সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
আন্তর্জাতিক পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমা ঘিরে সহিংসতায় নিহত ৫

পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমা ঘিরে সহিংসতায় নিহত ৫

আগামী ৮ জুলাই পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচন। তার আগে বৃহস্পতিবার ছিল মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। শেষ দিনেও সহিংসতার স্বাক্ষী থাকলো গোটা রাজ্যবাসী। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হল ৫ জনের, আহত আরো বেশ কয়েকজন। এছাড়াও বিরোধীদলের প্রার্থীদের বাস থেকে টেনে নেমে নামানো, মারধর করা, বিরোধীদের মনোনয়ন পত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া, হুমকি দেওয়া সহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে রাজ্যটির ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের হাত থেকে রেহাই পেলেন না শিক্ষার্থীরাও। পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রার্থী ভেবে বিশ্বভারতীর এক নারী শিক্ষার্থীকেও মারধরের অভিযোগ উঠেছে সেই তৃণমূলের বিরুদ্ধেই। 

এদিন সকালের শুরুটা হয় বোমা, গুলি আর মৃত্যু দিয়ে। উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়ার বিডিও অফিসে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাওয়ার সময় কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টের জোট প্রার্থীদের লক্ষ্য করে তৃণমূল আশ্রিত দুর্বৃত্তরা এই গুলি চালায় বলে অভিযোগ। বাম ও কংগ্রেস নেতারা যখন মিছিল করে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই কাঠালবাড়ি এলাকায় এলোপাথাড়ি গুলি চলে ওই মিছিলের উপর। এতে গুলিবিদ্ধ হয় চোপড়ার বেশ কয়েকজন বাম ও কংগ্রেস জোটের কর্মী। আহতদের সকলকেই দলুয়া স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই ২ সিপিআইএম কর্মীর মৃত্যু হয়।

ঘটনার পরেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এই ঘটনার জেরে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। 

দুইটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ভাঙ্গড়ে। ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী দল 'ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট' (আইএসএফ) কর্মী সমর্থকদের মধ্যে গোলাবর্ষণ শুরু হলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ২ আইএসএফ ও ১ তৃণমূল কর্মীর মৃত্যু। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আরো একাধিক ব্যক্তি ভর্তি রয়েছেন কলকাতার হাসপাতালে। 

পাশাপাশি ভাঙ্গড়ের বিজয়গঞ্জ বাজারে একাধিক গাড়িতে অগ্নি সংযোগ ঘটানো হয়। এছাড়াও বোমা গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ। 

এছাড়াও এদিন সকাল থেকেই ভাঙ্গড়-২ বিডিও অফিসের বাইরে দলীয় পতাকা, লাঠি নিয়ে জমায়েত করে তৃণমূলের কর্মী সমর্থকরা। অন্যদিকে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে আইএসএফ কর্মীরাও একসময় দু পক্ষের মধ্যেই বোমাবাজি শুরু হয়। আর এই ঘটনায় চরম উত্তেজনায় ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। তবে পুলিশ থাকলেও কোন কার্যকরী ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। 

কোচবিহার জেলার দিনহাটায় মনোনয়ন জমা দিতে আসা বিজেপি প্রার্থীদের অন্তত চারটি গাড়ি ভাংচুর করার অভিযোগ উঠল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ত্রিমোহনী এলাকায় বিজেপি কর্মীরা তাতে বাধা দিতে গেলে তাদের মারধর করা হয় এমনকি গাড়ির চালকদেরও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ৷ 

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মধ্যমগ্রামে বারাসত-২ বিডিও অফিসে যাওয়ার সময় বাস থেকে সিপিআইএম প্রার্থীদের জোর করে নামিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের উপর হামলার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। এমনকি পুলিশ থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেই বলেও অভিযোগ। হামলার পরই ঘটনাস্থলে বাস রেখেই প্রাণভয়ে পালিয়ে যায় বাস চালক। পরে পুলিশে নিরাপত্তায় সেই বাস চালককে নিয়ে এসে সিপিআইএম প্রার্থীদের বহনকারী বাসটিকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। 

