শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
ধর্ম কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হাদিস স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল

কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হাদিস স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল

হাদিস রচনা করা হয় উমাইয়া আমলে। আব্বাসীয় আমলে শেষ হয়। উমাইয়ারা ছিল আহলে বাইয়াতের প্রতিপক্ষ। কিন্তু তারা তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়ার সাহস পায়নি। উমাইয়াদের সমর্থনে হাদিসের জন্ম দেয়া হয়। তাদের নিজেদের স্বার্থে রসূলকে (সা.) কখনো যুদ্ধবাজ, কখনো হিংসুক, কখনো অত্যাচারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। 

 কুরআনে কোনো অস্পষ্টতা থাকলে অথবা কোনো বিষয়ের সমাধান না থাকলে হাদিস তালাশ করতে হবে। কুরআনে সমাধান পেয়ে গেলে হাদিসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হাদিস স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল। সাংঘর্ষিক হলে হাদিসকে কুরআনের সামনে মেলে ধরতে হবে এবং কুরআন সার্টিফাই না করলে বাতিল। হাদিস নিয়ে প্রায়ই কথা হয়। অনেকে মনে করেন, হাদিস অপ্রয়োজনীয় এবং হাদিস দিয়ে কুরআনের দিকনির্দেশনা ঢেকে দেয়া হয়েছে। আরো বলা হয় যে, রসূল (সা.) হাদিস সংগ্রহ ও সংকলন করতে বলেননি। তারপরও রসূলের ওফাতের প্রায় আড়াই শো বছর পর হাদিস সংগ্রহ শুরু হয়। হাদিস সংগ্রহ করায় আমাদের মুসলিম সমাজ ইমাম ইসমাঈল বুখারীকে অতি মানবের মর্যাদা  দেয়। ইমাম বুখারী একা হাদিস সংগ্রহ করেছেন তা নয়, আরো অনেকে হাদিস সংগ্রহ ও সংকলন করেছেন। হাদিস সংগ্রহকারীদের অধিকাংশ তাদের নামে তাদের সংকলিত হাদিস গ্রন্থের নামকরণ করেছেন। মুসলিম সমাজ মোট ৬ জন হাদিস সংগ্রাহককে উচুঁ মর্যাদা দেয়। তারা হলেন ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম বিন হাজ্জাজ, ইমাম নাসাঈ, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আস-তিরমিজী এবং ইমাম ইবনে মাজাহ। তাদের সংগৃহীত হাদিস গ্রন্থ ‘সিহাহ সিত্তা’ হিসেবে পরিচিত। সিহাহ সিত্তার অন্তর্ভুক্ত হাদিস গ্রন্থগুলো হলো: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে নাসাঈ, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে আল-তিরমিজী ও সুনানে ইবনে মাজাহ। সিহাহ সিত্তায় মোট ২৮ হাজার হাদিস স্থান পেয়েছে।  কোথাও কোথাও একই গ্রন্থে একই হাদিস দু-তিনবার এসেছে। ইমাম বুখারী হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন প্রায় ৬ লাখ।

