শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
ধর্ম হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও জীবনের প্রভাব

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও জীবনের প্রভাব

প্রায় ১৪০০ বছর পূর্বে, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে, আরবের মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন হজরত মুহাম্মদ (সা.), যিনি পরবর্তীতে বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেন। তাঁর জন্মের সময় আরব সমাজ ছিল জাহেলিয়া যুগের অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই সময়ে মানুষের মধ্যে শ্রেণিবৈষম্য, হিংস্রতা, নারীর প্রতি অবমাননা এবং দাসত্বের শৃঙ্খল প্রকট ছিল। কন্যাসন্তান জন্মের পর জীবন্ত দাফনের মতো বর্বর প্রথা প্রচলিত ছিল। এমন এক অন্ধকার যুগে তিনি এসেছিলেন আলোর দিশারী হিসেবে।
জন্মের পূর্বেই পিতৃহারা হন তিনি। প্রথমে পিতামহ আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। কৈশোর থেকেই তাঁর চারিত্রিক শুদ্ধতা, সততা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
নবুয়ত ও ঐশী বাণী
৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় প্রথম ওহি লাভের মাধ্যমে তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন। এই ঐশী বাণী প্রচারের পথ ছিল কঠিন ও বিপদসংকুল। তাঁকে বহু নির্যাতন, অপমান এবং প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। তবু তিনি ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং মানবিকতার মাধ্যমে তাঁর বাণী বিশ্বে ছড়িয়ে দেন। তাঁর শিক্ষা আরব-অনারব বিরোধ দূর করে, শ্রেণিবৈষম্য ভেঙে দেয় এবং নারীর প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনে। তাঁর আদর্শে মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
সমাজ সংস্কারে অবদান
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা সমাজের সকল স্তরে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি শুধু ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, বরং একজন সমাজ সংস্কারকও ছিলেন। তাঁর স্পর্শে দাস বিলাল (রা.) ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। উমর (রা.)-এর মতো প্রচণ্ড যোদ্ধার হৃদয় তিনি ভালোবাসা দিয়ে জয় করেন। আলী (রা.) তাঁর কাছ থেকে শিখেছিলেন কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত আক্রোশকে দমন করে উদারতা প্রদর্শন করতে হয়। তায়েফের যুদ্ধে রক্তাক্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি শত্রুদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যা তাঁর অসাধারণ মানবিকতার প্রমাণ।
বিশ্ব সভ্যতায় প্রভাব
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রভাব শুধু মুসলিম সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সমাজে প্রভাব ফেলেছে। বিখ্যাত জার্মান কবি জোহান উলফগ্যাং ভন গ্যেটে তাঁর সম্মানে কবিতা রচনা করেন। রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয় তাঁর হাদিসের সংকলন সঙ্গে রাখতেন। ইংরেজ ঐতিহাসিক থমাস কার্লাইল তাঁকে ‘মানবসভ্যতার নায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ড. মাইকেল এইচ হার্ট তাঁর বই ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ তাঁকে বিশ্বের সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রথম স্থান দেন, উল্লেখ করে যে তিনি ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ উভয় ক্ষেত্রেই অতুলনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও জীবন মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ আজও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবনকে আলোকিত করছে। তাঁর প্রতি মুসলমানদের ভালোবাসা এবং অমুসলিমদের শ্রদ্ধা তাঁর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি ধৈর্য, ক্ষমা, মানবিকতা এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মহৎ গুণ।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা
বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতা ‘অনাগত’ নবীর জন্ম ও তাঁর প্রভাবের এক অপূর্ব সাহিত্যিক উপস্থাপনা। নিম্নে কবিতার একটি অংশ উল্লেখ করা হলো:
অনাগত
দশদিক ছাপি ওঠে আবাহন, ‘ধন্য ধন্য মুত্তালিব!’
তব কনিষ্ঠ পুত্র ধন্য আবদুল্লাহ্ খোশ-নসিব,
ঔরসে যাঁর লভিল জনম বিশ্ব-ভূমান মহামানব,
ধেয়ানে যাহারে ধরিতে না পারি নিখিল ভুবন করে স্তব।
ধন্য গো তুমি ‘আমিনা’ জননী কেমনে জঠরে ধরিলে তায়
যোগী মুনি ঋষি পয়গম্বর গেয়ানে যাহার সীমা না পায়!
ধন্য ধরণি-কেন্দ্র মক্কা নগরী, কাবার পুণ্যে গো
বক্ষে ধরিলে তাঁহারে, যে-জন ধরেনি; অসীম শূন্যে গো
যাঁহারে কেন্দ্র করিয়া সৃষ্টি ঘুরিতেছে নিঃসীম নভে
ধরার কেন্দ্রে আসিবে সে-জন, এও কি গো কভু সম্ভবে!

খুঁজুন