এদিকে এদিনই বিশ্বভারতীর এক ছাত্রীকে প্রার্থী ভেবে পুলিশের সামনেই মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। বোলপুর-শ্রীনিকেতন ব্লক অফিসের সামনে বিশ্বভারতীর সমাজকর্ম বিভাগের এক ছাত্রীকে দাঁড় করিয়ে পীঠে কিল মারে৷ এদিন, ওই ছাত্রী তার ভাইয়ের বাইকে করে নিজের বিভাগে যাচ্ছিলেন৷ সেই সময় শান্তিনিকেতন থানার ওসি কস্তুরি মুখোপাধ্যায়ের সামনেই তাঁর পথ আটকায় তৃণমূলের লোকজন। এরপর বিরোধী দলের প্রার্থী ভেবে তাঁর পিঠে এক ঘা দিয়ে দেন। সেসময় ওই ছাত্রী চিৎকার করে করে ওসিকে ডেকে বলেন, "ম্যাডাম, আমার গায়ে হাত তুলছে, আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্টে যাচ্ছিলাম।" পরে অবশ্য পুলিশ তৃণমূলের লোকজনকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দেয়৷ 

এছাড়াও বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, বাঁকুড়া, মালদা, পূর্ব মেদিনীপুর সহ একাধিক জেলায় বিরোধীদলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া, হুমকি, মারধরের অভিযোগ উঠেছে। 

মনোনয়নপত্রকে কেন্দ্র করে রাজ্যর জেলায় জেলায় সহিংসতার ঘটনায় সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী, কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী, বিজেপির সুকান্ত মজুমদার সকলেই ক্ষমতাসীন দলকে নিশানা করেছে। যদিও তৃণমূলের তরফে বলা হয়েছে একাজ তাদের নয়। 

চোপড়ায় গুলি চলার ঘটনার পরেই সেখানে অবিলম্বে কেন্দ্রীয় বাহিনী নামানোর দাবি জানান  রাজ্য বিজেপির সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। তিনি বলেন "চোপড়াতে প্রথম দিন থেকেই মনোনয়ন দাখিল করা যাচ্ছে না। বিজেপি একটিও মনোনয়ন জমা করতে পারেনি। কয়েকদিন আগে এক কংগ্রেস নেতা ও তার কয়েকজন সঙ্গীকে অপহরণ করা হয়েছিল। আজকে গুলি চলেছে। একজন মারা গেছে চারজন গুলিবিদ্ধ। তাই অবিলম্বে কেন্দ্রীয় বাহিনী এই সমস্ত জায়গায় নামানো উচিত।

এদিন বিকালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজেই  "বলেন প্রায় ৭৩ হাজার বুথ আছে কিন্তু মাত্র তিন থেকে চারটি জায়গায় গন্ডগোলের খবর পাওয়া গেছে। সেখানেও স্থানীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করেই এই গন্ডগোল। ইসলামপুর ও চোপড়ায় যে সমস্যাটা হয়েছে এর সাথে দল কোনভাবেই যুক্ত নয়। নিজেদের মধ্যে ভাই পাবে, না বোন পাবে এই নিয়ে গন্ডগোল। যারা অশান্তি করেছে তাদের তৃণমূল টিকিট দেয়নি। আমি পুলিশকে বলে দিয়েছি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। 

অন্যদিকে ভাঙ্গরের ঘটনায় বিরোধীদল আইএসএফের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলে মমতা বলেন "ওখানে যারা বিরোধী আছে, নতুন জিতেছে (আইএসএফ) সেই সংখ্যালঘুদের একত্রিত করে লুটপাঠ, অগ্নি সংযোগ, গাড়ি ভাঙচুর করেছে, গন্ডগোল পাকিয়েছে।

তার দাবি উত্তর প্রদেশ, ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলিতে বিরোধীদের ৯০% ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হয় না। কিন্তু এরাজ্যে প্রায় এক লক্ষের বেশি মনোনয়ন পত্র জমা পড়েছে, যেটা দেশের অন্য কোন রাজ্যে হয়নি।

খুঁজুন