 ৬ লাখ থেকে তিনি এক লাখ হাদিস বাছাই করেন। এক লাখ থেকে তিনি সহীহ বুখারীতে স্থান দিয়েছেন প্রায় সাড়ে ৬ হাজার হাদিস। সব সিদ্ধান্ত তিনি একাই নিয়েছেন। অন্যরা ইমাম বুখারীকে অনুসরণ করেছেন। হাদিস সংগ্রহ ও সংকলনে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও অনিচ্ছা এবং সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়েছে। ইসলামকে আমরা সহজ-সরল মনে করলেও হাজার হাজার হাদিস মুসলিম জীবনকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। রসূল (সা.) বিদায় হজ্জে আমাদেরকে আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন অনুসরণ করার কথা বলে গিয়েছেন। গাদিরে খুমে তিনি আল-কুরআন ও আহলে বাইয়াতকে রেখে যাওয়ার কথা বলে গিয়েছেন। কিন্তু একদল পথভ্রষ্ট লাক রসূলের এ বিশুদ্ধ হুকুমকে আড়াল করে আল-কুরআনের পাশাপাশি রসূলের সুন্নাহ অনুসরণে মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিকে বর্ণিত একটি দুর্বল হাদিস দাঁড় করিয়েছে। সমাজ জীবনে ভালোভাবে তাকালে দেখা যাবে, সবাই হাদিসের পেছনে ছুটছে। ওয়াজে বলেন, বাহাসে বলেন, ইজমা-কিয়াসে বলেন, মাছয়ালা-মাসায়েলে বলেন সব জায়গায় হাদিসের রেফারেন্স খোঁজা হয়। কিন্তু কেউ কুরআন খুঁজতে যায় না। কুরআন অনুযায়ী ফয়সালা করে না। কেউ কেউ বলেন যে, মহান আল্লাহ আল-কুরআনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআনের ব্যাখ্যাকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 তাই আমরা কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদিস মানি। তবে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক ও কুরআনের অতিরিক্ত কোনো বক্তব্যকে হাদিস বলে মানা যায় না। আর তা হাদিস নামে প্রচলিত থাকলেও মূলত নবীজির হাদিস নয়। কেননা নবীজি কখনো কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বক্তব্য দিতে পারেন না। এছাড়া কুরআন ও হাদিস উভয়ই মহান আল্লাহর ওহী। আল্লাহ তায়ালার মতো মহান বিধায়ক দুই ধরনের ওহীতে পরস্পরিক সাংঘর্ষিক বক্তব্য দিতে পারেন না। আর নবীজি কুরআনের অতিরিক্ত বক্তব্যও দিতে পারেন না। কেননা কুরআন পরিপূর্ণ অনন্য এক মহাগ্রন্থ। এ কথা যথার্থ যে, বিশুদ্ধ হাদিসের বক্তব্যের সাথে কুরআনের বক্তব্যের কোনো সংঘর্ষ নেই। যা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক তা হাদিসে নববী হতে পারে না। কুরআন ও হাদিস উভয়ই একটিমাত্র সোর্স থেকে এসেছে। উভয়ই আল্লাহ প্রেরিত ওহী। মহান আল্লাহ কখনো বান্দার নিকট সাংঘর্ষিক বক্তব্য নাজিল করতে পারেন না।

 হাদিস আমাদের জীবনকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে। শুধু কি সিহাহ সিত্তাহ? আরো ৪৩টি হাদিস গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। সেগুলো হলো: (১) সহীহ ইবনে খুজাইমা (২) সহীহ ইবনে হাব্বান (৩) সহীহ ইবনে ওয়ানা (৪) সহীহ ইবনুল সাকান (৫) সহীহ মোস্তকা (৬) মুখতাসারেজিয়া (৭) সহীহ জুরকানি (৮) সহীহ ইসফাহানি (৯) সহীহ ইসমাঈলী (১০)  মোস্তাদরাক ইবনে হাকিম (১১) মসনদেমাম আজম (১২) মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক (১৩) মুয়াত্তায়ে ইমাম মুহাম্মদ (১৪) কিতাবুল আসাব (১৫) কিতাবুল খারাজ (১৬) কিতাবুল হেজাজ (১৭) কিতাবুল আমালী (১৮) মসনদে শাফেয়ী (১৯) মসনদে আবু ইয়ালী (২০) মসনদে আবদুর রাজ্জাক (২১) মুসান্নাফে আবু বকর ইবনে আবি শায়বী (২২) মসনদে আবদ ইবনে হুমায়েদ (২৩) মসনদে আবু দাউদ তায়লাসী (২৪) সুনানে দারে কুতনী (২৫) সুনানে দারেমী (২৬) সুনানে বায়হাকী (২৭) মারেফাতু সুনানে বায়হাকী (২৮) মায়ানিজুল আছার আছাবী (২৯) মুশফিকিজুল আছার তাহাবী (৩০) মুজামুল কবীর তিবরানী (৩১) মুজামুল আওসাত তিবরানী (৩২) মুজামুস সগীর তিবরানী (৩৩) কিতাবুল ইতিকাদ (৩৪) কিতাবুদ দোয়া (৩৫) মসনদে হারেস ইবনে উমামা (৩৬) মসনদে বাজ্জাজ (৩৭) সুনানে আবি মুসলিম (৩৮) সুনানে সাঈদ বিন মনছুর (৩৯) শরহুস সুন্নাহ (৪০) শেফা (৪১) হুলহায় (৪২) তাহাজীবুল আছার (৪৩) আল-মুখাতারা।  

