শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
আন্তর্জাতিক ফ্রান্সে কৃষি খাতে অবদান রাখছেন অভিবাসীরা

ফ্রান্সে কৃষি খাতে অবদান রাখছেন অভিবাসীরা

ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ব্রোতাইন অঞ্চলের রেন শহরের কাছে আশ্রয়প্রার্থীদের একটি দল সম্প্রতি সবজি চাষ শুরু করেছেন। এই উদ্যোগে তারা নিজেদের ব্যস্ত রাখার পাশাপাশি একইসঙ্গে স্থানীয় সমাজেও অবদান রাখছেন।

জুলাইয়ের ২৩ তারিখ, রেনে শহরের উপকণ্ঠে মেলেসে এলাকায় রোদ-বৃষ্টি দুইয়েরই দেখা মিলছিল। হঠাৎ বৃষ্টি থেমে যায়, আবার মুহূর্তের মধ্যে সূর্যের আলো ভেসে আসে। আবহাওয়া যেমনই হোক, অভিবাসী কৃষকদের কাজে কোনো বিরতি ছিল না।

ক্যামেরুন থেকে আসা ৪১ বছর বয়সী এডি ভালেরে বলেন,বৃষ্টি হলে আমরা খুশি হই। এতে সবজি ভালো হয়, আর পানি দেওয়ার কাজও কমে যায়।

তিনি এবং তার আরও ১০ জন সঙ্গী মিলে এ বছরের বসন্তে মেলেসে এলাকায় প্রায় আধা হেক্টর জমিতে সবজি চাষ শুরু করেন। দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ক্যামেরুন, কঙ্গো ও আইভরি কোস্ট থেকে আসা কয়েকজন শরণার্থীও। তারা রেন শহরের আশ্রয়কেন্দ্র এবং অস্থায়ী শিবিরে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হন।

গত শীতে শহরের জিমনেসিয়ামে কয়েক মাস কাটানোর পর এপ্রিল মাসে সেখান থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন তারা রেন শহরের উত্তরে মোরপা পার্কে অস্থায়ীভাবে থাকছিলেন। সেখান থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা হয়।

চাষাবাদের জমিটি দিয়েছেন স্থানীয় এক অবসরপ্রাপ্ত কৃষক সিলভি ফোরেল। তার ছেলে ইয়োহান ল্যুহুজে এখন জমি দেখাশোনা করেন এবং অভিবাসী কৃষকদের যতটা সম্ভব সহায়তা করেন।
মাত্র চার মাসের মধ্যেই অভিবাসী কৃষকেরা মাঠে টমেটো, আলু, মরিচ, বেগুন, শসা, জুকিনি ও কুমড়া ফলাতে সক্ষম হয়েছেন। মাঠের সবুজ পাতার নীচে এরইমধ্যে বড় কুমড়া দেখা যাচ্ছে।

এই দলটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘অভিবাসী কৃষক সমিতি’। শরণার্থীরা জানান, ফ্রান্সে আশ্রয়প্রার্থীরা আশ্রয় আবেদনের পর প্রথম ছয় মাস কাজ করতে পারেন না। বাস্তবে চাকরি পাওয়া আরও কঠিন। তাই তারা চেয়েছেন সময় নষ্ট না করে উপকারী কোনো কাজ করতে। প্রথমে রেন শহরের পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিতে চাইলেও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাননি। অবশেষে স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবীর সহায়তায় তারা কৃষিকাজ শুরু করেন।

এডি ভালেরে বলেন, আমরা শুধু বসে থাকতে চাই না। আমরা চাই কাজ করতে এবং সমাজে অবদান রাখতে।

দলের কয়েকজনের কৃষিকাজে অভিজ্ঞতা আছে। যেমন এডি ভালেরে এবং কঙ্গোর বেনা আগে কৃষি কাজের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তবে অনেকের জন্যই এটি নতুন অভিজ্ঞতা। ক্যামেরুনের ৬৮ বছর বয়সী সাবেক পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক লরঁ অথবা আইভরি কোস্টের সাবেক রিসেপশনিস্ট জাস্টিন মাঠে নেমে সবকিছু শিখছেন।

তাদের উৎপাদিত সবজি স্থানীয় দাতব্য সংগঠন ‘রেস্তো দ্যু কুর’-এ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে একাকী মানুষদের জন্য সবজি বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই প্রকল্প কেবল চাষাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সামাজিক দিকও আছে। তারা চান দরিদ্র মানুষেরা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাক। সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে জৈব কৃষির নীতিতে, যাতে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে।

তবে কাজটি সহজ নয়। রেন শহর থেকে মেলেসে অবস্থিত সবজে ক্ষেতে যেতে বাসে আধা ঘণ্টা লাগে। এরপর প্রায় ৪৫ মিনিট হেঁটে যেতে হয়। মাঠে তাদের কাছে কেবল হাতে কাজ করার কিছু যন্ত্রপাতি আছে। পানি সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পাইপও নেই।

দলের সদস্য ডেভিড বলেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার পাইপ। মাঠে পানি দেওয়াটা বড় সমস্যা। এজন্য তারা অনলাইনে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন।

বেনা আগে কঙ্গোর কিনশাসায় কৃষিকাজ শেখেন। পেছনে ফেলে এসেছেন কষ্টকর স্মৃতি। স্বামী সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাকে বাড়িতে আক্রমণ করা হয়েছিল। তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এবং গুরুতর আহত হন। ফ্রান্সে আসার পর চিকিৎসা পেয়েছেন, কিন্তু এখনো মাথাব্যথা এবং উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। কৃষিকাজ তাকে মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।

লের অন্যরাও একই কথা বলেন। আশ্রয়প্রার্থীরা দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে কাজ করতে পারেন না এবং সেই অপেক্ষার সময় তাদের মানসিকভাবে কষ্ট দেয়। কৃষিকাজে তারা ব্যস্ত থাকতে পারেন এবং উদ্বেগ কমে যায়।

ডেভিড বলেন, আমি এখানে আসি মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য। যদি না আসি ঘরে থেকে দিনটা অনেক লম্বা মনে হয়। এখানে কাজ করলে সময় দ্রুত যায়।

ফ্রান্সে কৃষি খাতে শ্রমিক সংকট রয়েছে। ফরাসি কর্মসংস্থান দপ্তর ‘ফ্রন্সঁ ত্রাভাই’-এর ২০২৫ সালের জরিপে বলা হয়েছে, শুধু ব্রেতান অঞ্চলেই প্রায় ৮ হাজার ৯৫০ জন কৃষিক্ষেত্রে নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে কৃষিতে দুই লাখেরও বেশি পদে কর্মী চাহিদা রয়েছে।

অভিবাসী কৃষকদের এই দল তাই শুধু নিজেদের জীবনে নয়, শ্রমিক সংকটে ভোগা ফরাসি কৃষি খাতেও অবদান রাখতে চায়। সম্প্রতি এনজিও ‘রেস্তো দ্যু কুর’ তাদের এই বাগান থেকে সরাসরি সবজি সংগ্রহ করেছে। আগামী মাসগুলোতে তারা আশেপাশের একাকী মানুষদের জন্য সবজির ঝুড়ি দেওয়ার উদ্যোগ নিতে চান।

সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস

খুঁজুন