রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
দেশের খবর মজিদ পাগলার শেষ আশ্রয় বোনের সংসার

মজিদ পাগলার শেষ আশ্রয় বোনের সংসার

উত্তম কুমার মোহন্ত,ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রামঃ

বাস্তব এক ইতিহাস ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন, সেই রক্তের বন্ধন যায়কি কোনদিন খণ্ডন।অচল বৃদ্ধবড় ভাইয়ের প্রতি বিধবা দুইছোট বোনের যে মায়া মমতা ভালোবাসা দেখতে যদি চাও,তাহলে পশ্চিম অনন্তপুর বাকুয়ার ভিটা গ্রামে চলে যাও। জন্মগতভাবে শারীরিক অক্ষমতা সম্পন্ন আব্দুল মজিদ পাগলার(৬৫)শেষ আশ্রয় স্থল তার ছোট দুই বিধবা বোনের ছোট্ট সংসার। সেই সংসারেও উপার্জনক্ষম নেই কেউ।বৃদ্ধ তিন ভাই বোন মিলে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছেন।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের পশ্চিম অনন্তপুর মৌজার বাকুয়ার ভিটা গ্রামের মৃত: মোহাম্মদ আলীর ছেলে, আব্দুল মজিদ পাগলা (৬৫) এলাকার সকলের কাছে মজিদ পাগলা নামে পরিচিত।

সরেজমিনে গিয়ে জানাযায়, আব্দুল মজিদ পাগলা জন্মগত ভাবে শারীরিক অক্ষমতা সম্পন্ন ছিলেন।ছোট বেলা থেকেই ভালোভাবে হাঁটাচলা করতে পারতেন না। শারীরিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ক্ষীণ থাকায় লক্ষ্যেস্থির করে একদিকে হাঁটতে চাইলে অন্যদিকে চলে যেত।লাঠিতে ভর করে কোনরকমে এলাকাতেই চলাফেরা করত। তখন এলাকার লোকজনের নিকট সাহায্য সহযোগিতা ও ভিক্ষাবৃত্তি করে কোন মতেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।এখন বয়োঃবার্ধক্যের ভারে চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে সবমিলে দুর্বিষহবস্থায় বিছানায় শুইয়ে বসে কাটাতে হচ্ছে দিন রজনী। জীবনের অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে কষ্ট করে জীবন যাপন করতেন শেষ বয়সে এসেও ভালো নেই সহদর তিন ভাইবোন। পৈত্রিক ভিটায় মাত্র আট শতাংশ জমিতে তিন সহদরের মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেও উপার্জনক্ষম কেউ নেই। ছোট দুই বোনের  ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়েছে মেয়েরা শ্বশুরালয়ে আর ছেলেরা পৃথক পৃথক ভাবে নিজেদের ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত,কেউ তাদের খোঁজ খবর রাখে না। বয়োবৃদ্ধ তিন ভাইবোন একসাথে অতিকষ্টে দিন যাপন করে বসবাস করছেন। 

০৯(সেপ্টেম্বর)শুক্রবার দুপুরে মজিদ পাগলার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র চারটি টিন দিয়ে তৈরি ছোট একটি ছাপরা ঘর পুরোনো চাটাই দিয়ে তৈরি জীর্ণশীর্ণ বেড়ায় বেষ্টিত ঘরে প্রচণ্ড রোধের তাপে ছাপরার টিন গুলো আগুনের মতো গরম হয়ে ঘরের ভিতরে পর্যন্ত গরম ভাপ ছুটেছে সেই গরমে মজিদ পাগলা ছোট একটা কাঠের চৌকিতে বসে আছে এদিকে শরীর ঘেমে পানি পরছে নিচে।ঘরের ভিতরে আসবাবপত্র বলতে কাঠের চৌকিটি আর ঘরের এক খুটি থেকে আর এক খুঁটিতে রশি টাঙ্গানো তাতেদুই তিনটি ছিরাফাটা ময়লা পরিধানের কাপড় চোপড় আর কিছু নেই। এমতাবস্থায় ঘরের ভিতরে ঢুকতেই অপরিচিত লোক দেখে চমকে উঠলেন তিনি পরে স্থানীয় কয়েক জনকে সঙ্গে দেখতে পেয়ে খুশিতে মলিন ভাবে একটা হাসি দিয়ে ফেললেন।

কেমন আছেন জানতে চাইলে,দুচোখে জল ছলছল হয়ে এলো কিছুক্ষণ পর মজিদ পাগলা অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন কি আর ভালরে ভাই আগোত তাও লাঠিঢোকা দিয়া চলাফেরা করিয়া এলাকার সগার সাথে দেখা কইরব্যার পাইচোং কথাবার্তা কবার পাইচোং এলা আর শরীলোত বল পাংনা ভাই। এক বছর থাকি ঘরোত পরি আচোং ক্যাং করি ভাল থাকোং।ঘরোত সুতি থাইক প্যার আর ভাল লাগে না।সউগ সময় সুতি থাইকতে, থাইকতে অসুখ মনে হয় মোক আরো বেশি করি ঠাশি ধইর ব্যার নাইকচে। তোমাক গুলাক অনুরোধ করি কংরে ভাই যদি মোক কাইও একটা হুইলচেয়ার দান করিল হয় তাহলে মরার আগোত বাইরার আলো বাতাস দেখি শান্তি পানুহয়। একনা দেখরে ভাই কারোটে এখান হুইলচেয়ার নিয়া দিবার পান নাকি। হুইলচেয়ারোত বসি একনা বাইরে গেনুং হয়।

মজিদ পাগলার বিধবা দুই ছোট বোন জামিলা বেওয়া (৫৪) ও ছালেহা বেওয়া (৫২) বলেন, আমার তিন ভাইবোন মিলে পৈত্রিক ভিটে মাটি আট শতাংশ ছাড়া আর কিছুই নাই।এমনিতেই আমাদের দুই বোনের অভাব অনটনে দিন কাটাতে হয় তারপর বড়ভাই অচল অবস্থায় কোথায় ফেলে দেই সব কিছু ত্যাগ করা রায় রক্তের সম্পর্ক তো আর ত্যাগ করা যায় না একেই মায়ের ওদোরে তিন ভাই বোনে ছিলাম। আল্লাহ যতদিন বাঁচে রাখবে ততদিন একসাথে থাকব আমাদের বাবা বেঁচে নাই বাবার মতো বড়ভাই কে শত দুঃখ কষ্টের মাঝেও ফেলে দিবো না।আমাদের দুইবোনের ও বয়স হয়েছে তারপরও অসুস্থ পাগলা ভাইটাকে কষ্ট করে ঘর বাহির করি ঘরে থাকতে থাকতে ভাইটা বাহির হবার জন্য কেঁদে ওঠে ভাইয়ের এতকষ্ঠ আমরা সইতে পারি না কেউ যদি দয়া করে আমাদের অচল পাগলা ভাইটাকে একটা হুইলচেয়ার দান করতো তাহলে ঘর বাহির করতে কষ্ট একটু কম হতো। হুইলচেয়ার থাকলে পাগলা প্রতিবন্ধী ভাইটা সহ-আমাদের দুই বোনের এই বয়সে একটু হলেও কষ্টটা লাঘব হতো।

স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন পরিচালক মোঃ আব্দুল জব্বার (৩৭)পল্লি চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম (৪১) খলিলুর রহমান (৫৪) রফিকুল ইসলাম (৪০) সহ-আরো অনেকে জানালেন মজিদ পাগলা জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধী হত্তয়ায় কর্মক্ষমতা অক্ষম ছিলেন ভিক্ষাবৃত্তি করে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করতেন। যৌবনের একটি সময়ে বিয়েও করেন তিনি।

শারীরিক অক্ষমতার কারণে‌ সেই সংসার জীবনও বেশিদিন টিকে থাকেনি বিয়ের কিছু দিন পর স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান, তারপরে দ্বিতীয় বিয়ের কথা আর কোনদিন ভাবেননি তিনি। এখন বয়োঃবৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরে বাসা বেঁধেছে নানান রোগ চলাফেরা করতে পারে না দিনরাত ঘরের ভিতরে সুইয়ে বসে থাকতে হয়।মজিদ পাগলার আপনজন বলতে বিধবা দুইটি ছোটবোন ছাড়া আর কেউ নেই।বোনদের সংসারের অবস্থা অসচ্ছল তারপরেও রক্তের টানে অচল পাগলা বড়ভাই কে নিজেদের কাছে রেখে দেখা শুনা করছেন। তাদের ও বয়স হয়েছে একসাথে তিন ভাইবোন মিলে দুঃখ কষ্ট সহ্য করে সাথে অতিকষ্টে দিনযাপন করছেন।স্থানীয় অনেক শুভা কাঙ্ক্ষীরাও একই কথা বলেন যে,সমাজের অনেক হৃদয়বান ও দানশীল ব্যক্তিবর্গ আছেন কেউ যদি এই অচল মজিদ পাগলাকে একটা হুইলচেয়ার দান করতো তাহলে বৃদ্ধ তিনভাই বোনের কষ্টটা একটু লাঘব হতো। 

খুঁজুন