শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
পর্যটন ঘুরে দেখি মক্কার পবিত্র স্থানসমূহ

ঘুরে দেখি মক্কার পবিত্র স্থানসমূহ

হাজিদের হজব্রত পালনের জন্য পবিত্র নগরী মক্কায় অবস্থান করতে হয়। মক্কা নামের মধ্যেই অন্যরকম এক বিশুদ্ধতা। সৌদি আরবের একটি শহর মক্কা। মুসলিম জাতির শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মভূমি। ইসলামের বহু সমৃদ্ধ ইতিহাস ও মুহাম্মদ (সা.)-এর অনেক অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এ নগরকে ঘিরে। রয়েছে কুরাইশ বংশধরদের আভিজাত্য, আবু জাহেলের অত্যাচারের করুণ চিত্র। মহানবী (সা.) ইসলাম প্রচারে বাধাগ্রস্ত হয়ে এ মক্কা থেকেই ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হিজরত করে মদিনা গিয়েছিলেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আসমানি কিতাব কোরআন শরিফের আয়াত এ শহরের জাবালে নূর পাহাড়ে প্রথম নাজিল হয়েছিল।

জাবালে নূর-এর অর্থ আলোর পাহাড়। ওহি নাজিল হওয়ার আগে যখন মহানবী (সা.) জাবালে নূর পাহাড়ে ধ্যানে বসতেন তখন তাঁর বিবি খাদিজা (রা.) প্রতিদিন তিনবেলা করে, সেই উঁচু পাহাড়ে উঠে খাবার দিয়ে আসতেন। যা এ যুগের নারীদের জন্য অনুপম শিক্ষণীয় বিষয়। প্রতি বছর আরবি মাসের ৮ জিলহজ শুরু হয়ে ১২ জিলহজ পর্যন্ত চলে মুসলমানদের হজের আনুষ্ঠানিকতা। সারা পৃথিবী থেকে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৩ মিলিয়ন মুসল্লি আসেন পবিত্র হজ পালনের জন্য। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এত এত মানুষের আনাগোনা তার পরও সবকিছুই থাকে সুশৃঙ্খল। বিশেষ করে তাওয়াফের দৃশ্য দেখলে কেউ আশ্চর্য না হয়ে পারবে না। আনুগত্য, ভক্তি, আল্লাহভীরু ও শৃঙ্খলার অনন্য দৃষ্টান্ত তাওয়াফকালীন মুহূর্ত। প্রত্যেককেই নিজ নিজ দেশ থেকে যাওয়ার পর হজ শুরুর আগেই মক্কা শহরের পবিত্র কাবা ঘিরে ওমরাহর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ায় সায়ি করতে হয়। কাবা শরিফেই বেহেশতি পাথর হাজরে আসওয়াদ রুপার ফ্রেমে সাঁটানো রয়েছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬০৫ সালে কাবার দেয়ালে হাজরে আসওয়াদ পাথরটি স্থাপন করেছিলেন। ইসলাম-পূর্ব পৌত্তলিক যুগ থেকেই পাথরটি সম্মানিত হয়ে আসছে।

তাওয়াফের শুরুতেই হাজরে আসওয়াদে চুমু দিয়ে, অবশ্য ভিড়ের কারণে কাছ থেকে না পারলেও দূর হতে দুই হাত তুলে তালুতে চুমু দিতে হয়। যা বর্তমানে হাজি ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অনন্য আকর্ষণ। আরেক বেহেশতি পাথর মাকামে ইব্রাহিম কাবাসংলগ্ন। মাকামে ইব্রাহিম ওই পাথর, যে পাথরে দাঁড়িয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) পবিত্র কাবাঘর নির্মাণ করেছিলেন। সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, কাবাঘর নির্মাণের সময় আল্লাহর হুকুমে পাথরটি প্রয়োজন অনুযায়ী হজরত ইব্রাহিম (আ.) কে নিয়ে ওপরে-নিচে ওঠা-নামা করতেন। পাথরটিতে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পা মুবারকের চিহ্ন রয়েছে।

এর সামনে দুই রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। এটিও হাজি ও পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। যতদূর জানি, পবিত্র বায়তুল্লাহ শরিফ পৃথিবীর মধ্যভাগে প্রতিষ্ঠিত। সারা দুনিয়ার মধ্যে মুসলমানদের সবচাইতে পবিত্রতার প্রথম স্থানে থাকা বায়তুল আল-হারাম মসজিদ এ মক্কাতেই। প্রায় ১০ লাখ নামাজি একত্রে জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন। হজ মৌসুমে প্রায় ৪০ লাখ মুসল্লির স্থান সংকুলান হয়। এর রয়েছে সুউচ্চ ৯টি দৃষ্টিনন্দন মিনার। আল-হারাম মসজিদের মোট ৮১টি দরজা রয়েছে, যা সব সময় প্রার্থনাকারীদের জন্য খোলা থাকে।

হজ করতে ইচ্ছুক আর ভ্রমণপিপাসুরা ভাবুন তো একবার, এরকম একটি মসজিদে নামাজ পড়াটা কতটা সৌভাগ্যের। ২০১২ সালের হিসাব অনুসারে মক্কায় ২ মিলিয়ন মানুষের বসতি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এ শহরের উচ্চতা ৯০৯ ফুট। আধুনিক মক্কা শহর এখন আরও নান্দনিক। প্রশস্ত সড়ক, নয়নাভিরাম সব স্থাপনা পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। বাড়তি সৌন্দর্য প্রাকৃতিক নিদর্শন শত শত পাহাড় তো রয়েছেই। পুরো শহরটাই পাহাড়বেষ্টিত। পবিত্র হারাম শরিফের পাশেই আবরাজ আল বাইত হোটেলের ওপর স্থাপন করা হয়েছে বিশ্বের সবচাইতে বড় ঘড়ি। যার নির্মাণকাজ ২০০২ সালে শুরু হয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০১২ সালে উদ্বোধন করা হয়েছে। পুরো মক্কা শহর থেকে রাতে ১৭ ও দিনের বেলা ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত এর সময় স্পষ্ট দেখা যায়।

ঘড়িটিতে সাদা ও সবুজ রঙের প্রায় ২১ হাজার বাতি ব্যবহার করা হয়েছে। মুসলমানদের বিশেষ দিনগুলোতে ঘড়ির ওপর আকাশের দিকে ১০ কিমি পর্যন্ত ১৬ রঙের আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায়। প্রতি ৫ ওয়াক্ত নামাজের সময় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত ফ্ল্যাশ লাইটের মাধ্যমে নামাজের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। ঘড়িটির ওপর বড় করে আল্লাহু লেখা রয়েছে। যা চারপাশ থেকে একই রকম দেখা যায়। ঘড়িটির সময় গ্রিনিচ সময় থেকে তিন ঘণ্টা এগিয়ে। এ শহরের প্রতি পৃথিবীর সব মুসলমানের রয়েছে এক অন্যরকম অনুভূতি ও ভালোবাসা। জীবদ্দশায় একবার হলেও মক্কা শহরে অবস্থিত পবিত্র কাবা শরিফ দেখার আকুল বাসনা থাকে সব মুসলিমের হৃদয়ে। সেই বাসনা থেকেই আমিও এবার পবিত্র হজ পালনের জন্য ছুটে গিয়েছিলাম পবিত্র মক্কা শহরে।

ইসলামি মতে, একজন হাজির হজ কবুল হলে তিনি শিশুর মতো পবিত্র হয়ে যান। এরকম সুযোগ কে চাইবে মিস করতে। কবুল হবে- এরকম আশা রাখাটাই উত্তম। স্বভাবসুলভভাবে হজ পালন শেষে ঘুরে বেড়িয়েছি শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে। ভ্রমণ যেহেতু আমার নেশা, সেহেতু ঘুরে ঘুরে ইসলামের নিদর্শনগুলো দেখার সুযোগ হাতছাড়া করিনি। তাছাড়া ভ্রমণ করা সুন্নতও বটে। বর্তমানে পবিত্র বায়তুল্লাহর সীমানা প্রাচীরের মধ্যেই রয়েছে একদা জালিম হিসেবে পরিচিত আবু জাহেলের বসতবাড়ি।

যেটিকে এখন তার প্রতি সম্ভবত ঘৃণাস্বরূপ মুসল্লিদের জন্য টয়লেট তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। একটু দূরেই মহানবী (সা.)-এর বসতভিটা রয়েছে। যা এখন লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বায়তুল্লাহর আরেক পাশে একখণ্ড জমি, তাইসির যাওয়ার পথে পড়ে। এখনো তা অন্ধকার আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের করুণ স্মৃতির সাক্ষী। এখানেই জীবন্ত কন্যাশিশু পুঁতে ফেলা হতো। উড়াল সড়ক হতে জায়গাটা বেশ ভালোভাবে দেখা যায়।

ইসলামের সুমহান বাণী সেই অন্ধকার হতে মানুষকে আলোকিত করেছে। নারীদের দেওয়া হয়েছে বিশেষ মর্যাদা। শহরের মধ্যভাগে রয়েছে মক্কা মিউজিয়াম। সেখানে রক্ষিত রয়েছে আদি কাবাঘরের নমুনা, জমজম কূপের পূর্বেকার নিদর্শন ও যন্ত্রপাতিসহ নানান দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার প্রতিকৃতি। মিউজিয়ামের পাশেই কাবাঘরের গিলাপ তৈরির কারখানা।

আরেকটু এগোলেই চোখ পড়বে, যেখান থেকে জমজম পানি মদিনা এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আগত হাজিদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় জারে করে সাপ্লাই দেওয়া হয়। জিয়ারত করার জন্য হাজিরা মক্কার জান্নাতুল মাওয়ায় গিয়ে থাকেন। যেখানে হাজার হাজার সাহাবিসহ মহানবী হজুর (সা.) প্রথম বিবি খাদিজা (রা.)-এর সমাধি রয়েছে। ইতিহাসের আরেক সাক্ষী সাফা ও মারওয়া পাহাড়। যে দুই পাহাড় ঘিরে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর বিবি হাজেরা (আ.) এবং তাঁদের ছেলে ইসমাঈল (আ.)-এর জীবনী রয়েছে। আল্লাহর দরবারে বিবি হাজেরা (আ.) তৃষ্ণার্ত শিশুপুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর জন্য পানি পান করানোর জন্য দোয়া করলে, আল্লাহপাকের নির্দেশে জিব্রাইল (আ.) পায়ের গোড়ালির মাধ্যমে কূপ খনন করেন। সে সময় থেকেই সৃষ্টি হয় জমজম পানির কুয়া। পবিত্র কাবাঘর হতে জমজম কূপের দূরত্ব মাত্র ৩৮ গজ। বর্তমানে সাফা-মারওয়া পাথুরে পাহাড় দুটো কেটেছেঁটে কাচের গ্লাস দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। তবে এর গুরুত্ব অসীম। হজ ও ওমরাহ পালন করতে হলে এই দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সায়ি করতে হয়। সীমানা বৃদ্ধি করায় সাফা-মারওয়া এখন হারাম শরিফের মক্কা মসজিদের ভেতরেই পড়েছে। ঐতিহাসিক জমজমের কূপ এখন আর উন্মুক্ত নয়। তবে এর পানি পানের যথেষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। জমজমের পানি পান বিশেষ বরকতময়। যেসব হাজি ও ভ্রমণপিপাসু এর গুরুত্ব জানেন তাঁরা তৃপ্তিসহকারে পান করেন এবং সঙ্গে করে নিয়েও যান। জমজমের পানি রোগীদের জন্য বিশেষ শিফা। যা পরম করুণাময়ের দেওয়া বিশেষ নেয়ামত। জমজম পানির বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরীক্ষিত। পবিত্র হারাম শরিফের সামনেই রয়েছে কবুতরের মাঠ নামক একটি জায়গা।

কিন্তু ওটা কোনো মাঠ নয়, চলাচলের প্রশস্ত সড়ক। সম্ভবত বাংলাদেশিরাই এর নামকরণ করেছে। সেখানে রয়েছে হাজার হাজার জালালি কবুতর। খুবই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য। আগত বহু দর্শনার্থী নিজ খরচে খাবার কিনে অবিরাম বিলিয়ে দিচ্ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা, চলে ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতরের আনাগোনা। এক কথায় অসাধারণ সব মুহূর্ত। মক্কাতেই রয়েছে জাবালে সাওর পর্বত। মহানবী (সা.), হজরত আবুবকর (রা.) নিয়ে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের সময় এ পর্বতের গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন। বর্তমানে সেখানে পর্যটকদের প্রজেক্টরের মাধ্যমে, ছাওর পর্বতের দৃশ্যাবলি দেখানো হয়। ইচ্ছে করলে অফিস কক্ষ হতে, বিনামূল্যে বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে সিডি নিয়ে আসতে পারেন। আর যদি আপনি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় হয়ে থাকেন তাহলে পর্বত আহরণের মাধ্যমে স্বচক্ষে দেখে আসতে পারেন।

এর পর আরেকদিন সকাল সকাল এক বাংলাদেশি চালক জহিরের গাড়িতে করে চলে যাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য লীলাভূমি তায়েফ। আজ না হয় এ পর্যন্তই থাক। অন্য আরেকদিন হাজির হব তায়েফ ভ্রমণের গল্প নিয়ে ইনশাআল্লাহ।

তথ্যঃ- প্রথম দিকে যাদের ফ্লাইট হয় তাদের কাফেলা বেশির ভাগ সময় পবিত্র মদিনায় অবস্থান করে। সুতরাং সেখানেও কাছে-ধারে ঘুরে বেড়াবেন। তবে অবশ্যই বাদ ফজর। কোনো অবস্থাতেই যেন ঘুরতে গিয়ে মসজিদে নববিতে জামায়াতে নামাজ আদায়ের ব্যাঘাত না ঘটে।

খুঁজুন