শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
দেশের খবর পাবনার বেড়ার ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়াম এখন জলাভূমি

পাবনার বেড়ার ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়াম এখন জলাভূমি

পাবনার বেড়া পৌর এলাকার ঐতিহ্যবাহী শহীদ আব্দুল খালেক স্টেডিয়াম এখন পরিত্যক্ত এক জলাভূমি। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাঠে একসময় নিয়মিত বড় বড় ফুটবল ও ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হতো। হাজারো দর্শকে মুখর থাকত মাঠটি। অথচ এখন মাঠজুড়ে নোংরা পানি, দুর্গন্ধ আর অব্যবস্থাপনা ছাড়া কিছুই নেই।

শহীদ আব্দুল খালেক স্টেডিয়ামের অবস্থান বেড়া পৌর এলাকার কাগমাইরপাড়া মহল্লার বেড়া ফাযিল মাদ্রাসার পাশে। বেড়ার ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণ বলতে এই মাঠটিকেই বোঝানো হয়। এটি শুধু বেড়া উপজেলারই নয়, আশেপাশের কয়েক উপজেলার সবচেয়ে বড় খেলার মাঠ। বেড়াবাসী দীর্ঘদিন ধরে এই মাঠে গ্যালারি স্থাপনের দাবি জানিয়ে এলেও তা উপেক্ষিত থেকে গেছে। অথচ অতীতে এই মাঠে গ্যালারি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এই এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা। তবে মাঠে গ্যালারি না থাকলেও এর চারদিকে দাঁড়িয়ে-বসে একসঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার দর্শক খেলা দেখতে পারেন।

এলাকাবাসী জানান, মাঠটি স্থাপনের পর নিয়মিতভাবে এখানে বড় ও বিখ্যাত দলগুলোর অংশগ্রহণে ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন হত। হাজার হাজার মানুষ টিকিট কেটে সেই প্রতিযোগিতা উপভোগ করেছেন। এ ছাড়া বছর জুড়েই আশেপাশের এলাকার ক্রীড়াবিদরা এই মাঠে বিভিন্ন খেলাধুলার চর্চা করতেন। সারা বছরই মাঠ থাকতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও খেলার উপযোগী।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে মাঠটি সংস্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। মাঠের প্রধান ফটকটি ভেঙে গিয়ে খোলা থাকায় আশেপাশের শত শত লোক ঢুকে গিয়ে যেখানে সেখানে প্রস্রাব পায়খানা করছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে মাঠের পূর্ব দিকের দেওয়াল ও রাস্তা ভেঙে পাশের মহল্লার জলাবদ্ধতার নোংরা পানি পুরো মাঠে ঢুকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এই বছরই এ সমস্যাটি প্রকট আকারে দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া মাঠের চারদিকের পরিবারগুলো অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি ও রাস্তা তৈরি করায় এই পানি বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই। প্রায় চার মাস ধরে মাঠে দুই থেকে তিন ফুট পানি জমে থাকায় খেলাধুলা ও অনুশীলনের উপযোগী কোনো অবস্থাই নেই।

এলাকাবাসী জানান, এক সময় নিয়মিতভাবে এই মাঠে দেশের বিখ্যাত দলগুলোর অংশগ্রহণে ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। অথচ গত ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এখানে নিয়মিতভাবে সে ধরনের প্রতিযোগিতা আর হচ্ছে না। তবে দুই থেকে পাঁচ বছর বিরতি দিয়ে এই সময়ের মধ্যে কিছু প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন নোংরা পানিতে মাঠ ডুবে থাকায় ও গোটা মাঠটিই এক ধরনের পাবলিক টয়লেটে পরিণত হওয়ায় বড় প্রতিযোগিতা আয়োজনের যেমন সুযোগ নেই তেমনি শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠে প্রবেশের প্রধান ফটকে ঢুকতেই অসহ্য প্রস্রাবের গন্ধে যে কারও বমি আসার মতো অবস্থা হয়। আশপাশের শত শত মানুষ মাঠের প্রবেশপথ থেকে একটু ভিতরে ঢুকে অঘোষিত পাবলিক টয়লেটে পরিণত করেছেন। মাঠের ভেতর প্রায় পুরো জায়গাজুড়ে জলাবদ্ধতা। গোলপোস্টের নিচ থেকে দুই-তিন ফুট পর্যন্ত নোংরা পানিতে ডুবে আছে। আর মাঠের অল্প যে জায়গাটুকু শুকনো রয়েছে সেখানে আশেপাশের এলাকার ট্রাকমালিকেরা অঘোষিত ট্রাকস্ট্যান্ড তৈরি করেছে।

মনজুর কাদের মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাসের শিক্ষক মনোয়ার হোসেন সৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘এই মাঠে প্রায় ১৫ হাজার দর্শক ফুটবল খেলা দেখতে পারতেন। আমার মনে আছে, প্রায় ৩০ বছর আগে আমরা একটি টুর্নামেন্টে ১১ হাজার টিকিট বিক্রি করেছিলাম। প্রতিটি টিকিটের দাম ছিল তিন টাকা। আরও হাজার চারেক শিক্ষার্থী বিনা টিকিটে মাঠে ঢুকে খেলা উপভোগ করেছিল। অথচ আজ এই মাঠের বেহাল চিত্র দেখে বুকটা হাহাকার করে ওঠে।’

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) তালিকাভূক্ত রেফারি শাহনেওয়াজ সাগরের বাড়ি স্টেডিয়ামটির একেবারে কাছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘কয়েক উপজেলার ক্রীড়াঙ্গণের প্রাণকেন্দ্র হলো এই স্টেডিয়াম। এর এমন বেহাল দশা কোনোভাবেই মেনে যায় না। এই মাঠে বেড়ার অসংখ্য শিশু-কিশোর সকাল-বিকালে ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা খেলাধুলায় অংশ নিত। মাঠের অভাবে তারা মোবাইলে আসক্ত হচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ নেশার জগতেও চলে যাচ্ছে। অবিলম্বে মাঠটির সংস্কারকাজ শুরু করা দরকার।’

মাঠটির দেখভালের দায়িত্ব উপজেলা পরিষদের বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোরশেদুল ইসলাম জানান, ‘মাঠটি নিচু বলে বৃষ্টির পানি জমে এতটা জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা পানি নিস্কাশনের উপায় খুঁজছি। এ ছাড়া অন্যান্য সমস্যাগুলোরও সমাধান করে মাঠটি যাতে দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী করা যায় সে ব্যাপারে আমরা চেষ্টা করছি বলেও তিনি জানান।

খুঁজুন