শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
পর্যটন জানা অজানার নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখা

জানা অজানার নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখা

নায়াগ্রা ফলস সম্পর্কে আমরা সকলেই কম বেশি জানি। আমেরিকার নিউইয়র্ক ও কানাডার অন্টারিও প্রদেশের সীমান্তে এই নায়াগ্রার অবস্থান। 
দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ছুটে আসেন প্রকৃতির সৃষ্ট এই জলপ্রপাতের সৌন্দর্য দেখার আশায়। 
এটি কানাডার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত অন্টারিও প্রদেশের রাজধানী শহর টরন্টো থেকে ১২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ‘Onguiaahra’ শব্দ থেকে নায়াগ্রা কথাটির উৎপত্তি, যার অর্থ ‘জলরাশির বজ্রধ্বনি’।

নায়াগ্রা নদীটি প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো।
এরও আগে ১৮০০ বছর পূর্বে ওন্টারিওর দক্ষিণে প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার বরফে ঢাকা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর নিয়মিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবর্তনের ফলে গলতে শুরু করে বরফ। আর গ্রেট লেকস বেসিনে প্রচুর পানি জমতে থাকে এবং লেক ইরি, নায়াগ্রা নদী আর লেক ওন্টারিও থেকে আসা পানি মিলে এই বিশাল জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়।

বর্তমানে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম জলপ্রপাত নায়াগ্রা।
নায়াগ্রা জলপ্রপাত মূলত তিনটি জলপ্রপাতের সমষ্টি। সবচেয়ে বড় জলপ্রপাতটির নাম হলো হর্সশু ফলস বা কানাডা ফলস। এটি প্রায় ১৬৭ ফুট উঁচু থেকে ২৬০০ ফুট চওড়া পানির স্রোত নিয়ে নিচে আছড়ে পড়ে। বলা হয় নায়াগ্রা জলপ্রপাতের প্রায় ৯০ ভাগ পানি এই ফলস দিয়েই পতিত হয়।

এর পরের ফলসটির নাম আমেরিকান ফলস। এটি প্রায় ৭০ ফুট উঁচু এবং ১৬০০ ফুট চওড়া। অন্যটির নাম ব্রাইডল ভেইল ফলস। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের তিন ভাগের এক ভাগ আমেরিকায়। বাকি দুই ভাগ কানাডায়।
অনুমান করা হয়, আজ থেকে প্রায় দশ হাজার নয়শ বছর আগে এই জলপ্রপাতকে প্রথম চিহ্নিত করা হয়েছিল। পর্যটকদের কাছে এক ভয়ংকর সুন্দর নায়াগ্রা জলপ্রপাত। জলপ্রপাতের দিকে তাকালে একদিকে যেমন ভয়ে আপনার বুক কেঁপে উঠে তেমনি কিছুতেই এর মোহময় আকর্ষণকে আপনি উপেক্ষা করতে পারবেন না।

এই আকর্ষণই অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষকে টেনে আনে নায়াগ্রাকে ছুঁয়ে দেখার কিংবা তার উপর হেঁটে যাওয়ার এক অদম্য বাসনা নিয়ে। 

১৮২৯ সালের অক্টোবরের দিকে স্যাম পেচ নামের এক দুঃসাহসী অভিযাত্রী ঝাঁপ দিয়েছিলেন নায়াগ্রায়। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ঝাঁপ দেয়ার পরও এই ভদ্রলোক কিন্তু বেঁচে গিয়েছিলেন। স্যামের এই অদ্ভত কান্ড আরও অনেক মানুষকে দু:সাহসী করে তোলে এবং তা ধারাবাহিকতায় রূপ নেয়। স্যামের দেখানো পথ ধরেই হেঁটে চলেছেন নায়াগ্রার নায়করা।
কেউ দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে ভয়ংকর এই জলপ্রপাত পার হয়েছেন, কেউ নিজেদের একটা ব্যারেলে ভরে নিয়ে ভেসে গিয়েছেন জলপ্রপাতের উত্তাল জলস্রোতের মধ্যে, ব্যারেলসুদ্ধ আছড়ে পড়েছেন ১৭৩ ফিট উচ্চতা থেকে। এদের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফাঁনামবুলিস্ট’।

