সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় সবুজ হাইড্রোজেন কি, দক্ষিন এশিয়ার জ্বালানীর চাহিদা পরিবর্তন করতে পারবে ?

সবুজ হাইড্রোজেন কি, দক্ষিন এশিয়ার জ্বালানীর চাহিদা পরিবর্তন করতে পারবে ?

পরিচ্ছন্ন শক্তির একটি সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে সবুজ হাইড্রোজেন যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং এটিকে  ‘ভবিষ্যতের জ্বালানি’ হিসেবে গন্য করা হচ্ছে। কিন্তু সবার আগে আমাদের বুঝা উচিত এই ‘সবুজ হাইড্রোজেন’ আসলে কী? কিভাবে এটি ‘সবুজে’ পরিনত হয় এর ব্যবহার ও উপকারিতাগুলো কী কী? এই নিবন্ধটিতে আমরা এই প্রতিশ্রুতিশীল শক্তির উৎসের ধরণটি তুলে ধরার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় এর অগ্রগতি এবং সম্ভাবনার বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করছি।

পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প কার্যক্রমে জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন গ্যাস  ব্যবহার করা যেতে পারে। যখন এটি পোড়ানো হয়, এটি কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গত করে না। সবুজ হাইড্রোজেন হল হাইড্রোজেন গ্যাসকে দেওয়া নাম যা নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত হয়েছে, যেমন বায়ু বা সৌর শক্তি, যা গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গত করে না।

একটি জ্বালানী ব্যটারী –যা রাসায়নিকের শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে – হাইড্রোজেন গ্যাস অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে বিদ্যুৎ এবং জলীয় বাষ্প তৈরি করে। হাইড্রোজেনের কার্বন নির্গত না করে শক্তি উৎপন্ন করার ক্ষমতার কারণে, এটি জীবাশ্ম জ্বালানির একটি সম্ভাব্য  বিকল্প।

হাইড্রোজেন মহাবিশ্বের সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে থাকা  রাসায়নিক উপাদান। অবশ্য প্রচুর পরিমাণে থাকা সত্ত্বেও, হাইড্রোজেন ব্যবহারযোগ্য পরিমাণে গ্যাস হিসাবে প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান নয়। এটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে নানা ধরনের যৌগগুলিতে উপস্থিত থাকে, যেমন পানি। তাই হাইড্রোজেন কেবল শিল্প প্রক্রিয়াতেই উৎপাদন করা আবশ্যক। এর মধ্যে বেশিরভাগই প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রতিস্থাপনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত – একটি জীবাশ্ম জ্বালানী। অন্যান্য যেসব পদ্ধতি রয়েছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে ইলেক্ট্রোলাইসিস নামক একটি প্রক্রিয়া সহ যা পানিকে এর মৌলিক উপাদানগুলিতে বিভক্ত করতে বৈদ্যুতিক প্রবাহ ব্যবহার করে। এই মৌলিক উপাদানগুলি হল হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন।

হাইড্রোজেন গ্যাস পোড়ানোর সময় কার্বন নির্গত করে না, এটি উত্পাদন করতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ, ইলেক্ট্রোলাইসিস বা অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, জীবাশ্ম জ্বালানী দ্বারা উত্পন্ন হতে পারে। এটি সাধারণত ‘ধূসর হাইড্রোজেন’ নামে পরিচিত, যা বর্তমানে মোট উৎপাদনের ৯৫ শতাংশের জন্য দায়ী।

কয়লা বা গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদিত হাইড্রোজেন, কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (CCS) প্রযুক্তির সাথে মিলিয়ে উৎপাদন করা হয় যা কার্বন নির্গমনকে বাধা দেয় এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। একে ব্লু বা নীল হাইড্রোজেন বলা হয়।

সবুজ হাইড্রোজেন হচ্ছে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দ্বারা চালিত ইলেক্ট্রোলাইসিসের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়, যা সৌর প্যানেল বা বায়ু টারবাইনের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপন্ন হয়।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA) এর মতে, হাইড্রোজেন বিশ্বব্যাপী শক্তির পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে এটি হবে এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট অংশ। এই সংস্থাটি আরো বলছে যে ২০২০ সালে, হাইড্রোজেন এবং হাইড্রোজেন-ভিত্তিক জ্বালানী বিশ্বব্যাপী মোট শক্তি ব্যয়ের ০.১ শতাংশেরও কম।কিন্তু ২০৫০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

হাইড্রোজেন একটি সম্পূরক হতে পারে, কিন্তু এটি কখনই সৌর বা বায়ু শক্তির মতো পরিচ্ছন্ন শক্তির অন্যান্য উৎসগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে না, যা উৎপাদন করা অত্যন্ত সাশ্রয়ী। এছাড়াও, সেগুলো বাড়ি এবং কারখানার ব্যাপক উৎপাদন এবং বিদ্যুতায়নের জন্য উপযুক্ত।

তবে একটি শক্তিশালী নবায়নযোগ্য অবকাঠামো পানিকে এর মৌলিক উপাদানগুলিতে আলাদা করার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বৃহৎ পরিসরে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনে সক্ষমতা এনে দিতে পারে। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের (আইওসি) এর গবেষণা ও উন্নয়ন পরিচালক এস. ভি. রামকুমার বলেন“সবুজ হাইড্রোজেন নবায়নযোগ্য শক্তিকে প্রতিস্থাপন করতে হয়ত পারবে না, তবে সৌর শক্তি থেকে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন খুব কার্যকর হবে।”