  এক জীবনে কি কারো পক্ষে এতগুলো হাদিসের গ্রন্থ পাঠ করা সম্ভব? পাঠ করা তো দূরে থাক, অনেকে হয়তো নামও শোনেননি। হাদিস সংগ্রহের যুক্তি হিসেবে বলা হয়, হাদিস না থাকলে আমরা নামাজ আদায় করতাম কিভাবে? এ প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়, হাদিস সংগ্রহের আগে আড়াই শো বছর মুসলমানরা নামাজ পড়তো কিভাবে? মুসলমানরা কিভাবে নামাজ পড়বে, কিভাবে রোজা রাখবে, কিভাবে ইফতার করবে, কিভাবে অজু করবে, কিভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা করবে, এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দানে রসূল তার উত্তরাধিকারী হিসেবে হযরত আলীকে রেখে যান। কিন্তু আমরা রসূলের উত্তরাধিকারীকে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ না দিয়ে নিজেরা খিলাফত দখল করেছি। এজন্য আমাদের মধ্যে গোলমাল। রসূলের পরিবারকে বাদ দিয়ে সুন্নাহ অনুসরণের চিন্তা করা যায় না। কিন্তু অবাস্তব হলেও আমরা রসূলের পরিবারকে বাদ দিয়ে ইসলাম অনুসরণ করছি। 

 কুরআনে সূরা বাকারার ২২২ নম্বর আয়াতে হায়েজকালে স্ত্রীদের কাছ থেকে দূরে থাকার এবং পবিত্র না হওয়া নাগাদ তাদের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করা হয়েছে। ‘তারা আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে রক্তস্রাব সম্বন্ধে। আপনি বলুন: তা অশুচি। কাজেই রক্তস্রাব অবস্থায় তোমরা স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাকবে এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না। সুতরাং যখন তারা উত্তমরূপে পরিশুদ্ধ হবে তখন তোমরা তাদের কাছে ঠিক সেভাবে গমন করবে যেভাবে আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সূরা আল-বাকারা ২/২২২)

  অন্যদিকে, সহীহ বুখারীর ৩০০, ৩০২ ও ৩০৩ নম্বর নম্বর এবং সহীহ মুসলিমের ৫৭২ নম্বর হাদিসে হযরত আয়েশার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, রসূলের স্ত্রীদের কেউ হায়েজ অবস্থায় থাকলে রসূল তাকে ইজার পরার নির্দেশ দিতেন এবং তারপর তার সাথে মেলামেশা করতেন। সহীহ বুখারীর ৩০০ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে: ‘আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এবং তিনি আমাকে নির্দেশ দিলে আমি ইজার পরে নিতাম। আমার হায়েজ অবস্থায় তিনি আমার সাথে মিশামিশি করতেন।’ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত এ হাদিস শুধু অশ্লীল, অশোভন ও অরুচিকর নয়, পুরোপুরি কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক। কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে আমরা কি হাদিস মানতে পারি? সহীহ বুখারীর ৩০৩ নম্বর হাদিসে বলা হয়, ‘মাইমুনা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ তার কোনো স্ত্রীর সাথে হায়েজ অবস্থায় মিশামিশি করতে চাইলে তাকে ইজার পরতে বলতেন।’ 
حَدَّثَنَا أَبُو النُّعْمَانِ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ، قَالَ حَدَّثَنَا الشَّيْبَانِيُّ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ شَدَّادٍ، قَالَ سَمِعْتُ مَيْمُونَةَ، كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا أَرَادَ أَنْ يُبَاشِرَ امْرَأَةً مِنْ نِسَائِهِ أَمَرَهَا فَاتَّزَرَتْ وَهْىَ حَائِضٌ‏.‏ وَرَوَاهُ سُفْيَانُ عَنِ الشَّيْبَانِيِّ‏.‏‏
 সূরা আহকাফের ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ‘বল আমি তো নতুন রসূল নই। আমি জানি না আমার সাথে কী আচরণ করা হবে এবং আমি এটাও জানি না যে, তোমাদের সাথে কী আচরণ করা হবে।’ এ আয়াত অনুসারে দেখা যাচ্ছে, পরকালে রসূলের (সা.) সাথে কী আচরণ করা হবে তা তিনি জানেন না। এ আয়াতে তো একথাও বলা হয়নি যে, রসূল (সা.) পরকালে জান্নাতে যাবেন অথবা রসূলকে জীবিত অবস্থায় জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়নি। পরকালে রসূলের ভাগ্য অনিশ্চিত হলে আশারায়ে মুবাশ্বারার হাদিস অনুযায়ী আবু বকরসহ ১০ জন সাহাবী জীবিত অবস্থায় জান্নাতের সুসংবাদ পান কিভাবে? 

মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড প্রশ্নে কুরআন ও হাদিসে দ্বিমত  
কুরআনের মূল পাঠ্যে সরাসরি মুরতাদের (ধর্মত্যাগকারী) মৃত্যুদণ্ডের কোনো কথা বলা নেই। কুরআনে ধর্মত্যাগের পার্থিব শাস্তির কথা না থাকলেও পরকালীন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যেমন সূরা আল-বাকারা, আয়াত নম্বর ২১৭), সূরা আলে ইমরান, আয়াত নম্বর-৮৫ এবং সূরা নাহল, আয়াত নম্বর-১০৬-এ উল্লেখ আছে যে, যারা ইসলাম ত্যাগ করে কুফরী অবস্থায় মারা যাবে, তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তারা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের আগুনে শাস্তি পাবে। কোনো ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হত্যা করা যায় না। ইসলামী আইন অনুযায়ী তাকে তওবা করার সুযোগ দেয়া হয়। তিন দিন পর্যন্ত তাকে সুযোগ ও সময় দেয়া হয় যাতে সে ইসলামে ফিরে আসতে পারে। সূরা তওবার ৭৪ নম্বর আয়াতে কাফেরের শাস্তি আখেরাতের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অন্যত্র কাফেরের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় কোথাও কোথাও মুরতাদের শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড বলে উল্লেখ করা হয়। কাফের এবং মুরতাদের প্রকৃতি একই রকম নয়। যে কখনো ঈমান আনেনি সে কাফের। আর যে ঈমান আনার পর ধর্ম ত্যাগ করে সে মুরতাদ। তবে মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড প্রশ্নে কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট দ্বিমত দেখা যায়। কুরআন অনুযায়ী মুরতাদের শাস্তি দেবেন আল্লাহ।   

  কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ স্বীয় দ্বীন হতে ফিরে যায় এবং কাফের রূপে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়। তারাই দোজখবাসী। সেখানে তারা স্থায়ী হবে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত নম্বর-২১৭)। 

‘কোনো ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীনের অনুসরণ করতে চাইলে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত নম্বর-৮৫)

‘যারা কুফরি করে তাদের ধনৈশ্চর্য ও সন্তান সন্ততি আল্লাহর নিকট কখনো  কোনো কাজে আসবে না। তারাই দোজখবাসী। সেখানে তারা স্থায়ী হবে।’ (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত নম্বর-১১৬)। 

‘তারা আল্লাহর শপথ করে যে, তারা কিছুই বলেনি। কিন্তু তারা তো কুফরির কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কাফের হয়েছে। কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দেবেন।’ (সূরা তওবা, আয়াত নম্বর-৭৪)।

‘কেউ ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরির জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আপতিত হবে আল্লাহর গজব এবং তার জন্য আছে মহাশাস্তি।’ (সূরা নাহল, আয়াত নম্বর-১০৬)। 

