শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় ৫লাখ রোহিঙ্গা

অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় ৫লাখ রোহিঙ্গা

মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আরও অন্তত ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছে। এবার কক্সবাজারের উখিয়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতারাই এমন দাবি করছে। যদিও উখিয়া টেকনাফের বাসিন্দারা জানান, সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে রোহিঙ্গারা। প্রতিদিনই এলাকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন রোহিঙ্গা পরিবার। আর প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি পাহারা বসানো হয়েছে। 

মালেক নামের একজন মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর নির্যাতনে পালিয়ে আসার পর অনেক আত্মীয়স্বজন গ্রামে ছিলেন। তাদের গ্রামও ছিল। কিন্তু এখন আরাকান আর্মির দখলে যাওয়ার পর ওই গ্রামটি আর নেই। সেখানে নেই একজন রোহিঙ্গাও। অনেকেই নতুন করে পালিয়ে এসেছেন। আবার অনেকেই পালিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যে এখন রোহিঙ্গাদের গ্রামের কোনো অস্তিত্ব নেই। কোথায় ফিরবে আমরা?

শুধু আবদুল মালেক না, অন্য রোহিঙ্গারাও বলছেন, রোহিঙ্গা সংকটের ৮ বছরে এসে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। এদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির চলা যুদ্ধের কারণে প্রায়ই সীমান্তের ওপারের গ্রামগুলোতে চলছে গোলাগুলি। তা ছাড়া আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের একাধিক সশস্ত্র গ্রুপেরও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে হরহামেশা। এই পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে অনেক রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন। সর্বশেষ শুক্রবার রাত ১১ থেকে গতকাল শনিবার ভোর পর্যন্ত টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে ব্যাপক গোলাগুলি হয়েছে।

এর আগে ১৯ আগস্ট রাতে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যের ‘নারকেল বাগিচা’ এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আরাকান আর্মির দখলে থাকা দুটি সীমান্তচৌকির দখলে নিতে অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী এ হামলা চালায় বলে জানা গেছে। তার ১০ দিন আগেও একই এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত রাখাইন রাজ্য দখলে রাখা মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। গত শুক্রবারও ৬২ জন রোহিঙ্গাকে প্রতিহত করেছে বিজিবি। এখনও সীমান্তের ওপারে হাজারো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায়। 

সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, বেশ কিছুদিন ধরে নতুন করে আরাকান আর্মির অবস্থানে হামলা চালাচ্ছে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা আর্মিসহ (আরআইআর) কয়েকটি গোষ্ঠী। তাতে বেশ কিছু রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে। কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মংডুটাউনশিপের কাছাকাছি নাফ নদের তীরে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। নাফ নদ অতিক্রম করে রোহিঙ্গারা টেকনাফ অনুপ্রবেশের সময় বিজিবির হাতে আটকও হচ্ছে।

উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা মো. হোসাইন বলেন, রাখাইনে এখনও অমানবিক নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ফলে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসা বন্ধ হচ্ছে না। মূলত প্রাণে বাঁচতে তারা এপারে পালিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সীমান্তে বেশকিছু রোহিঙ্গা জড়ো হচ্ছে বলে আমরাও জেনেছি স্বজনদের কাছ থেকে।

তবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবি তৎপর বলে জানিয়েছেন টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, কিছু লোক সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা কাউকে ঢুকতে দিচ্ছি না। যেসব পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছে, সেখানে আমরা টহল বৃদ্ধি করেছি। পাশাপাশি গেল রাতে সীমান্তের ওপার থেকে গোলার শব্দের বিষয়টি জেনেছি। কিন্তু সেটি আমার ইউনিটের বাইরে।

সীমান্তে

গোলাগুলির বিষয়টি স্থানীয় মাধ্যমে জেনেছেন উল্লেখ করে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, সীমান্তে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক রয়েছেন। পাশাপাশি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্থল ও জলপথে বিজিবি-কোস্ট গার্ড শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

থমকে আছে প্রত্যাবাসন

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক তৎপরতা, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, জাতিসংঘের নানা উদ্যোগ কিছুতেই প্রত্যাবাসনের কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। থামেনি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশও। গত দেড় বছরে আরও ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এর মধ্যে আরাকান আর্মি রাখাইন দখলে নেওয়ায় জটিল হয়ে উঠেছে প্রত্যাবাসন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে রাখাইনের ৯০ শতাংশের বেশি এলাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। মিয়ানমার সরকারের হাতে নেই এসব অঞ্চলের ক্ষমতা। যদিও গত বছর থাইল্যান্ডের বিমসটেক সম্মেলনের প্রান্তে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের বৈঠকে নতুন সম্ভাবনা দেখা যায়। তালিকাভুক্ত ৮ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজারকে ফেরত নেওয়ার যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে মিয়ানমার। এরপর কিছুটা আলাপ-আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কার্যত তা আলোচনাতেই বন্দি। এই প্রেক্ষাপটে আজ রবিবার কক্সবাজারে শুরু হতে যাচ্ছে তিন দিনের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। রোহিঙ্গা ইস্যু বিষয়ক হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভের দপ্তর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই সম্মেলনে অংশ নিতে আগামীকাল সোমবার কক্সবাজার আসবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই সম্মেলন ঘিরে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম নিয়ে কিছুটা আশার আলো দেখছেন স্থানীয়রা। যদিও রোহিঙ্গারা খুব এটা আশাবাদী নন।

উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের হোসেন আলী বলেন, আমরা নিরাপত্তা চাই, মর্যাদাসম্পন্ন প্রত্যাবাসন চাই। এখন রাখাইন তো আরাকান আর্মির দখলে, সেখানে কীভাবে নিরাপত্তা পাব?

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আমাদের দায়িত্ব নেবে কে? জান্তা সরকার স্পষ্ট করে বলেনি। নিরাপদ জোন ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই সমাধান নয়।

ক্যাম্পের বাসিন্দা বদরুল ইসলামের মতে, জান্তা সরকার যদি ফেরত নেয়ও, রাখাইনে পাঠাবে। অথচ ওখানে এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, প্রত্যাবাসন কোথায় হবে, কীভাবে হবে, এটা তো পরিষ্কার না। যেখানে রাখাইন রাজ্যই এখন আরাকান আর্মির দখলে। মিয়ানমার সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আবার আরাকান আর্মির বিরোধ রয়েছে। তাদের নির্যাতন ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ হচ্ছে। ফলে প্রত্যাবাসন আলোর মুখ দেখবে কবে বলা যাচ্ছে না। 

খুঁজুন