হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জে রয়েছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় টাঙ্গুয়ার হাওর, দেখার হাওর, মাটিয়ান হাওর শনির হাওর, চন্দ্রসোনার তালসহ ছোট বড় ১৫৪টি হাওর। হওরের জন্য সুনামগঞ্জ জেলার একটি প্রচলিত প্রবাদে হচ্ছে ‘মৎস পাথর ধান সুনামগঞ্জের প্রাণ’। সেই সুনামগঞ্জের হাওরে ফের পানি বাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় আবারও ফসল তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন কৃষকরা। উজানে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের ঝুঁঁকিতে রয়েছে তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লা, ছাতক ও জগন্নাথপুর উপজেলার হাওরের বোরো ফসল।
স্থানীয়রা জানান, গত তিন দিন ধরে উজানের ঢলে হাওর এলাকায় পানি বেড়ে ফসল রক্ষা বাঁধ ঝুঁঁকিপূর্ণ অংশে চাপ সৃষ্টি করছে। এ কারণে তাহিরপুর উপজেলার পাটলাই নদীর তীর উপচে শুরুতে গুরমার হাওরের বর্ধিতাংশে পানি প্রবেশ করে। পরে টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারের পাশের বাঁধ পানির চাপে ভেঙে যায়। এতে তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ও মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর এবং দক্ষিণ বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের বোরো ধান তলিয়ে যায়।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের ২৭ নম্বর পিআইসি ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে বর্ধিত গুরমা হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। গত রোববার বিকেল ৪টার দিকে বাঁধ ভেঙে যায়। এর আগে একই দিন সকাল ৮টায় ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন বাঁধের ওপর দিয়ে গুরমা হাওরে পানি প্রবেশ করে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে গুরমা হাওরে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করায় প্রায় ৬০ হেক্টর ফসলি জমি তুলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানা গেছে, পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রোববার সকাল থেকে ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন বাঁধ দিয়ে বর্ধিত গুরমা হাওরে পানি প্রবেশ করা শুরু হয়। উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, বর্ধিত গুরমা হাওরে তাহিরপুর উপজেলা অংশে প্রায় ৬০ হেক্টর জমি রয়েছে। বাঁধ উপচে হাওরে পানি প্রবেশ করার ফলে হাওরের জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, সকালে ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। পাটলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্ধিত গুরমার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের ২৭ নম্বর প্রকল্পটি দেবে গিয়ে পানি ঢুকেছে হাওরে। হাওরের কৃষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে পানি আটকানোর চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবীর বলেন, পাটলাই নদীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। অবশেষে রোববার বিকেলে পানির প্রবল চাপে বাঁধ ভেঙে যায়।
অপরদিকে সুনামগঞ্জ জেলায় ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, সোমবার ১৮ এপ্রিলএর মধ্যে মাত্র ৫১ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। আগাম বন্যার কারণে বাধ ভেঙে ৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে ২৭ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, সকাল থেকে সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টি না হলে পানি দ্রুত কমে যাবে। গতকাল উজানে সামান্য বৃষ্টি হয়েছে, তবে পানি দ্রুতই কমে যাবে। এদিকে সুনামগঞ্জের পানি নেত্রকোনার হাওরে প্রবেশ করতে পারে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ কর্মকর্তা।
সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জের হাওরের সব বাঁধ ঝুঁঁকিপূর্ণ। পানির চাপে বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। তাই দ্রুত হাওরের পাকা ধান কেটে ফেলার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, হাওরের বাঁধগুলোতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করা হচ্ছে। কারণ নদীর তীর উপচে হাওরে পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।
