বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
আব্বাসকে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে ফের ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র সরকার নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে আরো ২শ’ শয্যা যুক্ত হচ্ছে ভেটেরিনারি স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে সৃজন হচ্ছে ৪৯২ নতুন পদ কানাডাকে সহযোগী সদস্য করার উদ্যোগে ইইউকে ট্রাম্পের বাণিজ্য বন্ধের হুমকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক হলেন হাফিজুল্লাহ খান জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ফ্লেভারিং ক্যাপসুল সিগারেট বিক্রিতে কড়াকড়ি ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৫৪৬, মামলা ৬১ নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র আপসহীন চরিত্র স্থানীয় সরকার নির্বাচন : বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে ইসির প্রস্তুতি সভা আজ
দেশের খবর নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র আপসহীন চরিত্র

নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র আপসহীন চরিত্র

: কবি আবদুল হাই শিকদার

বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সাহিত্যকর্ম শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়কে আলোড়িত করেনি, বরং যুগের পর যুগ বাঙালির চেতনা, সংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

বাংলা সাহিত্যে তাঁর যুগান্তকারী প্রভাব, জাতীয় জীবনে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এবং তাঁর সৃষ্টির বহুমাত্রিক তাৎপর্যসহ নানা বিষয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও নজরুল গবেষক আবদুল হাই শিকদার।

কবি আবদুল হাই শিকদার । ফাইল ছবি

তিনি নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাম্যবাদী দর্শন, বাংলা গজল ও সংগীতে তাঁর নবতর সংযোজন এবং বাঙালির জাতীয় পরিচয় নির্মাণে নজরুলের ভূমিকা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাসসের উপ-প্রধান বার্তা সম্পাদক আয়েশা পারভীন (জুনান নাশিত)।

বাসস : বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির জাতীয় জীবনের অনিবার্য নাম কাজী নজরুল ইসলাম, প্রধান কী কী বৈশিষ্ট্য তাঁকে এ অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে?

আবদুল হাই শিকদার : ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সাল মাত্র ১০ বছরের মধ্যে নজরুল বাংলা সাহিত্যে কবি ও যুগের নায়কে পরিণত হন। এর প্রধান কারণ তৎকালীন রাজনীতি ও সাহিত্যের প্রেক্ষাপট। সে সময় একদিকে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলন ও অন্যদিকে মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহরের খিলাফত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজপথ উত্তপ্ত ও স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। অথচ তৎকালীন সাহিত্য ছিল নির্জীব ও কেবল রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন। বাঁশবাগানের মাথায় চাঁদ ওঠার গল্পেই যেন সীমাবদ্ধ ছিল তা। মানুষ যে প্রতিবাদী ভাষা শুনতে চাইছিল, যে আত্মিক ক্ষুধা অনুভব করছিল, নজরুল এসে ঠিক সেই শূণ্যতা পূরণ করলেন। সাহিত্যে আগুনের ফুলকি নিয়ে তাঁর এই বিশেষ আগমনই তাঁকে দ্রুত জননায়কে পরিণত করেছিল।

নজরুলের রক্তে মিশেছিল ১৭৫৭ সালের পলাশীর বিপর্যয়, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের আন্দোলন এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব। জাতির আসল বেদনার জায়গাটি তিনিই সবচেয়ে গভীরভাবে ধরতে পেরেছিলেন, যা সমসাময়িক অন্য কোনো কবি সেভাবে পারেননি। তৎকালীন অনেক সাহিত্যিক কোনো না কোনোভাবে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সমঝোতা রেখে চলেছেন, কিন্তু নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র আপসহীন (‘আন-কম্প্রোমাইজিং’) চরিত্র।

১৯২২ সালে তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরাধীনতা, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এত তীব্র শব্দ চয়ন আর কোনো কবি করেননি। পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, নারী মুক্তি এবং মুক্ত সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয় সৌন্দর্যমণ্ডিত। নজরুল তাঁর কাব্য, গান ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক সৌন্দর্য নিয়ে সোচ্চার হন।

