সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় পেটের দায়ে পেশা বদলাচ্ছে পরিবহণ শ্রমিকরা

পেটের দায়ে পেশা বদলাচ্ছে পরিবহণ শ্রমিকরা

মইনুল ইসলাম মিতুল : চলমান অবরোধ-হরতালে যানবাহনে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আতঙ্কে নিরূপায় হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন পরিবহণ শ্রমিকরা। এর মধ্যে দূরপাল্লার বাসের শ্রমিকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। জীবন বাঁচাতে বহু শ্রমিক ইতোমধ্যেই পরিবহণের চাকরি ছেড়ে হোটেলে, গার্মেন্টস, গ্যারেজ ও কৃষি কাজে যোগ দিয়েছেন। অনেকে দিনমজুরের কাজও করছেন। অস্থায়ীভাবে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়া শ্রমিকদের সংখ্যা হাজারো হতে পারে। পরিবহণের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনালে শিপন (২৩) নামের এমনই এক পরিবহণ শ্রমিকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বলেন, অভাবের তাড়নায় বাসের হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করি। দুই মাস আগে ঢাকা-ময়মনসিংহ-ঢাকা রুটে যাতায়াতকারী সৌখিন পরিবহণের হেলপার হিসেবে যোগ দেই। দিনে একটি ট্রিপ দেওয়া যায়। আবার রাতে আরেকটি ট্রিপ দেই। দুটি ট্রিপে ৮০০ টাকা পাই। এর মধ্যে খাওয়া-দাওয়াসহ অন্যান্য খরচ আছে। সব শেষে কোনো কোনো দিন ৩০০ বা ৪০০ টাকা থাকে। সবদিনই রোজগার সমান হয় না। প্রতিমাসে গড়ে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত থাকে। এই দিয়েই সংসার চলে।

এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলের হরতাল অবরোধ শুরু হলে একেবারে বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়। দূরপাল্লার বাস যাতায়াত করে না বললেই চলে। আর বাস না চললে টাকা রোজগার বন্ধ। কারণ পরিবহণ শ্রমিকরা দিন হাজিরা অনুযায়ী টাকা পায়। ট্রিপ নাই, টাকাও নাই। অবরোধ-হরতালে মালিকরা গাড়ি বের করেন না। উল্টো গাড়ি ভালোভাবে পাহারা দিতে বলেন। অথচ দিন হাজিরার কোনো টাকাও দেন না। শুধু সামান্য দুই বেলা খাওয়ার জন্য মানবিক কারণে টাকা দেন। আবার কোনো কোনো মালিক তাও দেন না বলে পরিচিত অনেক হেলপারের কাছে শুনেছি।

হরতাল-অবরোধ শুরুর আগে গাড়ি যদি টার্মিনালের ভেতরে নিরাপদ জায়গায় পার্কিং করে রাখা যায়, তাহলে তো কথাই নেই। মালিক একেবারে নিশ্চিন্ত থাকেন। কোনো কোনো মালিক সত্যি সত্যিই গাড়ি ভেতরে রাখা হয়েছে কিনা, তা এসে দেখে যান। মালিক বুঝে যান, তার গাড়ি যেহেতু নিরাপদ জায়গায় আছে, সেহেতু গাড়িতে ভাংচুর বা অগ্নিসংযোগের কোনো সম্ভাবনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মালিকই গাড়ি তালা দিয়ে চাবি নিয়ে শ্রমিকদের বাড়ি চলে যেতে বলেন। কারণ হেলপার, সুপারভাইজার ও চালক থাকলে মানবিক কারণে তাদের টাকা দেয়ার বা হাত খরচ দেয়ার বিষয় থাকে। মালিকরা গাড়ি বন্ধ তো সবই বন্ধ। অর্থাৎ পরিবহণ শ্রমিকদের পেছনে বাড়তি টাকা খরচ করতে রাজি নন। এমন পরিস্থিতিতে পরিবহণ শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অন্য গাড়িতে করে ভেঙে ভেঙে বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হন। এছাড়া আর কোনো উপায়ও থাকে না। কারণ থাকলেই খরচ।

 সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি হানিফ খোকন বলেন, পেটের দায়ে অনেক পরিবহণ শ্রমিক হোটেলের বয় হিসেবে কাজ নিয়েছেন। অনেকেই গ্যারেজে কাজ নিয়েছেন। এছাড়া যেসব শ্রমিকের গ্রামের বাড়িতে জমি আছে, তারা কৃষি কাজ করছেন। অনেকেই আবার দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন। এমন অনেক সুপার ভাইজার ও চালককে দেখেছি এই পেশা ছেড়ে আপাতত গ্রামে গিয়ে কৃষি কাজ করছেন। অনেকেই দিনমুজুর বা অটো চালাচ্ছেন। কারণ অনেকের সঙ্গেই পেশাগত কারণে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয়। তারা কে কোথায় কেমন আছে বা কি করছে তা কথা প্রসঙ্গে জানা যায়।