‘হে মু‘মিনগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ দ্বীন হতে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং যারা তাকে ভালোবাসবে।’ (সূরা মায়েদা, আয়াত নম্বর-৫৪)।   
 
‘আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি নিজের ধর্ম থেকে ফিরে যায়। আর সে অবিশ্বাসী অবস্থায় মারা যায়, তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের সকল নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে। তারা হলো জাহান্নামের অধিবাসী। তারা চিরকাল সেখানে থাকবে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত নম্বর-২১৭)। 
অন্যদিকে হাদিসে মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড উল্লেখ করা হয়েছে। বুখারী ও মুসলিম: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম ব্যক্তির রক্তপাত বৈধ নয়। তবে তিনটি কারণে তা বৈধ: বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচার, জীবনের বিনিময়ে জীবন (খুন) এবং ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।

  সহীহ বুখারীর ৬৮৭৮ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আবদুল্লাহ (রা.) থেকে  বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। তিনটি কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। (যথা) জানের বদলে জান, বিবাহিত ব্যভিচারী, আর নিজের দ্বীন ত্যাগকারী মুসলিম জামাআত থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া ব্যক্তি।’

 সহীহ বুখারীর ৩০১৭ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, ‘ইকরামা (রহ.) থেকে বর্ণিত। আলী (রা.) এক সম্প্রদায়কে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। এ সংবাদ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসের (রা.) নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, ‘যদি আমি হতাম, তবে আমি তাদেরকে জ্বালিয়ে ফেলতাম না। কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আল্লাহর আজাব (আগুন) দিয়ে কাউকে আজাব  দেবে না। বরং আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে লোক তার দ্বীন বদলে ফেলে, তাকে হত্যা করে ফেল।’

 সুনানে আবু দাউদ হাদিস নম্বর ৪৩০০-এ বলা হয়েছে, ‘আহমদ ইবন মুহাম্মদ (রহ.) .... ইকরামা (রহ.) থেকে বর্ণিত যে, আলী (রা.) ঐ সব লোকদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন, যারা মুরতাদ হয়েছিল। এ সংবাদ ইবনে আব্বাসের (রা.) নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন: যদি আমি তখন সেখানে উপস্থিত থাকতাম, তবে আমি তাদের আগুনে জ্বালাতে দিতাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমরা আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তির (বস্তু) দ্বারা কাউকে শাস্তি দেবে না। অবশ্য আমি তাদেরকে আল্লাহর রসূলের নির্দেশ মতো হত্যা করতাম। কেননা, তিনি বলেছেন: যদি কেউ দ্বীন পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তবে তোমরা তাকে হত্যা করবে।’

ব্যভিচারের শাস্তি নিয়ে কুরআন ও হাদিসে দ্বিমত
ইসলামে ব্যভিচারী পুরুষ ও মহিলাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার শাস্তি নিয়ে কুরআন ও হাদিসে দ্বিমত খুঁজে পাওয়া যায়। কুরআনে বলা হয়েছে:  ‘ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবান্বিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাসী হও। আর মু’মিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সূরা নূর, আয়াত নম্বর-২)

 অন্যদিকে, সহীহ বুখারীতে ১৩২৯ নম্বর হাদিসে বলা হয়, ‘আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ইহুদিরা তাদের এক পুরুষ ও এক স্ত্রীলোককে হাজির করল, যারা ব্যভিচার করেছিল। তখন তিনি তাদের উভয়কে রজমের (পাথর নিক্ষেপে হত্যা) নির্দেশ দেন। মসজিদের পাশে জানাযার স্থানের নিকটে তাদের দুজনকে রজম করা হল।’

