সেশেলেস (Seychelles) বিশ্ব ভ্রমণে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আমার ১৫৯তম দেশ। সেশেলস–১১৫টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দেশ। প্রথমে আমি এই দেশের নাম শুনে ভেবেছিলাম, এটা বুঝি কোনো বড় ফ্রেঞ্চ কলোনি। কিন্তু পরে জানতে পারি, এটি ১৯৭৬ সালের ২৯ জুন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। যদিও তার আগে বহু বছর ফরাসিদের শাসনে ছিল। তাই এখানকার প্রধানত ভাষা ফরাসি, পাশাপাশি ইংরেজি ও ক্রেওলও প্রচলিত।
বাংলাদেশ থেকে যখন বের হয়েছিলাম তখনই ইচ্ছা ছিল আলজেরিয়ায় যাব, কিন্তু হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ায় মার্চ মাসে থাকার সময় ইরান যুদ্ধ বেধে গেল, সেজন্য ইমিরেটস কিংবা কাতার এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করা দুষ্কর হয়ে গেল।
বাংলাদেশ থেকে যখন বের হয়েছিলাম তখনই ইচ্ছা ছিল আলজেরিয়ায় যাব, কিন্তু হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ায় মার্চ মাসে থাকার সময় ইরান যুদ্ধ বেধে গেল, সেজন্য ইমিরেটস কিংবা কাতার এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করা দুষ্কর হয়ে গেল।
তখনই মাথায় এল সেশেলেস দেশটি, যা বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন। যখনই চিন্তা সঙ্গে সঙ্গেই টিকিট কাটব, তারপর হঠাৎ মনে পড়ল আমাদের বাংলাদেশ থেকে এর আগে কে ভ্রমণ করেছে? ফেসবুক ঘেঁটে দেখলাম, Flyer ট্রাভেল এক্সপ্রেসের সুমন বাহাদুর ভাই বেড়াতে গিয়েছিলেন। তার কাছ ফোন করলেই টিকিট কাটার আগেই তিনি বললেন, ১০ ইউরোতে একটি অন অ্যারাইভাল পারমিট নিতে হয়।
তারপর আমি অনলাইনে টিকিট কেটে ব্যাংকক থেকে ইন্ডিগোয় চেপে বসলাম এই নতুন দেশের উদ্দেশে। ফ্লাইটে ভাড়া অবশ্য খুব বেশি নয়, আফ্রিকার কোনো দেশে যাওয়ার জন্য।
তারপর ২৪ মার্চ চলে এলাম এই দেশে। এয়ারপোর্টে নেমেই অন্য রকম একটা ভালো লাগা কাজ করল। সিকিউরিটির লোকরা হোটেলগুলো একটু যাচাই-বাছাই করে নিল। তারপর সহজেই চলে গেলাম মাহি এয়ারপোর্ট দিয়ে। হোটেল থেকে আগে থেকেই ট্রান্সপোর্ট বলা ছিল ৭৫ ইউরো, যা আমার জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। নীল সমুদ্রের সুন্দর রিসোর্টে চলে গেলাম। থাকা হলো প্রায় ১১ দিন।
এই দেশটি আফ্রিকার অনেক দেশের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত নয়–এটি আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি। এখানকার ট্যুরিজম মন্ত্রণালয় ও লেবার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ হয়েছিল এবং তাদের আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়।
দেশটি আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য–নীল সমুদ্র, বিশাল পাথরের গঠন, সবুজ পাহাড়ে ঘেরা সাদা বালুর সৈকত আর সারি সারি পাম গাছ চোখধাঁধিয়ে দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কচ্ছপগুলোরও দেখা মেলে এখানে, যা সত্যিই অসাধারণ।
সেশেলসের রাজধানী ভিক্টোরিয়া–বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রাজধানীগুলোর একটি। মাহে (Mahé) দ্বীপে এয়ারপোর্টটি অবস্থিত, যদিও এটি আকারে ছোট। আমি যতগুলো আফ্রিকার দেশ ভ্রমণ করেছি, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে ধনী বলে মনে হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য যাচাই করেও দেখা যায়, এটি আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে উন্নত। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার স্থানীয় এবং বাকিরা প্রবাসী কর্মী।
এখানকার গড় বেতন প্রায় ৬২০ ইউরো, যা ইউরোপের কিছু দেশের সমতুল্য। মজার বিষয় হলো, এখানে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, একটি পুরুষ ও তিনটি নারী এবং তারা আধুনিক, আত্মনির্ভরশীল ও শিক্ষিত। তারা খুবই উদার, আনন্দপ্রিয় ও সহজ-সরল। অনেক সময় মনে হয় না যে আমি আফ্রিকায় আছি—বরং ইউরোপের কোনো দ্বীপে আছি।
এখানকার প্রায় সব পণ্যই আমদানি করা হয়, তাই জীবনযাত্রার খরচ একটু বেশি। যেমন–একটি টমেটোর দামই প্রায় ১৪০ টাকা! শ্রমিকের সংকট থাকায় সবকিছুর দামই তুলনামূলক বেশি। তবু দেশের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা খুব ভালো।
বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে এখানে শ্রমবাজারে ভালো সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর হানিমুনের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম সুন্দর একটি গন্তব্য। অনেকেই মালদ্বীপ ঘুরে ফেলেছেন–তাদের জন্য সেশেলস হতে পারে চমৎকার বিকল্প।
এখানে বেশির ভাগ হোটেলে সেলফ-ক্যাটারিং সুবিধা আছে, অর্থাৎ আপনি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে নিজেই রান্না করতে পারেন। অনেক হোটেলেই হালাল খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা লাগে না–শুধু হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকিট এবং অনলাইনে আগমনী কার্ড পূরণ করলেই হয়।
তবে বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য এটি সাশ্রয়ী নয়। সেলফ-ক্যাটারিং হোটেলের খরচ প্রতিদিন ১২০ থেকে ২০০ ইউরো (দুজনের জন্য)। আর বিলাসবহুল হোটেলগুলোর দাম ৪৫০ ইউরো থেকে শুরু করে ৪০০০ ইউরোরও বেশি হতে পারে। খাবারে প্রায় ২৫ ইউরো (প্রতি ব্যক্তি) খরচ হয়।
তবে বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য এটি সাশ্রয়ী নয়। সেলফ-ক্যাটারিং হোটেলের খরচ প্রতিদিন ১২০ থেকে ২০০ ইউরো (দুজনের জন্য)। আর বিলাসবহুল হোটেলগুলোর দাম ৪৫০ ইউরো থেকে শুরু করে ৪০০০ ইউরোরও বেশি হতে পারে। খাবারে প্রায় ২৫ ইউরো (প্রতি ব্যক্তি) খরচ হয়।
আমি এখানে কয়েকটি দ্বীপে ঘুরেছি–প্রাসলিন আইল্যান্ড ছিল দারুণ সুন্দর। Les Ducs Resort এবং Paradise Sun হোটেলগুলো বেশ ভালো লেগেছে, তুলনামূলক কম খরচে ভালো সেবা দেয়। প্রথমে আমি থেকেছিলাম টাকামাকা বিচে, মাহে দ্বীপে–সেটিও অসাধারণ। বোভালন সৈকত খুবই আকর্ষণীয়, যেখানে বিচ শ্যাক ও বোট হাউস রেস্টুরেন্টে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং সন্ধ্যাটা খুব সুন্দরভাবে কাটানো যায়। এখানে জাতীয় ফল কিংবা জাতীয় প্রতীক কোকো।
যে গাছটি চমৎকার, ছেলে ও মেয়ে দুটি গাছের সমন্বয় এখানে ফল ধারণ করে। মেয়ে গাছটির ফলের গঠন মেয়েদের শরীরের নিম্নাংশের মতো, যা একটি নারী গোপন অংশের মতো দেখতে আর ছেলে গাছটির লিঙ্গটি দেখতে ঠিক পুরুষের লিঙ্গের মতো। এই গাছটির ফল ধরে সবুজ রঙের একটি লেজার আছে, তার মাধ্যমে সে ছেলে গাছটির কাছ থেকে এক ধরনের সাদা পাউডার খেয়ে মেয়ে গাছটির কাছে গিয়ে তার গোপন অংশের চেটে পাউডার ছড়ায়, তারপর সেখানে ফল ধরে। এই গাছটি পৃথিবীতে অনন্য হওয়ায় একে তাদের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
এখানে বেশ কিছু ক্যাসিনো রয়েছে, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং পরিবেশও উপভোগ্য–খেলার জন্য নয়, বরং সময় কাটানোর জন্য। তবে অবাক হয়েছি ক্যাসিনোগুলোয় বাংলাদেশি শ্রমিকে ভর্তি, বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার রাতে। তাছাড়া মাছ ধরার বড় বড় ট্যুর রয়েছে, যারা সমুদ্রে বড় মাছ ধরতে চান তাদের জন্য এটি চমৎকার অভিজ্ঞতা হতে পারে। সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা ছিল ফ্রুট ব্যাট খাওয়া–৪৫ ইউরো দিয়ে খেয়েছিলাম। মাংসের স্বাদটা একটু মিষ্টি, আর রান্নাটাও ছিল চমৎকার। যারা ভিন্নধর্মী খাবার পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।
এখানে বড় কোনো শপিং মল নেই, তাই শপিংয়ের ঝামেলা ছাড়া নিরিবিলিতে হানিমুন বা পারিবারিক সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ। আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই অসাধারণ যে ছবি তুলতে তুলতে হাতই ব্যথা হয়ে যেতে পারে! সব মিলিয়ে, যারা বাংলাদেশি পাসপোর্টে সহজে ভ্রমণ করতে চান, তাদের জন্য সেশেলস একটি অসাধারণ গন্তব্য হতে পারে। আমার এই দুই সপ্তাহের ভ্রমণ ছিল সত্যিই স্মরণীয়।