শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
প্রবাস প্রবাস জীবনের দায়, সংলাপ ও স্মৃতির পাতায় একটি দিন

প্রবাস জীবনের দায়, সংলাপ ও স্মৃতির পাতায় একটি দিন

নুরুল ওয়াহিদ লেখক,সাংবাদিক :

 প্রবাস জীবন মানেই দায়িত্ব, সংগ্রাম, আত্মনির্ভরতা ও সীমিত সুযোগের মধ্যে দেশের প্রতিনিধিত্ব। সময়ের অভাবে অনেক কিছুই পরিকল্পনা অনুযায়ী হয় না। তবে কখনো কখনো এমন কিছু উদ্যোগ কিংবা আমন্ত্রণ আসে, যা না বলে উপায় থাকে না। তেমনই একটি অভিজ্ঞতা হলো ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট, বাংলাদেশ দূতাবাস, মাদ্রিদ আয়োজিত ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবস’-এ অংশগ্রহণ ও আলোচনা সভায় যোগদান। বাংলাদেশ দূতাবাসের আয়োজনে রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবসে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ এসেছে। আমার শহর বার্সেলোনা থেকে মাদ্রিদের দূরত্ব প্রায় ৬০০ কিলোমিটার, কিন্তু স্পেনের উন্নত রেলপথ ও AVE হাই-স্পিড ট্রেনের কারণে এই যাত্রা সম্ভব মাত্র তিন ঘণ্টায়। সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগেনি তাই এই সংক্ষিপ্ত সফর। 

সকাল ৮টা। AVE ট্রেনে উঠলাম। জানালার পাশের আসনে বসে মনে হলো, এ শুধু ভ্রমণ নয়, একধরনের দায়িত্বও বটে। দূতাবাসের আয়োজনে ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবস’ মাদ্রিদে পৌঁছে প্রথমে বাংলাদেশি পাড়া খ‍্যাত লাভাপিয়াসে স্পেন
আড্ডা,হালকা খাওয়া দাওয়া এর পর সরাসরি বাংলাদেশ দূতাবাসে। প্রবাসী শ্রমিক, ব্যবসায়ী,
চাকরিজীবী—যাঁরা দিনের পর দিন রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, তাঁদের সম্মান জানাতে এ আয়োজন সত্যিই সময়োপযোগী। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের বক্তব্য, প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা, কিছু সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা সব মিলিয়ে এক আবেগঘন পরিবেশ। অনেক দিন পর প্রবাসে একটি আয়োজনে এই পরিমাণ পরিচিত মুখ একসঙ্গে। পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হওয়া, কুশল বিনিময়, পুরোনো দিনের কথা স্মরণ সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল একধরনের মিলনমেলা। অনুষ্ঠান পুর্বে বাংলাদেশ সরকারের মান্যবর রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেই।

 মূল আলোচ্য বিষয়গুলো ছিল: •বার্সেলোনায় প্রবাসীদের জন্য নিয়মিত কনসুলার সেবা চালু করা, অন্তত প্রতি দুই মাসে একবার। •একটি অস্থায়ী ই-পাসপোর্ট কেন্দ্র স্থাপন, যাতে পাসপোর্ট ইস্যু ও রি-ইস্যু সহজে সম্ভব হয়। •এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ইত্যাদি জরুরি নথিপত্রের কাজ স্থানীয়ভাবে করার সুযোগ। •মোবাইল কনসুলার টিমের ব্যবস্থা, বিশেষ করে যাঁরা মাদ্রিদ যেতে অক্ষম বা ব্যস্ততায় পারেন না, তাঁদের জন্য। •বার্সেলোনা ও আশপাশের অঞ্চলে প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে বার্ষিক মতবিনিময় সভা আয়োজন। রাষ্ট্রদূত মহোদয় অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে কথা শুনেছেন, এবং আশ্বাস দিয়েছেন বিষয়গুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার। তাঁর সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার, সদা হাস্যোজ্জ্বল মনোভাব ও আন্তরিকতা আমাদের ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। 

অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে যেটা সবচেয়ে আনন্দের ছিল অনেক পুরনো ও পরিচিত কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে দেখা হওয়া। কেউ আছেন যাঁকে এক যুগ পর দেখলাম, কেউ আছেন সম্প্রতি দেখা হয়েছে, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে আলাপ হয়নি। চা স্ন্যাক্সের টেবিলে ঘিরে আড্ডা, হাসি, গল্প, মতবিনিময় সব মিলিয়ে বুঝলাম, প্রবাস জীবনের এই সম্পর্কগুলোই মূল শক্তি। মাদ্রিদের পথে হেঁটে স্মৃতি ও সৌন্দর্যঃ অনুষ্ঠান শেষে হাতে কিছু সময় ছিল। মাদ্রিদের পরিচিত রাস্তায় কয়েক পা হাঁটলাম। প্লাজা মায়র, গ্রান ভিয়া, রেতিরো পার্ক ,প্লাসা সোল,লাভাপিয়াস সব কিছু যেন চেনা কিন্তু প্রতিবারই নতুন। মনে হলো, এ শহর শুধু ইট কাঠ নয়, এ শহর স্মৃতির; এ শহর অনুপ্রেরণার। প্রবাসের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে মাদ্রিদ যেন এক মায়াবী ছায়া হয়ে পাশে থাকে।

 রাত ৮টায় ফিরতি ট্রেনে বার্সেলোনার পথে রওনা দিলাম। দিনটি দীর্ঘ ছিল, কিন্তু মনে হল অনেক কিছু করলাম, বললাম, দেখলাম। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা, প্রবাসীদের স্বীকৃতি অনুষ্ঠান, পরিচিত মুখের দেখা—সব কিছু মিলিয়ে যেন একটি নতুন উদ্যম নিয়ে ফিরছি নিজের শহরে। মনে হলো, দায়িত্ব যদি হৃদয় থেকে আসে, তবে তা কখনোই ক্লান্তি আনে না। বরং আত্মতৃপ্তি দেয়। এক দিনের হঠাৎ সফর। কিন্তু প্রবাস জীবনের এক গভীর অধ্যায় হয়ে রইল স্মৃতিতে। 

বাংলাদেশ দূতাবাসের এমন উদ্যোগ আরও বাড়ুক, আরও নিয়মিত হোক। আর রাষ্ট্রদূতের মতো উদার, মানবিক ও সংবেদনশীল প্রতিনিধি থাকলে প্রবাসী সমাজ আরও উৎসাহিত হয় দেশের সঙ্গে সংযোগ রাখতে। আশা করি, এই সফরের আলোচনাগুলো বাস্তবে রূপ পাবে, এবং বার্সেলোনার প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনে আরও সহজ ও সেবামূলক সুবিধা আসবে। 

খুঁজুন