মহিউদ্দিন মোহাম্মদের 'বানরের আয়না' বইয়ে 'মানুষ কেন বেনজির হতে চায়' এমন শিরোনামে একটা লেখা আছে। লেখাটি কয়েক মাস আগে প্রকাশিত হলে সেটি ভাইরাল হয়। সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদেরও দৃষ্টিগোচর হয়। তখন তিনি সেটার প্রতিবাদ জানিয়ে কোথা থেকে যেন মোবাইল নাম্বার জোগাড় করে সরাসরি মহিউদ্দিন মোহাম্মদকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠান ও ফোন করেন। বেনজির আহমেদের সেই মেসেজটা নিচে হুবহু দেওয়া হলো, একইসাথে পুলিশের বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত ও বসুন্ধরা গ্রুপ সম্পর্কে বেনজির আহমেদের নিজের দেওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে পরিবেশন করা হলো।
বেনজির আহমেদের মেসেজ (হুবহু):
"সালাম,
আমার সম্পর্কে আপনার লেখাটি আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। আমাকে নিয়ে খুনি, মাফিয়া, বাংলাদেশের এপস্টিন,বসুন্ধরা গ্রূপের ঘৃণ্য অসত্য ও মিথ্যাচার কে পরিপূর্ণ সত্য জ্ঞান হিসাবে বিশ্বাস করে আপনার লেখার ভেতর যে সামাজিক মনোস্তাত্তিক সংকটের বিষয় অবতারণা করেছেন সেটা মূলত মার্ক্স এর একটি বিখ্যাত দর্শন বটে। বাংলাদেশে এটা নিয়ে বদরুদ্দিন ওমর ও আহমেদ ছফারও লেখা লেখি আছে।
সম্ভবত ২০১২ সালের দিকে আমাকে নিয়ে ntv এর একটা ডকুমেন্টারি টাইপ একটা শো ইউ টিউব এ এখনো আছে।
আমি যে বাড়িতে বড়ো হয়েছি, দেখবেন তার মাথার উপর একটা অনেক পুরোনো ছাদ রয়েছে।
আমাকে কখনো সেখানে কিছু যোগ করতে হয়নি।
আমি তিন তিন বার বিদেশে চাকরি করেছি।
সর্বশেষ, নিউইয়র্ক জাতি সংঘ সদর দপ্তরে মাসিক ১৫ হাজার ডলার বেতনে চাকরি করেছি।
আমার চাকরি জীবনে এমন কি রাজনৈতিক কারণে আমার দুশমন সহকর্মীদেরকে আজকেও জিজ্ঞেস করলে জানবেন নিয়োগ, পদোননতি, পদায়ন থেকে কখনো টাকা পয়সা নিয়েছি এমন কোনো অভিযোগ কেউই করতে পারবে না।
সব থেকে দুর্নীতি গ্রস্থ বলে অভিযুক্ত পুলিশ বাহিনীতে ২৫০ বছরের পুরোনো নিয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন করে শুধু মাত্র ১২০ টাকা সরকারি ব্যাংক ড্রাফট জমা দিয়ে ঘুষ মুক্ত নিয়োগের ব্যবস্থা করেছি। এ তথ্য গুলা এখনো পাবলিক ডোমইন এ আছে। একারণে ঘুষ দুর্নীতির সকল প্রকার সুবিধা ভোগী দের মারাত্মক চক্ষু শুল হবার ঝুকি নিয়েছি, হয়েছি ও বটে ।
আমার স্ত্রী একজন সেলফ এমপ্লয়েড ও এন্টারপ্রেনর। আমার পদ ও চাকরির সঙ্গে সেটির কোনো সম্পর্ক নাই। ১৯৯৫ সাল থেকে আমার স্ত্রীর পৃথক ইনকাম ট্যাক্স ফাইল রয়েছে।
অ্যারিস্টটল এর সেই বিখ্যাত উক্তি, "Man is a Political animal" মনে রেখে বলতে চাই আপনার কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতেই পারে, সেটাকে সম্মান করছি। আপনি নিজেকে অফ ট্র্যাক লেখক হিসাবে দাবি করেন। সে জায়গাটিতে আস্থা রেখে আসলে আপনাকে আমার এই লেখার প্রয়াস কিংবা অপপ্রয়াস।
ভালো থাকবেন।