দিরাই (সুনামগঞ্জ) থেকে মুহাম্মদ আব্দুল বাছির সরদার জানান, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে বাঁধ ভেঙে আবারও হাওর প্লাবিত হয়েছে। এতে হাওরের প্রায় এক হাজার ৫০ হেক্টর বোরো জমি তলিয়ে গেছে। উপজেলার জগদল ইউনিয়নের সাতবিলা রেগুলেটর সংলগ্ন হুরামন্দিরা হাওরের ৪২ নম্বর পিআইসির বাঁধ ভেঙে গত রোববার দিবাগত রাত ১০টার দিকে পানি প্রবেশ করে হাওর প্লাবিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, উপজেলার হুরামন্দিরা হাওরের ১.৩৪৭ কিলোমিটার অংশের বাঁধ ভাঙা বন্ধকরণ ও মেরামতের জন্য সরকার ১৭ লাখ ৭৮ হাজার ২১৭ টাকা ৭৭ পয়সা বরাদ্দ দিয়েছে। উপজেলার সীমান্ত দিয়ে বহমান কামারখালী নদীর পাড়ের ওই হাওর রক্ষা বাঁধটি ভেঙে হাওরে পানি ঢোকার খবর পেয়ে এলাকাবাসী সর্বাত্মক চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি।
দিরাই উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দিরাইয়ের হাওরে প্রায় ১১০টি হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। এ পর্যন্ত হাওরের ২৭ শতাংশ ধান কর্তন করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নাহিদ আহমেদ জানান, হুরামন্দিরায় প্রায় এক হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছিল। তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, হাওরটিতে অন্তত আড়াই হাজার হেক্টর বোরো জমি রয়েছে। যার অন্তত ৭০ শতাংশ কাটা হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দিরাই অফিসের উপ-সহকারি প্রকৌশলী শাখা কর্মকর্তা (এসও) এ.টি.এম. মোনায়েম হোসেন জানান, গত রোববার রাতে দিরাইয়ের আরও একটি হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে দিরাইয়ের নদীগুলোতে বিপদ সীমার ৫.০৭ মিটার উপরে অবস্থান করছে। তবে নদীতে এখনও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে রোববার রাত দেড়টায় উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের সাকিতপুর হাওরের বাঁধ রক্ষায় আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মসজিদ থেকে মাইকিং করে মাটিয়াপুর বাঁধে উরা-কুদাল নিয়ে যাওয়ার আহ্বানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন ঘুম থেকে উঠে হাওরের ধান রক্ষার জন্য বাঁধে গিয়ে মাটি কেটে আসেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাঁধটি ভালো রয়েছে।
নেত্রকোণা থেকে এ কে এম আব্দুল্লাহ জানান, নেত্রকোণায় দ্বিতীয় দফায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কির্তনখলা বাঁধ ঝুঁঁকির মুখে পড়েছে। নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুড়ি উপজেলার ধনু নদীর পানি দ্বিতীয় দফায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় কৃষকরা দিনরাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। নেত্রকোণা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এম এল সৈকত জানান, ধনু নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১৪ সেন্টমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
তিনি জানান, পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় কির্তনখলা, গোমাইল ও চরহাইসদা বাঁধ হুমকির মুখে। গত তিন সপ্তাহ ধরে এসব বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় কাজ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নেত্রকোণার কোন বাঁধ ভেঙে কৃষকের ফসলের কোন ক্ষতি হয়নি। আশা করি কৃষকরা তাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ এফ এম মোবারক আলী জানান, মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুড়ি হাওর উপজেলায় ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোর ধানের আবাদ করা হয়েছে। বন্যার হাত থেকে বাঁচতে ৮০ ভাগ ধান পাকলেই কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। আমরাও কৃষকদেরকে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি। এপর্যন্ত হাওরে ৫৫ ভাগ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
জেলা প্রশাসক কাজি মো. আবদুর রহমান বলেন, সরকার হাওরের ফসল রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। হাওরের বাঁধের যেন কোন ক্ষতি না হয় সেজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করছে। পানি আর না বাড়লে কৃষকরা তাদের স্বপ্নের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।
হাওরে ফসল রক্ষার অসম লড়াইয়ে কৃষক
হাওরে ফসল রক্ষার অসম লড়াইয়ে কৃষক
হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জে রয়েছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় টাঙ্গুয়ার হাওর, দেখার হাওর, মাটিয়ান হাওর শনির হাওর, চন্দ্রসোনার তালসহ ছোট বড় ১৫৪টি হাওর। হওরের জন্য সুনামগঞ্জ জেলার একটি প্রচলিত প্রবাদে হচ্ছে ‘মৎস পাথর ধান সুনামগঞ্জের প্রাণ’। সেই সুনামগঞ্জের হাওরে ফের পানি বাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় আবারও ফসল তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন কৃষকরা। উজানে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের ঝুঁঁকিতে রয়েছে তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লা, ছাতক ও জগন্নাথপুর উপজেলার হাওরের বোরো ফসল।স্থানীয়রা জানান, গত তিন দিন ধরে উজানের ঢলে হাওর এলাকায় পানি বেড়ে ফসল রক্ষা বাঁধ ঝুঁঁকিপূর্ণ অংশে চাপ সৃষ্টি করছে। এ কারণে তাহিরপুর উপজেলার পাটলাই নদীর তীর উপচে শুরুতে গুরমার হাওরের বর্ধিতাংশে পানি প্রবেশ করে। পরে টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারের পাশের বাঁধ পানির চাপে ভেঙে যায়। এতে তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ও মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর এবং দক্ষিণ বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের বোরো ধান তলিয়ে যায়।সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের ২৭ নম্বর পিআইসি ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে বর্ধিত গুরমা হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। গত রোববার বিকেল ৪টার দিকে বাঁধ ভেঙে যায়। এর আগে একই দিন সকাল ৮টায় ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন বাঁধের ওপর দিয়ে গুরমা হাওরে পানি প্রবেশ করে।সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে গুরমা হাওরে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করায় প্রায় ৬০ হেক্টর ফসলি জমি তুলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানা গেছে, পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রোববার সকাল থেকে ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন বাঁধ দিয়ে বর্ধিত গুরমা হাওরে পানি প্রবেশ করা শুরু হয়। উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, বর্ধিত গুরমা হাওরে তাহিরপুর উপজেলা অংশে প্রায় ৬০ হেক্টর জমি রয়েছে। বাঁধ উপচে হাওরে পানি প্রবেশ করার ফলে হাওরের জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় আশঙ্কা রয়েছে।স্থানীয় কৃষকরা জানান, সকালে ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। পাটলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্ধিত গুরমার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের ২৭ নম্বর প্রকল্পটি দেবে গিয়ে পানি ঢুকেছে হাওরে। হাওরের কৃষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে পানি আটকানোর চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবীর বলেন, পাটলাই নদীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। অবশেষে রোববার বিকেলে পানির প্রবল চাপে বাঁধ ভেঙে যায়।অপরদিকে সুনামগঞ্জ জেলায় ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫
হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, সোমবার ১৮ এপ্রিলএর মধ্যে মাত্র ৫১ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। আগাম বন্যার কারণে বাধ ভেঙে ৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে ২৭ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, সকাল থেকে সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টি না হলে পানি দ্রুত কমে যাবে। গতকাল উজানে সামান্য বৃষ্টি হয়েছে, তবে পানি দ্রুতই কমে যাবে। এদিকে সুনামগঞ্জের পানি নেত্রকোনার হাওরে প্রবেশ করতে পারে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ কর্মকর্তা।সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জের হাওরের সব বাঁধ ঝুঁঁকিপূর্ণ। পানির চাপে বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। তাই দ্রুত হাওরের পাকা ধান কেটে ফেলার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, হাওরের বাঁধগুলোতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করা হচ্ছে। কারণ নদীর তীর উপচে হাওরে পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।দিরাই (সুনামগঞ্জ) থেকে মুহাম্মদ আব্দুল বাছির সরদার জানান, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে বাঁধ ভেঙে আবারও হাওর প্লাবিত হয়েছে। এতে হাওরের প্রায় এক হাজার ৫০ হেক্টর বোরো জমি তলিয়ে গেছে। উপজেলার জগদল ইউনিয়নের সাতবিলা রেগুলেটর সংলগ্ন হুরামন্দিরা হাওরের ৪২ নম্বর পিআইসির বাঁধ ভেঙে গত রোববার দিবাগত রাত ১০টার দিকে পানি প্রবেশ করে হাওর প্লাবিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, উপজেলার হুরামন্দিরা হাওরের ১.৩৪৭ কিলোমিটার অংশের বাঁধ ভাঙা বন্ধকরণ ও মেরামতের জন্য সরকার ১৭ লাখ ৭৮ হাজার ২১৭ টাকা ৭৭ পয়সা বরাদ্দ দিয়েছে। উপজেলার সীমান্ত দিয়ে বহমান কামারখালী নদীর পাড়ের ওই হাওর রক্ষা বাঁধটি ভেঙে হাওরে পানি ঢোকার খবর পেয়ে এলাকাবাসী সর্বাত্মক চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি।দিরাই উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দিরাইয়ের হাওরে প্রায় ১১০টি হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। এ পর্যন্ত হাওরের ২৭ শতাংশ ধান কর্তন করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নাহিদ আহমেদ জানান, হুরামন্দিরায় প্রায় এক হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছিল। তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, হাওরটিতে অন্তত আড়াই হাজার হেক্টর বোরো জমি রয়েছে। যার অন্তত ৭০ শতাংশ কাটা হয়নি।পানি উন্নয়ন বোর্ডের দিরাই অফিসের উপ-সহকারি প্রকৌশলী শাখা
কর্মকর্তা (এসও) এ.টি.এম. মোনায়েম হোসেন জানান, গত রোববার রাতে দিরাইয়ের আরও একটি হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে দিরাইয়ের নদীগুলোতে বিপদ সীমার ৫.০৭ মিটার উপরে অবস্থান করছে। তবে নদীতে এখনও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও তিনি জানান।এদিকে রোববার রাত দেড়টায় উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের সাকিতপুর হাওরের বাঁধ রক্ষায় আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মসজিদ থেকে মাইকিং করে মাটিয়াপুর বাঁধে উরা-কুদাল নিয়ে যাওয়ার আহ্বানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন ঘুম থেকে উঠে হাওরের ধান রক্ষার জন্য বাঁধে গিয়ে মাটি কেটে আসেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাঁধটি ভালো রয়েছে।নেত্রকোণা থেকে এ কে এম আব্দুল্লাহ জানান, নেত্রকোণায় দ্বিতীয় দফায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কির্তনখলা বাঁধ ঝুঁঁকির মুখে পড়েছে। নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুড়ি উপজেলার ধনু নদীর পানি দ্বিতীয় দফায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় কৃষকরা দিনরাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। নেত্রকোণা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এম এল সৈকত জানান, ধনু নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১৪ সেন্টমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।তিনি জানান, পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় কির্তনখলা, গোমাইল ও চরহাইসদা বাঁধ হুমকির মুখে। গত তিন সপ্তাহ ধরে এসব বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় কাজ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নেত্রকোণার কোন বাঁধ ভেঙে কৃষকের ফসলের কোন ক্ষতি হয়নি। আশা করি কৃষকরা তাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ এফ এম মোবারক আলী জানান, মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুড়ি হাওর উপজেলায় ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোর ধানের আবাদ করা হয়েছে। বন্যার হাত থেকে বাঁচতে ৮০ ভাগ ধান পাকলেই কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। আমরাও কৃষকদেরকে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি। এপর্যন্ত হাওরে ৫৫ ভাগ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।জেলা প্রশাসক কাজি মো. আবদুর রহমান বলেন, সরকার হাওরের ফসল রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। হাওরের বাঁধের যেন কোন ক্ষতি না হয় সেজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করছে। পানি আর না বাড়লে কৃষকরা তাদের স্বপ্নের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত