ দফতরের প্রধান কর্মকর্তা প্রধান বয়লার পরিদর্শক। দুর্নীতি
ও অনিয়মের মাধ্যমে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌ. মোহাম্মদ
আব্দুল মান্নান। ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি ও সচিবদের প্রভাব
খাটিয়ে ১৫ বছরে প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান সরকারি দফতরকে নিজের
পৈতৃক সম্পত্তি ভেবে লুটপাট, বদলী বাণিজ্য, বয়লার নির্মাণে অনিয়ম, ঘুষ নিয়ে বয়লারের
নিবন্ধন প্রদান, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে আর্থিক দুর্নীতি, অবৈধভাবে বয়লার অপারেটরের
সনদ প্রদানে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তিনি স্বেচ্ছাচারীতার মাধ্যমে
একদিকে যেমন বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছে, অন্যদিকে কার্যালয়টিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে
নিয়ে যাচ্ছেন।
কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে
ঘুষ-বাণিজ্য ও কমিশন-বাণিজ্যে হয়েছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের
মন্ত্রী, এমপি ও সচিবদের প্রভাবে ছিলেন বেপরোয়া। বয়লার অনুমোদনে নিজের ভাগিনার
প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নানা অনিয়ম ও আর্থিক খাত থেকে কমিশন নিয়ে হয়েছেন কোটি কোটি
টাকার মালিক। গড়ে তুলেছেন কয়েক কোটি টাকা মূল্যের বহুতল ভবন ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট,
কিনেছেন গাড়ি ও শত বিঘা জমি।
প্রধান
বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সরকারের
বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
অভিযোগগুলোর
মধ্যে একটি অভিযোগ জিআরএস তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে
বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। জানা গেছে, এরই মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের
অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. নূরুজ্জামান এনডিসিকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি
করা হয়েছে।
খোঁজ
নিয়ে জানা যায়, ২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সহায়তায় ঘুষের
মাধ্যমে আবদুল মান্নান প্রধান বয়লার পরিদর্শক পদটি হাতিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, তার
মামাশ্বশুর আওয়ামী লীগের সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিম, চাচাশ্বশুর আওয়ামী
লীগপন্থি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ইকবাল আর্সলানের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ হন
সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর। এ প্রভাবশালী মন্ত্রীকে ম্যানেজ করে ঘুষ দিয়ে
এ পদে নিয়োগ পান মান্নান। এরপর তিনি বয়লারের বিভিন্ন সেক্টর থেকে কোটি কোটি টাকা
বাণিজ্য করেন। নিজ ভাগ্নের নামে প্রতিষ্ঠান ‘টেকনো কেয়ার’
এর মাধ্যমে বাধ্যতামূলক ডিজাইন করানো হতো। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে ঘুষ দিয়ে এসব
ইন্ডাস্ট্রিয়াল বয়লারের অনুমোদন মিলত। টেকনো কেয়ারের বাইরের কোন প্রতিষ্ঠান থেকে
ডিজাইন করালে সেটির অনুমোদন মিলত না।
সূত্র
বলছে, মান্নান কার্যালয়ে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে বয়লার নির্মাণ, বয়লার নিবন্ধন,
কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও বয়লার অপারেটর সনদ প্রদানে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির
মাধ্যমে বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এছাড়া প্রতি বছর ছোট, বড় মিলিয়ে স্থানীয়ভাবে
প্রধান বয়লার পরিদর্শকের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩০০টি বয়লার তৈরি হয়।
ইন্ডাস্ট্রিয়ালের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ডিজাইনে ঘুষ বাবদ ১-৩ লাখ টাকা, ডিজাইন ও তা
অনুমোদন বাবদ ৮ স্তরের প্রতি স্তরে ১৫-২৫ হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হতো। এ টাকা
সরাসরি প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের কাছে দিতে হতো।
ডিজাইন-ড্রইং অনুমোদকালীন মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে প্রতিবার ৬০-৭৫ হাজার টাকা নাশতার
বিল নিয়ে অনুমোদন দিতেন এ প্রকৌশলী।
সংশ্লিষ্ট
সূত্র জানান, প্রধান বয়লার পরিদর্শক হওয়ার পর থেকে কৌশলে বয়লার অপারেটরদের সনদ
দিতে নিজের নিকটাত্মীয় ও নিজ জেলা রাজবাড়ীর লোকজন নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন
আবদুল মান্নান। এ সিন্ডিকেটে তার ভাগিনা প্রথম শ্রেণির বয়লার অপারেটর মোহাম্মদ
শরীফ হোসেন ও অন্যজন প্রথম শ্রেণির বয়লার অপারেটর ইমন হাসানের মাধ্যমে নামমাত্র
পরীক্ষায় প্রার্থীদের সনদ দেওয়া হতো।
বাণিজ্যিক
অডিট অধিদপ্তর ও দুদকে জমা অভিযোগ বলছে, প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের
স্মারক নং-৩৬.১১.০০০০.০০১.১১.০০৪.১৯.১৩৯৪৫ তারিখঃ ২৬/০৬/২০১৯ খ্রি.-এর মাধ্যমে
অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে ০১ জন ও বয়লার টেকনিশিয়ান পদে ০২ জনের
নিয়োগের নিমিত্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের নিয়োগ
বিধিমালা-২০১২-এর তফসিল (০৭নং) এ উল্লিখিত শর্ত মোতাবেক বয়লার টেকনিশিয়ান পদের
জন্য ‘কোন স্বীকৃত বোর্ড থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের সার্টিফিকেটসহ
সরকার অনুমোদিত কোনো ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিটিউট হইতে মেকানিক্যাল বা পাওয়ার ট্রেড
কোর্স সম্পন্ন করা সার্টিফিকেট’ থাকা বাধ্যতামূলক। তবে শর্ত না মেনে
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মো. শরাফত আলী যথাযথ জেলা কোটা
অনুসরণ না করে, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষের বিনিময়ে বয়লার টেকনিশিয়ান পদে ১৫ জনকে নিয়োগ
দেন। বয়লার টেকনিশিয়ান পদে অধিকাংশ নিয়োগপ্রাপ্তদের দাখিলকৃত ভোকেশনাল ট্রেনিং
ইনস্টিটিউট থেকে মেকানিক্যাল বা পাওয়ার ট্রেড কোর্স সম্পন্ন করা সার্টিফিকেট জাল
এবং সার্টিফিকেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।
জানা
গেছে, নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মো. শরাফত আলীর আপন ভাগিনা এলিস হাসনাইন তালুকদার,
আপন চাচাতো বোনের ছেলে তারিকুল ইসলাম, আপন চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মো. ইকবাল হোসেনকে
নিয়োগ দেন। এছাড়া মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও মো. শরাফত আলী ঘুষের বিনিময়ে আরো নিয়োগ
দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি টাকার বিনিময়ে মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের গ্রামের
বাড়ির কাজের লোককে নিয়োগ দিয়েছেন বয়লার টেকনিশিয়ান পদে।
দুদকের
তালিকায় দেখা যায়, এলিস হাসনাইন তালুকদার, তারিকুল ইসলাম ও মো. ইকবাল হোসেন একই
ডাকঘরের বাসিন্দা। নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মো. শরাফত আলী উপপ্রধান বয়লার
পরিদর্শকের স্থায়ী ঠিকানা ও নিয়োগকৃত প্রার্থীদের স্থায়ী ঠিকানা প্রায় একই। মো.
