রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে হাজার হাজার পরিবার

পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে হাজার হাজার পরিবার

মুন্সী মো: আল ইমরান: বান্দরবানে ভারী বর্ষণের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে পাহাড়ের পাদদেশ। ফলে যেকোনো মুহূর্তে পাহাড় ধসে ঘটতে পারে প্রাণহানির ঘটনা। এ অবস্থায় আতঙ্কে দিন পার করছে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী ৩০ হাজার পরিবার। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানে প্রায় প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। স্থানীয় প্রশাসন তাদের রক্ষার্থে প্রতি বছর নানা উদ্যোগ নিলেও পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বসবাসকারীদের সরিয়ে আনতে পারেনি। শহরের ইসলামপুর, লাঙ্গিপাড়া, হাফেজ ঘোনা, কালাঘাটা, বনরুপা, ক্যাচিং ঘাটাসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার কয়েক হাজার পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে।

স্থানীয়দের তথ্য মতে, প্রতি বছরই শুষ্ক মৌসুমে পাহাড় কেটে তার পাদদেশে নতুন নতুন বসতি নির্মাণ করা হচ্ছে। পাহাড়ি জমির মূল্য সমতলের তুলনায় কম হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ পাহাড় কেটে সেখানে বসতি নির্মাণ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন। আর বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় নিহতদের বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। স্থানীয়রা জানান, বান্দরবান সদর ছাড়াও লামা, আজিজনগর, ফাসিয়াখালী, ফাইতং, গজালিয়া, রোয়াংছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠেছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছে হাজার হাজার পরিবার। ফলে সেখানে পাহাড় ধসের ঝুঁকি ও মৃত্যুর সম্ভাবনা আগের তুলনায় বেড়ে গেছে।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করে এমন কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, সাত উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তুলেছে ৩০ হাজারের বেশি পরিবার। এ বছর পাহাড়ের পাদদেশে নতুন নতুন বসতি গড় ওঠায় গত বছরর তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও পরিবারের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।

তাদের তথ্য মতে, শুষ্ক মৌসুমে উন্নয়নের নামে পাহাড় কেটে সেই মাটি দিয়ে বিভিন্ন এলাকার সড়কে সৃষ্ট গর্ত ভরাট, নতুন সড়কে মাটি দেওয়াসহ নানা কাজ করা হয়। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে বসতবাড়ি নির্মাণ করা হয়। বর্ষাকালে টানা বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে সেই পাহাড়ের কাটা অংশ ধসে গিয়ে ঘরের ওপর পড়ে। এতে মাটি চাপা পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বিগত বছরগুলোতে এভাবেই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছিল। তবে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীরা জানিয়েছেন তাদের অসহায়ত্বের কথা। তাদের ভাষ্য মতে, বেঁচে থাকার তাগিদে কয়েক বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছেন। সরকার প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি শুরু হলেই মাইকিং করে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলে। তখন পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ঘটনা কেটে গেলে আশ্বাস বাস্তবায়ন হয় না। প্রতি বছর বলা হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।

বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড এলাকার কাসেমপাড়ায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, আমার বাড়িটি পাহাড়ের পাদদেশে। যারা নিচে থাকে তারা প্রভাব দেখিয়ে পাহাড়ের মাটি কেটে ফেলায় আমার বাড়ি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। কালাঘাটায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী নোয়ারা বেগম বলেন, আমরা বাধ্য হয়েই এখানে বসবাস করছি। এ ছাড়া আমাদের যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।

বান্দরবানের মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা, প্রাকৃতিকভাবে ভূমিকম্প এবং অতিবৃষ্টি- এসব কারণে পাহাড়ের মাটির গঠন দুর্বল হয়ে যায়।

এ ব্যাপার বান্দরবান জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কায়েসুর রহমান বলেন, বান্দরবানে বিভিন্ন উপজেলায় ঝুঁকিতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়ে গেছে।

এ অবস্থায় এবার দ্রুত সময়ের মধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরিয়ে না নিলে পাহাড় ধসে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সরকারি তথ্য মতে, ২০০৬ সালে জেলা সদরে তিন, ২০০৯ সালে লামা উপজেলায় শিশুসহ ১০, ২০১০ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় পাঁচ, ২০১১ সালে রোয়াংছড়ি উপজেলায় দুই, ২০১২ সালে লামা উপজেলায় ২৮ ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ১০, ২০১৫ সালে লামায় চার, সিদ্দিকনগরে এক ও সদরের বনরুপা পাড়ায় দুই, ২০১৭ সালের ১৩ জুন সদরের কালাঘাটায় সাত ও রুমা সড়কে ২৩ জুলাই পাঁচ, ২০১৮ সালের ৩ জুলাই কালাঘাটায় এক ও লামায় তিন, ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই লামাতে এক, ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর আলীকদমের মিরিঞ্জা এলাকায় এক ও ২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাইঙ্গ্যা ঝিরিতে এক পরিবারের তিনজন পাহাড় ধসে নিহত হন।

খুঁজুন