 সহীহ মুসলিমের ৪৩২৯ নম্বর হাদিসে বলা হয়, ‘হাকাম ইবনু মূসা আবু সালিহ (রহ.) নাফির মাধ্যমে ..... আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একজন ইহুদি পুরুষ এবং একজন ইহুদি মহিলাকে আনা হল, যারা উভয়েই ব্যভিচার করেছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছে গেলেন এবং তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা তাওরাতে ব্যভিচারী ব্যক্তির শাস্তি কী পেয়েছ? তারা বলল, এতে আমরা উভয়ের মুখমণ্ডলে কালি লাগিয়ে দেই এবং উভয়কে বিপরীতমুখী করে উটের উপর উঠিয়ে পরিভ্রমণ করাই। (এ হল তাওরাতে বর্ণিত শাস্তি) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তোমরা তাওরাত কিতাব নিয়ে এসো, যদি তোমরা এ ব্যাপারে সত্যবাদী হয়ে থাক। তারা তখন তাওরাত কিতাব নিয়ে এলো এবং পাঠ করতে শুরু করল। যখন رجم (ব্যভিচারের শাস্তি) এর আয়াত নিকটবর্তী হল তখন যে যুবকটি তাওরাত পাঠ করছিল সে আপন হাত آيَةِ الرَّجْمِ (পাথর নিক্ষেপের আয়াত) এর উপর রেখে দিল এবং রক্ষিত হাতের আগের-পেছনের অংশ পাঠ করলো।

 তখন রাসূলুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু সালামকে (রা.) (একসময় তাওরাতের হাফেজ ও বিখ্যাত ইহুদি পণ্ডিত) আবদুল্লাহ ইবনু সালাম) লক্ষ্য করে বললেন, আপনি তাকে নির্দেশ করুন যেন সে আপন হাত উঠিয়ে ফেলে। সে তার হাত উঠিয়ে নিল। হঠাৎ দেখা গেল যে, তার নিচেই آيَةِ الرَّجْمِ (পাথর নিক্ষেপের আয়াত) রয়েছে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়কে পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন। সুতরাং উভয়কে পাথর মারা হল। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বলেন যে, যারা উভয়কে পাথর মেরেছিল, আমিও তাদের মধ্যে একজন ছিলাম। আমি দেখতে পেলাম যে, পুরুষটি মহিলাটিকে পাথরের আঘাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। (অর্থাৎ ভালোবাসার আকর্ষণে নিজেই তার পাথরের আঘাত গ্রহণ করছে)।’

 কুরআনে ব্যভিচারের শাস্তি একশো বেত্রাঘাতের কথা উল্লেখ করা হলেও হাদিসে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার কথা বলা হয়েছে। সহীহ মুসলিমের ৪৩২৯ নম্বর হাদিস পাঠ করলে বুঝা যায় যে, ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড ছিল না। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত থেকে এ নিষ্ঠুর বিধান আমদানি করা হয়েছে। কুরআন ও হাদিসে ব্যভিচারের শাস্তি ভিন্ন। একটির সাথে আরেকটির মিল নেই। তাহলে আমরা দুটির মধ্যে কোনটি মানবো, কুরআনের নাকি হাদিসের? 

নরহত্যা নিয়ে কুরআন ও হাদিসে দ্বিমত
পবিত্র কুরআনে নরহত্যা নিষিদ্ধ। সূূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াত, সূূরা নিসার ৯২ নম্বর আয়াত এবং সূূরা নিসার ৯৩ নম্বর আয়াতে নরহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। ‘এ কারণেই বনি ইসরাঈলের প্রতি এ বিধান দিলাম যে, নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কার্য করা হেতু ব্যতীত কেউ কাউকেও হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকে হত্যা করল। আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।’ (সূূরা মায়েদা আয়াত নম্বর-৩২) 

‘কোনো মু’মিনকে হত্যা করা মু’মিনের কাজ নয়। তবে ভুলবশত হত্যা করলে তা স্বতন্ত্র এবং কেউ কোনো মু’মিনকে ভুলবশত হত্যা করলে এক মুমিন  দাস মুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ করা বিধেয়, যদি না তারা ক্ষমা করে।’ (সূূরা নিসা আয়াত নম্বর-৯২)‘ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মু’মিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম।’ (সূূরা নিসা আয়াত নম্বর-৯৩) 