বিশ্বব্যাপী, বর্তমানে উৎপাদিত বেশিরভাগ হাইড্রোজেন পরিশোধন ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয়। ন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি এর ধারণামেত, এই দশকের শেষ নাগাদ, হাইড্রোজেন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেকগুলো নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ গ্রিড তরঙ্গায়িতকরণ ,বাসাবাড়িতে জ্বালানী ব্যবহার এবং পরিবহন খাত।

বর্তমানে উৎপাদিত মোট হাইড্রোজেনের একটি ছোট অংশ সার কারখানায় অ্যামোনিয়া তৈরি বা জাহাজে জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ইস্পাত শিল্পেও এর ব্যবহার রয়েছে। যদি কয়লা এবং কোক উৎপাদন শিল্পে (যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্লাস্ট ফার্নেস ব্যবহার করে) সবুজ হাইড্রোজেন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যায় তাহলে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমানে নির্গমন মাত্রা কমিয়ে আনা যেতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো যেমন ভারত যে তার জ্বালানী পরিবর্তন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে জাতীয় হাইড্রোজেন মিশনে বিনিয়োগ করছে, তারা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পে এই হাইড্রোজেন ব্যবহার করতে পারে। উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সবুজ করার মাধ্যমে ধূসর হাইড্রোজেন যেমন প্রাকৃতিক গ্যাস বা ন্যাপথা উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারের পরিমাণও কমিয়ে আনা যেতে পারে।

নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি, যেমন সৌর, বায়ু বা পানিবিদ্যুৎ প্রধানত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যই ব্যবহৃত হয়। যদিও জ্বালানী ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদু্যৎই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তুলনামূলকভাবে সহজেই নবায়নযোগ্য শক্তি দ্বারা এই ব্যবহারের মাত্রা অত্যন্ত সাশ্রয়ী প্রক্রিয়ায় এটি প্রতিস্থাপিত হতে পারে। তবে অন্যান্য খাত যেমন দৃরপাল্লার পরিবহন বা ভারী শিল্প এখনও কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস বা পেট্রোলিয়াম জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এইগুলোর জ্বালানী হিসেবে প্রধান যা হাইড্রোজেন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে।

ন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি এর মতে হাইড্রোজেন ব্যাটারিতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। জ্বালানী ব্যাটারি যদি বৃহৎ পরিসরে বিকশিত হয়, তাহলে দেশগুলিকে এমন অবকাঠামো স্থাপনে সাহায্য করতে পারে যা বায়ুর গতি বা সৌর বিকিরণের মতো পরিবেশগত অবস্থার উপর নির্ভর করে তাদের নবায়নযোগ্য শক্তির সরবরাহ সংরক্ষণ এবং স্থিতিশীল করতে পারে। কিন্তু পরিবেশগত নানা কারনে এটি পরিবর্তনশীল হতে পারে।

ন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি -এর গ্লোবাল হাইড্রোজেন রিভিউ ২০২১ অনুসারে, বর্তমানে সবুজ হাইড্রোজেনের মূল্য প্রতি কিলোগ্রাম ৩ মার্কিন ডলার থেকে ৮ মার্কিন ডলার। অবশ্য এটি ধূসর হাইড্রোজেনের সাথে প্রতিযোগিতামূলক নয়, ধূসর হাইড্রোজেনের মূল্য প্রতি কিলোগ্রাম ০.৫ থেকে ১.৭ মার্কিন ডলারের মধ্যে। সংস্থাটির মতে,  এই মূল্যের ব্যবধানের কারনে বর্তমানে সবুজ হাইড্রোজেনের ব্যবহার আরো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না , তবে নবায়নযোগ্য শক্তির মূল্য কমে যাওয়ার সাথে সাথে সময়ের সাথে সাথে এই ব্যবধানটি সংকুচিত হবে বলে তারা আশা করছে। দিল্লি-ভিত্তিক  কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার (CEEW) এর দীপক যাদব, বলেন, অনেক দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি কিলোগ্রাম এক  ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা সবার ক্ষেত্রে প্রায় একই রকম হবে। তখন জীবাশ্ম জ্বালানী হিসেবে এর মূল্য প্রতিযোগীতামূলক করে তুলবে।

কাউন্সিল অন এনার্জি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার এর দীপক যাদব  বলেন, পাকিস্তান বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ টন সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় গ্রিন হাইড্রোজেন নিয়ে পাইলট প্রকল্প চালুর কাজ এগিয়ে চলছে। তবে যাদবের মতে, ভারতই দক্ষিণ এশিয়ায় সবুজ হাইড্রোজেনের প্রধান উৎপাদক হবে বলে ধারনা করা যাচ্ছে।

২০২১ সালের আগষ্ট মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতীয় হাইড্রোজেন মিশন উদ্বোধন করেন। এটি আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্দারণ করেছে এক মিলিয়ন টন। আইওসি-এর এসএসভি রামকুমার বলেন, এই পরিকল্পনার অধীনে সরকার ইলেক্ট্রোলাইজার  তৈরি ও গবেষণা বিকাশে আর্থিক সহায়তার জন্য একটি প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেন্টিভ পরিকল্পনা শুরুর পরিকল্পনা করেছে।

বাংলাদেশ সরকারের নতুন সমন্বিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ি ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে ৪০% বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও অভ্যন্তরীণ গ্যাসের উৎপাদন দ্রুত বাড়ার কোনাে সম্ভাবনা নেই। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের ব্যবহার ১৬০ – ৩৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে কারণ ২০৫০ সালের মধ্যে বিদ্যুত উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার ৩০ শতাংশ বাড়বে। অবশ্য সরকার সবুজ হাইড্রোজেন এবং অ্যামোনিয়া  থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি  এবং প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে বিদ্যুত আমদানির বিষয়গুলো সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।

খুঁজুন