শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
অর্থ ও বাণিজ্য চার মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৩৫%

চার মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৩৫%

আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশের রফতানি বেড়েছে শতাংশের বেশি। আর রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। তবুও সময়ে অব্যাহত থেকেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষয়। সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ কমেছে প্রায় দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিদেশী হিসাবে (নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট) ডলার স্থিতি কমেছে প্রায় দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে মোট রিজার্ভ হ্রাস পেয়েছে বিলিয়ন ডলারের বেশি।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রিজার্ভে হাত না দিয়েই সরকার প্রায় বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের স্বল্প দীর্ঘমেয়াদি দায় পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে জ্বালানি আমদানির দায়, আদানির বিদ্যুৎ বিল এবং সার খাদ্য আমদানির মতো বিষয়গুলো রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার রিজার্ভে হাত না দেয়ার কথা বললেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার বহির্মুখী অন্তর্মুখী প্রবাহ বিশ্লেষণেই প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। আর বিদেশী ঋণের প্রবাহ কমে এলেও আগের বিভিন্ন দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। আবার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ এবং প্রবৃদ্ধি কমে আসার প্রভাবও পড়েছে রিজার্ভের ওপর। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রিজার্ভ স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে যাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় গত আগস্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ ডিসেম্বর তা নেমে এসেছে ১৮ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে। সে অনুযায়ী চার মাসের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ কমেছে দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত চার মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভও ক্রমাগত কমে এসেছে। গত জুলাইয়ে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে ডলার রিজার্ভ ছিল দশমিক শূন্য বিলিয়ন। কিন্তু অক্টোবর শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ চার মাসের ব্যবধানে রিজার্ভ কমেছে প্রায় দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভ হ্রাসের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারে।

দেশের সার্বিক অর্থনীতি এখন স্বস্তির পর্যায়ে আছেএমনটা বলা যাবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ . মুস্তফা কে মুজেরী। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ কমে গেছে। তাই প্রবৃদ্ধিও শ্লথ হয়ে এসেছে। অর্থনীতি সচল না হলে বৈদেশিক হিসাবের চিন্তা থেকেই যাবে। একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কিত। তাই সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রিজার্ভ স্বস্তিদায়ক অবস্থায় যাবে না।

এদিকে রিজার্ভ পতন অব্যাহত থাকলেও রফতানি রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্রমেই বাড়ছে। রেমিট্যান্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চার মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। আর গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। সে অনুযায়ী, চার মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বেশি পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত বছরের তুলনায় এবার রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

একইভাবে রফতানির ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতাংশের বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-অক্টোবর) দেশে রফতানির পরিমাণ ছিল ১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রফতানির পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রফতানি খাতে গত চার মাসে দশমিক শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যেখানে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক শতাংশ।

রফতানি রেমিট্যান্স বাড়লেও বিদেশী উন্নয়ন সহায়তার গতি কমে আসায় রিজার্ভে টান পড়ছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ . মুস্তফা কে মুজেরী। তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি যেসব বাজেট সহায়তা আসার কথা সেগুলোও এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু সরকারকে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের আগের দায় মেটাতে হচ্ছে। তাই রিজার্ভে হাত না দেয়ার কথা বলা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডলারের অন্তর্মুখী বহির্মুখী প্রবাহের হিসাবটাই আসল কথা।

এদিকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশে যে পরিমাণ বিদেশী ঋণ এসেছে, পরিশোধ করতে হয়েছে তার চেয়ে বেশি। অন্যদিকে সময়ে নতুন করে বিদেশী সহায়তার প্রতিশ্রুতিও তেমন একটা মেলেনি বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ইআরডির তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে বাংলাদেশের অনুকূলে ১২০ কোটি ২০ লাখ ডলারের বিদেশী ঋণের অর্থ ছাড় করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম। আবার চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ১৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের বিদেশী ঋণ পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। যেখানে গত বছরের একই সময়ে পরিশোধ করা হয়েছিল ১১০ কোটি ১৫ লাখ ডলার। সময়ে বিদেশী ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৩০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থছাড়ের চেয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে বেশি পরিমাণে। চলতি অর্থবছরের পুরো সময়েই ঋণ পরিশোধের চাপ বজায় থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা বলেন, ‘রেমিট্যান্স বাড়লেও তা সরাসরি রিজার্ভে যোগ হয় না। ব্যাংকগুলোয় এটা আসে। তারা একটি নির্দিষ্ট সময় পর বাংলাদেশ ব্যাংকে ডলার বিক্রি করে, তখন তা রিজার্ভে যুক্ত হয়। তাই রেমিট্যান্সের ডলার রিজার্ভে যুক্ত হতে সময় লাগে। আর রফতানি আয় থেকেও ব্যাংকের নিজস্ব ডলারের অনেক চাহিদা থাকে, সেগুলো মেটায় তারা।

রিজার্ভ কমার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মূলত দেড় বিলিয়ন ডলারের একটি বড় দায় পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে। সম্প্রতি এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মাধ্যমে আগের দায় পরিশোধ করতে গিয়ে রিজার্ভ কিছুটা কমে গেছে। আমরা রিজার্ভ থেকে অন্য কোনো ব্যয় করিনি। তাহলে তা আরো কমত। দায় পরিশোধের পর থেকে রিজার্ভ আর না কমে বরং কিছুটা বাড়ছে।

ডিসেম্বরের পর রিজার্ভ আরো বাড়বে বলেও প্রত্যাশা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা।

প্রতি দুই মাস পর পর আকুর দায় পরিশোধ করতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দেড় বিলিয়ন ডলারের দায় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পরিশোধ করা হয়েছে। আর নভেম্বর-ডিসেম্বরের দায় পরিশোধ হবে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে।

খুঁজুন