নজরুলের এই প্রতিভার যথার্থ মূল্যায়ন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯২২ সালে ২৩ বছরের যুবক নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেন। তখন রবীন্দ্রনাথের শিষ্যরা তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন যে একজন তরুণ, যিনি কেবল কবিতা ও গানে চিৎকার চেঁচামেচি করেন, তাঁকে কেন বই উৎসর্গ করা হলো? জবাবে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তোমরা কেবল ওর চিৎকারটাই দেখছ, কিন্তু যুগের যে দাবি ও প্রত্যাশা, তা একমাত্র নজরুলের কবিতাতেই স্পন্দিত হচ্ছে। তোমরা নজরুলের সাহিত্য পড়েছ ঠিকই, তবে কেবল আজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ, ভেতরের রসের সন্ধান করোনি। রসের সন্ধান করলে দেখতে ও যা লিখছে তা কেবল কাব্য নয়, মহাকাব্য। আমি যদি আজ ওর বয়সে থাকতাম, তবে আমিও এটিই লেখার চেষ্টা করতাম।’ এইসব গুণের কারণেই নজরুল একাধারে যুগের নায়ক এবং জনগণের নায়কে পরিণত হতে পেরেছিলেন।

বাসস : নজরুল আমাদের জাতীয় কবি,  কিন্তু কেন?

আবদুল হাই শিকদার : একটি জাতির আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যার রচনায় পূর্ণাঙ্গভাবে ওঠে আসে, তিনিই সেই জাতির জাতীয় কবি। যেমন শেক্সপিয়র ইংরেজদের, ফেরদৌসী ইরানিদের কিংবা হুইটম্যান আমেরিকানদের জাতীয় কবি।

নজরুল সাহিত্যে স্বাধীনতা, শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই, গণমুখী সাংবাদিকতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার সর্বজনীন সমাধান রয়েছে। তিনি একদিকে শ্যামাসঙ্গীত, ভজন ও অসামান্য কীর্তন লিখেছেন, অন্যদিকে অসাধারণ ইসলামী গান, হামদ ও নাত সৃষ্টি করেছেন, যেখানে অন্য কোনো ধর্ম বা মানুষকে কখনোই ছোট করা হয়নি। সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি এই সমান আতিথেয়তা ও অসাম্প্রদায়িক ভারসাম্য নজরুলের রচনার মূল ভিত্তি। সব মানুষের জন্য অকৃপণ প্রার্থিত কবি ছিলেন বলেই তিনি আমাদের জাতীয় কবি।

বাসস : সরকারের ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আবদুল হাই শিকদার : আমি এই উদ্যোগগুলোকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী বলে মনে করি। নজরুল বর্ষ ঘোষণার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে কোনো কবির নামে একটি পুরো ‘বছর’ ঘোষণা করার নজির নেই।

নজরুলকে কেন আমাদের দরকার এবং তাঁর চর্চার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু- এই একটা ঘোষণার মাধ্যমে নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। সারা দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে নজরুলকে জানার ও উদযাপনের যে নতুন ঢেউ জেগেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, জাতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে শক্তিশালী ও টিকিয়ে রাখতে হলে নজরুলের কাছেই ফিরতে হবে। নজরুল হলেন মূলত ‘বাংলাদেশের আত্মার যথার্থ প্রতীক’। নজরুলকে চর্চা করার অর্থই হলো সত্য, কল্যাণ ও মঙ্গলের সাথে যুক্ত হওয়া এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়ানো। সর্বোপরি, নজরুল চর্চার মাধ্যমেই আমরা আমাদের সাহিত্যকে মেরুদণ্ডহীনতার হাত থেকে রক্ষা করে একটি শক্তিশালী ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন সাহিত্য ধারায় রূপ দিতে পারি।

বাসস : নজরুলকে কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে দেখলে তাঁর সাহিত্যচিন্তার কতটা অংশ অগোচরে থেকে যায় বলে আপনি মনে করেন?

আবদুল হাই শিকদার : নজরুলকে কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে দেখাটা তাঁর একটি খণ্ডিত উপস্থাপনা। এটি সত্য যে তিনি অন্যায়, জুলুম, শোষণ, পরাধীনতা ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন এবং তাঁর সাহিত্যের একটি বিরাট অংশ এক্ষেত্রে ব্যয় করেছেন। কিন্তু নজরুলের প্রেম ও প্রকৃতির অংশটি বাদ দিলে তাঁর সাহিত্য চিন্তার বিরাট একটি দিক আড়ালেই থেকে যায়।

তিনি যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন, তেমনই ‘দোলনচাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘চক্রবাক’ কিংবা ‘সিন্ধু-হিন্দোল’-এর মতো অসামান্য প্রেমের কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যে প্রথম খাঁটি ও সফল গজলের প্রবর্তন ঘটে কাজী নজরুল ইসলামের হাত ধরে। পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়িতে কাশ্মীরি শাহর মাজারে বসেই তিনি এ গজল রচনা করেন।

এছাড়া বাংলাদেশের প্রকৃতি তাঁর কবিতায় ও গানে যেভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তা অবিশ্বাস্য। তিনি লিখেছেন:

“সবুজ শোভার ঢেউ খেলে যায় নবীন আমন ধানের ক্ষেতে” কিংবা—‘‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী! ফুলে ও ফলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবণী।’’

প্রেমের কবিতায় তিনি আত্মনিবেদনের যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তা আর কোথাও মেলা ভার। একদিকে ঘনঘোর সংগ্রামী রূপ, আর অন্যদিকে প্রকৃতি ও অনাবিল প্রেমের অবিস্মরণীয় দ্যোতনা এবং তেমনই প্রেম-প্রকৃতি, বিপ্লব-বিদ্রোহ এবং ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার এক অনন্য সমন্বয় তিনি সাহিত্য ও সঙ্গীতে ঘটিয়েছেন।

বাংলা ভাষা আগে ছিল কিছুটা ঝুলে যাওয়া বা ভিজে ধরনের, কিন্তু নজরুলের আগমনে বোঝা গেল এই ভাষার ভেতরে ডিনামাইটের মতো বিধ্বংসী ক্ষমতা এবং ভিসুভিয়াসের আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত লাভা উদগীরণের শক্তি লুকানো ছিল। বিশ্বাসের সঙ্গে বিজ্ঞান, বিপ্লবের সঙ্গে প্রেম এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক গতির সমন্বয় ঘটিয়ে নজরুল যে ক্যানভাস তৈরি করেছেন, তা এককথায় অনন্যসাধারণ।

বাসস : ২০২৪ সালে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এ নিয়ে এখনো পৃথক কোনো আইন প্রণীত হয়নি। এ অবস্থায় গেজেটের মাধ্যমে দেওয়া স্বীকৃতির ঐতিহাসিক ও আইনগত গুরুত্ব কী?

আবদুল হাই শিকদার : বিষয়টি গেজেট নোটিফিকেশনের পর আর বেশি দূর এগোয়নি, যা নিয়ে কাজ করা জরুরি। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সে সময় বহু অধ্যাদেশ বা আইন জারি করেছেন। তবে নজরুলের জাতীয় কবির এই গেজেটটিকে চূড়ান্ত আইনের রূপ দেওয়া কিংবা সংসদে তুলে সংবিধানে স্থায়ী করার উদ্যোগটি এখনো সম্পন্ন হয়নি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ অনায়াসেই এ উদ্যোগ নিতে পারেন। নজরুল বর্ষ পালনের এই ঐতিহাসিক বছরেই যদি বিষয়টি সরকার বা সংশ্লিষ্টদের স্মরণে এনে জাতীয় সংসদে পাস করার কিংবা স্থায়ী আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া যায়, তাহলে নজরুলকে সম্মান জানানোর কাজটি পূর্ণতা পাবে।