পরবর্তীতে জানা যায় নায়াগ্রাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এসব দুঃসাহসী অভিযান করা হয়েছিল। পর্যটকদের মনোরঞ্জনই ছিল যার লক্ষ্য। এজন্য দড়ির উপর দিয়ে হেঁটেও কোন কোন অভিযাত্রী নায়াগ্রা পার হয়েছেন। যেসব নায়ক দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে নায়াগ্রা পার হয়েছেন, তাদের মধ্যে সেরা জাঁ ফ্রাঁসোয়া গ্রাভলো বা দ্যা গ্রেট ব্লঁদ্যা। যিনি ১৮৫৯ থেকে ৬০ সালের মধ্যে মোট ২৩ বার নায়াগ্রা পারাপার করেছিলেন। তার পরেই আছেন সিগনর ফেরিনি, হ্যারি লেসলি, অ্যান্ডউ,প্রফেসর জেঙ্কিন্স, হেনরি বেলেনি, স্টিফেন পিয়র, জেমস হার্ডিরা। নারীও আছেন একজন, মিসেস এ্যানী টেইলর। এদের সাথে এবার যুক্ত হল নিক ওয়ালান্ডার নাম।

তারা সকলেই চেষ্টা করতেন, দড়ির উপর দিয়ে শুধু না হেঁটে মাঝপথে কিছু কায়দাকানুন করে দেখাতে। এ ব্যাপারে সকলকে টেক্কা দিয়েছিলেন ব্লঁদ্যা। তিনি যখনই নায়াগ্রা পার হতেন, সকলের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা থাকত, এবার কি খেল দেখতে পাওয়া যাবে!
প্রথমবার এই কাণ্ড দেখতে জড়ো হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার দর্শক। তারপর সকলের কাছে ব্লঁদ্যার নায়াগ্রা পার হওয়া নিয়ে কোনো সংশয়ই ছিল না। দর্শক মনোরঞ্জনের জন্য কখনো তিনি ঝুলন্ত তারের উপর দিয়ে দৌঁড়াতেন, একপায়ে দাঁড়িয়ে পড়তেন, উল্টো মুখে হাঁটতেন, কখনো আবার ইচ্ছে করে পড়ে গিয়ে তার ধরে ঝুলে দর্শকদের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিতেন। সবচেয়ে রুদ্ধশ্বাস যাত্রা ছিল, যেদিন ইংল্যান্ডের প্রিন্স অফ ওয়েলস অ্যালবার্ট এডোয়ার্ড এসেছিলেন তার খেলা দেখতে। প্রিন্সকে কাঁধে নিয়েই নায়াগ্রা পার হতে চেয়েছিলেন। স্বভাবতই প্রিন্স রাজি হননি। তখন নিজের ম্যানেজার কলকর্ডকে তিনি আদেশ করেন, তার পিঠে চড়তে।

 কলকর্ডকে কাঁধে নিয়ে তিনি হেঁটেছেন, যাত্রাপথে ৭ বার থেমেছেন। সাতবারই কলকর্ডকে পিঠ থেকে নামিয়েছেন। আবার নতুন করে কাঁধে তুলেছেন। আরেক দিনের গল্প ছিল এমন, ব্ল্ঁদ্যা একটা রান্নার স্টোভ নিয়ে তারের উপর দিয়ে হেঁটে মাঝপথে থেমে যান। তারপর স্টোভ জ্বালিয়ে অমলেট বানিয়ে খেলেন। এরপর নায়াগ্রা পার হন। রাতের অন্ধকারেও একাধিক বার তিনি নায়াগ্রা পার হয়েছিলেন।

১৮৫৯ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত এরকম উপায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় নায়াগ্রা পার হওয়া একটা নেশায় পরিণত হয়েছিল। মার্কিন গৃহযুদ্ধের কয়েকটা বছর পর এই খেলা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তারপর আবার শুরু হয়। তখন নায়াগ্রা ফলসকে জয় করার জন্য আরও যেসব খেলা দেখানো হত তা হল, ব্যারেলের মধ্যে ঢুকে জল প্রপাতের সঙ্গে নিচে আছড়ে পড়া, বোটে চেপে জল প্রপাত বেয়ে নিচে নামা বা কোনও কিছুর সাহায্য ছাড়াই জলে ঝাঁপ দিয়ে ভেসে গিয়ে আছড়ে পড়েও বেঁচে ফিরে আসা। স্বভাবতই সকলে বেঁচে ফেরেন নি। অনেকে আবার ভয় পেয়ে মাঝ পথে ফিরেও এসেছেন। ক্রমেই নায়াগ্রা পার হওয়া নিষিদ্ধ হয়ে যায়। অনুমতি চেয়েও অনেকদিন অনেকেই হতাশ হয়েছেন। পরবর্তীতে নায়াগ্রা পার হওয়ার জন্য অনুমতি নিতে হত।এরপর একরকম বন্ধই হয়ে ছিল নায়াগ্রা পার হওয়া। 

তবে ২০১২ সালের ১৫ জুন,
নিক ওয়ালান্ডা নামের এক মার্কিন নাগরিক দুই ইঞ্চি তারের উপর দিয়ে হেঁটে নায়াগ্রা জল প্রপাত পার হয়েছিলেন। কিন্তু নিককে এজন্য কর্তৃপক্ষের কিছু শর্ত মানতে হয়। যেমন: নায়াগ্রা পার হওয়ার জন্য তার শরীরের সঙ্গে সেফটি বেল্ট বাঁধা থাকতে হবে, যাতে নিচে পড়ে গেলেও টেনে তোলা যায়।

তবে নিক যেখান দিয়ে এই জলপ্রপাত পার হয়েছিলেন, সেটি হর্স শু জলপ্রপাতের একেবারেই উপর দিয়ে। ব্লঁদ্যারা পার হতেন জলপ্রপাতের মুখ থেকে খানিকটা সরে গিয়ে, নদীর উপর দিয়ে। কারণ, গোট আইল্যান্ডের কোন পাথরে তাদের তার বাঁধতে দিতে অস্বীকার করেছিলেন আতঙ্কিত গোট আইল্যান্ডের মালিকরা।

ব্লঁদ্যা কি পারতেন যেখান দিয়ে নিক নায়াগ্রা পার হয়েছিলেন, ঠিক সেখান দিয়েই পার হতে?
ব্লঁদ্যা সম্পর্কে যারা জানেন, তাদের মতে, বেঁচে থাকলে তিনি নিকের এই চ্যালেঞ্জকে প্রত্যাখ্যান করতেন কারণ সেটাই ছিল তার স্বভাব। তিনি চাইতেন, অন্যরা তাঁর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুক,

নিক ওয়ালান্ডা তাই বলেছেন, “আমি ওর উত্তরাধিকারকে বহন করতে চেষ্টা করেছি। আমি চেয়েছি এই শহরের নামের সঙ্গে আমার নামটা চিরকালের জন্য যুক্ত হয়ে যাক”।
দড়ির উপর দিয়ে হাঁটা নিশ্চয় নতুন কিছুই নয়। আমাদের গাঁ- গ্রামের মেলাতে এরকম দৃশ্য হরহামেশাই দেখা যায়। মানুষ প্রকৃতিকে জয় করার নিয়ত বাসনা থেকেই ভয়ংকর নায়াগ্রা জলপ্রপাত পার হওয়ার এই দীর্ঘ ইতিহাস।

নায়াগ্রা জলপ্রপাত আকার অনেকটা ঘোড়ার খুরের মতো বাঁকা। আমেরিকা থেকে নায়াগ্রা জলপ্রপাতটি পেছন থেকে দেখতে হয় এবং কানাডা থেকে সরাসরি সামনে থেকে দেখা যায়। এখানে রংধনু দেখতে আকাশের দিকে তাকাতে হয় না, জলপ্রপাতের জলরাশিতেই পর্যটকরা মুগ্ধ হয়ে রংধনু দেখে থাকে। এখানে প্রতিবছর প্রায় ৩০ মিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণ করে থাকেন। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে এই মনোরম জলপ্রপাতটি পরিদর্শনের সেরা সময়। 

এখানে গড়ে উঠেছে সাত ও পাচ তারকা বিশিষ্ট হোটেল মোটেল কাসিনো থীমপার্ক এবং বর্তমান সময়ের সব রকম জমকালো আয়জন। এখানে রয়েছে প্রজাপতির ভাণ্ডার, যেখানে দুই হাজারেরও বেশি রকমের প্রজাপতি রয়েছে। আরো রয়েছে নায়াগ্রা অ্যাকুয়ারিয়াম, মিউজিয়াম, নায়াগ্রা অ্যাডভেঞ্চার থিয়েটার এবং ওয়ার্লপুল স্টেট পার্ক। শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, নায়াগ্রার পানির স্রোতকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে।

খুঁজুন