সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় পথের কাঁটা তিন চাকার যানবাহন

পথের কাঁটা তিন চাকার যানবাহন

রোকসানা মনোয়ার : উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে প্রায় অবাধে চলছে তিন চাকার বিভিন্ন যানবাহন। এসব বাহনের কারণে মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, ঘটছে দুর্ঘটনাও। আসন্ন ঈদে স্বাভাবিকের তুলনায় মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যাবে কয়েক গুণ।

তখন এই তিন চাকার যান মহাসড়কগুলোতে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রেজমিনে গিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে তিন চাকার যান চলাচল করতে দেখা যায়। এসব যানের মধ্যে রয়েছে তিন চাকার ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক, পায়ে ও মোটরচালিত রিকশা, ভটভটি, টেম্পো, সিএনজিচালিত অটোরিকশা প্রভৃতি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার ২০১৫ সালে দেশের ২২টি মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

এরপর হাইকোর্ট ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দেশের সব প্রধান মহাসড়কে তিন চাকার যান না চালানোর আদেশ দিয়ে সেই নিষেধাজ্ঞা আরো জোরদার করেন। সর্বশেষ গত ৪ এপ্রিল এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত এক আদেশে বলেন, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান মহাসড়কে উঠতে পারবে না।

তিন চাকার যানের কারণে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য বলছে, দিন দিন পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠছে যে তিন চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনার সংখ্যা ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে তিন গুণ বেড়েছে। তবে এত কিছুর পরও মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল বন্ধ করা যায়নি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

এই মহাসড়কের ১০৫ কিলোমিটার অংশ রয়েছে কুমিল্লাজুড়ে। এর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি এলাকায়ই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইঞ্জিনচালিত থ্রি-হুইলার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রিকশা, ভ্যান। কোথাও কোথাও প্রকাশ্যেই চলছে নছিমন, করিমন, ভটভটিও।

মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মহাসড়কের ওপরেই সারি সারি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দাঁড়িয়ে রয়েছে।

এসব তিন চাকার যানবাহনের চালকরা ডেকে ডেকে যাত্রী তুলছেন বিভিন্ন গন্তব্যের। এরপর মহাসড়ক হয়েই এসব যানবাহন চলাচল করছে বিভিন্ন স্থানে। এই এলাকায় মহাসড়কের ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী দুটি লেনই অবৈধ তিন চাকার যানবাহনের দখলে। এ কারণে মহাসড়কের এই অংশে প্রায়ই যানজট লেগে থাকে, ঘটে দুর্ঘটনাও।

দাউদকান্দির গৌরীপুর এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, তিন চাকার যানবাহনের কারণে মহাসড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া মহাসড়কের দাউদকান্দি অংশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই যানজট লাগে। সামনের ঈদ যাত্রায় মহাসড়কে যাত্রীদের দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হতে পারে এই তিন চাকার যান।

চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার, সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজি, পদুয়ার বাজার, কুমিল্লা সদরের আলেখারচর বিশ্বরোড, সেনানিবাস এলাকা, বুড়িচংয়ের নিমসার, চান্দিনা বাসস্ট্যান্ড, দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ, গৌরীপুর, বলদাখাল, শহীদনগর ,গজারিয়ার ভবেরচর এলাকায়ও অবাধে তিন চাকার যানবাহন চলাচল

করতে দেখা গেছে। এসব জায়গার বেশির ভাগ স্থানেই মহাসড়কের ওপরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার অঘোষিত স্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছে।

কুমিল্লা-ঢাকা রুটে চলাচলকারী একটি পরিবহনের বাসচালক কবির হোসেন বলেন, অবৈধ এসব তিন চাকার যানবাহনের অনেক চালক আছে, তারা জানেই না কিভাবে মহাসড়কে গাড়ি চালাতে হয়। অনেক সময় তারা হুট করে দ্রুতগতির গাড়ির সামনে চলে আসে। যখন ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে একটি বাস চলে তখন এসব নিষিদ্ধ যান হুট করে সামনে চলে এলে হার্ড ব্রেক করে গাড়ি থামাতেও বেকায়দায় পড়তে হয়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। এখনই এগুলো বন্ধ করা না গেলে ঈদের সময় চরম সমস্যায় পড়তে হবে চালক ও যাত্রীদের।

গাজীপুরে তিন মহাসড়ক

ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও টঙ্গী-ঘোড়াশাল-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে নিত্য যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তিন চাকার যানবাহন।

গতকাল শুক্রবার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী স্টেশন রোড পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, শত শত ইজি বাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এসব যানবাহন সংযোগ সড়কে মুখে, বাসস্ট্যান্ডে, বাজারে এবং গুরুত্ব্বপূর্ণ স্থানে যখন-তখন থামার কারণে মহাসড়কে যানজট লেগেই আছে।

