শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা

‎দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দবার্তা মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে পৌঁছেছে। আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এই উপলক্ষ রমজানের সংযম ও ইবাদতের এক উজ্জ্বল পরিণতি। তাই ঈদ কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি আত্মিক প্রশান্তি, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য প্রতিফলন।

‎ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা, ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, সেমিস্টার ফাইনাল ও পড়াশোনার চাপ পেছনে ফেলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছুটে গেছেন নিজ নিজ বাড়িতে। দীর্ঘদিন পর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানো এবং শৈশবের স্মৃতিকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার মধ্যেই তাদের ঈদের আনন্দ ধরা দেয়।

‎শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদের অনুভূতি, উপলব্ধি ও প্রত্যাশা জানতে কথা বলেছেন মাভাবিপ্রবির শিক্ষার্থী, ক্যাম্পাস সাংবাদিক এবং বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, মাভাবিপ্রবি শাখার আহ্বায়ক মো. হৃদয় হোসাইন। পাচজন শিক্ষার্থীর বক্তব্যে উঠে এসেছে ঈদের নানা মাত্রা—আনন্দ, আত্মিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতা।

‎মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা ইউশা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জীবনে ঈদ যেন দ্বিগুণ খুশির বার্তা নিয়ে আসে। সারা বছর ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষার চাপে দূরবর্তী অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী বাসায় যেতে পারেন না। ঈদের দীর্ঘ ছুটি তাদের জীবনে স্বস্তির আবহ নিয়ে আসে।

‎তিনি বলেন, অন্যান্য বছর বিভিন্ন জায়গায় যানবাহনের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় দেখা গেলেও এবছর তুলনামূলক কম মনে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। তবে এখনও কিছু জায়গায় তৎপরতা কম রয়েছে। তাই একজন সচেতন নাগরিক ও শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানান, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যানজট ও ছিনতাই যেন ঈদযাত্রা ব্যাহত না করে, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছেও অনুরোধ করেন, যারা হলে থেকে ঈদ কাটান, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় আয়োজন নিশ্চিত করা হোক।

‎শ্যামলী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদ এক ভিন্ন অনুভূতির নাম। সারা বছরের ব্যস্ততার মাঝে ঈদ আসে স্বস্তি ও প্রশান্তির বার্তা নিয়ে। শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো ঘরে ফেরা—পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া ও প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা।

‎তিনি আরও বলেন, ঈদ কেবল বাহ্যিক উৎসব নয়; এটি আত্মিক নবজাগরণের সময়ও। রমজানের সংযম, ধৈর্য ও আত্মশুদ্ধির চর্চা ঈদের মাধ্যমে একটি সুন্দর পরিণতি পায়। অনেক শিক্ষার্থী নতুনভাবে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা পায় এই সময়টিতে।
‎একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা বাড়ছে। তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের বিশ্বাস, সবার মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায়। এছাড়া ঈদে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরি ও স্মৃতি ভাগাভাগি করার সুযোগ তৈরি হয়, যা সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে।

‎তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই পঙ্‌ক্তির কথাও স্মরণ করেন—

‎“আজ ভুলে যা তোর দোস্ত ও দুশমন, হাতে মিলাও হাতে।”
‎শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামান্না মুন বলেন, রোজার দীর্ঘ এক মাসের সাধনা, ধৈর্য ও আত্মসংযমের পর ঈদ আমাদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ততার মাঝেও ঈদের আনন্দ মনকে হালকা করে এবং নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। তিনি সবার জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুখময় জীবনের প্রত্যাশা জানান।

‎পাবনা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মো. মুছা মিয়া বলেন, ঈদের আনন্দের পাশাপাশি ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার চাপও অনুভব করছেন তিনি। কয়েক মাস ধরে ক্লাস, ওয়ার্ড ডিউটি ও ক্লিনিক্যাল পড়াশোনার ব্যস্ততা শেষে ছুটি পেলেও সামনে পরীক্ষার কারণে মানসিক চাপ রয়েছে।

‎তিনি বলেন, “পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো ভালো লাগছে, তবে পড়াশোনার চাপ সবসময় মাথায় থাকে। চেষ্টা করছি প্রতিদিন কিছু সময় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে, যদিও বাসায় গিয়ে তা কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও ঈদের আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য ভালো ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করছি।”

‎কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনুভা জামান বলেন, ঈদ তার কাছে শুধু উৎসব নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার এক বিশেষ সময়। রমজানের শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের অনুপ্রেরণা দেয়। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ নেওয়া এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই তিনি ঈদের প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পান।

‎সব মিলিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদ একটি বহুমাত্রিক অনুভূতির নাম। এটি যেমন আনন্দ ও প্রশান্তির বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি আত্মিক উন্নয়ন, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ব্যস্ত জীবনের মাঝে এই উৎসব শিক্ষার্থীদের নতুন উদ্যমে পথচলার প্রেরণা জোগায় এবং সম্পর্কগুলোকে করে আরও দৃঢ় ও প্রাণবন্ত।

‎ঈদ তাই কেবল একটি উৎসব নয়; এটি মানুষের মাঝে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এক মহামিলন।

খুঁজুন