বাসস : নজরুলের সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির যে বার্তা, বৈশ্বিক ও দেশীয়ভাবে এর প্রাসঙ্গিকতা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আবদুল হাই শিকদার : মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী একবার বলেছিলেন,‘নজরুলের প্রতিটি শব্দ যেন এক-একটি যুদ্ধ ঘোষণা।’ তবে এ যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদ, অন্যায় ও অনাহারের বিরুদ্ধে, মানবতার মুক্তির পক্ষে। নজরুল নিজেকে কেবল বাংলা ভাষার ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ রাখেননি। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি হয়তো বাংলা ভাষার কবি, কিন্তু আমি শুধু বাংলা ভাষার কবি নই, আমি সকল যুগের, সকল কালের ব্যথিত-বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধিত্বের স্বর।’

তিনি নিজের শেকড় হিসেবে বাংলাদেশের মাটি ও বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন ঠিকই, তবে তাঁর হাত প্রসারিত ছিল আন্তর্জাতিক দিগন্তের দিকে। যখন তিনি লেখেন—

‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না

অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না

বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত / আমি সেই দিন হব শান্ত।’

তখন তিনি কেবল বাংলার মানুষের কথা বলেননি, সারাবিশ্বের প্রতিটি নিগৃহীত ও নিপীড়িত মানুষের হয়ে কথা বলেছেন। তাঁর আন্তর্জাতিক চেতনার কয়েকটি স্পষ্ট উদাহরণ তুলে ধরা যায়। যেমন- নজরুলের ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘ভাঙার গান’ ও ‘প্রলয়শিখা’—এই চারটি গ্রন্থ মার্ক্সবাদের মূল চেতনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারতে যখন কমিউনিস্ট পার্টির বাংলা শাখা ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’ গঠিত হয়, সেই দলের ম্যানিফেস্টো এবং গঠনতন্ত্র নিজের হাতে প্রণয়ন করেছিলেন নজরুল। এমনকি তাঁদের দলীয় মুখপত্র ‘লাঙল’-এর প্রধান সম্পাদকও ছিলেন তিনি।

প্রযুক্তিহীন সেই ১৯২২ সালে বসে নজরুল আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ব্রিটিশদের হাতে শহীদ হওয়া আইরিশ বিপ্লবী রবার্ট এমেটের ওপর তাঁর ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় বিস্তারিত নিবন্ধ লিখেছিলেন। টেলিফোন বা টেলেক্সের জমানা না থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক বিপ্লব ও আন্দোলনের খবর তিনি কীভাবে পেয়েছিলেন, তা আজও এক পরম বিস্ময়!

এছাড়া ইরানের শিরাজ নগরীর বিখ্যাত ‘হাফিজ বিশ্ববিদ্যালয়’-এর বিভাগীয় প্রধানের সাথে সাক্ষাৎকালে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, কবি নজরুল ফার্সি কবি হাফিজের ‘দেওয়ান’ অনুবাদ করতে গিয়ে মূল গ্রন্থের তিনটি কবিতাকে নকল বা পরে সংযোজিত বলে নাকচ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পারস্যের গবেষকরা অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেন নজরুলের সেই যুক্তি শতভাগ সঠিক ছিল। ফার্সি না জানা এক কবি হাজার বছর ধরে চলে আসা একটি ভুল যেভাবে ধরে দিয়েছিলেন, তাতে ইরানি গবেষকরা নজরুলকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।

এদিকে কমিউনিস্টদের বিশ্বখ্যাত ‘ইন্টারন্যাশনাল সং’-কে নজরুল রূপান্তর করেছিলেন ‘অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত’-এ, যা অনুবাদ সাহিত্যকেও ছাপিয়ে নতুন সৃষ্টিতে রূপ নেয়। ওয়াল্ট হুইটম্যানের পাইওনিয়ার ও পাইওনিয়ার কবিতাটিকে তিনি অসামান্য বাংলায় রূপ দেন।

এছাড়া, ইন্টারনেট বা ওয়াই-ফাই না থাকা সত্ত্বেও নজরুল তাঁর বিখ্যাত ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’ গানে হুবহু তুর্কি লোকসঙ্গীতের সুর তুলে এনেছেন। তাঁর ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ গানটিতে তিনি ক্যারিবিয়ান বা কিউবান নাবিকদের লোক সুরের স্বাদ এনে দিয়েছেন।

ভারতবর্ষের সীমানা না পেরিয়েও কেবল গভীর পঠন-পাঠন, অদম্য জানার আগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নজরুল জাতীয় কবি হয়েও এক বিশ্বজনীন ও বৈশ্বিক ব্যক্তিত্বে রূপ নিতে পেরেছিলেন।

বাসস : নজরুল অকৃপণভাবে নারী স্বাধীনতা ও নারীর মর্যাদার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। আপনার দৃষ্টিতে তাঁর সাহিত্যকর্মে এই বিষয়টির প্রতিফলন কেমন?

আবদুল হাই শিকদার : বাংলা সাহিত্যে তো বটেই, আমার দৃষ্টিতে বিশ্বসাহিত্যে নারীকে উদ্দেশ্য করে রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা হলো নজরুলের ‘নারী’ কবিতা। নজরুল কোনো ধরনের ফাঁকা ভাববাদিতায় বন্দি ছিলেন না। তিনি নারীকে কেবল ‘কন্যা’, ‘মাতা’ বা ‘জায়া’ হিসেবে আলাদা না দেখে নর-নারীকে একে অপরের পরিপূরক এবং পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখেছেন।

তিনি ইতিহাসে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ত্যাগের কথা, ভূমিকার কথা যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি নারীদের জাগরণের আহ্বান জানিয়েছেন। অতি সম্প্রতি কলকাতার আর জি কর কাণ্ডের প্রতিবাদেও আন্দোলনকারীরা নজরুলের “জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা” গান গেয়েই পথ হেঁটেছেন। বেগম রোকেয়া কিংবা ইসমাইল হোসেন সিরাজীর পর নজরুলই একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যিনি অত্যন্ত ঐকান্তিকতা ও গভীর আবেগ দিয়ে নারীর শৃঙ্খল মোচনের জন্য উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন।

বাসস : বর্তমান ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তরুণ প্রজন্মের প্লে-লিস্টে নজরুলসঙ্গীত কতটা স্থান পাচ্ছে?

আবদুল হাই শিকদার : যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের পোশাক, খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইল বদলে যায়। এটি যুগের স্বাভাবিক নিয়ম। তরুণরা এখন নজরুলকে ভিন্নভাবে গ্রহণ করছে। সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লবে যেমন নজরুলের গানই ছিল আন্দোলনের প্রধান সাহিত্যিক কণ্ঠস্বর, তেমনি পশ্চিমবঙ্গেও নারীদের নানা প্রতিবাদী আন্দোলনে নজরুলের সাহিত্যই মুখ্য হয়ে ওঠে।

এখন বিভিন্ন ব্যান্ড ও নতুন শিল্পীরা পরিবেশনের ঢং বা সুরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে নজরুলকে তরুণদের কাছে নিয়ে আসছে। অনেকে সুর বিকৃত না করে নতুন আঙ্গিকে পরিবেশন করছেন। নজরুল নিজেই তো বাংলা আধুনিক গানের জনক এবং এক ‘মুক্তপক্ষ বিহঙ্গ’ যিনি খাঁচায় বন্দি বাংলা সঙ্গীতকে মহাকাশ দেখিয়েছেন। তিনি তাঁর গানে কোনো শৃঙ্খল বেঁধে রেখে যাননি। কিছু ভাঙচুর বা নতুনত্ব হলেও তরুণরা নজরুলের গান শুনছে ও ধারণ করছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক।

খুঁজুন