ঢাকার নগরজীবনের এক অনিবার্য অংশ হলো ফুটপাত। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা হাসপাতালের পথে এই ফুটপাত ব্যবহার করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- ঢাকার ফুটপাত আর পথচারীদের হাঁটার জায়গা নেই, তা পরিণত হয়েছে ব্যবসার আস্তানায়। বাস্তবতা হলো, ঢাকা শহরের অধিকাংশ ফুটপাত বর্তমানে হাঁটার জন্য নয়, বরং দোকানপাট, হকার, অস্থায়ী বসতি আর নানা অবৈধ ব্যবসার কবলে।
ফুটপাতের মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদে মানুষকে হাঁটার জায়গা দেওয়া। যানবাহনের ভিড়ে ভরা ব্যস্ত সড়কে পথচারীরা যাতে ঝুঁকি ছাড়াই চলাচল করতে পারে, সেজন্য ফুটপাত নির্মাণ করা হয়। কিন্তু রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি এলাকায় গেলেই দেখা যায় ফুটপাতের করুণ দশা। নিউমার্কেট থেকে শুরু করে গুলিস্তান, ফার্মগেট থেকে উত্তরা- সর্বত্রই একই চিত্র। যেখানে মানুষের হাঁটার কথা, সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান, হকারের স্টল আর ভ্যানগাড়ির পার্কিং। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হয়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে রয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার ফুটপাত। কিন্তু এর সিংহভাগই দখলে রয়েছে অবৈধ দোকানদার ও ব্যবসায়ীদের কাছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ ফুটপাত কোনো না কোনোভাবে দখলে রয়েছে।
ফুটপাত দখলের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, অর্থনৈতিক চাপ। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে অনেকেই ফুটপাতে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেন। তাদের কাছে এটি জীবিকার একমাত্র উপায়। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত তদারকির অভাব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি না থাকায় ধীরে ধীরে ফুটপাত স্থায়ী দখলে চলে যায়।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদে ফুটপাত দখল হয়। চতুর্থত, পর্যাপ্ত বাজার ব্যবস্থার অভাব। শহরে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় বাজার ও শপিং কমপ্লেক্স নেই। ফলে মানুষ বিকল্প হিসেবে ফুটপাতের ওপর নির্ভর করে।
ফুটপাত দখলের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ পথচারীরা। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য এটি একটি মারাত্মক সমস্যা। তাদের রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়।
মা-বাবারা সন্তানদের হাত ধরে রাস্তার পাশে হাঁটেন, যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকেন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনেক সময় দেখা যায়, ফুটপাতের দোকানগুলো এতটাই বিস্তৃত যে পথচারীদের জন্য কোনো জায়গাই থাকে না।
এই সমস্যার একটি জটিল দিক হলো অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ফুটপাতে যারা ব্যবসা করেন, তাদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের। তাদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া শুধু উচ্ছেদ করা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই হকাররা স্থানীয় এলাকার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা কম দামে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করেন, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সুবিধাজনক।
কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও সত্য যে, ফুটপাত দখলের ফলে নগরের সামগ্রিক পরিবেশ ও জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হচ্ছে। ট্রাফিক জ্যাম বৃদ্ধি, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়া এবং নগর পরিকল্পনার ব্যাঘাত ঘটছে।
বিভিন্ন সময়ে সরকার ফুটপাত উদ্ধারের জন্য অভিযান পরিচালনা করেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, র?্যাব, পুলিশ- সবাই মিলে চেষ্টা করেছে ফুটপাত মুক্ত করতে। কিছু এলাকায় সাময়িক সাফল্যও এসেছে। কিন্তু কয়েকদিন পরেই আবার দখলদাররা ফিরে এসেছে।
এর মূল কারণ হলো, উচ্ছেদের পর বিকল্প ব্যবস্থা করা হয় না। শুধু জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের জীবিকার বিকল্প সুযোগ তৈরি করা হয় না। ফলে তারা আবার ফিরে আসতে বাধ্য হয়।
এই সমস্যার সমাধান শুধু জোরপূর্বক উচ্ছেদ নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বিকল্প বাজার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। সরকার নির্ধারিত স্থানে হকার বাজার প্রতিষ্ঠা করে সেখানে তাদের পুনর্বাসন করতে পারে। এতে তাদের ব্যবসার পাশাপাশি ফুটপাতও মুক্ত হবে। কঠোর আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন। যারা বারবার ফুটপাত দখল করবেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
পৃথিবীর অনেক শহরে এই ধরনের সমস্যার সমাধান হয়েছে সুপরিকল্পিত উপায়ে। সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো হকারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা তৈরি করে এই সমস্যার সমাধান করেছে। তারা হকার সেন্টার তৈরি করে সবাইকে সেখানে স্থানান্তর করেছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ীদের জীবিকা নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে রাস্তা ও ফুটপাত মুক্ত হয়েছে।
সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকার ফুটপাত আবার পথচারীদের কাছে ফিরে আসবে। তখন ফুটপাত হবে প্রকৃত অর্থেই হাঁটার জায়গা, ব্যবসার আস্তানা নয়।
তামান্না ইসলাম : শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
এই ঢাকা শহরে একটু হাঁটার জায়গা কোথায়