ড বেনজীর আহমেদ"
বেনজির সম্পর্কে পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা থেকে প্রাপ্ত তথ্য:
১। পুলিশে নিয়োগ-দুর্নীতির বড় উৎস ছিলো কনস্টেবল নিয়োগ। এই নিয়োগ-বাণিজ্য জেলা এসপি'রা করতেন, কারণ তখন জেলা এসপির হাতে ছিলো কনস্টেবল নিয়োগ-পরীক্ষার খাতা দেখার ক্ষমতা। বেনজির আহমেদ আইজিপি হওয়ার পর তিনি কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার খাতা দেখার ক্ষমতা জেলা এসপি'দের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সরাসরি পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে আসেন। শুরু হয় কেন্দ্রীয়ভাবে পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষার খাতা দেখা। কেন্দ্রীয়ভাবে চাকরিপ্রার্থীদের নম্বর স্কোরিং ও মেধা তালিকা চালু হয়। ফলে মাত্র ১২০/- টাকা সরকারি ব্যাংক ড্রাফট দিয়ে প্রার্থীরা পুলিশে চাকরি পাওয়ার সুযোগ লাভ করেন। এই কৃতিত্ব বেনজির আহমেদের বলে জানিয়েছেন পুলিশে বর্তমানে উচ্চপদে চাকরিরত একাধিক কর্মকর্তা।
২। আগে জেলা পুলিশের জন্য ফার্নিচার কেনা বাবদ মাসে মাসে মোটা অঙ্কের টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হতো পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। এই টাকা প্রায় পুরোটাই (আনুমানিক ১৫ লাখ টাকা মাসিক) জেলা পুলিশ সুপাররা মেরে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বেনজির আহমেদ আইজিপি হওয়ার পর এটা বন্ধ করেন। তিনি পরিপত্র জারি করেন যে, এখন থেকে ফার্নিচার কেনা বাবদ কোনো থোক বরাদ্দ দেওয়া হবে না। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে চাহিদামাফিক সরাসরি ফার্নিচার কিনে পাঠানো হবে।
৩। জেলা পুলিশের জন্য আগে বিপুল পরিমাণ ওষুধ কেনার টাকা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেওয়া হতো, যা জেলা এসপি'রা মেরে দিতেন। বেনজির আহমেদ আইজিপি হয়ে এটা বন্ধ করেন। তিনি পুলিশ সদস্যরা যেন নিজের ওষুধ নিজে তুলতে পারেন, সেই ব্যবস্থা চালু করেন।
৪। পুলিশে টাকা কামানোর প্রধান উপায় চাকরি জীবনে কোনো একবার জেলা এসপি হওয়া। কিন্তু বেনজির আহমেদ কেবলমাত্র ১ বার কয়েক মাসের জন্য কিশোরগঞ্জের জেলা এসপি হয়েছিলেন, এবং সেখান থেকে পূর্ণ মেয়াদ (আনুমানিক কয়েক বছর) শেষ করা দূরের কথা, জেলা এসপি হওয়ার ২-৩ মাসের মধ্যেই সদর দপ্তরে স্বেচ্ছায় বদলি হওয়ার জন্য তদবির করেন। কারণ হিশেবে জানা যায়, দীর্ঘ সময় জেলা এসপি থাকতে হলে নানা আজেবাজে ও ব্যক্তিত্বহীন কাজ করতে হয়, যেমন সাংবাদিকদের অন্যায় আবদার মানা, রাজনীতিক নেতাদের নানা অন্যায় তদবির মানা, এগুলো। বেনজির এগুলো পছন্দ করতেন না। এবং বেনজির কিশোরগঞ্জের এসপি থাকাকালীন আওয়ামী লীগের বড় রাজনীতিক নেতাদের কথাও শুনতেন না বলে সৈয়দ আশরাফের মতো নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। বেনজির যে-কয়েক মাস কিশোরগঞ্জের এসপি ছিলেন, সে-কয়েক মাসে তার বিরুদ্ধে কোনোপ্রকার ঘুষ বা অন্য কোনো দুই নম্বরির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তৎকালীন কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে এখনও শোনা যায় যে, বেনজির আহমেদ তাদের সামনেই মন্ত্রী এমপিদের সুপারিশযুক্ত কাগজ ছিড়ে ফেলে দিতেন।