অন্যদিকে, সহীহ মুসলিমের ৩৮১৩ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে যে, বনি ইসরাইলের যুগে এক লোক ৯৯টি খুন করার পরও ক্ষমা পেয়ে যায়। হাদিসে বলা হয়, ‘আবু সাঈদ সা’দ বিন মালিক বিন সিনান খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের পূর্বে (বনি ইসরাইলের যুগে) একটি লোক ছিল। লোকটি ৯৯টি মানুষকে হত্যা করেছিল। অতঃপর লোকদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে একটি খ্রিস্টান সন্নাসীর কথা বলা হল। সে তার কাছে এসে বলল, ‘সে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে। এখন কি তার তওবার কোনো সুযোগ আছে?’ খ্রিস্টান সন্নাসী বলল, ’না।’ সুতরাং সে (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকেও হত্যা করে একশো পূরণ করল। পুনরায় সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। এবারও তাকে এক আলেমের খোঁজ দেয়া হল। সে তার নিকট এসে বলল যে, ‘সে একশো মানুষ খুন করেছে। সুতরাং তার কি তওবার কোনো সুযোগ আছে?’ আলেম বলল, ’হ্যাঁ আছে! তার ও তওবার মধ্যে কে বাধা সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশ চলে যাও। সেখানে কিছু এমন লোক আছে যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে।

 তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তোমার নিজ দেশে ফিরে যেও না। কেননা, ও দেশ পাপের দেশ।’ সুতরাং সে ব্যক্তি ঐ দেশ অভিমুখে যেতে আরম্ভ করল। যখন সে মধ্য রাস্তায় পৌঁছল, তখন তার মৃত্যু এসে গেল। (তার দেহ-পিঞ্জর থেকে আত্মা বের করার জন্য) রহমত ও আজাবের ফেরেশতা উপস্থিত হলেন। ফেরেশতাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ হল। রহমতের ফেরেশতাগণ বললেন, ’এই ব্যক্তি তওবা করতে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে তার আগমন ঘটেছে।’ আর আজাবের ফেরেশতারা বললেন, ’এ এখনো ভাল কাজ করেনি (এই জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত)।’ এমতাবস্থায় একজন ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে উপস্থিত হলেন। ফেরেশতাগণ তাকে সালিস মানলেন। তিনি ফয়সালা দিলেন যে, ’তোমরা দুই দেশের দূরত্ব মেপে দেখ। (অর্থাৎ এ যে এলাকা থেকে এসেছে সেখান থেকে এই স্থানের দূরত্ব এবং যে দেশে যাচ্ছিল তার দূরত্ব) এই দুয়ের মধ্যে সে যার দিকে বেশি নিকটবর্তী হবে, সে তারই অন্তর্ভুক্ত হবে।’ অতএব তারা দূরত্ব মাপলেন এবং যে দেশে সে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই (ভালো) দেশকে বেশি নিকটবর্তী পেলেন। সুতরাং রহমতের ফেরেশতাগণ তার জান কবজ করলেন।’ সহীহ বুখারীতে আর একটি বর্ণনায় এরূপ আছে যে, ’পরিমাপে ঐ ব্যক্তিকে সৎশীল লোকদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশি নিকটবর্তী পাওয়া গেল। সুতরাং তাকে ঐ সৎশীল ব্যক্তিদের দেশবাসী বলে গণ্য করা হল।’

সহীহতে আরো একটি বর্ণনায় এরূপ এসেছে যে, ’আল্লাহ তাআলা ঐ দেশকে (যেখান থেকে সে আসছিল তাকে) আদেশ করলেন যে, তুমি দূরে সরে যাও এবং এই সৎশীলদের দেশকে আদেশ করলেন যে, তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও। অতঃপর বললেন, ’তোমরা এ দু’য়ের দূরত্ব মাপ।’ সুতরাং তাকে সৎশীলদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশি নিকটবর্তী পেলেন। যার ফলে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হল।’ 
(লেখাটি আমার ‘আহলে বাইয়াত’ থেকে নেয়া।)

খুঁজুন