সুপার ভাইজার ও চালকদের এছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই। কারণ একজন সুপার ভাইজার সিঙ্গেল দুই বার আপ-ডাউন করলে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পায়। আর চালক পায় ১৪শ টাকা। গাড়িই যেহেতু চলে না, সে ক্ষেত্রে পরিবহণ শ্রমিকদের রোজগার বন্ধ। এজন্য তাদের অনেকেই গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ ঢাকায় বিভিন্ন বাসের ভেতরে থাকার সুযোগ থাকায় টাকা লাগে না। তবে খাওয়া দাওয়া করতে অনেক টাকা ।

হানিফ খোকনের ভাষ্য মতে, বহু শ্রমিক পরিবহণ সেক্টরের পেশা ছেড়েছেন। কারণ একদিকে রোজগার নেই। আরেক দিকে প্রাণের মায়া। সম্প্রতি যাত্রাবাড়িতে পার্কিং করে রাখা একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে বাসের ভেতরে থাকা হেলপার জীবন্ত পুড়ে মারা যান। সবারই প্রাণের মায়া আছে। দূরপাল্লার বাসে ভয় আরও বেশি। কারণ রাতে বাস চলাচল করে। কে কোথা থেকে অন্ধকারের মধ্যে বাসে আগুন বোমা ছুড়ে মারবে, তার কোনো হদিস নেই। বাস মালিকের বাস পুড়ে যাবে। আর যাত্রী, হেলপার, সুপারভাইজার ও চালকের জীবন যাবে। চোরাগোপ্তা হামলা করে বাসে আগুন দেওয়ার কারণে পরিবহণ মালিকরা রাস্তায় বাস বের করতে চান না। আর শ্রমিকরাও জীবনের মায়ায় যানবাহন চালানোর সাহস পাচ্ছেন না।

অনেকটা কষ্টেই হানিফ খোকন বলছিলেন, সবারই তো জীবনের মায়া আছে! যাত্রীরা প্রাণের ভয়ে বাসে উঠেন না। বেঁচে থাকলে কিছু না কিছু করে জীবন পার করতে পারবে। ঘরে পিতা-মাতা ভাই বোন আছে।

পরিবহণ শ্রমিক লীগের তথ্য মতে, সারা দেশে পরিবহণ শ্রমিকের সংখ্যা এক কোটির উপরে। দূরপাল্লার প্রতিটি বাসে কমপক্ষে তিনজন করে শ্রমিক থাকেন। চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার। তবে মালবাহী যানবাহনে শ্রমিকের সংখ্যা আরও বেশি। আর লেগুনা, হিউম্যান হলারে দুজন করে শ্রমিক থাকেন।

গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাবেশে ব্যাপক নাশকতার ঘটনা ঘটে। ওইদিন অনেক যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের কবলে পড়ে। এরপর থেকে বিএনপি-জামায়াত দেশব্যাপী অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচিতে যানবাহনে চোরাগোপ্তা হামলার ঘটনা ঘটছে। যাত্রীবাহী বাস বা মালবাহী কাভার্ড ভ্যান ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন হামলাকারীদের মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের কবলে পড়েছে। হতাহত হয়েছেন যাত্রী, চালক, সুপারভাইজার, হেলপারসহ পরিবহণ সংশ্লিষ্ট অনেকেই। এমন পরিস্থিতিতে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে রীতিমত আতঙ্ক বিরাজ করছে। যে কারণে অবরোধ বা হরতালের দিন দূরপাল্লার বাস বা অন্যান্য যানবাহন চলাচল করছে না বললেই চলে। যেসব যানবাহন চলাচল করছে, তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিতান্তই পেটের দায়ে যানবাহন নিয়ে রাস্তায় বের হচ্ছেন।

পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, পুলিশ ও র‌্যাবের তরফ থেকে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দিলেও পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি হয়নি। আতঙ্কে পরিবহণ মালিকরা যেমন রাস্তায় যানবাহন বের করছেন না, তেমনি পরিবহণ শ্রমিকরাও জীবনের মায়ায় রাস্তায় যানবাহন নিয়ে বেরুতে সাহস পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য মতে, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সারা দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৫৭ লাখ ৪২ হাজার। অনিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা লাখ লাখ। যার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। যদিও ২০২১ সালে জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ। সারা দেশে ১১ হাজার ৭০৮ কিলোমিটার মহাসড়ক রয়েছে। মহাসড়কে নিয়মিত যাতায়াতকারী দূরপাল্লার যানবাহনের সংখ্যা ২১ লাখের বেশি।

খুঁজুন