জাহিদ হাসান ও বিজয় কুমার হালদার প্রধান বয়লার পরিদর্শকের নিজ জেলা রাজবাড়ীর
বাসিন্দা এবং তাদের সবার স্থায়ী ঠিকানা প্রায় একই।
প্রধান
বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের কার্যক্রমের গত ২০২২ সালে বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর
নিরীক্ষাদল নং-০৪ অডিট সম্পাদন করেন। নিরীক্ষাদল নিয়োগ পদোন্নতির ফাইল যাচাই করতে
চাইলে সংবিধানের ১২৮(১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত নথি
নিরীক্ষায় উপস্থাপন না করে মোহাম্মদ আবদুল মান্নান প্রধান বয়লার পরিদর্শক
নিরীক্ষার কাজে বাধা প্রদান করেন। নিরীক্ষাদল মোহাম্মদ আবদুল মান্নান প্রধান বয়লার
পরিদর্শক ও নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মো. শরাফত আলী উপপ্রধান বয়লার পরিদর্শককে
নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত নথি বারবার দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেও তাদের অনিয়ম
ও দুর্নীতি গোপন করার নিমিত্ত নিরীক্ষার শেষদিন পর্যন্ত নথিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে
সরবরাহ করা থেকে বিরত থাকেন ও গোপন রাখেন। নিরীক্ষাদলের অনুসন্ধানে ওই নিয়োগে
ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে মর্মে নিরীক্ষদল আপত্তি জানান এবং অধিকতর তদন্তের
সুপারিশ করেন।
দুদকে
দায়ের করা সম্পত্তির বিবরণ বলছে, প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের মিরপুর
ডিওএইচএসের ৬ নম্বর রোডের ৪১৬ নম্বর গ্রীন উড সাউথ শাইন বিল্ডিং ২২৫০ বর্গফুটের
দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। যার মূল্য ৭ কোটি টাকা। রাজবাড়ী শহরে প্রায় ১০
কোটি টাকা মূল্যের একটি ডাবল ইউনিটের বহুতল আলিসান বাড়ি নির্মাণ করেছেন। রাজবাড়ী
সদর হাসপাতালের কাছে ৫ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ২০ কাঠা জমি, ঢাকার হেমায়েতপুরে
সুগন্ধা হাউজিংয়ে ৫ কোটি টাকা মূল্যের ৮ কাঠার একটি প্লট কিনেছেন। এছাড়া ঢাকার
অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট ছাড়াও মালয়েশিয়া ও কানাডায় নামে-বেনামে সম্পদ
কিনেছেন। এ সম্পদ কিনতে অর্থ পাচার করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে
যোগাযোগ করা হলে প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান দাবি
করেন, ‘একটি চক্র তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে সাংবাদিকদের
বিভ্রান্তি করছে। আমাকেও হয়রানি করছে।
অভিযোগ
নিয়ে তদন্ত কমিটির বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব
(প্রশাসন) মো. নূরুজ্জামান এনডিসি বলেন, ‘এ অভিযোগ জিআরএস সফটওয়্যারে গৃহীত
হয়েছে এবং কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
বয়লার পরিদর্শক মান্নানের কোটি টাকার পাহাড়
বয়লার পরিদর্শক মান্নানের কোটি টাকার পাহাড়
প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয় শিল্প মন্ত্রাণলয়ের অধীন একটি কারিগরি দফতর। এ দফতরের প্রধান কর্মকর্তা প্রধান বয়লার পরিদর্শক। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌ. মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান। ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি ও সচিবদের প্রভাব খাটিয়ে ১৫ বছরে প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান সরকারি দফতরকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি ভেবে লুটপাট, বদলী বাণিজ্য, বয়লার নির্মাণে অনিয়ম, ঘুষ নিয়ে বয়লারের নিবন্ধন প্রদান, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে আর্থিক দুর্নীতি, অবৈধভাবে বয়লার অপারেটরের সনদ প্রদানে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তিনি স্বেচ্ছাচারীতার মাধ্যমে একদিকে যেমন বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছে, অন্যদিকে কার্যালয়টিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছেন।কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ঘুষ-বাণিজ্য ও কমিশন-বাণিজ্যে হয়েছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও সচিবদের প্রভাবে ছিলেন বেপরোয়া। বয়লার অনুমোদনে নিজের ভাগিনার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নানা অনিয়ম ও আর্থিক খাত থেকে কমিশন নিয়ে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। গড়ে তুলেছেন কয়েক কোটি টাকা মূল্যের বহুতল ভবন ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, কিনেছেন গাড়ি ও শত বিঘা জমি।প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি অভিযোগ জিআরএস তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। জানা গেছে, এরই মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. নূরুজ্জামান এনডিসিকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সহায়তায় ঘুষের মাধ্যমে আবদুল মান্নান প্রধান বয়লার পরিদর্শক পদটি হাতিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, তার মামাশ্বশুর আওয়ামী লীগের সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিম, চাচাশ্বশুর আওয়ামী লীগপন্থি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ইকবাল আর্সলানের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ হন সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর। এ প্রভাবশালী মন্ত্রীকে ম্যানেজ করে ঘুষ দিয়ে এ পদে নিয়োগ পান মান্নান। এরপর তিনি বয়লারের বিভিন্ন সেক্টর থেকে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করেন। নিজ ভাগ্নের নামে প্রতিষ্ঠান ‘টেকনো কেয়ার’ এর মাধ্যমে বাধ্যতামূলক ডিজাইন করানো হতো। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে ঘুষ দিয়ে এসব ইন্ডাস্ট্রিয়াল বয়লারের অনুমোদন মিলত। টেকনো কেয়ারের বাইরের কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজাইন করালে সেটির অনুমোদন মিলত না।সূত্র বলছে, মান্নান কার্যালয়ে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে বয়লার নির্মাণ, বয়লার নিবন্ধন, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও বয়লার অপারেটর সনদ
প্রদানে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এছাড়া প্রতি বছর ছোট, বড় মিলিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রধান বয়লার পরিদর্শকের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩০০টি বয়লার তৈরি হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়ালের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ডিজাইনে ঘুষ বাবদ ১-৩ লাখ টাকা, ডিজাইন ও তা অনুমোদন বাবদ ৮ স্তরের প্রতি স্তরে ১৫-২৫ হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হতো। এ টাকা সরাসরি প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের কাছে দিতে হতো। ডিজাইন-ড্রইং অনুমোদকালীন মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে প্রতিবার ৬০-৭৫ হাজার টাকা নাশতার বিল নিয়ে অনুমোদন দিতেন এ প্রকৌশলী।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, প্রধান বয়লার পরিদর্শক হওয়ার পর থেকে কৌশলে বয়লার অপারেটরদের সনদ দিতে নিজের নিকটাত্মীয় ও নিজ জেলা রাজবাড়ীর লোকজন নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন আবদুল মান্নান। এ সিন্ডিকেটে তার ভাগিনা প্রথম শ্রেণির বয়লার অপারেটর মোহাম্মদ শরীফ হোসেন ও অন্যজন প্রথম শ্রেণির বয়লার অপারেটর ইমন হাসানের মাধ্যমে নামমাত্র পরীক্ষায় প্রার্থীদের সনদ দেওয়া হতো।বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর ও দুদকে জমা অভিযোগ বলছে, প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের স্মারক নং-৩৬.১১.০০০০.০০১.১১.০০৪.১৯.১৩৯৪৫ তারিখঃ ২৬/০৬/২০১৯ খ্রি.-এর মাধ্যমে অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে ০১ জন ও বয়লার টেকনিশিয়ান পদে ০২ জনের নিয়োগের নিমিত্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের নিয়োগ বিধিমালা-২০১২-এর তফসিল (০৭নং) এ উল্লিখিত শর্ত মোতাবেক বয়লার টেকনিশিয়ান পদের জন্য ‘কোন স্বীকৃত বোর্ড থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের সার্টিফিকেটসহ সরকার অনুমোদিত কোনো ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিটিউট হইতে মেকানিক্যাল বা পাওয়ার ট্রেড কোর্স সম্পন্ন করা সার্টিফিকেট’ থাকা বাধ্যতামূলক। তবে শর্ত না মেনে মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মো. শরাফত আলী যথাযথ জেলা কোটা অনুসরণ না করে, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষের বিনিময়ে বয়লার টেকনিশিয়ান পদে ১৫ জনকে নিয়োগ দেন। বয়লার টেকনিশিয়ান পদে অধিকাংশ নিয়োগপ্রাপ্তদের দাখিলকৃত ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে মেকানিক্যাল বা পাওয়ার ট্রেড কোর্স সম্পন্ন করা সার্টিফিকেট জাল এবং সার্টিফিকেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।জানা গেছে, নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মো. শরাফত আলীর আপন ভাগিনা এলিস হাসনাইন তালুকদার, আপন চাচাতো বোনের ছেলে তারিকুল ইসলাম, আপন চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মো. ইকবাল হোসেনকে নিয়োগ দেন। এছাড়া মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও মো. শরাফত আলী ঘুষের বিনিময়ে আরো নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি টাকার বিনিময়ে মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের গ্রামের বাড়ির কাজের লোককে নিয়োগ দিয়েছেন বয়লার টেকনিশিয়ান পদে।দুদকের তালিকায় দেখা যায়,
এলিস হাসনাইন তালুকদার, তারিকুল ইসলাম ও মো. ইকবাল হোসেন একই ডাকঘরের বাসিন্দা। নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মো. শরাফত আলী উপপ্রধান বয়লার পরিদর্শকের স্থায়ী ঠিকানা ও নিয়োগকৃত প্রার্থীদের স্থায়ী ঠিকানা প্রায় একই। মো. জাহিদ হাসান ও বিজয় কুমার হালদার প্রধান বয়লার পরিদর্শকের নিজ জেলা রাজবাড়ীর বাসিন্দা এবং তাদের সবার স্থায়ী ঠিকানা প্রায় একই।প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের কার্যক্রমের গত ২০২২ সালে বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর নিরীক্ষাদল নং-০৪ অডিট সম্পাদন করেন। নিরীক্ষাদল নিয়োগ পদোন্নতির ফাইল যাচাই করতে চাইলে সংবিধানের ১২৮(১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত নথি নিরীক্ষায় উপস্থাপন না করে মোহাম্মদ আবদুল মান্নান প্রধান বয়লার পরিদর্শক নিরীক্ষার কাজে বাধা প্রদান করেন। নিরীক্ষাদল মোহাম্মদ আবদুল মান্নান প্রধান বয়লার পরিদর্শক ও নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মো. শরাফত আলী উপপ্রধান বয়লার পরিদর্শককে নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত নথি বারবার দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেও তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতি গোপন করার নিমিত্ত নিরীক্ষার শেষদিন পর্যন্ত নথিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ করা থেকে বিরত থাকেন ও গোপন রাখেন। নিরীক্ষাদলের অনুসন্ধানে ওই নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে মর্মে নিরীক্ষদল আপত্তি জানান এবং অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করেন।দুদকে দায়ের করা সম্পত্তির বিবরণ বলছে, প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের মিরপুর ডিওএইচএসের ৬ নম্বর রোডের ৪১৬ নম্বর গ্রীন উড সাউথ শাইন বিল্ডিং ২২৫০ বর্গফুটের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। যার মূল্য ৭ কোটি টাকা। রাজবাড়ী শহরে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ডাবল ইউনিটের বহুতল আলিসান বাড়ি নির্মাণ করেছেন। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের কাছে ৫ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ২০ কাঠা জমি, ঢাকার হেমায়েতপুরে সুগন্ধা হাউজিংয়ে ৫ কোটি টাকা মূল্যের ৮ কাঠার একটি প্লট কিনেছেন। এছাড়া ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট ছাড়াও মালয়েশিয়া ও কানাডায় নামে-বেনামে সম্পদ কিনেছেন। এ সম্পদ কিনতে অর্থ পাচার করেছেন তিনি।এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান দাবি করেন, ‘একটি চক্র তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে সাংবাদিকদের বিভ্রান্তি করছে। আমাকেও হয়রানি করছে। অভিযোগ নিয়ে তদন্ত কমিটির বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. নূরুজ্জামান এনডিসি বলেন, ‘এ অভিযোগ জিআরএস সফটওয়্যারে গৃহীত হয়েছে এবং কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত