দীর্ঘ ১৭ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে লন্ডনের নির্বাসিত জীবন শেষে আগামীকাল দুপুরে দেশের মাটিতে পা রাখছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন তিনি। তাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটটি সিলেট হয়ে ঢাকায় নামবে। এরপর রাজধানীর পূর্বাচলের তিনশ’ ফিট সড়কে ঐতিহাসিক সংবর্ধনায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেবেন তিনি।
৫ আগস্ট পরবর্তী স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ছিলো কবে ফিরছেন তারেক রহমান। অবশেষে সব শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ২৫ ডিসেম্বর দেশের মাটিতে পা রাখছেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা। তার এই আগমনকে ঐতিহাসিক বলছে বিএনপি। দলটি বলছে, স্মরনকালের সব রেকর্ড ভাঙবে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
সম্প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার শারিরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রশ্ন ওঠে কেনো ফিরছেন না তারেক রহমান। যার ব্যাখ্যা নিজেই দিয়েছিলেন তারেক রহমান। তার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু তার নিজের ইচ্ছের ওপর নয় বলে জানিয়েছিলেন। পরে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান দেশে এসে বেগম খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন। এরই মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষনা দেন তারেক রহমান।
**তারেক রহমান দেশে ফেরার জন্য ট্রাভল পাসের আবেদন করেন গত ১৮ ডিসেম্বর। পরদিনই তা হাতে পান।
**বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করবেন তারেক রহমান।
**বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার** উড়োজাহাজটি ২৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
**এর আগে বিমানটি সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় এক ঘণ্টা যাত্রাবিরতি করবে।
**তারেক রহমানসহ সফরসঙ্গী ৬ জন :
>সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান,
>কন্যা জাইমা রহমান,
>মিডিয়া টিমের প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ
>ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবদুর রহমান সানি
>তাবাসসুম ফারহানা।
**বিমানবন্দরে অবতরণের পর দলের সিনিয়র নেতারা তারেক রহমানকে স্বাগত জানাবেন।
**এরপর **এসএসএফের নিরাপত্তায় ( হতে পারে) বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কুড়িল বিশ্বরোড সংলগ্ন ৩০০ ফিট এলাকায় নির্মিত সংবর্ধনা মঞ্চে উঠবেন তিনি।
**সেখানে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখবেন। দেশবাসীকে কৃতজ্ঞতা জানাবেন।
**সমাবেশস্থল থেকে সরাসরি যাবেন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অসুস্থ মা বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে।
**মায়ের শয্যাপাশে কিছু সময় কাটাবেন।
**গুলশানের বাসায় ফিরবেন। গুলশান ২ এভিনিউ এর ১৯৬ নম্বর বাড়ি।
**তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে ৩০০ ফিট এলাকা সংলগ্ন মহাসড়কে নির্মিত হয়েছে বিশাল সংবর্ধনা মঞ্চ।
**রোববার দুপুর থেকেই মঞ্চ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি ৪৮ ফিট বাই ৩৬ ফিট মঞ্চ।
** বিভিন্ন রুটে ১০টি ট্রেন : বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢাকায় যাতায়াতের উদ্দেশ্যে বিশেষ ট্রেন ও অতিরিক্ত কোচ বরাদ্দ করেছে রেলওয়ে। মানুষ এসেছে বাস- লঞ্চ- ট্রাক- মাইক্রোবাসেও।
**প্রায় ৩০ লক্ষাধিক দলীয় নেতাকর্মীসহ প্রায় ৫০ লাখ মানুষের উপস্থিতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের শক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যও রয়েছে এই আয়োজনকে ঘিরে। **ইতোমধ্যে তার এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বইছে উৎসবের আমেজ। বলা যায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন রূপ নিয়েছে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে।
**দেশের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে কঠোর নিরাপত্তার বলয়ে থাকবেন তারেক রহমান। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)-এর নিরাপত্তা প্রটোকল সরবরাহ করা হবে**। এ ছাড়া পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রায় দুই হাজার সদস্য কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে।
**বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং গুলশান এভিনিউয়ের বাসভবন পর্যন্ত পুরো পথটি নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হবে।
**পুলিশের স্পেশাল এস্কর্ট ছাড়াও সাদা পোশাকে ও পোশাকি পুলিশের পাশাপাশি বিএনপির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী ‘চেয়ারপার্সন সিকিউরিটি ফোর্স’ (সিএসএফ) সমন্বিতভাবে এই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।
**নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৩ ডিসেম্বর থেকেই পুলিশের বিশেষ পাহারা শুরু হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত প্রতিটি থানা এলাকায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নতুন করে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
**তারেক রহমানের ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করা বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন বুলেট প্রুফ ‘হার্ড জিপ’ গাড়ি দেশে আনা হয়েছে। টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো এলসি ২৫০ মডেলের এই গাড়িটি ইতোমধ্যেই বিএনপির নামে নিবন্ধিত হয়েছে। এ ছাড়া তার নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের জন্য বুলেট প্রুফ বাসও দেশে চলে এসেছে। বাসটি রবিবার চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হয়েছে।