এই ঢাকা শহরে একটু হাঁটার জায়গা কোথায়
ঢাকার নগরজীবনের এক অনিবার্য অংশ হলো ফুটপাত। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা হাসপাতালের পথে এই ফুটপাত ব্যবহার করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- ঢাকার ফুটপাত আর পথচারীদের হাঁটার জায়গা নেই, তা পরিণত হয়েছে ব্যবসার আস্তানায়। বাস্তবতা হলো, ঢাকা শহরের অধিকাংশ ফুটপাত বর্তমানে হাঁটার জন্য নয়, বরং দোকানপাট, হকার, অস্থায়ী বসতি আর নানা অবৈধ ব্যবসার কবলে।ফুটপাতের মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদে মানুষকে হাঁটার জায়গা দেওয়া। যানবাহনের ভিড়ে ভরা ব্যস্ত সড়কে পথচারীরা যাতে ঝুঁকি ছাড়াই চলাচল করতে পারে, সেজন্য ফুটপাত নির্মাণ করা হয়। কিন্তু রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি এলাকায় গেলেই দেখা যায় ফুটপাতের করুণ দশা। নিউমার্কেট থেকে শুরু করে গুলিস্তান, ফার্মগেট থেকে উত্তরা- সর্বত্রই একই চিত্র। যেখানে মানুষের হাঁটার কথা, সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান, হকারের স্টল আর ভ্যানগাড়ির পার্কিং। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হয়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে রয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার ফুটপাত। কিন্তু এর সিংহভাগই দখলে রয়েছে অবৈধ দোকানদার ও ব্যবসায়ীদের কাছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ ফুটপাত কোনো না কোনোভাবে দখলে রয়েছে।ফুটপাত দখলের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, অর্থনৈতিক চাপ। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে অনেকেই ফুটপাতে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেন। তাদের কাছে এটি জীবিকার একমাত্র উপায়। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত তদারকির অভাব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি না
থাকায় ধীরে ধীরে ফুটপাত স্থায়ী দখলে চলে যায়।তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদে ফুটপাত দখল হয়। চতুর্থত, পর্যাপ্ত বাজার ব্যবস্থার অভাব। শহরে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় বাজার ও শপিং কমপ্লেক্স নেই। ফলে মানুষ বিকল্প হিসেবে ফুটপাতের ওপর নির্ভর করে।ফুটপাত দখলের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ পথচারীরা। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য এটি একটি মারাত্মক সমস্যা। তাদের রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়।মা-বাবারা সন্তানদের হাত ধরে রাস্তার পাশে হাঁটেন, যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকেন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনেক সময় দেখা যায়, ফুটপাতের দোকানগুলো এতটাই বিস্তৃত যে পথচারীদের জন্য কোনো জায়গাই থাকে না।এই সমস্যার একটি জটিল দিক হলো অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ফুটপাতে যারা ব্যবসা করেন, তাদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের। তাদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া শুধু উচ্ছেদ করা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই হকাররা স্থানীয় এলাকার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা কম দামে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করেন, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সুবিধাজনক।কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও সত্য যে, ফুটপাত দখলের ফলে নগরের সামগ্রিক পরিবেশ ও জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হচ্ছে। ট্রাফিক জ্যাম বৃদ্ধি, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়া এবং নগর পরিকল্পনার ব্যাঘাত ঘটছে।বিভিন্ন সময়ে সরকার ফুটপাত উদ্ধারের জন্য অভিযান পরিচালনা করেছে। ঢাকা
উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, র?্যাব, পুলিশ- সবাই মিলে চেষ্টা করেছে ফুটপাত মুক্ত করতে। কিছু এলাকায় সাময়িক সাফল্যও এসেছে। কিন্তু কয়েকদিন পরেই আবার দখলদাররা ফিরে এসেছে।এর মূল কারণ হলো, উচ্ছেদের পর বিকল্প ব্যবস্থা করা হয় না। শুধু জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের জীবিকার বিকল্প সুযোগ তৈরি করা হয় না। ফলে তারা আবার ফিরে আসতে বাধ্য হয়।এই সমস্যার সমাধান শুধু জোরপূর্বক উচ্ছেদ নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বিকল্প বাজার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। সরকার নির্ধারিত স্থানে হকার বাজার প্রতিষ্ঠা করে সেখানে তাদের পুনর্বাসন করতে পারে। এতে তাদের ব্যবসার পাশাপাশি ফুটপাতও মুক্ত হবে। কঠোর আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন। যারা বারবার ফুটপাত দখল করবেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।পৃথিবীর অনেক শহরে এই ধরনের সমস্যার সমাধান হয়েছে সুপরিকল্পিত উপায়ে। সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো হকারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা তৈরি করে এই সমস্যার সমাধান করেছে। তারা হকার সেন্টার তৈরি করে সবাইকে সেখানে স্থানান্তর করেছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ীদের জীবিকা নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে রাস্তা ও ফুটপাত মুক্ত হয়েছে।সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকার ফুটপাত আবার পথচারীদের কাছে ফিরে আসবে। তখন ফুটপাত হবে প্রকৃত অর্থেই হাঁটার জায়গা, ব্যবসার আস্তানা নয়।তামান্না ইসলাম : শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত