রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় খুন ডাকাতি ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে

খুন ডাকাতি ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে

মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক গবেষক :

সম্প্রতি দেশে প্রকাশ্যে হত্যাছিনতাইডাকাতি ও নারী নির্যাতন ঘটনা বেড়েছে এতে দেশ জুড়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। নারী নির্যাতন ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ঢাকাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহরে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন। যৌথবাহিনীর সমন্বয়ে সারা দেশে অপারেশন ডেভিল হান্ট নামে একটি বিশেষ অভিযানের মধ্যে এই ঘটনাগুলো ঘটছে।

রাজধানীর মিটফোর্ডে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে, কুপিয়ে ও পাথরের খণ্ড দিয়ে লালচাঁদ ওরফে সোহাগ হত্যা ব্যাপক আলোচিত ঘটনা। শুধু সোহাগ হত্যাই নয়, গুলি করে পায়ের রগ কেটে হত্যা, অস্ত্র দেখিয়ে সর্বস্ব ছিনতাই, চাঁদা না পেয়ে গুলি এ ধরনের বেশ কয়েকটি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি।

সোহাগ হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক শেষে বলেন, রাজধানীর মিটফোর্ডে যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও বর্বরোচিত। দেশে খুন, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, সন্ত্রাস, মাদক চোরাচালানসহ নানা অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিশেষ চিরুনি অভিযান শুরু করছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সরকারে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভূমিকা রাখতে না পারায় পরিস্থিতি অবনতি ঘটছে। এতে সর্বদাই নিরাপত্তাহীনতা ও আতংকে ভুগছেন দেশের নাগরিকরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিগত ১১ মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি; বরং দিন দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে খুনের ঘটনা। জানুয়ারিতে সারা দেশে খুনের মামলা হয় ২৯৪টি, জুনে হয়েছে ৩৪৪টি। গত ছয় মাসে ডাকাতি, দস্যুতা, ধর্ষণ ও পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনায় মামলা কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে অনেক ধরনের অপরাধ ভিন্ন প্রবণতা দেখা গেছে। যেমন- চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডাকাতির মামলা হয়েছে ৭১টি, যা জুনে এসে দাঁড়ায় ৪৯টিতে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডাকাতির মোট মামলা ৩৬৭টি। এ বছরের ছয় মাসে পরিসংখ্যানে জুনের দিকে ডাকাতির ঘটনা কম হওয়ার প্রবণতা দেখা গেলেও বছরভিত্তিক হিসাবে তা বেশি। যেমন- গত ৬ মাসে ডাকাতির মামলা হয়েছে ৩৬৭টি। অথচ ২০২০ সালে পুরো বছরে ডাকাতির মামলা হয়েছিল ৩০২টি, ২০২১ সালে ৩০৮টি, ২০২২ সালে ৪০৬টি, ২০২৩ সালে ৩১৯টি এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে ডাকাতির মামলা হয়েছে ৪৯০টি। একইভাবে দস্যুতার ঘটনায় করা মামলার সংখ্যাও গত ছয় মাসে কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। জানুয়ারিতে দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭১টি, যা জুনে এসে দাঁড়ায় ১৫১টিতে। এভাবে গত ৬ মাসে দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৯৭২টি। অথচ পূর্ববর্তী বছরগুলোতে সারা বছরে এমন সংখ্যক দস্যুতার মামলা হতো। যেমন- ২০২০ সালে দস্যুতার মামলা ৯৭৮টি, ২০২১ সালে ৯৭১টি, ২০২২ সালে ১ হাজার ১২৮টি, ২০২৩ সালে ১ হাজার ২২৭টি এবং ২০২৪ সালে দস্যুতার মামলা হয় ১ হাজার ৪০৫টি।

গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের দেওয়া পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রেস উইং ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে।

গত বুধবার ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে বিকেলে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে কুপিয়ে এবং পাথর মেরে হত্যা করা হয়। গত বৃহস্পতিবার খুলনার দৌলতপুরে যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে ও রগ কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গত শুক্রবার চাঁদপুরে মসজিদের ভেতরেই কোপানো হয় ইমামকে। একই দিনে ঢাকার শ্যামলীতে ছিনতাইকারীরা এক যুবকের পরনের কাপড় ও স্যান্ডেল পর্যন্ত নিয়ে যায়। আর পল্লবীতে এক আবাসন প্রতিষ্ঠানে চাঁদা না পেয়ে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার সুগারমিল আদর্শগ্রাম থেকে অপহরণের আট দিন পর পোলট্রি ব্যবসায়ী মো. মামুনের (২৫) দ্বিখণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নের মাঝের পাড়া এলাকায় বস্তাবন্দি অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া সরকারের প্রেস উইংয়ের সরবরাহ করা অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে খুনের মামলা বেড়েই চলছে। জানুয়ারিতে মামলা হয়েছে ২৯৪টি। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ৩০০টি। এরপর মার্চে খুন ৩১৬টি, এপ্রিলে ৩৩৮টি, মে মাসে ৩৪১টি। আর গত জুনে খুনের মামলা ছিল ৩৪৪টি। আবার ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেও খুনের মামলা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। যেমন- ২০২০ সালে সারা দেশে খুনের মামলা ছিল ৩ হাজার ৫৩৯টি, ২০২১ সালে ৩ হাজার ২১৪টি, ২০২২ সালে ৩ হাজার ১২৬টি এবং ২০২৩ সালে ৩ হাজার ২৩টি মামলা হয়।

এরপর ২০২৪ সালে সাধারণ খুনের ঘটনার পাশাপাশি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নির্বিচার গুলি চালানো হয়। এতে বছরটিতে খুনের মামলার সংখ্যা অনেকটা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ১১৪। আবার অনেক পুরোনো খুনের ঘটনাতেও গত বছর মামলা হয়। ফলে অপরাধ পরিসংখ্যানে বিগত খুনের মামলাগুলোও যুক্ত হয় বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে। কিন্তু চলতি বছরে এসেও অতীতের চেয়ে খুনের মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। যেমন- ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চার বছরে মোট খুনের মামলা ১২ হাজার ৯০২টি। সেই হিসাবে চার বছরে প্রতি মাসে গড়ে খুনের মামলা হয় প্রায় ২৬৯টি। এই সময়ে (চার বছর) প্রতি ছয় মাসে গড়ে খুনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ৬১৩টি। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে মোট খুনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ৯৩৩টি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মূল ভূমিকায় থাকা পুলিশ সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও থেমে নেই। কেবল গত ছয় মাসে পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ৩২৯টি মামলা হয়েছে। ছয় মাসের গড় হিসাবে এই সংখ্যাও বিগত বছরগুলোর চেয়ে তুলনামূলক বেশি। ২০২০ সালে এমন মামলা ছিল ৪৪৯টি, ২০২১ সালে ৬০৮টি, ২০২২ সালে ৬০১টি, ২০২৩ সালে ৬০৭টি এবং ২০২৪ সালে ৬৪২টি।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৯৩০ জন খুন হয়েছে। প্রতি মাসেই খুনের সংখ্যা বেড়েছে। জানুয়ারিতে ২৯৪ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০ জন, মার্চে ৩১৬ জন, এপ্রিলে ৩৩৬ জন, মেতে ৩৪১ এবং জুন মাসে ৩৪৪ জন মানুষ খুন হয়েছে। এ ছাড়া গত ছয় মাসে সারা দেশে ৩৬৬টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৫৩৮টি। এই সময়ে ৫১৬ জন অপহরণ, ৩২৯ জন পুলিশ লাঞ্ছিত এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ১১ হাজার ৮টি ঘটনা পুলিশের কাছে নথিভুক্ত হয়েছে।

এদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গবেষক, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের সংগঠন সিটিজেন ইনিশিয়েটিভ। এতে সিটিজেন ইনিশিয়েটিভের চেয়ারম্যান ও নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়; কাতারের সহকারী অধ্যাপক ড. হাসান মাহমুদ এবং সেক্রেটারি কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক তাইয়িব আহমেদ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক কোন্দল ও সহিংসতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সারা দেশে অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ মীমাংসায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চর্চা নিশ্চিত করার এবং সহিংসতা পরিহার করার জোর আহ্বান জানান তারা।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ সদর দপ্তর সাধারণত মামলার হিসাব দিয়ে অপরাধ পরিসংখ্যান তৈরি করে থাকে। এজন্য এই পরিসংখ্যান দিয়ে সব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না। পুলিশ মামলা নিতে অনীহা দেখালে পরিসংখ্যানেও অপরাধ কম দেখায়। তবে এই পরিসংখ্যান থেকে সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, নৃশংস অনেক ঘটনা আশপাশের মানুষ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন। এসব ঘটনায় কেউ প্রতিরোধ করছেন না কারণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে আক্রান্ত হলে তার পাশে কেউ দাঁড়াবে না। এ অবস্থায় যে যার মতো করে ভালো থাকার চেষ্টার ফলে সমাজে নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। পরিসংখ্যান দিয়ে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নৃশংসভাবে খুন ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো ব্যাপকভাবে সামনে আসছে। দেশের মানুষের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা বেড়েছে। এটিই অপরাধ পরিস্থিতির নেতিবাচক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। মানুষ নিরাপদ কিনা সেটি বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি স্বীকার করে সরকারকে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

খুঁজুন