**তারেক রহমান নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণের জন্য আগামী ২৭ ডিসেম্বর ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রণয়নের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন।
**সল্প সময়ের মধ্যে জিয়াউর রহমানের সমাধি জিয়ারত করার কথা রয়েছে তারেক রহমানের।
**ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আগমনকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে বিএনপির গুলশান ও নয়াপল্টন কার্যালয়। উদ্বোধন হযেছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরবচারনা অফিস।
**বিএনপির নেতারা বলছেন- ১৭ বছর ধরে তাকে তার পরিবার, দেশ ও মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। তিনি তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি, এমনকি ছোট ভাইয়ের লাশ ও জানাজায়ও অংশ নিতে পারেননি। এসব ঘটনার জন্য স্বৈরচার শেখ হাসিনা দায়ী।
**দলীয় নেতাকর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তার এই প্রত্যাবর্তনকে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছে বিএনপি।
**বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০'র পথ ধরে ২০২২ সালে রাষ্ট্র সংস্কারের ২৭ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেন তারেক রহমান। যার মূল অঙ্গীকার রাষ্ট্র ও দেশকে নতুন একটি দিগন্তের প্রান্তে নিয়ে যাওয়া।
**পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জুলাইতে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও দীর্ঘ মতবিনিময়ের পর ঘোষিত হয় ৩১ দফা। যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বিনির্মাণের নতুন এক ইশতেহার ৩১ দফা।
জীবন বৃত্তান্ত :
**তারেক রহমান; জন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯৬৫
**বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের একজন সাক্ষী এবং অংশগ্রহণকারী তারেক রহমান।
**১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যুদ্ধে গেলে তাকে, তার মা এবং তার ভাইকে, অন্যান্য আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে গ্রেফতার করা হয়।
**তারেক রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কারাবন্দী হওয়া সর্বকনিষ্ঠ কারাবন্দীদের একজন।
**ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হন।আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।
**১৯৮৮ সালে দলের গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়।
**১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি তার মা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেন।
** ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই দলের কর্মকান্ডে জরান তারেক রহমান।
**২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে চেয়ারপারসনের ছেলে হয়েও এবং তৃণমূল থেকে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও তিনি স্বজনপ্রীতি করে কোনো মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্যপদ গ্রহণ না করে দলের তৃণমূলের ক্ষমতায়নে মনোনিবেশ করেন।
**দল সংগঠনে তার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০২ সালে স্থায়ী কমিটি তাকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত করে।
**২০০৫ সালে, তারেক রহমান দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন করেন এবং বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা ইউনিটের সাথে মতবিনিময় করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
**২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সামরিক শাসকদের বেআইনি ক্ষমতা দখলের পর জনাব তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়।
**তখনকার সরকারি দপ্তরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ব্যক্তিরা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের জনাব রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য করেছিল।
**এসময় তার মা বেগম জিয়াকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে তাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে যেতে হয়েছিল।
**বাংলাদেশে নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন- এই ইস্যুতে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতার জের ধরে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিতে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিলো, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘ওয়ান ইলেভেন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
**আওয়ামী লীগসহ সমমনা দলগুলোর আন্দোলনের মুখে রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে তখনকার প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ১১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি সে বছরের ২২ জানুয়ারি যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল তা বাতিল করেছিলেন।
**এর সূত্র ধরেই ক্ষমতায় এসেছিলো সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার প্রধান হয়েছিলেন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ। আর তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ।
**মঈন ইউ আহমেদ সে সময়ের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে ‘শান্তির স্বপ্নে: সময়ের স্মৃতিচারণ’ নামক একটি বই লিখেছেন। সেই বইতে তিনি ওয়ান ইলেভেনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। কোন পরিস্থিতিতে তখনকার সামরিক কর্মকর্তারা জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে ছিলেন তাও বইতে উল্লেখ করেন তিনি।
জরুরি অবস্থা জারির পর রাজনৈতিক দলগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। শুরু হয় রাজনৈতিক নেতাদের ধরপাকড়। দুর্নীতির অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকে গ্রেপ্তার হন। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানকে ক্যান্টমেন্টের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে পাঠানোর নানা চেষ্টা ছিল। তবে তিনি দেশ ছাড়তে রাজি হননি। ফলে একই বছর ৩ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করে বিশেষ কারাগারে নেওয়া হয়।
**কারাগারে তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন হয় বলে অভিযোগ করে এসেছে বিএনপি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠাতে হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তখনকার পিজি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুক্তি পান তিনি। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পান। ওদিন তখনকার পিজি হাসপাতালে মা-ছেলের দেখা হয়। ওইদিন রাতেই তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
**২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ধীরে ধীরে বিএনপির পুনর্গঠনে যুক্ত হন। **২০১৮ সালে, যখন সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বেগম খালেদা জিয়া মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে বন্দী হন, তখন তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনীত করা হয়। তখন থেকেই তিনি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
**১৯৯৪ সালে, তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রাক্তন নৌবাহিনী প্রধান এবং পরবর্তী সরকারের দুই বারের মন্ত্রী প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা ডাঃ জোবায়দা রহমানকে বিয়ে করেন। জোবায়দা রহমান একজন কার্ডিওলজিস্ট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছেন।
**জাইমা রহমান তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা।
**উপমহাদেশের ইতিহাসে এত বেশি দিন নির্বাসিত জীবন যাপন করে একটি জনপ্রিয়তম দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার যে ঐতিহাসিক চরিত্র, তারেক রহমানের তাদের মধ্যে অন্যতম একজন।
> নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর নির্বাসিত ছিলেন
>গ্রীসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জর্জ পাপান্দ্রেউ নির্বাসিত ছিলেন কয়েক বছর
>প্রতিবেশি ভারতের রাহুল গান্ধী ছিলেন কিছু সময় নির্বাসনে
>পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ছিলেন নির্বাসনে
>পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ২০১৩-২০১৮ নির্বাসনে ছিলেন। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফও ছিলেন লন্ডনে নির্বাসিত।
>নির্বাসনে ছিলেন ইরানের জাতীয় নেতা প্রয়াত খোমেনীও।
সাধারণ সদস্য পদ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করা তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিগত দুই যুগ ধরে আলোচিত এই অধ্যায়ের নাম। যিনি রাজনীতির প্রধান চরিত্র হিসেবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রতিষ্ঠার পেছনে তার সংগ্রাম, ত্যাগ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দিকটিই বেশি প্রাসঙ্গিক।
৫ আগস্ট পরবর্তী স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ছিলো কবে ফিরছেন তারেক রহমান। অবশেষে সব শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ২৫ ডিসেম্বর দেশের মাটিতে পা রাখছেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা। তার এই আগমনকে ঐতিহাসিক বলছে বিএনপি। দলটি বলছে, স্মরনকালের সব রেকর্ড ভাঙবে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
সম্প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার শারিরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রশ্ন ওঠে কেনো ফিরছেন না তারেক রহমান। যার ব্যাখ্যা নিজেই দিয়েছিলেন তারেক রহমান। তার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু তার নিজের ইচ্ছের ওপর নয় বলে জানিয়েছিলেন। পরে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান দেশে এসে বেগম খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন। এরই মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষনা দেন তারেক রহমান।
**তারেক রহমান দেশে ফেরার জন্য ট্রাভল পাসের আবেদন করেন গত ১৮ ডিসেম্বর। পরদিনই তা হাতে পান।
**বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করবেন তারেক রহমান।
**বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার** উড়োজাহাজটি ২৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
**এর আগে বিমানটি সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় এক ঘণ্টা যাত্রাবিরতি করবে।
**তারেক রহমানসহ সফরসঙ্গী ৬ জন :
>সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান,
>কন্যা জাইমা রহমান,
>মিডিয়া টিমের প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ
>ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবদুর রহমান সানি
>তাবাসসুম ফারহানা।
**বিমানবন্দরে অবতরণের পর দলের সিনিয়র নেতারা তারেক রহমানকে স্বাগত জানাবেন।
**এরপর **এসএসএফের নিরাপত্তায় ( হতে পারে) বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কুড়িল বিশ্বরোড সংলগ্ন ৩০০ ফিট এলাকায় নির্মিত সংবর্ধনা মঞ্চে উঠবেন তিনি।
**সেখানে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখবেন। দেশবাসীকে কৃতজ্ঞতা জানাবেন।
**সমাবেশস্থল থেকে সরাসরি যাবেন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অসুস্থ মা বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে।
**মায়ের শয্যাপাশে কিছু সময় কাটাবেন।
**গুলশানের বাসায় ফিরবেন। গুলশান ২ এভিনিউ এর ১৯৬ নম্বর বাড়ি।
**তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে ৩০০ ফিট এলাকা সংলগ্ন মহাসড়কে নির্মিত হয়েছে বিশাল সংবর্ধনা মঞ্চ।
**রোববার দুপুর থেকেই মঞ্চ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি ৪৮ ফিট বাই ৩৬ ফিট মঞ্চ।
** বিভিন্ন রুটে ১০টি ট্রেন : বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢাকায় যাতায়াতের উদ্দেশ্যে বিশেষ ট্রেন ও অতিরিক্ত কোচ বরাদ্দ করেছে রেলওয়ে। মানুষ এসেছে বাস- লঞ্চ- ট্রাক- মাইক্রোবাসেও।
**প্রায় ৩০ লক্ষাধিক দলীয় নেতাকর্মীসহ প্রায় ৫০ লাখ মানুষের উপস্থিতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের শক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যও রয়েছে এই আয়োজনকে ঘিরে। **ইতোমধ্যে তার এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বইছে উৎসবের আমেজ। বলা যায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন রূপ নিয়েছে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে।
**দেশের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে কঠোর নিরাপত্তার বলয়ে থাকবেন তারেক রহমান। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)-এর নিরাপত্তা প্রটোকল সরবরাহ করা হবে**। এ ছাড়া পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রায় দুই হাজার সদস্য কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে।
**বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং গুলশান এভিনিউয়ের বাসভবন পর্যন্ত পুরো পথটি নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হবে।
**পুলিশের স্পেশাল এস্কর্ট ছাড়াও সাদা পোশাকে ও পোশাকি পুলিশের পাশাপাশি বিএনপির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী ‘চেয়ারপার্সন সিকিউরিটি ফোর্স’ (সিএসএফ) সমন্বিতভাবে এই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।
**নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৩ ডিসেম্বর থেকেই পুলিশের বিশেষ পাহারা শুরু হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত প্রতিটি থানা এলাকায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নতুন করে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
**তারেক রহমানের ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করা বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন বুলেট প্রুফ ‘হার্ড জিপ’ গাড়ি দেশে আনা হয়েছে। টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো এলসি ২৫০ মডেলের এই গাড়িটি ইতোমধ্যেই বিএনপির নামে নিবন্ধিত হয়েছে। এ ছাড়া তার নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের জন্য বুলেট প্রুফ বাসও দেশে চলে এসেছে। বাসটি রবিবার চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হয়েছে।
**তারেক রহমান নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণের জন্য আগামী ২৭ ডিসেম্বর ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রণয়নের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন।
**সল্প সময়ের মধ্যে জিয়াউর রহমানের সমাধি জিয়ারত করার কথা রয়েছে তারেক রহমানের।
**ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আগমনকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে বিএনপির গুলশান ও নয়াপল্টন কার্যালয়। উদ্বোধন হযেছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরবচারনা অফিস।
**বিএনপির নেতারা বলছেন- ১৭ বছর ধরে তাকে তার পরিবার, দেশ ও মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। তিনি তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি, এমনকি ছোট ভাইয়ের লাশ ও জানাজায়ও অংশ নিতে পারেননি। এসব ঘটনার জন্য স্বৈরচার শেখ হাসিনা দায়ী।
**দলীয় নেতাকর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তার এই প্রত্যাবর্তনকে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছে বিএনপি।
**বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০'র পথ ধরে ২০২২ সালে রাষ্ট্র সংস্কারের ২৭ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেন তারেক রহমান। যার মূল অঙ্গীকার রাষ্ট্র ও দেশকে নতুন একটি দিগন্তের প্রান্তে নিয়ে যাওয়া।
**পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জুলাইতে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও দীর্ঘ মতবিনিময়ের পর ঘোষিত হয় ৩১ দফা। যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বিনির্মাণের নতুন এক ইশতেহার ৩১ দফা।
জীবন বৃত্তান্ত :
**তারেক রহমান; জন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯৬৫
**বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের একজন সাক্ষী এবং অংশগ্রহণকারী তারেক রহমান।
**১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যুদ্ধে গেলে তাকে, তার মা এবং তার ভাইকে, অন্যান্য আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে গ্রেফতার করা হয়।
**তারেক রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কারাবন্দী হওয়া সর্বকনিষ্ঠ কারাবন্দীদের একজন।
**ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হন।আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।
**১৯৮৮ সালে দলের গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়।
**১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি তার মা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেন।
** ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই দলের কর্মকান্ডে জরান তারেক রহমান।
**২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে চেয়ারপারসনের ছেলে হয়েও এবং তৃণমূল থেকে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও তিনি স্বজনপ্রীতি করে কোনো মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্যপদ গ্রহণ না করে দলের তৃণমূলের ক্ষমতায়নে মনোনিবেশ করেন।
**দল সংগঠনে তার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০২ সালে স্থায়ী কমিটি তাকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত করে।
**২০০৫ সালে, তারেক রহমান দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন করেন এবং বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা ইউনিটের সাথে মতবিনিময় করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
**২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সামরিক শাসকদের বেআইনি ক্ষমতা দখলের পর জনাব তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়।
**তখনকার সরকারি দপ্তরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ব্যক্তিরা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের জনাব রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য করেছিল।
**এসময় তার মা বেগম জিয়াকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে তাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে যেতে হয়েছিল।
**বাংলাদেশে নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন- এই ইস্যুতে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতার জের ধরে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিতে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিলো, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘ওয়ান ইলেভেন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
**আওয়ামী লীগসহ সমমনা দলগুলোর আন্দোলনের মুখে রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে তখনকার প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ১১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি সে বছরের ২২ জানুয়ারি যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল তা বাতিল করেছিলেন।
**এর সূত্র ধরেই ক্ষমতায় এসেছিলো সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার প্রধান হয়েছিলেন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ। আর তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ।
**মঈন ইউ আহমেদ সে সময়ের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে ‘শান্তির স্বপ্নে: সময়ের স্মৃতিচারণ’ নামক একটি বই লিখেছেন। সেই বইতে তিনি ওয়ান ইলেভেনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। কোন পরিস্থিতিতে তখনকার সামরিক কর্মকর্তারা জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে ছিলেন তাও বইতে উল্লেখ করেন তিনি।
জরুরি অবস্থা জারির পর রাজনৈতিক দলগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। শুরু হয় রাজনৈতিক নেতাদের ধরপাকড়। দুর্নীতির অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকে গ্রেপ্তার হন। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানকে ক্যান্টমেন্টের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে পাঠানোর নানা চেষ্টা ছিল। তবে তিনি দেশ ছাড়তে রাজি হননি। ফলে একই বছর ৩ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করে বিশেষ কারাগারে নেওয়া হয়।
**কারাগারে তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন হয় বলে অভিযোগ করে এসেছে বিএনপি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠাতে হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তখনকার পিজি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুক্তি পান তিনি। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পান। ওদিন তখনকার পিজি হাসপাতালে মা-ছেলের দেখা হয়। ওইদিন রাতেই তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
**২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ধীরে ধীরে বিএনপির পুনর্গঠনে যুক্ত হন। **২০১৮ সালে, যখন সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বেগম খালেদা জিয়া মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে বন্দী হন, তখন তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনীত করা হয়। তখন থেকেই তিনি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
**১৯৯৪ সালে, তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রাক্তন নৌবাহিনী প্রধান এবং পরবর্তী সরকারের দুই বারের মন্ত্রী প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা ডাঃ জোবায়দা রহমানকে বিয়ে করেন। জোবায়দা রহমান একজন কার্ডিওলজিস্ট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছেন।
**জাইমা রহমান তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা।
**উপমহাদেশের ইতিহাসে এত বেশি দিন নির্বাসিত জীবন যাপন করে একটি জনপ্রিয়তম দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার যে ঐতিহাসিক চরিত্র, তারেক রহমানের তাদের মধ্যে অন্যতম একজন।
> নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর নির্বাসিত ছিলেন
>গ্রীসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জর্জ পাপান্দ্রেউ নির্বাসিত ছিলেন কয়েক বছর
>প্রতিবেশি ভারতের রাহুল গান্ধী ছিলেন কিছু সময় নির্বাসনে
>পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ছিলেন নির্বাসনে
>পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ২০১৩-২০১৮ নির্বাসনে ছিলেন। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফও ছিলেন লন্ডনে নির্বাসিত।
>নির্বাসনে ছিলেন ইরানের জাতীয় নেতা প্রয়াত খোমেনীও।
সাধারণ সদস্য পদ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করা তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিগত দুই যুগ ধরে আলোচিত এই অধ্যায়ের নাম। যিনি রাজনীতির প্রধান চরিত্র হিসেবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রতিষ্ঠার পেছনে তার সংগ্রাম, ত্যাগ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দিকটিই বেশি প্রাসঙ্গিক।