৫। বেনজির আহমেদ কখনো এসপি র্যাংকের নিচে কারও সাথে কথা বলতেন না। কোনো ওসি তার সাথে কথা বলার সুযোগ পেতেন না। ডিএমপি কমিশনার ও আইজিপি থাকার সময়ে তার অফিসে কোনো ওসি ঢুকতে পারতেন না। পুলিশে দুর্নীতির একটি বড় উৎস ওসি পদায়ন। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বেনজির ডিসিপ্লিন্ড বাহিনীর চেইন অভ কমান্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন। তার সাথে ওসি বা ইন্সপেক্টরদের দহরম মহরম কেউ কখনো দেখেননি।
৬। বেনজির আহমেদ পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের ছিলেন। পাশাপাশি একাধিকবার বিদেশে উচ্চ বেতনে চাকরি করেছেন। পেনশনও নিয়েছেন। চাকরিজীবনে ঘুষ-টুষ না খেলেও তিনি ব্যবসায়িক মাইন্ডের লোক ছিলেন। চাকরিরত থাকা অবস্থায়ই তিনি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো জমির ব্যবসা। বেনজির আহমেদ সম্পত্তি করেছেন মূলত জমির ব্যবসার মাধ্যমে। পুলিশের আনন্দ হাউজিং বেনজিরের নিজের প্রতিষ্ঠান নয়, এটা পুলিশ সমিতির প্রতিষ্ঠান। আনন্দ হাউজিং মূলত পরিচালনা করতেন বেনজিরের আস্থাভাজন এসপি জাবের চৌধুরী, যিনি বর্তমানে বিএনপি সরকারের অধীনে সিলেটের এসপি।
বসুন্ধরা গ্রুপ সম্পর্কে বেনজিরের দেওয়া তথ্য:
১। বসুন্ধরা গ্রুপের সাথে বেনজিরের ঝামেলা শুরু হয় আলোচিত মুনিয়া হত্যা মামলার ঘটনা থেকে। বসুন্ধরার মালিকের ছেলের বিরুদ্ধে যখন মামলা হয়, তখন বসুন্ধরার মালিক শাহ আলম বেনজিরকে বসুন্ধরায় তার বাসায় ডাকেন। বেনজির যেতে অস্বীকৃতি জানান। বেনজির আহমেদের মতে, বসুন্ধরার মালিকের বাসায় তৎকালীন মন্ত্রী-এমপিরা ডাক পেলেই ছুটে যেতেন। সেই হিসেবে শাহ আলম ভেবেছিলেন বেনজিরও যাবেন। কিন্তু বেনজির কখনোই এ ধরণের ডাকে বসুন্ধরার মালিকের বাসায় যাননি। ফলে বসুন্ধরার মালিক বাধ্য হয়ে বেনজিরের অফিস/বাসভবনে এসে দেখা করেন। সেখানে বেনজিরের সাথে বসুন্ধরার মালিকের কথা কাটাকাটি হয় মামলা নিয়ে। মালিক শাহ আলম বলেন, আপনার পুলিশ আমার ছেলের বিরুদ্ধে মামলা নেয় কোণ সাহসে? আপনি বলতেছেন আপনি জানেন না, আপনার অর্ডার ছাড়া মামলা নিছে? বেনজির তখন বলেন, আমি বাংলাদেশ পুলিশের আইজি। কোথায় কোন ওসি কার বিরুদ্ধে মামলা নিলো না নিলো এগুলো আমার দেখার বিষয় না। সিআরপিসি অনুযায়ী মামলা নেয়ার ক্ষমতা থানার ওসির। সে বড়জোর তার ডিসির সাথে বা জেলা এসপি বা সার্কেল এসপির সাথে পরামর্শ করতে পারে। আমি আইজি’র কি এই টাইম আছে নাকি যে ওসির মামলা নেওয়া তদারকির করার?
