মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
দেশের খবর নওগাঁর আম্রপালি আম কে ব্রান্ড ঘোষণা ও জিআই স্বীকৃতির দাবি

নওগাঁর আম্রপালি আম কে ব্রান্ড ঘোষণা ও জিআই স্বীকৃতির দাবি

শহিদুল ইসলাম জি এম মিঠন :

স্বাধে-গন্ধে ও খেতে সুস্বাদু-সুমিষ্টি এবং গুনগতমান ভালো হওয়ায় দেশ সেরা এখানকার আম্রপালি আম। সারাদেশে সুনাম কুড়িয়ে আম্রপালি আমের ব্যাপক সুনাম ছড়িয়েছে বিদেশেও। তাই এই আমকে ব্রান্ডিং হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি জিআই স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

নওগাঁর বদলগাছী, ধামইরহাট, মান্দা উপজেলায় আম্রপালি আম চাষ করা হলেও বরেন্দ্রের সাপাহার, পোরশা, পত্নীতলা ও নিয়ামতপুর উপজেলায় প্রায় ৯০ ভাগ জমিতে এই আম চাষ করা হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আম চাষে উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে সীমান্তবর্তী নওগাঁ জেলা। জেলায় বিভিন্ন জাতের আম চাষ হলেও সবচেয়ে বেশি চাষ হয় আম্রপালি।

নওগাঁ জেলা কৃষি সস্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর ধরে দেশে আমের জন্য সুখ্যাতি পেয়েছে এই জেলা। চলতি বছর নওগাঁ জেলার ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আম চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি আম্রপালি আমের চাষ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আম্রপালি চাষ হয় সাপাহার, পোরশা ও পত্নীতলা উপজেলায়। এছাড়াও নাক ফজলি, ল্যাংড়া বা হাড়িভাঙ্গা, খিরশাপাত, বারি-৪, ব্যানানা ম্যাংগো, নাগফজলি, গৌড়মতিসহ দেশি-বিদেশি ২৪টি জাতের আম চাষ করেছেন চাষিরা।

কৃষি বিভাগ ও ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিকটন আম উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ফলে জেলায় আম কেনা-বেচার হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা থেকে তিন হাজার কোটি টাকা। শুধুমাত্র সাপাহার দুইশ’ আড়ৎদারের মধ্যেমে প্রতিদিন প্রায় তিনশ’ ট্রাক যোগে আম সারাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে।

নওগাঁর সবচেয়ে বড় আমের হাট সাপাহারে। ইতোমধ্যে সাপাহার আমের নতুন রাজধানী হিসেবে সারাদেশে পরিচিত হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, নোয়াখালি,উত্তরাঞ্চল, কুমিল্লসহ সারাদেশ থেকে কয়েকশ’ ব্যবসায়ী এসে প্রতিদিন আম কিনে নিজ নিজ জেলায় আম্রপালি আম পাঠাচ্ছেন। ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, অন্যান্য আমের তুলনায় ‘আম্রপালি’ আম বর্ণে-গন্ধে ও খেতে সুস্বাদু-সুমিষ্টি এবং গুনগতমান ভালো হওয়ায় তাদের লোকসান গুণতে হয়না। সে জন্যেই দিনের পর দিন সাপাহার ও এর আশে পাশ হোটেল ভাড়া করে এই আম কিনছেন।  

