শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় ভড়া মৌসুমেও চড়া চালের দাম

ভড়া মৌসুমেও চড়া চালের দাম

বোরোর ভরা মৌসুম চলছে। সারা দেশে কৃষকের ঘরে ঘরে এখন ধান। একদিকে বোরোর ভরা মৌসুম, অন্যদিকে সরকারের গুদামে রয়েছে পর্যাপ্ত চাল। সাধারণত ভরা মৌসুমে দেশের বাজারে চালের দাম কমে যায় কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। চালের জেলা খ্যাত কুষ্টিয়া, নওগাঁ ও দিনাজপুরসহ ওইসব এলাকার মিল পর্যায়ে এবং পাইকারি বাজারেও বস্তাপ্রতি বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এর প্রভাবে খুচরা বাজারে বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত। কিন্ত কেন এই অবস্থা জানতে চাইলে মিল মালিকরা দেখান দুই কারণ। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ধান কিনতে মাঠে নামা। অন্যটি ধানের দাম বেড়ে যাওয়া। এর বাইরে অধিক লাভের আশায় ব্যবসায়ীদের মজুদ করার বিষয়টিও উঠে আসছে।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে সরু চালের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। মাঝারি মানের চালের দাম ৩ দশমিক ৯২ এবং মোটা চালের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৪ টাকায়। সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭২ টাকায়। ভালো মানের সরু (নাজিরশাইল ও জিরাশাইল) চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৮ থেকে ৮০ টাকায়।

খোঁজ নিয়ে জোনা গেছে, মূলত ১০ প্রতিষ্ঠানের কারণেই ভরা মৌসুমেও ধান-চালের বাজার এখন অস্থির। এর মধ্যে আছে ৫টি বৃহৎ মিল এবং ৫টি গ্রুপ অব কোম্পানি। এর পাশাপাশি কালো টাকার প্রবেশের কারণেও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পেশাদার ধান-চালের ব্যবসায়ী নন এমন অনেক ব্যক্তি যাদের হাতে অঢেল কালো টাকা রয়েছে তারাও এখন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে ধান কিনতে নেমেছেন। বোরোর অধিকাংশ ধান চলে যাচ্ছে ওই বৃহৎ পাঁচ মিলমালিক, পাঁচ গ্রুপ অব কোম্পানি এবং অপেশাদার ও হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ধান ব্যবসায়ীদের কব্জায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বৃহৎ পাঁচ মিলমালিকের মধ্যে আছে যশোরের মেসার্স মজুমদার রাইস মিল। মিলটির স্বত্বাধিকারী চিত্ত মজুমদার। মিলটি যশোরের নওয়াপাড়ার গুয়াখোলা এলাকায়। এরপর রয়েছে দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জের জহুরা অটো রাইস মিল, চাঁপাইনবাগঞ্জের এরফান অটো রইস মিল। এর স্বত্বাধিকারী মো. এরফান আলী। নওগাঁর বেলাল অটো রাইস মিল এবং বৃহত্তর কুষ্টিয়া এলাকার রশিদ গ্রুপের রশিদ অটো রাইস মিল। মিলমালিকদের মধ্যে এই ৫টি প্রতিষ্ঠান দেশের চালের বাজারে বড় একটি অংশ জোগান দিয়ে থাকে। এজন্য ধানের মৌসুমে এসব মিলমালিক প্রচুর ধান কিনে মজুদ করে।

মিলমালিকদের বাইরে ধান-চালের বাজারে এখন ৫টি গ্রুপ অব কোম্পানি আছে। এর মধ্যে রয়েছে সিটি গ্রুপ, প্রাণ আরএফএল, এসিআই, স্কয়ার গ্রুপ ও আকিজ গ্রুপ। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত বিভিন্ন রকমের ভোগ্যপণ্য আমদানি বা উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান প্যাকেটজাত চাল বিক্রিতে নেমেছে। এর জন্য এসব প্রতিষ্ঠান দেশের বাজার থেকে প্রচুর ধান কিনে মজুদ করছে।

এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যা করণীয় তার সবই করা হবে। প্রয়োজনে ট্যাক্স কমিয়ে চাল আমদানি করে ভোক্তাকে স্বস্তিতে রাখা হবে। এ সময় তিনি ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত প্রফিট না করে ভোক্তাদের প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান জানান।