নগরীর গাজীপুরার একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে কথা হয় ইজি বাইকচালক লাল মিয়ার (৪৫) সঙ্গে। তিনি জানান, টঙ্গীর স্টেশন রোড থেকে বাসনের ভোগড়া চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রতিদিন কমপক্ষে চার হাজার ইজি বাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। এ

বলেন, এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো শুরু করেছি। আগের চেয়ে হাইওয়ে পুলিশের বেশি সদস্য মহাসড়কে তৎপর রয়েছে। কোথাও এসব তিন চাকার যানবাহনকে মহাসড়কে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া যেসব এলাকায় অবৈধ স্ট্যান্ড আছে, সেগুলো উচ্ছেদে আমাদের অভিযান চলবে। আশা করছি, মানুষ কোনো সমস্যা ছাড়াই এবারের ঈদ যাত্রায় ঘরে ফিরতে পারবে। 

জন্য তাঁদের প্রতিদিন স্টেশন রোডে ৫০ এবং বোর্ডবাজারে ৪০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

গাজীপুরা এলাকার বাসিন্দা একটি তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদন কর্মকর্তা আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, ইজি বাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকরা মহাসড়কে অত্যন্ত বেপরোয়া। তারা ট্রাফিক আইন-কানুনের ধার ধারে না। তাদের কারণে মহাসড়কে যানজট লেগেই থাকে। ১০ মিনিটের পথ যেতে এক ঘণ্টা লাগে।

একই অবস্থা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সালনা, পোড়াবাড়ী, মাস্টারবাড়ি, রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা, হোতাপাড়া, বাঘের বাজার ও মাওনা চৌরাস্তা এলাকায়। অবাধে মহাসড়কে চলছে নিষিদ্ধ ওই সব যানবাহন।  

কালিয়াকৈর পরিবহনের বাসচালক আবদুল লতিফ বলেন, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তার নিত্য যানজটের অন্যতম কারণ এসব অবৈধ তিন চাকার যানবাহন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই মহাসড়ক

ঢাকা-সিলেট ও কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ৭৪ কিলোমিটার অংশ রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। আশুগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে বিজয়নগরের সাতবর্গ পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার এবং বিশ্বরোড থেকে কসবার কুটি পর্যন্ত কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেশ দাপট।

হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়ক দুটিতে বেশি দুর্ঘটনা ঘটার যে ১৩টি কারণ চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে তিন চাকার যানের অবাধ চলাচল উল্লেখযোগ্য। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দুই মহাসড়কেই অবাধে তিন চাকার যানবাহন চলাচল করছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাউতলী, বিশ্বরোড মোড়, আশুগঞ্জ গোলচত্বর এলাকায় মহাসড়কের ওপরেই অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশাস্ট্যান্ড। কাউতলীতে অবৈধ স্ট্যান্ডের কারণে একটি সেতু দিয়ে অন্য কোনো যানবাহন চলাচলই করতে পারে না।

বিশ্বরোড মোড়ে কথা হয়, কুমিল্লা ট্রান্সপোর্ট নামের একটি বাসের চালক দুলাল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, অটোরিকশাগুলো যত্রতত্র ব্রেক কষে। যেখানে-সেখানে যাত্রী নামায়। এ কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে যায়।

সরাইল খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ওসি বলেন, মহাসড়কে তিন চাকার যান পুরোপুরি বন্ধ না হলেও নিয়ন্ত্রণে আছে। হাইওয়ে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালালেও লোকবলের সংকটে তিন চাকার যান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বারবাড়িয়া থেকে আরিচা ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার অংশ পড়েছে মানিকগঞ্জ জেলায়। গত দুই দিন এই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অবাধে চলাচল করছে তিন চাকার ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক, পায়ে ও ইঞ্জিনচালিত রিকশা, ভটভটি, টেম্পো, সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের টেপড়া বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন শিবালয় উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স। আজমত আলী এখানে একটি দপ্তরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তাঁর বাড়ি প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে মানিকনগর গ্রামে। তিনি জানান, গ্রাম থেকে অফিসে আসতে ইজি বাইক কিংবা মোটরচালিত রিকশা ছাড়া গতি নেই। প্রায় তিন কিলোমিটার ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দিয়ে আসতে হয়। দুর্ঘটনার ভয় থাকলেও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরেই তাঁকে নিয়মিত অফিস করতে হয়।   

আজমত আলীর মতো অনেককে নিয়েই মহাসড়কে এভাবে দাপিয়ে বেড়ায় তিন চাকার যানবাহন।   

মানিকগঞ্জের গোলড়া হাইওয়ে থানার ওসি বলেন, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এখন পর্যন্ত তিন চাকার যান চলাচলের জন্য আলাদা লেন নির্মাণ করা হয়নি। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এ কারণেই তিন চাকার যানবাহন মহাসড়কে ওঠে। এদের বিরুদ্ধে মামলা বা জরিমানা করেও ঠেকানো যাচ্ছে না।

 

 

খুঁজুন