বর্তমানে চলছে আম্রপালি আমের ভরা মৌসুম। সাপাহারে চাষিরা প্রতিদিন বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে ভ্যান, ভটভটি ও অটোরিকশায় করে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে এই বাজারে। প্রতিদিন ভোর থেকেই শুরু হয় আম বেচাকেনা। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকাররা আম কিনতে আসেন এই বাজারে। এছাড়াও বারি-৪, ফজলি ও ব্যানানা ম্যাংগো জাতের আম বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এখানে যত আম কেনাবেচা হচ্ছে তার মধ্যে প্রায় ৯৫ ভাগই আম্রপালি আম। আম্রপালি প্রকারভেদে ২০০০ টাকা থেকে ৩৭০০ টাকা, বারি-৪ জাতের আম ২৭০০ টাকা থেকে ৩২০০ টাকা, ফজলি ১৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা এবং ব্যানানা ম্যাংগো ৬ হাজার টাকা মণ হিসাবে বিক্রি হচ্ছে।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবহাওয়া ও মাটির কারণে অন্যান্য আমের থেকে আম্রপালি আমের ফলনও হয় বেশি। সাধারণত আম এক বছর ফলন দেওয়ার পর পরের বছর আর ফলন দেয় না কিন্তু আম্রপালি প্রতিবছর ফলন দেয়। তাছাড়া এই গাছ খুব বেশি লম্বা হয় না। পনেরো বছর পর্যন্ত একটি গাছ থেকে আম সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। এরপর সেই গাছ কেটে আবার নতুন করে আম্রপালি গাছ লাগানো হয়। ফলে ছোট গাছে প্রতি বিঘায় অন্যান্য আমের তুলনায় বেশি আম্রপালি আমের ফলন পাওয়া যায়। বরেন্দ্র এলাকার এঁটেল মাটির এই আম অত্যন্ত সুস্বাদু ও সুমিষ্ট হওয়ায় বাজারে চাহিদা থাকে। ভালো দামও পাওয়া যায়। সাপাহার উপজেলার আশন্দ গ্রামের মনিরুল ইসলাম জানান, তার ১১২ বিঘা জমিতে আমের বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ১১০ বিঘা জমিতেই আম্রপালি আম। আম্রপালি আম খেতে সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা বেশি থাকে। এছাড়াও দাম ভালো পাওয়া যায়। এজন্যই চাষিদের মাঝে চাষের আগ্রহ বেশি থাকে।

সাপাহার উপজেলার চাচাহার গ্রামের আম চাষি ফিরোজ হোসেন বলেন, বর্তমানে আম্রপালি আমের দাম ভালো আছে। এ আম উৎপাদন, বিক্রি, ক্রেতার চাহিদা আর স্বাদ সবদিক মিলিয়ে অন্য কোন আমের সাথে তুলনা করা যায় না।

সাপাহারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর থেকে আম কিনতে আসা শরিফুল ইসলাম বলেন, অনেক জায়গাতে আম্রপালি চাষ হলেও এখানকার আম খেতে খুবই সুস্বাদু। এজন্য রহনপুর থেকে এখানে এই আমটি কিনতে এসেছি। এখান থেকে আম কিনে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, নোয়াখালী, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠাবো। এই আমটা যেখানেই যায়, সবাই নাম করে। এজন্য সাপাহারের আম্রপালি আমের চাহিদা বেশি। ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে আম কিনতে আসা ইকবাল হোসেন বলেন, এ উপজেলার আম্রপালি অত্যন্ত সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। এ আমের সারাদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ ৩৭০০ টাকা মণ চলছে। এখান থেকে কিনে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় সরবরাহ করা হয়। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট এলাকার আম ব্যবসায়ী মাহফুজ আহমেদ জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে সারাদেশে জানতেন আমের রাজধানী বলতে বুঝত ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ’। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মোকাম সারাদেশে রয়েছে। এখানে আম কেনা-বেচা করছেন বেশি ভাগ ব্যবসায়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জের। বিভিন্ন জেলায় যখন সাপাহারের এই আম সরবরাহ করা হয় তখন চালান ফরম কিন্তু সাপাহার হিসেবে পাঠানো হয় না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের চালান ফরম হিসেবে পাঠানো হয়। ফলে প্রচার-প্রচারণার অভাবে সাপাহারের এই অত্যন্ত সুস্বাদু ও সুমিষ্ট আম্রপালি আম কিনলে বিভিন্ন জেলায় পাঠালেও ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ’ জেলায় উৎপাদিত হিসেবে আম্রপালি আম পরিচিত পাচ্ছে। 

অপরপ্রশ্নে এই ব্যবসায়ী আরো জানান, এটি অন্যায় হলেও কিছু করার নেই। নওগাঁ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী এই আমের চালান ফরমে নওগাঁ হিসেবে লিখতে বা তুলে ধরতে প্রধান উদ্যোগ নিতে হবে।

খুঁজুন