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন করপোরেট হাউস বাজার থেকে ধান চাল কেনায় লিপ্ত হয়েছে। তারা কৃত্রিম কোনো সংকট তৈরি করছে কি না তা খতিয়ে দেখতে বলেন মন্ত্রী। ভোক্তা যেন আতংকিত না হয় সেজন্য সচেতনতা তৈরি করার পাশাপাশি ধান চালের বাজারে নজরদারি বাড়াতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, কুষ্টিয়ার মিলমালিকরা বলছেন, মিল পর্যায়েই চালের দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। কিন্তু মিল পর্যায়ে কেন দাম বাড়ল চালের এ প্রশ্নে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলমালিক সমিতির কুষ্টিয়ার সাধারণ সম্পাদক জয়নুল আবেদীন প্রধান বলেন, বোরোর ভরা মৌসুমেও চালের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত সপ্তাহের ব্যবধানে ধানের দাম মণপ্রতি বেড়ে গেছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। গত ঈদের আগেও মোটা ধানের মণ ছিল ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকা। ঈদের পরপর তা বেড়ে হয় ৮০০ টাকা। মোটা ধানের মণ ঠেকেছে ৯৫০ টাকায়। মিনিকেট বা চিকন ধানের মণ ঈদের আগে ছিল ১১৫০ টাকা, ঈদের পরপর তা হয় ১২৫০ টাকা, এখন হয়েছে ১৩৫০ টাকা। সুতরাং ধানের দাম বৃদ্ধির কারণে চালের দাম বেড়েছে। কয়েক দিন আগেও যেখানে মিনিকেট চাল ৫০ কেজির বস্তা আমরা মিল থেকে ২৮০০ টাকায় বিক্রি করেছি, এখন বিক্রি করছি ২৯৫০ টাকায়।

জয়নুল আবেদীন বলেন, চালের দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হচ্ছে বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে প্রচুর পরিমাণে ধান কিনতে মাঠে নেমেছে। এতে মিলমালিকরা পর্যাপ্ত ধান কিনতে পারছেন না। এর প্রভাবও পড়ছে চালের বাজারে। পরিস্থিতি যদি এমনই চলতেই থাকে তা হলে চালের দাম আরো বেড়ে যাবে। এজন্য বিষয়গুলো এখনই সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে জানতে চাইলে নওগাঁ পৌর খুচরা চাল বাজার সমিতির সভাপতি উত্তম সরকার বলেন, পাইকারি কেনার ওপর খুচরা দর ঠিক করা হয়। দাম বাড়ানো বা কমানো কোনো কিছুতেই খুচরা বিক্রেতাদের কিছুই করার থাকে না। বর্তমানে মোকাম থেকেই প্রকার ভেদে মোকাম থেকে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চালের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। খুচরা বাজারেও চালের দাম বেড়ে গেছে।

জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, চালের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হলো হঠাৎ ধানের দাম বেশি। বৈরি আবহাওয়ার কারণে নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ধানের উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কার কারণে বাজারে ব্যবসায়ীদের ধান কেনার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বেশি দামে ধান কেনার পর চাল উৎপাদনের পর খরচ সমন্বয় করতে গিয়ে চালের দাম বাড়াতে হচ্ছে।

নওগাঁর ধান-চাল আড়তদার সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা চন্দন বলেন, প্রতিনিয়তই প্রায় আকাশ খারাপ থাকছে। ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। এজন্য ধান বাঁচানোর চেষ্টা করলেও কিছুতেই বাঁচানো যাচ্ছে না। সরকারি গুদামগুলোতে সংগ্রহ চলছে ফলে কমছে না মোটা চালের দর। আবার হাটগুলোতেও বেড়েছে ধানের দাম।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, হাওরে ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারছেন না। কৃষকদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। এখনো ৫ শতাংশ চাল ওঠেনি কৃষকের ঘরে। তবে মিল পর্যায়ে চালের দাম বাড়েনি।

এ বিষয়ে বাজার বিশ্লেষক ও কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান  বলেন, সারা বছর দেশে যা চাল উৎপাদন হয় তার অর্ধেকের বেশি আসে এই বোরো মৌসুমে। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা থাকে এ সময় সারা দেশে চালের দাম কমে আসবে। এর আগের কয়েক বছর আমরা দেখেছিও তাই কিন্তু এবার বোরো মৌসুমের একেবারে শুরু থেকেই চালের দাম বাড়তি দেখতি পাচ্ছি। তার মানে বাজারে কোথাও গলদ আছে। সে গলদ খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের।

খুঁজুন