এই কথা শুনে শাহ আলম বেনজিরের এখান থেকে বেরিয়ে কোন এক মন্ত্রীর বাসায় যান। এবং বেনজির তখন শাহ আলমের ছেলেকে মুনিয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেন পুলিশকে।
বেনজিরের দাবি, তারপর থেকেই নাকি বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন পত্রিকা একযোগে বেনজিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন ছাপাতে থাকে। এবং বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক এক পর্যায়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করে তার ছেলেকে রক্ষা করে। বেনজির আহমেদ আরও দাবি করেন, আমি আইজিপি থাকলে মুনিয়া হত্যা মামলার বিচার হতো।
২। বেনজির দাবি করেন, দেখেন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির। অথচ আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার যে-চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, সেইখানে মাত্র ১৭ কোটি টাকার চার্জশিট। তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকা গেলো কোথায়? আর ১৭ কোটি টাকার সম্পত্তি ভাই কতো মানুষেরই আছে। গ্রামগঞ্জেও বহু মানুষ আছে এখন যাদের মোট সম্পত্তি ১৭ কোটি টাকার বেশি। বেনজির আরও দাবি করেন, আমি অনেক আগে কম দামে জমি কিনেছি, সেগুলোর দাম বেড়েছে সেইটা কি আমার দোষ?
লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ এক পর্যায়ে বেনজির আহমেদকে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম নিয়ে প্রশ্ন করেন। বেনজির জবাব দেন, আপনার কি মনে হয় যে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ক্ষমতা আছে এইসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার? মহিউদ্দিন মোহাম্মদ পাল্টা প্রশ্ন করেন, তাহলে সিদ্ধান্তগুলো কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী দিতেন? তখন বেনজির আহমেদ এ বিষয়ে এই মুহুর্তে বিস্তারিত বলতে অপারগতা জানান।
একজন বেনজীর আহমেদ ও মানুষের মিথ্যাচার
একজন বেনজীর আহমেদ ও মানুষের মিথ্যাচার
মহিউদ্দিন মোহাম্মদের 'বানরের আয়না' বইয়ে 'মানুষ কেন বেনজির হতে চায়' এমন শিরোনামে একটা লেখা আছে। লেখাটি কয়েক মাস আগে প্রকাশিত হলে সেটি ভাইরাল হয়। সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদেরও দৃষ্টিগোচর হয়। তখন তিনি সেটার প্রতিবাদ জানিয়ে কোথা থেকে যেন মোবাইল নাম্বার জোগাড় করে সরাসরি মহিউদ্দিন মোহাম্মদকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠান ও ফোন করেন। বেনজির আহমেদের সেই মেসেজটা নিচে হুবহু দেওয়া হলো, একইসাথে পুলিশের বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত ও বসুন্ধরা গ্রুপ সম্পর্কে বেনজির আহমেদের নিজের দেওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে পরিবেশন করা হলো। বেনজির আহমেদের মেসেজ (হুবহু): "সালাম,আমার সম্পর্কে আপনার লেখাটি আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। আমাকে নিয়ে খুনি, মাফিয়া, বাংলাদেশের এপস্টিন,বসুন্ধরা গ্রূপের ঘৃণ্য অসত্য ও মিথ্যাচার কে পরিপূর্ণ সত্য জ্ঞান হিসাবে বিশ্বাস করে আপনার লেখার ভেতর যে সামাজিক মনোস্তাত্তিক সংকটের বিষয় অবতারণা করেছেন সেটা মূলত মার্ক্স এর একটি বিখ্যাত দর্শন বটে। বাংলাদেশে এটা নিয়ে বদরুদ্দিন ওমর ও আহমেদ ছফারও লেখা লেখি আছে।সম্ভবত ২০১২ সালের দিকে আমাকে নিয়ে ntv এর একটা ডকুমেন্টারি টাইপ একটা শো ইউ টিউব এ এখনো আছে।আমি যে বাড়িতে বড়ো হয়েছি, দেখবেন তার মাথার উপর একটা অনেক পুরোনো ছাদ রয়েছে।আমাকে কখনো সেখানে কিছু যোগ করতে হয়নি।আমি তিন তিন বার বিদেশে চাকরি করেছি।সর্বশেষ, নিউইয়র্ক জাতি সংঘ সদর দপ্তরে মাসিক ১৫ হাজার ডলার বেতনে চাকরি করেছি।আমার চাকরি জীবনে এমন কি রাজনৈতিক কারণে আমার দুশমন সহকর্মীদেরকে আজকেও জিজ্ঞেস করলে জানবেন নিয়োগ, পদোননতি, পদায়ন থেকে কখনো টাকা পয়সা নিয়েছি এমন কোনো অভিযোগ কেউই করতে পারবে না।সব থেকে দুর্নীতি গ্রস্থ বলে অভিযুক্ত পুলিশ বাহিনীতে ২৫০ বছরের পুরোনো নিয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন করে শুধু মাত্র ১২০ টাকা সরকারি ব্যাংক ড্রাফট জমা দিয়ে ঘুষ মুক্ত নিয়োগের ব্যবস্থা করেছি। এ তথ্য গুলা এখনো পাবলিক ডোমইন এ আছে। একারণে ঘুষ দুর্নীতির সকল প্রকার সুবিধা ভোগী দের মারাত্মক চক্ষু শুল হবার ঝুকি নিয়েছি, হয়েছি ও বটে ।আমার স্ত্রী একজন সেলফ এমপ্লয়েড ও এন্টারপ্রেনর। আমার পদ ও চাকরির সঙ্গে সেটির কোনো সম্পর্ক নাই। ১৯৯৫ সাল থেকে আমার স্ত্রীর পৃথক ইনকাম ট্যাক্স ফাইল রয়েছে।অ্যারিস্টটল এর সেই বিখ্যাত উক্তি, "Man is a Political animal" মনে রেখে বলতে চাই আপনার কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতেই পারে, সেটাকে সম্মান করছি। আপনি নিজেকে অফ ট্র্যাক লেখক হিসাবে দাবি করেন। সে জায়গাটিতে আস্থা রেখে আসলে আপনাকে আমার এই লেখার প্রয়াস কিংবা অপপ্রয়াস।ভালো থাকবেন।ড বেনজীর আহমেদ" বেনজির সম্পর্কে পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা থেকে প্রাপ্ত তথ্য: ১। পুলিশে নিয়োগ-দুর্নীতির বড় উৎস ছিলো কনস্টেবল নিয়োগ। এই নিয়োগ-বাণিজ্য জেলা এসপি'রা করতেন, কারণ তখন জেলা এসপির হাতে ছিলো কনস্টেবল নিয়োগ-পরীক্ষার খাতা দেখার ক্ষমতা। বেনজির আহমেদ আইজিপি হওয়ার পর তিনি কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার খাতা দেখার ক্ষমতা জেলা এসপি'দের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সরাসরি পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে আসেন। শুরু হয় কেন্দ্রীয়ভাবে পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষার খাতা দেখা। কেন্দ্রীয়ভাবে চাকরিপ্রার্থীদের নম্বর স্কোরিং ও
মেধা তালিকা চালু হয়। ফলে মাত্র ১২০/- টাকা সরকারি ব্যাংক ড্রাফট দিয়ে প্রার্থীরা পুলিশে চাকরি পাওয়ার সুযোগ লাভ করেন। এই কৃতিত্ব বেনজির আহমেদের বলে জানিয়েছেন পুলিশে বর্তমানে উচ্চপদে চাকরিরত একাধিক কর্মকর্তা। ২। আগে জেলা পুলিশের জন্য ফার্নিচার কেনা বাবদ মাসে মাসে মোটা অঙ্কের টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হতো পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। এই টাকা প্রায় পুরোটাই (আনুমানিক ১৫ লাখ টাকা মাসিক) জেলা পুলিশ সুপাররা মেরে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বেনজির আহমেদ আইজিপি হওয়ার পর এটা বন্ধ করেন। তিনি পরিপত্র জারি করেন যে, এখন থেকে ফার্নিচার কেনা বাবদ কোনো থোক বরাদ্দ দেওয়া হবে না। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে চাহিদামাফিক সরাসরি ফার্নিচার কিনে পাঠানো হবে। ৩। জেলা পুলিশের জন্য আগে বিপুল পরিমাণ ওষুধ কেনার টাকা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেওয়া হতো, যা জেলা এসপি'রা মেরে দিতেন। বেনজির আহমেদ আইজিপি হয়ে এটা বন্ধ করেন। তিনি পুলিশ সদস্যরা যেন নিজের ওষুধ নিজে তুলতে পারেন, সেই ব্যবস্থা চালু করেন। ৪। পুলিশে টাকা কামানোর প্রধান উপায় চাকরি জীবনে কোনো একবার জেলা এসপি হওয়া। কিন্তু বেনজির আহমেদ কেবলমাত্র ১ বার কয়েক মাসের জন্য কিশোরগঞ্জের জেলা এসপি হয়েছিলেন, এবং সেখান থেকে পূর্ণ মেয়াদ (আনুমানিক কয়েক বছর) শেষ করা দূরের কথা, জেলা এসপি হওয়ার ২-৩ মাসের মধ্যেই সদর দপ্তরে স্বেচ্ছায় বদলি হওয়ার জন্য তদবির করেন। কারণ হিশেবে জানা যায়, দীর্ঘ সময় জেলা এসপি থাকতে হলে নানা আজেবাজে ও ব্যক্তিত্বহীন কাজ করতে হয়, যেমন সাংবাদিকদের অন্যায় আবদার মানা, রাজনীতিক নেতাদের নানা অন্যায় তদবির মানা, এগুলো। বেনজির এগুলো পছন্দ করতেন না। এবং বেনজির কিশোরগঞ্জের এসপি থাকাকালীন আওয়ামী লীগের বড় রাজনীতিক নেতাদের কথাও শুনতেন না বলে সৈয়দ আশরাফের মতো নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। বেনজির যে-কয়েক মাস কিশোরগঞ্জের এসপি ছিলেন, সে-কয়েক মাসে তার বিরুদ্ধে কোনোপ্রকার ঘুষ বা অন্য কোনো দুই নম্বরির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তৎকালীন কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে এখনও শোনা যায় যে, বেনজির আহমেদ তাদের সামনেই মন্ত্রী এমপিদের সুপারিশযুক্ত কাগজ ছিড়ে ফেলে দিতেন। ৫। বেনজির আহমেদ কখনো এসপি র্যাংকের নিচে কারও সাথে কথা বলতেন না। কোনো ওসি তার সাথে কথা বলার সুযোগ পেতেন না। ডিএমপি কমিশনার ও আইজিপি থাকার সময়ে তার অফিসে কোনো ওসি ঢুকতে পারতেন না। পুলিশে দুর্নীতির একটি বড় উৎস ওসি পদায়ন। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বেনজির ডিসিপ্লিন্ড বাহিনীর চেইন অভ কমান্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন। তার সাথে ওসি বা ইন্সপেক্টরদের দহরম মহরম কেউ কখনো দেখেননি। ৬। বেনজির আহমেদ পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের ছিলেন। পাশাপাশি একাধিকবার বিদেশে উচ্চ বেতনে চাকরি করেছেন। পেনশনও নিয়েছেন। চাকরিজীবনে ঘুষ-টুষ না খেলেও তিনি ব্যবসায়িক মাইন্ডের লোক ছিলেন। চাকরিরত থাকা অবস্থায়ই তিনি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো জমির ব্যবসা। বেনজির আহমেদ সম্পত্তি করেছেন মূলত জমির ব্যবসার মাধ্যমে। পুলিশের আনন্দ হাউজিং বেনজিরের নিজের প্রতিষ্ঠান নয়, এটা পুলিশ সমিতির
প্রতিষ্ঠান। আনন্দ হাউজিং মূলত পরিচালনা করতেন বেনজিরের আস্থাভাজন এসপি জাবের চৌধুরী, যিনি বর্তমানে বিএনপি সরকারের অধীনে সিলেটের এসপি। বসুন্ধরা গ্রুপ সম্পর্কে বেনজিরের দেওয়া তথ্য: ১। বসুন্ধরা গ্রুপের সাথে বেনজিরের ঝামেলা শুরু হয় আলোচিত মুনিয়া হত্যা মামলার ঘটনা থেকে। বসুন্ধরার মালিকের ছেলের বিরুদ্ধে যখন মামলা হয়, তখন বসুন্ধরার মালিক শাহ আলম বেনজিরকে বসুন্ধরায় তার বাসায় ডাকেন। বেনজির যেতে অস্বীকৃতি জানান। বেনজির আহমেদের মতে, বসুন্ধরার মালিকের বাসায় তৎকালীন মন্ত্রী-এমপিরা ডাক পেলেই ছুটে যেতেন। সেই হিসেবে শাহ আলম ভেবেছিলেন বেনজিরও যাবেন। কিন্তু বেনজির কখনোই এ ধরণের ডাকে বসুন্ধরার মালিকের বাসায় যাননি। ফলে বসুন্ধরার মালিক বাধ্য হয়ে বেনজিরের অফিস/বাসভবনে এসে দেখা করেন। সেখানে বেনজিরের সাথে বসুন্ধরার মালিকের কথা কাটাকাটি হয় মামলা নিয়ে। মালিক শাহ আলম বলেন, আপনার পুলিশ আমার ছেলের বিরুদ্ধে মামলা নেয় কোণ সাহসে? আপনি বলতেছেন আপনি জানেন না, আপনার অর্ডার ছাড়া মামলা নিছে? বেনজির তখন বলেন, আমি বাংলাদেশ পুলিশের আইজি। কোথায় কোন ওসি কার বিরুদ্ধে মামলা নিলো না নিলো এগুলো আমার দেখার বিষয় না। সিআরপিসি অনুযায়ী মামলা নেয়ার ক্ষমতা থানার ওসির। সে বড়জোর তার ডিসির সাথে বা জেলা এসপি বা সার্কেল এসপির সাথে পরামর্শ করতে পারে। আমি আইজি’র কি এই টাইম আছে নাকি যে ওসির মামলা নেওয়া তদারকির করার? এই কথা শুনে শাহ আলম বেনজিরের এখান থেকে বেরিয়ে কোন এক মন্ত্রীর বাসায় যান। এবং বেনজির তখন শাহ আলমের ছেলেকে মুনিয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেন পুলিশকে। বেনজিরের দাবি, তারপর থেকেই নাকি বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন পত্রিকা একযোগে বেনজিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন ছাপাতে থাকে। এবং বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক এক পর্যায়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করে তার ছেলেকে রক্ষা করে। বেনজির আহমেদ আরও দাবি করেন, আমি আইজিপি থাকলে মুনিয়া হত্যা মামলার বিচার হতো। ২। বেনজির দাবি করেন, দেখেন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির। অথচ আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার যে-চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, সেইখানে মাত্র ১৭ কোটি টাকার চার্জশিট। তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকা গেলো কোথায়? আর ১৭ কোটি টাকার সম্পত্তি ভাই কতো মানুষেরই আছে। গ্রামগঞ্জেও বহু মানুষ আছে এখন যাদের মোট সম্পত্তি ১৭ কোটি টাকার বেশি। বেনজির আরও দাবি করেন, আমি অনেক আগে কম দামে জমি কিনেছি, সেগুলোর দাম বেড়েছে সেইটা কি আমার দোষ? লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ এক পর্যায়ে বেনজির আহমেদকে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম নিয়ে প্রশ্ন করেন। বেনজির জবাব দেন, আপনার কি মনে হয় যে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ক্ষমতা আছে এইসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার? মহিউদ্দিন মোহাম্মদ পাল্টা প্রশ্ন করেন, তাহলে সিদ্ধান্তগুলো কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী দিতেন? তখন বেনজির আহমেদ এ বিষয়ে এই মুহুর্তে বিস্তারিত বলতে অপারগতা জানান।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত